স্বাধীনতা : দেশ বিভাগ—আমার স্মৃতি (৫)

(জানুয়ারি ২০২৬, উনত্রিংশ বর্ষ তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত অংশের পর)

১০

রায় সাহেব সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। মেহেরপুর শহরের বিশিষ্ট জন। মেহেরপুরের নিকটবর্তী গ্রাম ভবানীপুর। সেই গ্রামের এক বনেদী পরিবারে তাঁর জন্ম। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ সুভাষ চন্দ্র আচার ব্যবহারেও ছিলেন অভিজাত।

তিনি ছিলেন মেহেরপুর স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারী। পেশায় ছিলেন ব্যবসায়ী। মেহেরপুর থেকে চুয়াডাঙা পর্যন্ত যে মটর গাড়ি চলত- তিনি ছিলেন তারই মালিক। তিনি ইংরাজ সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে রায় সাহেব খেতাব পেয়েছিলেন। মেহেরপুর শহরে তাঁর আগে একজন রায় বাহাদুর খেতাব পেয়েছিলেন। রায় বাহাদুর ইন্দুভূষণ মল্লিক। তিনি ছিলেন মল্লিক জমিদার পরিবারের মানুষ। মেহেরপুর মিউনিসিপ্যালিটির বর্তমান চেয়ারম্যান সত্যেন্দ্রভূষণ মল্লিকের পিতৃদেব। ইন্দুভূষণও চেয়ারম্যান ছিলেন।

ইন্দুভূষণ ছিলেন শহরবাসীর কাছে অতি সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর নিজের নাম আর উচ্চারিত হতো না- রায়বাহাদুর নামেই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন। সরকারি এই খেতাব পাওয়ার ব্যাপার নিয়ে মেহেরপুরে বেশ কিছু গালগল্প প্রচলিত ছিল। মেহেরপুরে মহকুমা দপ্তর স্থাপিত হলো। থানা বসল, আদালত বসল, মহকুমা শাসক এলেন, মুন্সেফ বাবু এলেন। গ্রাম পরিচয় থেকে শহর হিসাবে পরিচিত হবার সূচনা হলো। মহকুমার শাসকদের ওপর সরকারি একটা অলিখিত ঘোষণা থাকত এই যে, তোমার এলাকায় যদি ভালো কাজ দেখাতে পারো তাহলে দ্রুত পদোন্নতি হবে।

—ভালো কাজ কি?

— সমাজ মঙ্গলকর কোন কর্ম- যেমন স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ইত্যাদি স্থাপন করা। এজন্য ইংরাজ সরকার তো অর্থ ব্যয় করে না। মহকুমা শাসকের কাজ হবে কোন ধনী ব্যক্তি বা জমিদারকে ধরে তাকে দিয়ে ওই সব কাজ করিয়ে নেওয়া। ওখানেই মহকুমা শাসকের কৃতিত্বের পরিচয় মিলবে। ধনী ব্যক্তিরা অর্থ ব্যয় করবেন কোন স্বার্থে বা আকর্ষণে? তাঁরা পাবেন খেতাব, বাহবা, প্রশংসাপত্র। যা হবে তাঁদের নিরাপত্তা ও সম্মানের ব্যাপার। মেহেরপুরে স্কুল, হাসপাতাল, টাউনহল- নাকি ওই ভাবেই গড়ে উঠেছে।

রায়বাহাদুর ইন্দুভূষণ মল্লিক কি করেছিলেন? সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন ঘোষণা নেই। তবে শোনা যায়- স্কুল স্থাপন ও তার উন্নতি বিষয়ে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল।

মেহেরপুরের টাউন হলের নাম কালাচাঁদ মেমোরিয়াল হল। সে সময় একজন মহকুমা শাসক এসে উকীলবাবুদের বললেন, আপনারা এখানে আছেন কিন্তু এখনও একটা টাউনহল গড়েননি। আধুনিক শহরে ওটার তো একান্ত প্রয়োজন। আপনাদের পক্ষে কি চন্ডীমণ্ডপে গিয়ে বসা সম্ভব? দেখুন একটা টাউনহল গড়তে পারেন কিনা এমন কাউকে দেখুন।

মেহেরপুরের কাছেই কোলা বা বিল কোলা গ্রাম। সেই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন কালাচাঁদ বিশ্বাস। তিনি জমিদার হয়েছিলেন। তাঁর পৌত্র মেহেরপুরে বাড়ি করে বাস করছিলেন। তিনি সম্মত হলেন টাউনহল গড়ে দিতে। মহকুমার শাসকের সঙ্গে দেখা করে তিনি বললেন, আমি টাউনহল গড়ে দেব। তবে সেটা হবে ঠাকুর্দার নামে- তাঁর স্মৃতিতে। মহকুমা শাসক সম্মত হলেন। তখন দাতা বললেন, আরেকটি শর্ত আছে। ভবন উদ্বোধন করতে হবে বড়লাটকে দিয়ে।

মহকুামাশাসক এমন প্রস্তাব শুনে হতবাক। তিনি বললেন, আমি সামান্য কর্মচারী- বড়লাট ধরার সাধ্য আমার নেই। আপনি একজন ইংরাজকে দিয়ে উদ্বোধন করাতে চান তো? ঠিক আছে, জেলা শাসককে দিয়ে উদ্বোধন করিয়ে দেব।

—দাতা বললেন, না বড়লাটকে চাই।

—তাঁকে ধরার সাধ্য আমার নেই। আর এই সামান্য কাজের জন্য তিনি আসবেনই বা কেন? তিনি তো নন, সরকার- ভারত সরকারের ব্যাপার- গুরুত্বটা বুঝে কথা বলুন।

—দাতা বললেন, সব বুঝেই বলছি। বড়লাট যখন মেহেরপুরে আসবেন- তখন তাঁকে দিয়ে—

—বড়লাট মেহেরপুরে আসবেন কেন?

—প্রতি বছরই আসেন- বড়দিনের ছুটিতে আমাদের বেতাই-এর জঙ্গলে যান শিকার করতে- শহরের ওপর দিয়েই যান। ফেরার পথে উদ্বোধনটা করে দেবেন।

এ কথা শুনে মহকুমা শাসক হতবাক। সেই ভাবেই নাকি টাউন হলের উদ্বোধন হয়েছিল। সত্য-মিথ্যা জানিনে— এটা শহরের একটি প্রচলিত মুখরোচক গল্প। এসবই উনিশ শতকের পরিবেশ পরিস্থিতির কথা।

এরপর ভারতবর্ষের তথা বঙ্গদেশের জনজীবনে উঠল রাজনৈতিক আন্দোলনের ঝড়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। সে সময় রায় বাহাদুর, রায় সাহেব হতে গেলে কি করতে হতো?

কৃষ্ণনগর শহরে বিশ্বম্ভর রায় নামে একজন স্বনামধন্য উকীলবাবু ছিলেন। কৃষ্ণনগরে থাকার সময় তাঁর নামে প্রচলিত একটি গল্প শুনেছিলাম। মহারানী ভিক্টোরিয়া মারা গিয়েছেন। বিশ্বম্ভর রায় সেদিন আদালতে এসেছিলেন কাছা পরে।

—বিস্মৃত উকীলবাবুরা প্রশ্ন করলেন, কি হয়েছে?

—তিনি বললেন, মাতৃবিয়োগ ঘটেছে।

—আপনার মা এখনও জীবিত ছিলেন? আপনার বাড়িতে ছিলেন?

—না, না- আমার মা মহারানী ভিক্টোরিয়া। এর পরই তিনি রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

এখন দেশের রাজনীতি আরও জটিল। এখন সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস কিভাবে রায় সাহেব খেতাব পেলেন? এ বিষয়ে স্পষ্ট কোন প্রমাণ দেওয়া কঠিন। সুভাষবাবু কোন রাজনৈতিক দলভুক্ত নন বলেই প্রচারিত। শহরের ক্ষমতা দখলের কোন লড়াইও করেন না। তিনি মটর ব্যবসায়ী। এখানে  একচেটিয়া ব্যবসা। সরকার নির্ভর ব্যবসা। সরকারি লাইসেন্স ছাড়া এ ব্যবসা হয় না। এখানেই সরকারের কাছে তাঁর টিকি বাঁধা। মহকুমা শাসক থেকে থানার বড়বাবুরা সকলকেই সমীহ করে মান্য করে চলতে হয় তাঁকে। সরকারের নেক নজরে থাকতেই হয়। বহিরাগত এই সব সরকারি কর্মচারিরা ও অপিরিচিত স্থানে এসে নিরাপত্তার প্রয়োজনেই সুভাষচন্দ্রের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করেন। প্রয়োজনে সাহায্য সহযোগিতা কামনা করেন। এই রকম একটি ঘটনাই সুভাষচন্দ্রকে চিহ্নিত করে রেখেছে শহরবাসীর কাছে।

