রুইদাস ছায়ার দিকে তাকায়। নোনা ধরা পাঁচিলের মাথায় একটা আখাম্বা অশ্বত্থ গাছ, সেই গাছ বেয়ে ছেঁড়া ফাটা ছায়া পাঁচিল ডিঙিয়ে রুইদাসের শরীরে নামে, চারপাশে ছাতার মতো ছড়িয়ে যায়। ছায়াটা ওই অশ্বত্থ গাছেরই হুবহু নকল। ওই ছায়াটুকুই রুইদাসের ঘড়ি। কোন সাত সকালে ছায়াটা নামে তা রুইদাস জানেনা। তবে সে যখন সকাল বেলা এসে কাজে বসে, তার আগে থেকেই ছায়াটা তার জন্য অপেক্ষা করে। অফিসে যাওয়ার পথে, বাজার যাওয়ার পথে, চলতি মানুষের তাকে দরকার। সেটা জেনেই সে খুব একটা দেরি করেনা। ছায়াটা তখন থেকেই থাকে, তারপর এগারোটার পর থেকে সে আবার গাছের মাথায় ফিরে যাবার ইন্তাম করে। ছায়ার ডিজাইন ছোট হতে থাকে। যাই যাই করে, গেল গেল করে খুব কপাল জোর হল তো সাড়ে বারোটা। তারপর সে পাততাড়ি গুটিয়ে নেয়। গুটিয়ে নেয় মানে রুইদাসকেও বিছিয়ে রাখা সাজানো যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নেবার নোটিশ দেয়, আর একটু একটু করে সাদা রঙের রোদের ভোঁতড়া চালিয়ে চালিয়ে ছায়াটা হাপিশ করতে থাকে। তথাপি রুইদাস কিছুটা বাড়তি সময় ছায়াহীন রোদে অপেক্ষা করে। জমা রাখা মাল খদ্দেরের হাতে তুলে দিতে হয়। সেই অপেক্ষার নামে আরও কিছু কাজের ফিরিস্তি জমে। সে বড় ব্যস্ত মানুষ।
অন্ধকার নয়। ঝলমলে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকায় সাময়িক অন্ধত্ব রুইদাসের দু’চোখে। ছায়াটা সামান্য ছুঁয়ে আছে রুইদাসকে। পায়ের আঙুলে চেপে ধরে রাখা চামড়া বেঁধা ছুচ হাতড়ে সে কাজে মন দেয়। এইটুকু শেষ করে আজকের মতো বিদায় নেবে সে। কাল আবার নতুন করে শুরু হবে। ক্লান্ত, মুমূর্ষু চটি, জুতোরা রুইদাসের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক । রুইদাসের মতো মানুষ ছাড়া এই কাজের মর্ম কে বোঝে! সে জুতোর একপাটি হাতে নিয়েই বলে দিতে পারে কী তার রোগ, কোন চামড়ায় তাকে গড়া হয়েছে, কতদিন ধরে সে অসুস্থ, এমনকি মালিকের পায়ের গড়নের জন্যই বা কী ধরনের আত্মপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে জুতোটাকে, সেটাও!