মেহেরপুরে এ রহমান নামে একজন এস ডি ও ছিলেন। ৩০-৪০ বছর বয়স। অকৃতদার ব্যক্তি। অল্প দিনের মধ্যেই করিতকর্মা মানুষ হিসাবে শহরবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছিলেন। প্রশাসনিক ব্যাপারে তাঁর কাজের সুখ্যাতি হয়েছিল। হঠাৎ একটা অঘটন ঘটে গেল। এস.ডি.ও. সাহেবের বাসার কাছেই মেহেরপুরের ডাক বাংলো। ডাক বাংলোর পিছনে ঘোষপাড়া। ঘোষপাড়ারই একজন ডাকবাংলোর কর্মচারি। সেখানকার আর এক পরিবারের সঙ্গে বিরোধ। সেই পরিবারের একটি কিশোর ডাকবাংলোর আমগাছের আম পেড়ে নিতে থাকল। এ নিয়ে দুই পরিবারে নতুন করে ঝগড়া বাধল। কিন্তু ছেলেটির আম পাড়া বন্ধ হলো না। কেয়ারটেকারের আত্মীয় এস.ডি.ও. সাহেবের আরদালি। দুজনে পরামর্শ করে এস.ডি.ও. সাহেবের কাছে অভিযোগ জানাল ছেলেটির নামে। সত্য-মিথ্যা অনেক বলল। এস.ডি.ও. রহমান সাহেব উত্তেজিত হয়ে ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন।

ছেলেটি এসে অভিযোগ অস্বীকার করতেই রহমান তাকে প্রহার করলেন। কান ধরে গালে চপেটাঘাত করায় গাল ফুলে উঠল। সে ফিরে গেল কাঁদতে কাঁদতে। বাবা ছেলেকে বাড়ি নিয়ে চলে এলো বাজারে—হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে। লোকে পরামর্শ দিল মাধবেন্দু মহান্তর কাছে যেতে।

মাধবেন্দু মহান্ত ব্যবসায়ী। পুস্তক এবং মনোহারী দোকান। এছাড়া তিনি পি.টি.আই, আনন্দ বাজার ও হিন্দুস্থান স্টান্ডার্ডের স্থানীয় সংবাদদাতা। মাধবেন্দু মোহান্ত বলছেন, ডাক্তারবাবুর সার্টিফিকেট নিয়ে এসো আর আমার কাছে লিখে দাও, তোমার অভিযোগের কথা।

ছেলেটির বাবা সেইমতো সব কিছু করে দিল। মাধবেন্দু মহান্ত পি.টি.আই.-এর সংবাদ করে দিলেন। ওটা পরদিন কলকাতার দৈনিক সংবাদপত্রগুলিতে সংবাদ হিসাবে ছাপা হয়ে গেল। অমনি সরকারি দপ্তর থেকে শোকজ চিঠি এসে গেল রহমান সাহেবের কাছে। শুরু হয়ে গেল মাধবেন্দু মহান্তর কাছে ছোটাছুটি— উকীলবাবু সাবরেজিস্টারবাবু— আরও কত এসে অনুরোধ, ভীতিপ্রদর্শন, কতো কি করলেন। কাজ হলো না। বদলির নির্দেশ এলো এস.ডি.ও. সাহেবের নামে। সম্ভবত কিছু শাস্তির কথাও ছিল।

রহমান সাহেব কাঁদলেন। তাঁর স্থানীয় সমর্থক বা শুভানুধ্যায়ীরা হয়ে উঠলেন ক্ষিপ্ত। এতো চরম পরাজয় তাঁদের। শহরবাসী হাসছে। এই অপমান ও রহমান সাহেবের অপমানের গুরুত্ব কমাতে, শহরবাসীর মন অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে রহমান সাহেবকে রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা দেবার পরিকল্পনা তৈরি হলো।

শুনেছি সেই পরিকল্পনার প্রধান ব্যক্তি ছিলেন এই সুভাষ বিশ্বাস। তখন আমরা স্কুলের নীচের ক্লাশের ছাত্র। দেখলাম, আমাদের স্কুলের মাঠে সামিয়ানা টাঙান হলো— মঞ্চ তৈরি হলো। প্রথমদিন রহমান সাহেবকে নিয়ে চলল ভোজপর্ব। কলকাতা থেকে এলো ফুল, মালা, ভালো খাবার, ফল, এলেন ফটোগ্রাফার ডি.রতন আর এলেন জাদুকর পি.সি. সরকার (সিনিয়র-প্রতুল চন্দ্র সরকার)। পরদিন দেখান হলো তাঁর ম্যাজিক। এক ঘন্টা ম্যাজিক দেখাবেন—পাঁচশ টাকা নেবেন। কিন্তু আধ ঘন্টা দেখানোর পরই তিনি খেলা বন্ধ করে দিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে জানালেন, দর্শকের মধ্যে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে— এই পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে মঞ্চে দাঁড়িয়ে খেলা দেখান সম্ভব হচ্ছে না। নিরাপত্তার অভাব বোধ করছি। শুধু শহর নয়, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে ছুটে এসেছিল মানুষ। সেই রাতে পি.সি. সরকার আর ফটোগ্রাফার কলকাতায় ফেরার পথে মাজদিয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছিল।

শোনা যায় এ ঘটনার পর থেকেই মেহেরপুরের প্রশাসকদের বিশেষ নেকনজর পড়ে সুভাষ চন্দ্রের ওপর। তারই পরিণতি তাঁর রায় সাহেব খেতাব পাওয়া। কিন্তু সময়ের হাওয়াটা তখন অন্যদিকে। রাজনৈতিক ঝড়ো হাওয়া এমনই প্রবল। ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জনজীবনের সর্বস্তরে। ফলে রায় সাহেব খেতাব সুভাষবাবুর প্রতি যুব সমাজ ও সাধারণ মানুষের বিরূপতা দেখা দিল। এখন লোক মধ্যে আলোচনা হচ্ছে— ব্রিটিশের ঘরের খাঁ সুভাষ বাবুর কি হবে:

ব্রিটিশ চলে যাবে। দেশ স্বাধীন হবে। হয় হিন্দুস্থান, নয়তো পাকিস্তান হবে মেহেরপুর। তখন তিনি কি করবেন? এই প্রশ্নের জবাব অবশ্য তাঁরাই দিচ্ছেন।

— কি আর হবে? সুভাষবাবু কি বুদ্ধিহীন মানুষ? আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ঘরে গিয়ে দেখোগে— কংগ্রেসের পতাকা আর লীগের পতাকা দুইই তৈরি করিয়ে রেখেছেন। হিন্দুস্থান হলে সকলের আগে কংগ্রেস পতাকা তুলে দেবেন বাড়িতে। পাকিস্তান হলে লীগের পতাকা তুলবেন।

ক্ষুব্ধ যুবকদের বক্তব্য হচ্ছে—দেশ স্বাধীন হলেই ওঁর একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে আন্দালন করব। হঠাতেই হবে।

১১

মেহেরপুরের মতো মহকুমা শহরে এস.ডি.ও. বা মহকুমা শাসকই সম্রাট বা লাট বাহাদুর। জনসাধারণদের মনে ভয় মিশ্রিত ভক্তি সঞ্চারিত। এস.ডি.ও. সাহেবের আরদালি মিন্টু ঘোষ। তাকেই মনে হয় কতো শক্তিধর ভাগ্যবান ব্যক্তি।

সেই এস.ডি.ও. সাহেবকে বদলী হয়ে যেতে হলো মাধবেন্দু মহান্তর এক খবরের জেরে। স্বভাবতই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি পড়ল মাধবেন্দু মহান্তর দিকে। বলিহারি মাধব, কলজের জোর আছে- মায়ের দুধ খেয়েছিলে বটে। শহরের তাবড় তাবড় মানুষ- কতো ভয় দেখাল- তবু দমলো না। মেহেরপুর শহরের পশ্চিমে ভৈরব নদ। তার ওপারে গোভিপুর গ্রাম। সেখানে মাধবেন্দু মহান্তর বাড়ি। দরিদ্র পরিবার। বাবা অল্পবেতনের সরকারি চাকরি করতেন। তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল অকালে। মাধবেন্দু বড় ছেলে। তিনি তখন মেহেরপুর স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি ম্যাট্রিক পাশ করলেন প্রথম বিভাগে। বাড়িতে মা আর ভাই গুটিকতক। তাঁকে মেহেরপুর স্কুলে চাকরী দেওয়া হলো। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। রংপুর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কারারুদ্ধ হলেন। কারাগার থেকে ফিরে এসে দোকান খুলে বসলেন মনোহারি দ্রব্য আর পুস্তকের। আর হলেন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদদাতা। এই মাধবেন্দু মহান্ত এস.ডি.ও’র ডাকে ভীত হবেন কেন?