রুইদাস একটা ট্যানারিতে কাজ করত। চামড়া পাকা করে তোলার ব্যাপারে তার আন্দাজ ছিল অপরিসীম। চামড়া হাতে নিয়ে সে অনায়াসে বলে দিতে পারে ঠিকমতো ট্যানিং হয়েছে কিনা। তাছাড়া এক এক ধরনের চামড়ার এক এক রকমের ট্যানিং। ভাল রোজগার ছিল রুইদাসের। কিন্তু কপালে সইলোনা। পুরনো ছিঁড়ে যাওয়া জুতোর দুঃখ তাকে বদলে দিল। ট্যানারির মালিক হাতে পায়ে ধরেছিল রুইদাসের, এ’কাজ ছেড়ে যাসনা রুইদাস, না খেয়ে তুই তো মরবিই, সাথে সাথে আমাকেও মারবি। ক’টা টাকা বেশি লাগলে তাও দেব, তোর মতো ওস্তাদ লোক যে নেই রুইদাস। চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী।
রুইদাস কাজ ছেড়ে দিল। এখন সে মুচি, রুইদাস মুচি। কিন্তু সে যখন ছেঁড়া, আধমরা জুতোটা হাতে নিয়ে তার গায়ে হাত বোলায়, মেরামত করে মালিকের হাতে দেবার সময় নিজেরই গলার গামছা দিয়ে তার গা মুছিয়ে দেয়, সে দৃশ্য যে দেখেছে সে বলবে রুইদাস বুঝি বদ্ধ উন্মাদ।
তার বাড়ি ফেরার একটা রকম আছে। শীত হোক বা গরম, রকমটা একই। জলের বোতল থেকে খানিকটা জল খেয়ে খানিকটা জলে গামছা ভিজিয়ে মাথায় পাট করে রেখে রুইদাস ঝোলা কাঁধে নিয়ে হাঁটা দেয়। সোজা রাস্তা দিয়ে গেলে বাড়ি যেতে তার মিনিট পনেরো লাগে, কিন্তু রুইদাস সারা শহর ঘুরে এ’গলি, সে’গলি, তস্য গলি, লেন, বাইলেন করে এক প্রহর কাটিয়ে ফেরে।
অশ্বত্থ গাছের নিচ থেকে বেড়িয়ে সে ধরল জান মহম্মদ রোডের সোজা চওড়া রাস্তা। সেখান থেকে কানাইদাস বৈরাগী লেন হয়ে গিয়ে উঠল মক্কেশ্বরের রাস্তায়। রুইদাস ঘোরে, ক্লান্ত পায়ে জনপদের নির্জনতম তস্য গলির ভেতরেও পা রাখে। রোদ মরে গিয়ে ছায়া গাঢ় হলে রায়পাড়ার গা দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি শান্ত গলির ভেতরে একটি ভগ্নপ্রায় দোচালা ঘরে গিয়ে যখন তার চলা থামে, তখন তার ঝোলা ভরে উঠেছে ছেঁড়া চটি আর জুতোয়। দুটি ভাত খেয়ে রুইদাস তাদের গা থেকে নোংরা তোলে, ছেঁড়া-ফাটা অংশ মেরামত করে, অতি সাবধানে পেরেক গাঁথে তাদের জীর্ণ শরীরে। যেটার একপাটি নেই সেটার দোসর বানায় অন্য শরীর দিয়ে। ধীরে ধীরে সেগুলো তাদের নিজস্ব উজ্জ্বল শরীর ফিরে পেলে রুইদাস পাগলের মতো হাসে আর বিড়বিড় করে তাদের উদ্দেশ্যে কথা কয়, বলে, নাও, আবার শহরের এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরে বেড়াও পায়ে পায়ে।
একদিন রুইদাস ঘুরতে ঘুরতে একটা নাম না জানা মেয়ে ইস্কুলের সামনের ডাস্টবিন থেকে একপাটি জুতো পেল। আনকোরা নতুন একপাটি জুতো। মেটে লাল রঙের উজ্জ্বলতা এতটুকু মলিন হয়নি। নাকের কাছে এনে রুইদাস নতুন জুতোর গন্ধও অনুভব করে। তার মন বলে এই ইস্কুলের কোনো মেয়ের জুতো নিশ্চয়ই। সে জুতোটা কুড়িয়ে নিয়ে ইস্কুল বাড়ির দিকে তাকায়। ইস্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। খোলা থাকলে সে জুতোটা জমা দিয়ে আসতো। এখন সে কী করবে? যার জুতো সে কি আসবে খুঁজতে? বিকেল গড়িয়ে যাওয়া ম্লান আলোয় সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে যায় রুইদাস। যদিও সে জানে এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো গলির ভেতর আবর্জনা্র আড়ালে তারই জন্য অপেক্ষা করে আছে মৃতপ্রায় চটি জুতোরা। তবু রুইদাস আশা করে, যদি কেউ খুঁজতে আসে।