কিন্তু এস.ডি.ও. রহমান সাহেবের ঘটনার পর সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস আর মাধবেন্দুর মধ্যে সম্পর্ক হয়ে দাঁড়াল অহিনকুলের মতো। প্রকাশ্যে কোন বিবাদ ছিল না। ভিতরে ছিল তিক্ত সম্পর্ক। এই সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছিল মাধবেন্দু মহান্ত কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ায়। তিনি ছিলেন মেহেরপুর কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতা। সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস ছিলেন মটর মালিক। ড্রাইভার শ্রমিক নিয়ে তার চলাচল। মেহেরপুর কৃষিভিত্তিক স্থান। কারখানা বলতে সুভাষচন্দ্রের ওই মটর শ্রমিকই প্রধান। সহজেই অনুমেয় দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির কারণ কি? মেহেরপুর কম্যুনিষ্ট পার্টিতে মধ্যবেন্দু মহান্তের সঙ্গে যাঁদের দেখতাম, তাঁদের ভিতর ছিলেন মটর (সমরেন্দু) সান্যাল। পরিমল বাগচি, ডা: শক্তি ভট্টাচার্য (ভোম্বল)। এঁরা সভা করতেন, মিছিল করতেন। কিন্তু সুভাষবাবুর মটর শ্রমিক নিয়ে কোন গণ্ডগোল গতে দেখিনি। সুভাষবাবুর মটর শ্রমিকদের বিশেষত ড্রাইভারদের তথাকথিত শ্রমিক বলে মনে হতো না। ত্রিদিবদা, ললিতদা, দাশুদা, বিশুদা-সবই গৃহস্থ মানুষ। ভদ্রলোক ত্রিদিবদা- ত্রিদিব ঘোষাল। তাঁর বাড়ি ছিল রানাঘাট। ত্রিদিবদা, ললিত দা দুজনেই ছিলেন ফুটবল খেলোয়াড়। মেহেরপুর টাউনক্লাবে খেলতেন। ত্রিদিবদা শুধু খেলোয়াড় নন। স্কুলের ছাত্রদের খেলার কোচ। ফলে ছাত্র মহলে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল খুব। সেইকালে এঁরা ছিলেন স্বদেশীভাবনায় ভাবিত।

ত্রিদিবদা সম্পর্কে একটি ঘটনার কথা শুনেছিলাম। মেহেরপুর শহরের প্রায় ছ’মাইল উত্তরে কুতবপুর গ্রাম। সেখানে স্বামী নিগমানন্দর বাড়ি। সেবার তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট শিষ্য সহ বাড়ি আসছিলেন। চুয়াডাঙার মাথাভাঙা নদী পার হয়ে এসে মেহেরপুরগমী মটর গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি ছাড়ার সময় হলো। ত্রিদিব ঘোষাল এসে ড্রাইভারের আসনে বসলেন। তাঁর পাশে বসে আছেন স্বামীজী। ত্রিদিব গাড়ি থেকে নেমে বললেন, গাড়ি যাবেনা।

—কেন?

—স্বামীজী বিলাতি সিগারেট খাচ্ছেন।

—তাতে তোমার কি? বললেন শিষ্যরা।

ত্রিদিব বললেন, আমি একজন স্বদেশী, সত্যাগ্রহী- বিলাতি বর্জন চাই।

—তুমি ড্রাইভার। কর্মচারী। গাড়ি চালাতে বাধ্য। যাত্রী কে কি করল সেটা দেখার তুমি কে? তোমার চাকরী থাকবে?

—চাকরী করব না। চাকরী ছেড়ে দিলাম। আপনারা গাড়ি নিয়ে যান।

স্বামীজী সব শুনছিলেন। এবার ত্রিদিবকে ডেকে বললেন, ভাই সিগারেট ফেলে দিলাম। এবার গাড়ি চালাবে তো? ত্রিদিব গাড়িতে উঠে বসলেন।

মেহেরপুরে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার সময় স্বামীজী ত্রিদিবকে বললেন, ভাই এই যে গাড়িটা, ওর ইঞ্জিনটা কিন্তু বিলাতি— তুমি চালাচ্ছো। এই গল্পটা থেকে বোঝা যায় মেহেরপুরের ওই সব মটর ড্রাইভার ও শ্রমিকরা কেমন ছিল। এছাড়া মেহেরপুরের তৎকালীন পরিবেশটাও এমন ছিল যার জন্য কম্যুনিষ্ট পার্টি তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে সুভাষবাবুরাও সতর্ক ছিলেন খুব। আর মাধবেন্দু মহান্তকে সুনজরে দেখতেন না। কম্যুনিষ্ট পার্টিও সুভাষ বাবুকে সুনজরে দেখতেন না। দুপক্ষই পরস্পরকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মুস্কিল এই যে- দুপক্ষই তখন ইংরাজ ও শাসক সমর্থক। তাই দুই পক্ষই তাকিয়ে ছিলেন দেশের স্বাধীনতা লাভের দিকে।

কম্যুনিষ্ট পার্টির শ্রমিক আন্দোলনের আরেকটা স্থান হয়েছিল তাঁতিপাড়া। তাঁত শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন। তাঁতি পাড়ার মোড়ল ছিলেন নিত্যানন্দ বসাক। পরিচিত ছিলেন নিতাই বসাক নামে। পুরুষানুক্রমে তাঁরা পাড়ার মোড়ল। নিতাই বসাক তখন কৃষ্ণনগর কলেজে বি.এ. পড়ছিলেন। মেধাবী ছাত্র। ম্যাট্রিকে বিভাগীয় বৃত্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে কলেজ ছেড়ে চলে এলেন। পরে অবশ্য বহরমপুর কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। তিনি চাকরী না করে বস্ত্র ব্যবসায়ী হয়েছেন। নিজে তাঁত চালান না। একটা কারখানা খুলেছেন বস্ত্র বয়নের। শাড়ীর নক্সা পাড়ের জন্য মেশিন তৈরী হয়েছে। তিনি সেই মেশিন খান কুড়ি পঁচিশ এনে কারখানা খুলেছেন। তাঁতি পাড়ার মানুষজনই সেখানে কাজ করেন। প্রায় সকলেই নিতাই বসাকদের আত্মীয় স্বজন।

তাঁতি পাড়ার মানুষ সাদামাটা, ধর্মপ্রাণ। ওপাড়ায় কীর্তন, মহোৎসবের বড় জাঁক। কীর্তনের, খোল-বাজনার চর্চা হয় এখানে নিয়মিত। নিতাই বসাকের পরনে খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবী, মাথায় টিকি, গলায় কন্ঠী। তাঁর কারখানার জমিতেই পাড়ার মহোৎসবের পংক্তি ভোজন হয়। একটি জনসমাজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বৃত্তি ভিত্তিক সমাজে গোষ্ঠিগতভাবে বসবাসের এটাই স্বাভাবিক রূপ। মেহেরপুর জনবসতির রূপটাই এই রকম। সেখানে নিজ সম্প্রদায়ের লোকের বাইরের কোন বহিরাগতের অনুপ্রবেশের ঠাঁই নেই। এখানে একদিন কম্যুনিষ্ট পার্টির আন্দোলন শুরু হলো।

তাঁতি পাড়ার ভিতরে চৌমাথার মোড়। প্রশস্ত স্থান। বিকালে সেখানে পাড়ার ছেলেরা হাডুডু খেলে। উত্তর দিকে একটা ইঁদারা। তার চাতালের ওপর বসে কিছু লোক দশ পঁচিশ কিংবা লুডো খেলে। ইঁদারার পুবে সরু গলিপথের ধারে লুটু প্রামাণিকের বাড়ি। ভালো পাকা বাড়ি। বিকালে নুকু বিহারী লাল রঙের একখানা ধুতি প’রে গায়ে একটা পাঞ্জাবি দিয়ে হাতে একটা চট বা সতরঞ্জি আর কৃত্তিবাসী রামায়ণ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। দক্ষিণ দিকে তাঁর বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে চট পাতেন। তারপর তার ওপর বসে পকেট থেকে সরু তারের ডাণ্ডি লাগান চশমাটা বার করে কাপড় দিয়ে কাঁচ মুছে সেটা চোখে লাগিয়ে চারদিকে তাকান। তারপর রামায়ণ খুলে পাতা উল্টাতে থাকেন। গুটি গুটি আরও দু-তিনজন বৃদ্ধ এসে সেখানে বসেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু আলোচনা করে নিয়ে তিনি বই খুলে শুরু করেন রামায়ণ পড়তে। খানিক দূরে ছেলেদের খেলা চলছে, ইঁদারা-তলায় লুডোর কি তাসের আসর। আর তারই পাশে নুটু বিহারীর রামায়ণ পাঠ। তাঁতি পাড়ার একটি পরিচিত দৃশ্য। এরই মধ্যে শুরু হলো কম্যুনিষ্ট পার্টির পথসভা। শ্রমিক আন্দোলনের ডাক।

নুটু প্রামাণিকের বড় ছেলে ম্যাট্রিক পাশ করে রেল চাকুরে। তিনি সপরিবারে কলকাতায় থাকেন। মেজ ছেলে ছিলেন উকীলবাবুর মহুরী। তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটেছে। তাঁর বিধবা পত্নী, দুই কন্যা নিয়ে শ্বশুর বাড়িতেই থাকেন। ছোট ছেলে (লালু) লালগোপাল প্রামাণিক (বসাক) । তিনি আই.এ. ফেল। আমি পাঠশালায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়াকালে তিনি কিছুদিন আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। হয়তো তাঁর প্রত্যাশা মতো আমি তাঁর অনুগত ছিলাম না, অথবা অমনোযোগী ছিলাম কিংবা মেধাবী ছিলাম না তাই তিনি বিরক্ত হয়ে আমাকে খেতাব দিয়েছিলেন, ‘কানাবক’।

এই লালগোপাল বসাক পরবর্তী কালে মেহেরপুরের বাইরে কোথাও থাকতেন। অনেকদিন পর মেহেরপুরে ফিরলেন। মনে হচ্ছে কিছুকাল কাপড়ের সুতো রঙচঙ করতেন। তারপর দেখলাম তিনি কম্যুনিষ্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। বোধহয় সর্বক্ষণের কর্মী হয়েছিলেন।

এখন সেই লালগোপাল বসাকই তাঁতি পাড়ায় শ্রমিক আন্দোলনের ডাক দিলেন। লালগোপাল পাড়ার ছেলে। গুরুত্ব পাবেনা। তাই তাঁর সঙ্গী, নেতা হিসাবে আসতেন পরিমল বাগচি। বাজারে তাঁদের মুদিখানার দোকান ছিল। এই পরিমল বাগচিই স্বাধীনোত্তর নদীয়ার জেলা পরিষদের প্রথম সভাধিপতি। লালগোপাল বসাকদের বাড়ির দক্ষিণে পথের ওপাশে ছিলেন রবি প্রামাণিক (বসাক)। রবি বসাক যুবক। বড়িতে বসে কাপড় বুনতেন। এই রবি প্রামাণিকও তখন কম্যুনিষ্ট দলে যোগ দিয়ে পাড়ার পথসভায় ধ্বনি দিতেন। নিতাই বসাকের কারখানা পর্যন্ত মিছিল করে যেতেন। রবি প্রামাণিকের কাছে মাঝে মাঝে অবকাশমতো যেতাম। বছর পঁচিশেকের  যুবক। স্কুলে ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণী অবধি পড়েছেন। বাবার মৃত্যু হয়েছে অকালে। মা আর ছেলের সংসার। তিনি তাঁত চালাতেন, আমি তাঁর পাশে বসে থাকতাম। তাঁর কথা শুনতাম। বাড়ির জীর্ণ, পরিবেশ, মা আর ছেলের সংসার কোন মতে চলে। চলেই না বলা যায়। অথচ রবি বসাক ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী। মনে তাঁর কতো স্বপ্ন বাসনা। তাঁর অতীত জীবন তাই ক্ষুব্ধ। কত দুঃখ আর ক্ষোভের কথা যে বলতেন। শুনে ব্যথিত হতাম। তিনি নিতাই বসাকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। বলতেন, তুমি রাগ করোনা— নিতাই বসাক তোমার বাবার বন্ধু— তোমার বাবার কাছে যাতায়াত। তোমার বাবা মাস্টারমশাইকে আমরা শ্রদ্ধা করি, খুব ভালো মানুষ। কিন্তু নিতাই বসাক তেমন নয়। অনেক দুর্নীতি আছে। শ্রমিকদের ঠকায়।

আমি বলতাম, নিতাই বসাকের কারখানা যদি না থাকে তাহলে কোন্ সুবিধা হবে?

—সে একটা ব্যবস্থা হবেই। রবি বসাক বলতেন, চিরকাল কি নিতাই বসাকের কারখানা ছিল?

রবি বসাকের ক্ষোভ দুঃখ বেদনাকে বুঝতাম— তাঁকে ভালো লাগত। তাঁর কাছে যেতে আকর্ষণ বোধ করতাম।

কিন্তু কী যে হলো, ওঁদের পাড়া ঘরে। রবি বসাকরা বাড়ির তাঁত উঠিয়ে দিলেন। আর নিতাই বসাকের কারখানায় গিয়ে তাঁত বুনতে থাকলেন।

রবি বসাক তাঁর বাড়িতে বসে আমাকে বলতেন, নিতাই বসাক ভণ্ড। মাথার টিকি, গলায় কণ্ঠী কীর্তন গান-সব ভণ্ডামি।

কিন্তু এখন দেখলাম, পাড়ার মহোৎসবে নিতাই বসাকের সহযোগী হয়ে খুব খাটাখাটনি করছেন।

লালগোপাল বসাকের নেতৃত্বে তাঁতি পাড়ায় পথসভা মিছিল চলছেই।

নিতাইকাকা আমার বাবার কাছে প্রায়ই আসেন। নানা রকম আলোচনা গল্প করেন। মাঝে মাঝে আমিও তাতে যোগ দিই।

দেশের স্বাধীনতা আসছে। এই সময়ে একদিন বললাম— কাকা, কম্যুনিষ্ট পার্টি আপনাকে ছাড়বে না। দেশ স্বাধীন হলে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার ওপর।

নিতাইকাকার বড় গুণ তিনি উত্তেজিত হন না। আমার কথার জবাবে বললেন, বাবা, কতো রকমতো দেখলাম। ওসব চিন্তা আমি করিনে। নিয়তি কেন বাধ্যতে? বাবা, রাম-রাবনের যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কি শেষ হয়ে গিয়েছে? মোটে না। শেষ হলে ওসব লেখার আর গুরুত্ব থাকত না। ওসব চিরকালীন ব্যাপার-প্রতি মুহূর্তের। দেশের মধ্যে, সমাজের মধ্যে, পরিবার মধ্যে, এমন কি আমাদের দেশের মধ্যেও ওই যুদ্ধ চলেছে। নিত্য ঘটনা। এখন একরকম চলছে, দেশ স্বাধীন হলে তখন অন্য আরেক রকম রূপ হবে। এছাড়া আর কি হবে? তবে দেখ বাবা, ক্ষমতা তো আসছে ওই গান্ধী আর নেহরুর হাতে। তার মানে আমাদের দলের হাতে। কংগ্রেস করেছি, জেল খেটেছি গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে কলেজ ছেড়েছি তার পুরস্কার কি কিছুই পাব না? কেউ আমাকে ভদ্র বলবে, অসাধু বলবে— তারাই সত্য নিয়ে থাকবে? তারা কি নিরপেক্ষ, তারা কি স্বার্থশুন্য!  যত যাই বলো বাবা, একথা সত্য, যুগে যুগে গ্লানিময় হয়ে ওঠে সমাজ। আর সেই গ্লানি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে তিনি আসেন— সম্ভমামি যুগে যুগে— আমরা তাঁরই উপাসক। স্বাধীন তো হোক ভারতবর্ষ।

মেহেরপুরের পশ্চিমে ভৈরব নদ। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত। এখন প্রায় স্রোতহীন, রুদ্ধ জলাশয়। বৈশাখ মাসে কোথাও হাঁটু জল, কোথাও বুক অবধি। সরু একটা নালার মতই, প্রায়। মেহেরপুরে এই জলাশয়— এর অধিকাংশই কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। কিন্তু বন্যাকালে এই নদী সম্পর্কে প্রবীণরা বলতেন, এককালে খুব বড় নদী ছিল গো। বেতাই থেকে আমঝুপী এই সাত মাইল চওড়া ছিল নদী। দিনে একবার খেয়া যেত আর একবার ফিরে আসত। তখন আমাদের এই মেহেরপুর ছিল নদীর তলায়। প্রশ্ন করতাম, সে নদী দেখেছেন?