অনেকটা সময় নষ্ট হয় রুইদাসের। কেউ আসেনা জুতোর খোঁজে। এমনকি পরের দিন ইস্কুল বসার সময় সে জুতোটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঠায় আধ ঘণ্টা। কেউ আসেনা। মেয়েগুলোর পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ফাঁকা হয়ে যায় রাস্তা।
এখনও রুইদাস খুঁজছে। সারা শহর জুড়ে ঘুরে ঘুরে সে খুঁজছে আর এক পাটি মেটে লাল উজ্জ্বল জুতো। তার বিশ্বাস একদিন সে আর একপাটি খুঁজে পাবেই। শহরের সব ছেঁড়া-ফাটা হারিয়ে যাওয়া জুতোরা তো তার কাছেই ফিরে আসে আর নতুন হয়ে পায়ে পায়ে ঘোরে। খালি পায়ের মানুষ দেখলেই সে তার সারিয়ে তোলা একজোড়া জুতো বিলিয়ে দেয়। তবে একদিন সেই মেটে লাল জুতোও তার হাতে আসবে। আর যাদি না-ই আসে তাহলে সে হুবহু একটা নতুন বানিয়ে নেবে, আর তারপর খুঁজে খুঁজে বার করবে হুবহু একজোড়া পা। এমন একটা স্বপ্নদোষ ছুটিয়ে নিয়ে যায় রুইদাসকে।
রুইদাস সম্ভবত সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নয়। অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় সে নিত্য বসে থাকে একা। আপন মনে জুতো সারায় আর প্রতিটি পথচলা মানুষের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। খালি পায়ের মানুষ দেখলে কাছে ডাকে। তার পায়ের দিকে তাকিয়ে একজোড়া চপ্পল বার করে ঝোলা থেকে। সব মানুষ অবশ্য আসেনা। মাঝে মাঝে একনিষ্ঠ চোখ তুলে হঠাৎ পাশে রাখা পলিথিনের প্যাকেট থেকে লাল জুতোটা বার করে দেখে, দেখতেই থাকে। আবার ঢুকিয়ে রাখে একসময়। বাড়ি ফেরার পথে ইস্কুলের সামনে একবার থমকায়, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, আবার হাঁটা দেয়। বাড়ি ফিরে বউ শ্যামাদাসী ভাত বেড়ে দিলে, সেটা খেতে খেতে বলে, মাইয়াটার লক্ষ্মীমন্ত চরণ ছিল। আমি জুতা দেইখলে মানুষটারেও দেখতি পাই। শ্যামাদাসী নির্বিকার শোনে শুধু। সে রুইদাসের কথা আর কাজের খেই বুঝতে পারেনা। ছেঁড়া চটি আর জুতোর সংসারে রুইদাস তার সাথে কটা কথাই বা কথা পাড়ে, তার সকল কথাই তো মরা চামড়ার সাথে। কর্তার খাওয়া শেষ হলে সে একটা হাত পাখা নিয়ে চৌকিতে শরীর বিছিয়ে দেয়। রুইদাস সারাদিন ধরে দেখা খালি পায়ের জন্য কুড়িয়ে আনা চটি-জুতোর পাহাড় নিয়ে বসে।
দিন সাতেক বাদে রুইদাসের কানে একটা খবর আসে হাওয়ায়। একটা নিরুদ্দেশ হওয়া ইস্কুলের মেয়ের দেহ পাওয়া গেছে মক্কেশ্বর ঘাটে, নদীর ধারের ঝোপে। দেহর পাশেই পাওয়া গেছে ইস্কুলের ব্যাগ আর একপাটি লাল জুতো। রুইদাসের ছুঁচ চামড়া ভেদ করে থেমে যায়! একবার অস্ফুটে বিড়োয়, লক্ষ্মীমন্ত চরণ ছিল গা, লক্ষ্মীমন্ত চরণ!