তাঁরা বলতেন, না গো। বাপ-ঠাকুরদার মুখে শুনেছি। বাপঠাকুরদা শুনেছিল তাদের বাপ ঠাকুরদার কাছে। নদীর এই বিবরণ কোন কালের কথা কে জানে! তবে মেহেরপুরের চারপাশে খাল, বিল দেখে মনে হয় ওগুলি সবই নদীর ছাড়। সপ্ত সরস্বতী নদী একদিন যেভাবে হারিয়ে গিয়েছে, ভৈরবও সেই ভাবেই তার রূপ হারিয়েছে। মোঘল যুগেও ভৈরব ছিল নাব্য। মোঘল সৈন্য ভৈরব দিয়ে নৌকা যোগে যেতো যশোহরের দিকে, প্রতাপাদিত্যর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে। তখন মেহেরপুরের কাছেই বাগোখানে মোঘল সৈন্যর আস্তানা ছিল। তারপর নদী মজে গেল। হয়তো বা ভূমিকম্প বা অন্য প্রাকৃতিক কারণে এটা ঘটেছে। মেহেরপুর অঞ্চল জন্ম নিয়েছে তখন। কিন্তু আমঝুপী আর বেতাই ওই দুটি স্থান তখনও ছিল? অতো প্রাচীন ওই স্থান দুটি? মেহেরপুর থেকে পুবে দুমাইল দূরে আমঝুপী আর মেহেরপুর থেকে পাঁচ মাইল পশ্চিমে বেতাই। নীলকরদের আমলে ওই দুই স্থানেই নীলকুঠি স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে নীলকরদের ওই সব সম্পত্তি নিয়ে মেদিনীপুর জমিদারী কোম্পানী নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়। সেই কোম্পানীর কাছারি বাড়ি আছে। সেখানে থাকেন একজন ইংরাজ ম্যানেজার, ‘যমাফিল্ড’ সাহেব নামে পরিচিত এক ইংরাজ। নায়েব দাবিরুদ্দিন সেখ। বাড়ি মুর্শিদাবাদের জলঙ্গীতে। তাঁর ছেলেরা মেহেরপুর স্কুলে পড়তেন—নুরুদা, কায়েস দাদা, আর বরবানি ছিল তাঁর আত্মীয়— সে ছিল আমার সহপাঠী। এঁরা সকলেই ভালো ফুটবল খেলতেন বলে আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন। এঁদের আচার ব্যবহারও ছিল খুব ভালো, বেশ ভদ্র এবং মিশুকে।

বেতাই-এর নীলকুঠি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষীদের আন্দোলনের সময়। এই কুঠিয়ালের অত্যাচারে চাষীরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। চাষীরা এই কুঠি আক্রমণ করেছিল। তার বিবরণ আছে প্রমোদ সেনগুপ্ত রচিত ‘নীলবিদ্রোহ’ গ্রন্থে। চাষী পরিবারের মেয়েরা পর্যন্ত ‘খাপরা’ বাহিনী তৈরী করে লড়েছিল। শুধু চাষীরাই নয় মেহেরপুর-এর মুখোপাধ্যায় জমিদাররা তাঁদের লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে বেতাই কুঠিতে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। মল্লিক জমিদারবাবুরা ফরিদপুর থেকে নিজ খরচায় চাষীদের পক্ষে লড়তে লাঠিয়াল এনে দিয়েছিলেন। তারপর নীলচাষ একদিন বন্ধ হয়ে গেল। নীলকর ইংরাজরা স্বদেশে ফিরে গেলেন। তখন এই বেতাই পেল এক নতুন পরিচয়। ভারতের ইংরাজ লাটবাহাদুরের শিকার বা মৃগয়াক্ষেত্র। হয়তো নীলকরদের আমল থেকেই শুরু হয়েছিল এটা। তাঁরাই আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসতেন লাটবাহাদুরকে। নীলকর নেই, কিন্তু বেতাই আছে, নীলকরের কৃষিবাড়ি আছে। তাই লাটবাহাদুরের এই স্থানে আগমন, স্থায়ী প্রথা হয়ে গেল।

প্রতি বছর বড়দিনের সময় বড়লাট সপারিষদ চলে আসতেন বেতাই কুঠিতে। কটা দিন ছুটি কাটাতেন এখানে আমোদ আহ্লাদে। বেতাই মৃগয়া ক্ষেত্র। বিস্তৃত খড়ের ভুঁই, নিবিড় বেতবন, প্রশস্ত বিল, জলা ভূমি-স্বাপদ সংকুল স্থান। বাঘ, শুয়োর, গোসাপ, সজারু, খরগোষ আরও কত বন্য জন্তু, বিলে কতো রকম পাখি। আর নীলকর সাহেবদের তৈরী কুঠিবাড়ি, আরামপ্রদ বাসস্থান।

লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায় তাঁর ‘সেকালের স্মৃতি’ গ্রন্থে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর যৌবনকালে ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতায়, তখন তিনি বড়লাট বাহাদুরকে দেখেছেন— সপুত্র মেহেরপুরের খেয়াখাটে নৌকায় পার হয়ে বেতাই চলেছেন বড়দিনের সময়। সঙ্গে চলেছে বড় বড় ঘোড়া। চলেছে আরও কত লোকজন, কর্মচারী। ভারতের রাজধানী চলে গেল দিল্লিতে। কলকাতায় থাকল ছোটলাটের বাসস্থান। তখন থেকে ছোটলাটই আসা শুরু করলেন বেতাই জঙ্গলে— সেই ডিসেম্বর মাসে বড়দিনের সময়। মেহেরপুরের পথ দিয়ে গরুর গাড়িতে বিশেষ ধরনের নৌকা যেতে থাকে। সেটা দেখলেই লোকে বুঝে নেয়, লাটসাহেব আসছেন বেতাই জঙ্গলে। বুঝে নেয়, ডিসেম্বর মাস। ইংরাজদের বড়দিন এসেছে। পশু শিকার, পক্ষী শিকারের ধুম লাগবে যীশুর জন্মোৎসবে। গত বছর ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরের বড়দিনের সময় যথারীতি ছোটলাটের আগমন ঘটেছিল বেতাই জঙ্গলে।

এই আলোচনাটা হচ্ছিল আমাদের থিয়েটার ক্লাবের ঘরে। মুখোপাধ্যায় জমিদারদের দেউড়ীর পিছনে ছোট একটা কুঠুরি— একখানা চৌকি পাতা। সেখনে আমরা ছ-সাতজন বসে। রাত্রিবেলা ঘরে মোমবাতি জ্বলছে। বাইরে নিবিড় অন্ধকার। পাশের বড় হল ঘরে জমিদার ভূপতি ভূষণ (বুদুবাবু) মুখোপাধ্যায়ের বৈঠকখানায় দাবার আসর চলেছে।

আমাদের ঘরে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদের ভিতর বাঁটুলদা (শিবনাথ ভট্টাচার্য) অন্যতম। বছর পঁচিশ বয়স। পেশায় পুরোহিত। নেশায় অভিনেতা, নাট্যপ্রেমী এবং আবৃত্তিকার। মেহেরপুরে তখন তিনি সুপরিচিত যুবক। তিনিই বেতাই প্রসঙ্গটা তুলেছেন।

তিনি সেই ঘরে বসে বলতে থাকলেন, এই তো কমাস আগে— গত ডিসেম্বরেও লাটসাহেব বেতাই এসেছিলেন। প্রথমে দেখলাম গরুর গাড়িতে নৌকা চলেছে। তখনই বুঝলাম সাহেবরা আসছেন। আমাদের রাজা আসছেন। তারপরই সেদিন সকালে বাজারে, দুলাল ঘোষের চায়ের দোকনে বসেছিলাম, দেখি দশ কি বারোজন বাগদি, পরনে নতুন ধুতি, গায়ে হলদে রঙের নতুন গেঞ্জি, হাতে লাঠি আর সড়কি নিয়ে বাজারের মোড়ে নাচানাচি করছে— যেন খুব খুশি, খুব আনন্দ হয়েছে। দোকান থেকে বেরিয়ে বললাম, কি ব্যাপার গো?

শুনলাম তারা বেতাই যাচ্ছে, লাট সাহেবের কাছে। নতুন ধুতি আর গেঞ্জি সাহেবদেরই দেওয়া। ব্যাপারটা তো আমাদের জানা। ওই বাগদি বুনোরা খুবই গরীব। সারা বছর কি করে, কি খায় তার ঠিক নেই। এই কটা দিন তদের মধ্যে কিছু লোক সুখের মুখ দেখে। কাজ পায় কদিন, ডবল মজুরি পায়, পেট ভরে খেতে পায়, বকশিস পায়, আরও কতো কি পায়। সেই কাজ পেয়েছে বলে ওদের অতো আনন্দ। ওরা বনতাড়ুয়া। ওই নিবিড় বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বনের জন্তু জানোয়ারকে বনছাড়া করবে বনে লাঠি পিটে পিটে। ভয় পেয়ে জন্তুগুলো বনের আস্তানা ছেড়ে বিলের ধারে ফাঁকা মাঠের মধ্যে চলে আসবে। সেই মাঠ আগের থেকেই সুরক্ষিত। জন্তুরা সেখানে আশ্রয় নিলে— সাহেবরা ঘোড়ায় চ’ড়ে সড়কি, তরোয়াল, বন্দুক হাতে নিয়ে শিকারে নামবেন। বন্দী জন্তুদের হত্যা করবেন। তাদের মাংস দিয়ে ভোজ হবে। বাঘ মারতে পারলে সেই মরা বাঘের মাথায় পা রেখে ফটো তুলে স্বদেশে পাঠাবেন বীরত্বের নিদর্শন হিসাবে। তা এবার কি ঘটল? শিকার শেষ হলো। লাটবাহাদুর ফিরে গেলেন কলকাতায়। ছুটি হয়ে গেল বনতাড়ুয়াদের। ওই বাহারের মোড়ে বিকালবেলা দেখলাম, খান তিনেক গরুর গাড়ি যাচ্ছে— তাতে শুয়ে আছে কজন বনতাড়ুয়া। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের। আর গরুর গাড়ির পিছনে তাদের মা-বউরা চলেছে কাঁদতে কাঁদতে, বুক চাপড়াতে চাপড়াতে।

কি হয়েছে গো? আমি সুধালাম। ওদের সঙ্গী একজন বলল, আমাদের ছুটি হয়ে গেল। আমি বনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলাম। বনের ভেতর ঝোপের মধ্যে বসে ছিল বাঘ। রেগে ছিল খুব। এখন হঠাৎ ঝাপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। যাকে পারল যেভাবে পারল খামচে, কামড়ে দিল। একজনের অবস্থা খুব খারাপ গো-বাঁচার আশা নেই।

—লাট কি বলল?

—কি বলবেন? তিনি তো পগাড় পার— মরণ আমাদেরই গো— পেট মানেনা— ছুটতে হয়— দুটো পয়সা মেলে কিন্তু যার গেল তার গেল, আমাদের ছোটলোকের জীবন…। আমি বললাম, এবার থেকে আর আসবেন না লাট সাহেব। আর ক’দিন পরেই দেশে ফিরে যাবেন। বেতাই-এর এই ইতিহাস, ইতিহাসের

এই পর্ব, এখানেই শেষ হয়ে গেল।

বাদলদা বললেন, বাঁচা গেল ভাই, সে যে কী কান্না মা বউ-এর, আমাদের দেশের সমাজের মানুষতো। স্বাধীনতা এলে তাদের একটা হিল্লে হবেই।

পি ছনে বসে ছিলেন ধনুদা, বারীন মুখার্জী। এই জমিদার পরিবারের ছেলে। তিনি আবেগে ধ্বনি দিয়ে উঠলেন, বন্দে মাতারম, স্বাধীন ভারত কি জয়।

অন্যান্যরা যেন নিজের অজান্তেই করতালি দিয়ে উঠলেন। একটা আবেগ হিল্লোলিত হতে থাকল ঘরময়।

ধনুদা বললেন, শুধু বেতাই-এর সাহেব নয়, আমঝুপীর মোফিল্ড সাহেবও যাবে, তাহলে দেশটা সাহেব শূন্য হবে, বাঁচা যাবে।

সন্ধ্যাবেলা। পাবলিক লাইব্রেরীতে হ্যাচাক আলো জ্বলছে। গ্রাহকরা বই লেনদেন করতে যাচ্ছেন। রাস্তা থেকে নেমে, লাইব্রেরীর সবুজ মাঠ পেরিয়ে বারান্দায় উঠলাম। বারান্দার পুবদিকে টেবিলের ওপর ক্যারাম বোর্ড জমেছে। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন সার্কেল অফিসার, সাব রেজিস্ট্রার ইত্যাদি। ক্যারাম খেলছেন। সকলেই যুবক, ত্রিশের কাছাকাছি বয়স। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবী। আমাকে দেখে সাবরেজিস্ট্রারবাবু বললেন, মাষ্টারমশাই স্বাধীনতা তো এসে গেল। আর মাত্র কদিন বাকী। মস্ত বড় ঐতিহাসিক ঘটনা— আমাদের জীবনে ঘটতে চলেছে। স্বাধীনতা ঘোষিত হলেই, আপনার বাড়িতে জমিয়ে সাহিত্য সভা করতে হবে।

আমি হেসে বললাম, আমার বাড়িতে কেন— টাউন হলে করা হবে।

—না-না। টাউনহলে ভালো হবে না। আপনার বাড়িতে প্রতি মাসে কোনো এক সন্ধ্যায় যে সাহিত্যবাসর বসান সেটা করতে হবে। ঘরোয়া ব্যাপার— আর ওই পরিবেশটা—’ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’—শান্ত নির্জন পল্লীর পরিবেশ— উত্তরে প্রাচীন বকুল বৃক্ষ, ফুলে ফুলে ভরা, পশ্চিমে নিবিড় বাঁশ বন, দক্ষিণ থেকে বাতাসে ভেসে আসা বাতাবি লেবুর ফুলের গন্ধ— আম কাঁঠালের কুঞ্জ, নারকেল গাছের সারি, চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত— সে এক পরিবেশ— ‘মরি যদি সেও ভালো’— সেই পরিবেশে ছাদে বসে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, সংগীত তার স্বাদই ভিন্ন। সাবডেপুটি বাবু বললেন, এবার আমিও যাব।

আমি বললাম, কিন্তু দেশ ভাগ হচ্ছে। যদি এটা পাকিস্তান ভুক্ত হয়? সার্কেল অফিসার বললেন, এখনও সংশয়? মেহেরপুর পাকিস্তান ভুক্ত হবেনা— কোন মতেই, এটা সেটেলড ফ্যাক্ট… এস.ডি.ও অনিল রঞ্জন বিশ্বাস মশায় এলেন। পরণে ধুতি পাঞ্জাবি, পায়ে নিউকাট জুতো, হতে শৌখিন লাঠি— টুকটুকে ফর্সা, ছিপছিপে গড়ন। বারান্দার পশ্চিম দিকে দুখানি চেয়ার পাতা। একটিতে তিনি বসলেন। আমি গিয়ে পাশের চেয়ারে বসলাম। তিনি বললেন, আসতে দেরী হলো। খুব ব্যস্ত, কাজের চাপ। আর কদিন পরেই স্বাধীনতার ঘোষণা।

—মেহেরপুর কোনদিকে পড়বে, মনে হচ্ছে?

—মনে হওয়া অর্থ অনুমান। অনুমানের সঙ্গে মিশে থাকে নিজের বাসনা কামনা প্রত্যাশা। তাতে মনে হয় মেহেরপুর পাকিস্তান ভুক্ত হবে না। নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই সরকারি নির্দেশ মতো কাগজপত্র তৈরী রাখতে হচ্ছে। পাকিস্তান হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায়িত্বভার ছেড়ে দেব। চার্জ বুঝিয়ে দেওয়া হলে আর এক মুহুর্তও পাকিস্তানে থাকব না। যত সত্বর সম্ভব পালাবো, বাক্সপেটরা গুছিয়ে রাখছি।

মেহেরপুরের আধুনিক পল্লী, হোটেল পাড়া। বহিরাগত সরকারী কর্মীরা সেই পাড়াতেই অধিকাংশ জন থাকতেন। কৃষিদপ্তরের ইনসপেক্টর গিরিনবাবুও সেই পাড়াতেই থাকতেন একটি দোতলা বাড়িতে। অকৃতদার যুবক। ভালো গায়ক। উদাত্ত কণ্ঠ। রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। আর গান শুনতে চাইলেই তিনি হারমনিয়াম নিয়ে বসে যেতেন। গান শোনার সুবাদেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। মাঝে মাঝে বিকালে বা সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় যেতাম। গান শুনতাম।

দেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হবে আর দিন চারেক পরে। কিন্তু বঙ্গদেশ বিভক্ত হবে। হিন্দুস্থান, পাকিস্তান দুভাগে। এখানেই যত চিন্তাভাবনা। করার কিছু নেই— যা ঘটবে তাকে মেনে নিতে হবে। তবু দুশ্চিন্তা মনকে পীড়িত করছে। মন অস্থির, চঞ্চল। কিছু স্বস্তি পেতে বা ভুলে থাকতেই সন্ধ্যা নাগাদ গিরিন বাবুর বাসায় ঢুকে পড়লাম।

গিরিনবাবু তাঁর দোতলার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। হারমোনিয়াম নামিয়ে বসে বললেন, বলুন, কোনটা শুনবেন?

ওঁর ভারী এবং মিষ্টি কণ্ঠে শুনতে ভালো লাগত ‘প্রাঙ্গনে মোর শিরীষ শাখায়’। আমি বললাম, ওটা দিয়েই শুরু করুন। সেই গানটি শেষ হতে না হতেই ঘরে ঢুকলেন, সাব ডেপুটি, সাব রেজিস্ট্রার, সার্কেল অফিসার। গান বন্ধ হলো। কথাবার্তা শুরু হলো। আর একটু পরেই ঢুকলেন মুন্সেফবাবু। বছর চল্লিশ বয়স। দীর্ঘদেহী সুপুরুষ। পরনে খদ্দেরের ধুতি পাঞ্জাবি। ইনিও অকৃতদার। তিনিও সুগায়ক। তিনি বললেন, ওসব কি হচ্ছে? এখন কি ওসব গান গাইবার সময়? দেশ স্বাধীন হতে চলেছে, আমাদের কতকালের স্বপ্ন সফল হতে চলেছে।

এই স্বাধীনতার জন্য কতো মৃত্যুবরণ, কতো কতো সংগ্রাম— আজ তার ফল পেতে চলেছি।

সাব ডেপুটি বাবু বললেন, স্বাধীনতা তো আসছে কিন্তু তার রূপ কেমন হবে তা তো বুঝা যাচ্ছে না।

—তুমি কি বলতে চাচ্ছ? মুন্সেফবাবু বললেন, পাকিস্তানের কথা বলছ? না, সে সম্ভাবনা নেই। গিরিন বঙ্গদেশের মানচিত্র আছে তোমার কাছে?