উঠে দাঁড়ায় রুইদাস। পলিথিনের প্যাকেটটা হাতে জড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রুইদাস। অশ্বত্থ গাছের তলায় তার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর দৃশ্য স্তব্ধ করে দেয় গোটা শহর যেন! তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে রুইদাস মক্কেশ্বর ঘাটের দিকে। জান মহম্মদ ঘাটের শেষ মাথা থেকে কানাই বৈরাগী লেন হয়ে সোজা মক্কেশ্বর ঘাটের দিকে।
রুইদাস গিয়ে দেখল চারপাশ ফাঁকা, কেউ নেই, দেহ নেই, পুলিশ নেই, উৎসাহী মানুষের ভিড় নেই, সবাই চলে গেছে। নদীর কিনারে ঝোপের ধারে একা দাঁড়িয়ে সে দেখল একপাশে কাদায় গিঁথে রয়েছে লাল রঙের একপাটি জুতো। রুইদাস সযত্নে জুতোটা তুলে নিল, কাঁধের গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিল তার গায়ের কাদা, মুছতে মুছতে দু’গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জলে পরিস্কার হয়ে গেল বাকি মলিনতা। পলিথিনের প্যাকেট থেকে বাকি একপাটি জুতো বার করে সে চোখ বুজিয়ে নিথর দাঁড়িয়ে থাকল নদীর দিকে ফিরে। মনে মনে জুতো জোড়া মৃত শরীরের পায়ে পড়িয়ে দিল বুঝি।
রুইদাস তো সুস্থ নয়, তাই তার চোখের জলের কোনো মানে নেই। মেয়েটির জন্য সে কাঁদছে নাকি জুতোর জন্য, সে কেউই জানে না। কিন্তু সে অনাবশ্যক কাঁদে। অনেকদিন হল অশ্বত্থ গাছের তলায় তাকে কেউ বসতে দেখেনা। পাড়ায় পাড়ায় ছেঁড়া চটি-জুতো কুড়িয়ে বেড়াতে দেখেনা কেউ। কিন্তু রুইদাস ছিল। শহরের আনাচে কানাচে সে ঘুরে ফিরে দেখা দিত, এক কাঁধে বড় ঝোলার ভারে কাত হয়ে, পলিথিনের প্যাকেট হাতে নিয়ে হেঁটে চলেছে, কিছু একটা প্রলাপ বকছে বিড়বিড় করে।
স্টেশন লাগোয়া ভাঙা পাঁচিলের ওপর বসে বসে পা দোলাচ্ছিল এক পাগলিনী। তার কাছে গিয়ে রুইদাস বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। অনেকটা সময় চুপ করে থেকে বলল, এই তো সেই লক্ষ্মীমন্ত চরণ! তোমার চরণ দুইখান সন্মুখে এগিয়ে দাও দেখি মা। পাগলিনী হাসতে হাসতে পা দুটো এগিয়ে দেয়। রুইদাস তার পায়ে জুতো দুটো পড়াতে গিয়ে দেখে হুবহু একই মাপ! উজ্জ্বল মেটে লাল রঙের জুতোয় ঢাকা দুটি লক্ষ্মীমন্ত পায়ের দিকে রুইদাস হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
নারীরা ঘরের ভিতর আসে আর যায়,
মাইকেলএঞ্জেলো নিয়ে খালি বকে যায় ।
যে হলদে কুয়াশা পিঠ ঘষে যায় জানলার শার্সিতে,