হ্যাঁ আছে। বলে গিরিনবাবু মানচিত্র বার করে দিলেন।

মুন্সেফবাবু সেটা দেওয়ালে টাঙিয়ে বুঝাতে থাকলেন, বঙ্গ দেশ ভাঙাটা কিভাবে, কোথা দিয়ে হচ্ছে। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, মেহেরপুর হিন্দুস্থানে পড়ছেই।

এরপর তিনি বললেন, স্বাধীনতা ঘোষিত হলেই সেদিন বিকালে এখানকার টাউনহলের মাঠে জনসভা করতে হবে। মহতী সভা, বিজয়োল্লাস। সেখানে দেশাত্মবোধক গান হবে। বলেই তিনি গাইতে শুরু করলেন- 

‘একবার তোরা মা বলিয়া ডাক

জগৎ জনের শ্রবণ জুড়াক।’

গান থামিয়ে বললেন, গিরিন সে গানের স্কোয়ার্ডের নেতৃত্ব দেব কিন্তু আমি। গিরিন তুমি আমার পাশে থাকবে। তোমরা সকলে আমাকে অনুসরণ করবে। এরপর শুরু হলো দেশাত্মবোধক গান গাওয়া। ওঁরা সকলে মিলে কোরাসে গাইতে থাকলেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে আলোচনায় সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়তে থাকল। সকলেই যেন ক্ষিপ্ত— উগ্র— উন্মাদ।

আমি ঠিক এভাবে চিন্তা ভাবনা করিনি কোনদিন। ফলে মনোমধ্যে কেমন এক অস্বস্তি জাগতে থাকল। ঘরের ভিতর আমরা এখন যে সব কথা বলছি, তা যদি প্রকাশ পায়? আমাদের মতো মুসলমানরাও ঘরের ভিতর বসে এই রকমই আলোচনা করছে তাহলে! গিরিনবাবুর বাসা থেকে সেদিন যখন বেরিয়ে এলাম তখন রাত নটা। পথে লোক চলাচল কমেছে। আমার মনে এই সব আলোচনার কথা। মনে কেমন এক অপরাধবোধ। আলোচনায় যোগ না দিলেও শ্রোতা হয়েতো ছিলাম। হিন্দু আজ মুসলমান বিদ্বেষী। মুসলমান আজ হিন্দু বিদ্বেষী। দেশের স্বাধীনতা আসছে, দেশ বিভক্ত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ অজানার অন্ধকারে। যদি হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধ থাকত, যদি অখণ্ড ভারত স্বাধীন হতো, কিন্তু… কী যে হবে— নিদারুন অস্বস্তি নিয়ে পথ হাঁটতে থাকলাম একাকী।

১২

১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ঘোষিত হবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। ইংরাজী মতে রাত্রি বারোটার পরেই পরদিবস শুরু হয়। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট রাত্রি বারোটার পর ১৫ আগষ্টের শুরু। ওই সময়েই দিল্লি থেকে ঘোষিত হবে ভারতের স্বাধীনতা। কিন্তু মেহেরপুরে ইলেকট্রিক ব্যবস্থা নেই।

রেডিও নেই। সংবাদমাধ্যম বলতে কলকাতার দৈনিক সংবাদপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। ফলে রাত বারোটার পর স্বাধীনতা ঘোষণা শোনবার কোন সুযোগই নেই। পরদিন তখন জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র মধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকা ছিল বিশেষ জনপ্রিয়।

আমরাও সেই পত্রিকার গ্রাহক ছিলাম। বেলা নটা নাগাদ সেই পত্রিকা বাড়িতে এলো। আর সেই পত্রিকা নিয়ে বাড়িতে পড়ার জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেল। বাবা, মা, আমি, আমার ভাই, সকলেই পত্রিকার সংবাদ পড়তে চায়। ঘরের সামনের বারান্দায় পত্রিকা রেখে সকলে তার সামনে গোল হয়ে গেলাম। দিল্লির খবর নয়, বঙ্গদেশের খবর-এর প্রতিই আমাদের বিশেষ আগ্রহ। সে খবর পড়ে হতাশ হয়ে গেলাম। মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া পাকিস্তান ভুক্ত হয়েছে। আর খুলনা হয়েছে হিন্দুস্থান ভুক্ত। তবে এই তিন জেলার ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। বলা হয়েছে এটা হলো নোশনাল ডিভিসন। খুলনা হিন্দু প্রধান জেলা— তাই ওটাকে রাখা হয়েছে হিন্দুস্থানে। মুর্শিদাবাদ মুসলমান প্রধান জেলা তাই পাকিস্তান ভুক্ত।

আর নদীয়াও পাকিস্তানভুক্ত। এটা কি মুসলমান প্রধান জেলা? কে জানে। তবে এই তিন জেলার ভাগ্য চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হবে 

১৮ আগষ্ট।

দেখা গেল ভাগটা হয়েছে ভাগীরথী দিয়েই। কিন্তু পাকিস্তান ঢাকা শহরকে পাচ্ছে রাজধানী হিসাবে। অন্য অংশকেও একটা রাজধানী দিতে হয়— কলকাতাকে রাখতে হয় সেদিকে। সেটা করতে গিয়েই নদী ছেড়ে স্থলভূমির ওপর দিয়ে কাঁচি চালান হয়েছে। আমাদের এরকমই মনে হলো। বাবা বললেন, এর মধ্যে কতো স্বার্থ, কতো ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। সোজা ভাঙলে কি কি ওঠে? যে যা খুশি ওরা করুক এইতো বাঁদরের পিঠে ভাগের মতোই ব্যাপার— যে মরল সে মরল। এখনও আমাদের কি হলো সেটাই ভেবে দেখ। দিল্লি হাসছে, কলকাতা হাসছে আর আমরা— আমাদের কথা কে ভাবছে? আমরা কি হাসতে পারছি? বাবা একটা গানের কলি শোনালেন। এ সমকালের পরিচিত গান— আমাদের শহর নিয়ে গান-

বলরামের চেলার মতো

কৃষ্ণকথা লাগে তেতো।

বলরাম হচ্ছে হাড়ি— কলহাড়ি, সাধক, সিদ্ধপুরুষ— লোকায়ত ধর্মগুরু। এই শহরে আমাদের বাড়ির কাছেই ভৈরবের তীরে তাঁর আখড়া। এই বলরাম এবং তার শিষ্য বর্গবৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম— এমন কি বৈষ্ণবদেরও বিরোধী ছিলেন। তাই অন্য এক ধর্ম সম্প্রদায়ের গীতিকার গানে ওই মন্তব্য করেছেন। এখন বাবা গানের সেই কলি শুনিয়ে বললেন, কাগজে ওই যে স্বাধীনতার উদ্দাম উদ্দীপনা— আমাদের কাছে অর্থহীন, বিস্বাদ ভরা হয়ে গেল।

ওরা স্বাধীন হলো। আমরা পরাধীন হলাম—বন্দী হয়ে গেলাম। সারা ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।

ওরা চেয়েছিল পাকিস্তান— মুসলমানের দেশ সেটা পেল। আমরা কি পেলাম?

মা বললেন, নদীয়া জেলাটাই পাকিস্তান হয়েছে? কৃষ্ণনগরও? যাক একপক্ষে ভালো। আমার বাপের বাড়িটাও পাকিস্তান— তাহলে যাতায়াতে অসুবিধা হবে না।

বাবা রেগে গেলেন।

আমি বললাম, এটাই তো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। দেখা যাক ১৮ তারিখে কি হয়। নিশ্চয় কিছু বদল হবে।

বাবা বললেন, কথায় আছে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। একবার যখন ছুঁয়েছে তখন পার পাওয়া কঠিন-দেখো কতোজনে কতো কথা বলল। পদ্মা দিয়ে ভাগ হবে মাথাভাঙা দিয়ে ভাগ হবে, মেহেরপুর কিছুতেই পাকিস্তান ভুক্ত হবে না, কি হলো— সব সাত চোঙার যুদ্ধ এক চোঙায় ঢুকে গেল। মরতে মরলাম আমরা।

সেদিন বাড়ি থেকেই বার হলাম না। মনের অবস্থা খুবই খারাপ। সারা ভারত যখন উৎসব-মত্ত, তখন আমাদের কাছে যেন কালো দিবস নেমে এলো।

পরদিন বাড়ি থেকে বার হয়ে দেখলাম, শহরের প্রধান প্রধান স্থানে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। কিন্তু পরিবেশ থমথমে। কেউ মুখ খুলছে না। সকলেই বুঝি ১৮ আগষ্টের প্রতীক্ষায়।