যে হলদে ধোঁয়াটা নাক রগড়ায় জানলার শার্সিতে,
যার জিভ চাটে সন্ধ্যার আনাচ কানাচ,
নর্দমা জলে খানিক দাঁড়ায়
চিমনি থেকে গড়িয়ে নামা ঝুল কালি পিঠে গড়িয়ে পড়ে
ছাদ থেকে পিছলায়, ছোট্ট লাফায়,
অক্টোবরের নরম রাতের পেলব পরশ পেয়ে,
বাড়ির কোথাও গুটিয়ে থেকে অঘোরে ঘুমায়।
আর নিশ্চয় সময় থাকবে
হলদে কুয়াশা রাস্তা ধরে গড়িয়ে পড়ার জন্য,
জানলার শার্সিতে নিজের পিঠ ঘষার জন্য;
সময় থাকবে, থাকবে অনেক সময়
সাজবে তোমার মুখ অনেক মুখ দেখার জন্য;
সময় থাকবে ধ্বংস করে সৃষ্টি করার,
আর সময় সকল কাজের জন্য,
হাতে গোনা সব দিনের জন্য
প্রতি উঠে আসা প্রশ্নের জন্য
সময় তোমার জন্য, সময় আমার জন্য,
আর সময় থাকবে বহু সংশয়, দ্বিধা দ্বন্দ্বের,
সময় থাকবে শুধরে নেওয়া অজস্র স্বপ্নের,
যদি তার আগে এক কাপ চা বিস্কুট হয়।
নারীরা ঘরের ভিতর আসে আর যায়,
মাইকেলএঞ্জেলো নিয়ে খালি বকে যায় ।
আর সময় নিশ্চই থাকবে ভাবার,
“একটু সাহস করব?” “করব আমি সাহস?”
সময় থাকবে, পিছন ফিরে, সিঁড়ি বেয়ে নামতে
মাথার মধ্যে চুল সরিয়ে খোলা টাক ঢাকতে—
(ওরা তখন বলবে:”দেখ ওর চুল কত পাতলা হয়ে গেছে!”)
আমার মর্নিং কোট, বেষ্টিত কলার উন্নত চিবুকের কাছে,
আমার দামি, শৌখিন টাই, ছাপোষা পিনে আটকে আছে—
(ওরা বলবে: “কিন্তু ওর হাত পা জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেছে!”)
আমার স্পর্ধা হবে?
ব্রহ্মাণ্ড নাড়িয়ে দিতে?
মুহূর্তে মিলবে সময়
সিদ্ধান্ত নেবার, শুধরে নেবার,
আর পরমুহূর্তেই পাল্টি খাওয়ার
কারণ আমি এদের সবাইকে ইতিমধ্যে চিনে গেছি, জেনে গেছি সবাইকে—
জেনেছি সন্ধ্যা, সকাল, বিকেলগুলোকে,
কফির চামচে মেপেছি আমার জীবন;
চিনেছি ক্ষীয়মাণ স্বর, মৃত্যুকূপে লীন
দূর কক্ষ থেকে ভেসে আসা সুরের অতল হতে।
ভরসা তাই কোত্থেকে করি?
আমি এদের সবার চোখের দৃষ্টি চিনেছি, চিনেছি সবাইকে—
যে দৃষ্টি তোমাকে একটা বাক্যখণ্ডে বদ্ধ করে
তেমনই বদ্ধ আমি, লটকে আছি পিনে, দেয়ালে আটকে ছটফটাচ্ছি
তখন কেমন করে শুরু করব বলো?
উগরে দেবো কি দিন যাপনের পোড়া অবশেষ?
ভরসা তাই করি কোত্থেকে ?
আমি সব বাহু দঙ্গল ইতিমধ্যে চিনেছি, চিনেছি সবগুলি—
কঙ্কন পরা বাহু, শুভ্র, উন্মুক্ত
(দীপের শিখায় হালকা বাদামি কেশের ছায়ায় !)
করে তুলছে উদ্ভ্রান্ত?
টেবিলে, আলতো এলানো বাহু, উষ্ণ শালে জড়ানো বাহু,
তাহলে কি আমি ভরসা করতে পারি?