সেই প্রতীক্ষিত ১৮ আগষ্ট এলো। চূড়ান্ত ঘোষণায় জানা গেল খুলনা জেলা পাকিস্তানভুক্ত হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলা পড়েছে হিন্দুস্থানে। আর নদীয়া জেলা হয়েছে দ্বিধাবিভক্ত।

নদীয়া জেলায় ছিল পাঁচটি মহকুমা। রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙা, কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়া পাকিস্তানভুক্ত হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। চুয়াডাঙা মহকুমার অধিকাংশ স্থানই পড়েছে পাকিস্তানের মধ্যে। কেবল দর্শনগরের পর থেকে মাজদিয়া পর্যন্ত অংশটা পড়েছে হিন্দুস্থানে। মেহেরপুর মহকুমায় ছিল চারটি থানা। গাথুনী, মেহেরপুর, তেহট্ট, করিমপুর। গাথুনী ও মেহেরপুর, দুটি থানা পড়েছে পাকিস্তানে। আর তেহট্ট ও করিমপুর থানা পড়েছে হিন্দুস্থানে।

আমাদের ঐতিহাসিক স্থান বেতাই হিন্দুস্থান ভুক্ত। বেতাই-এর পূর্ব সীমাানার পর থেকেই পাকিস্তান— মেহেরপুর থানার অধীন। আর করার তো কিছু নেই।

বাবা বললেন, আমরাই পাপীতাপী। মা বললেন, কৃষ্ণনগর তাহলে হিন্দুস্থানে পড়ল? বেঁচে গেল। যাক তাও গিয়ে দাঁড়াবার মতো একটা জায়গা থাকল।

বাবা বললেন, বেল পাকলে কাকের কি? আমার বাড়ি ঘর, পাড়া শহর সব যে জলে গেল। আমি যাব কোথায়?

দুপুরে স্নানাহার সেরে স্কুলে গেলাম। পথে লোক চলাচল আগের মতোই। দোকান পাট, বাজার হাট, চলেছে যথারীতি। দেশের এতোবড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেল যেন নিঃশব্দে। কোথাও কোন প্রতিক্রিয়ার চিহ্ন নেই, সব নির্বিকার, উদাসীন। এই রকমই একটা ছবি দেখা যেতে থাকল।

স্কুলে গেলাম। ছাত্র উপস্থিতি নগণ্য। শিক্ষকদের বিশ্রাম কক্ষে বসলাম। হিন্দু মুসলমান দুই পক্ষই উপস্থিত। কিন্তু এতোবড় ঘটনার কথা নিয়ে আলোচনা নেই।

ভেবেছিলাম লীগপন্থীরা দাপাদাপী করে শহর মাতিয়ে দেবে। কিন্তু তা হলো না। যা করার ১৫ আগষ্টেই করেছে।

আমরা স্কুলে বসে ছিলাম। বেলা একটা নাগাদ একদল লোক এলো স্কুলের মাঠে। প্রায় সকলেই অচেনা। তারা এসে আমাদের বলল— মাষ্টারমশাইরা আসুন, আমরা পাকিস্তানের পতাকাকে সেলাম দেব।

আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সামনেই মাঠের মধ্যে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছিল। ১৫ আগষ্ট তোলা হয়েছিল। সেই পতাকা দণ্ডের সামনে আমরা দাঁড়ালাম। ওরা নানা প্রকার ধ্বনি দিল। তারপর আমরা সকলে পতাকাকে নমস্কার করলাম।

ওরা চলে গেল। আমরা আরও খানিকক্ষণ স্কুলে বসে থাকার পর স্কুল থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাজারের পথে খানিকদূর যেতেই শুনলাম মিছিল আসছে। পিছন ফিরে দেখলাম— একটা ছোট মিছিল আসছে হোটেল পাড়ার দিক থেকে। আমি পথের পাশে একটা দোকানের দরজার কাছে দাঁড়ালাম। মিছিল এগিয়ে এলো। ছোট্ট একটা দল, জনা তিরিশ লোক হবে। তাদের মুখে কোন কথা নেই। সুশৃংখল, শান্ত একটি দল। সামনে একজন চলেছে পাকিস্তানের পতাকা কাঁধে নিয়ে। তারপর ঘোড়ায় করে চলেছেন একজন। তাঁর দুপাশে দুজন চলেছে রক্ষীর মতো। পিছনে অন্যরা। অশ্বারোহী পরিচিত জন। বৃদ্ধ উকীল মহসীন আলি। কৃষক প্রজা পার্টি দলের প্রাক্তন বিধায়ক। এই মিছিল মনে হলো, ওই দলের সমর্থকদের। ঘোড়াটা সম্ভবত গাড়ি টানা, ছোট খাটো মানুষের ভার বইতে অনভ্যস্ত। তার মুখে দড়ির লাগাম। বৃদ্ধ মহসীন আলি সেই ঘোড়ার পিঠে বসে যে অস্বস্তি বোধ করছেন সেটা তাঁর ভঙ্গীতে স্পষ্ট।

মহসীন আলিকে দুপুর রোদে ওই ভাবে নগর পরিক্রমা করতে দেখে আমার মনটা খারাপ হলো। শহরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্মানীয় ওই বৃদ্ধকে এভাবে কষ্ট দেওয়া হলো। এ কি রাজনৈতিক সুখভোগের মজুরি দেওয়া। তাঁর পুত্র আমার প্রিয় ছাত্র। অতি ভদ্র বিনয়ী শান্ত প্রকৃতির কিশোর ভালো আবৃত্তি করে। পারিবারিক সুরুচি ও শিষ্ঠতা প্রকাশ পায় তার আচরণে।

ঘোড়ার পিঠে বসতে পারছেন না মহসীন আলি। দড়ির লাগামটা ধরে কোনমতে বসে থাকতে চেষ্টা করছেন।

মিছিলটা চলে গেল ধীর গতিতে।

আমি আবার হাঁটতে থাকলাম। খানিকদূর গিয়ে মাধবেন্দু মহান্তর দোকানে উঠে পড়লাম। সামনে লম্বা ফরাস পাতা। তাতে বসলাম। সামনের ফরাসে বসে আছেন মাধবেন্দু মহান্তর ভাই, রাঘবেন্দু মহান্ত। ইনি আমার ভগ্নীপতি। বছর দুই আগে আমার বোনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

ইনি আসাম রেলের কর্মী ছিলেন।

আমাকে দেখে রাঘবদা বললেন, স্কুল হয়ে গেল?

আমি বললাম, মিছিল দেখলেন?

রাঘবদা বললেন, ওতো হবেই। তেমন হৈচৈ হচ্ছে না।

—কেন বলুন তো?

—কি হলো ওরাও ঠিক বুঝতে পারছে না। কাগজওয়ালারাই (সংবাদপত্র) বাজার মাতিয়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষ— তুমি আমি কি বুঝছি?

—অপেক্ষা করুন। বুঝিয়ে দেবে। 

—মাধবদা কি বলছেন?

—কোথায় দাদা? কোথায় গাঁয়ে গাঁয়ে কৃষক সমিতি করে বেড়াচ্ছে। মাকে বলে দিয়েছে ওসব ভাগাভাগি নিয়ে মাথা ঘামিও না।

রাঘবদার দোকানে খানিক বসে থাকার পর উঠে পড়লাম। পথের দুপাশে দোকানের সারি। দোকানিরা বসে আছে, কিন্তু মনে হতে লাগল ওই দুপুরে বাজারে যেন বিষণ্ণ বিকাল নেমে এসেছে।

দুপুরে পথে লোকজন বিশেষ নেই। একা পথে হেঁটে বাড়ির দিকে চললাম। স্বামী বিবেকানন্দের গাওয়া সেই গানটি মনে ঘুরছে- “মন চল নিজ নিকেতনে।”

১৩ 

আজ সকালে শুনলাম, শহরের বিশিষ্ট উকীল আশুতোষ ঘোষাল মহাশয়ের বাসায় সন্ধ্যাবেলা হিন্দুদের একটি সভা হবে। আশুতোষ ঘোষাল শহরের বিশিষ্ট আইনজীবী। হিন্দু মহাসভার সমর্থক। তিনি আমার পরিচিত। তাঁর বড় আর মেজো— দুই ছেলে সোমনাথ ও বিশ্বনাথ আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী। স্কুলে পড়ার সময় ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। বিকালে আশুতোষ কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতেন। পোশাক পরিবর্তন করে হয়ত মুখ ধুয়ে, বাড়ির বাইরের দিকে খোলা রোয়াকে বসে ছেলেদের নিয়ে আসর বসাতেন। সেই আসরে আমিও থাকতাম। জলখাবার ও চা পান ও হাসাহাসি চলত। সন্ধ্যা নামার মুখে আসর ভাঙত। তিনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঠাকুর ঘরে ঢুকতেন। তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অনুগামী। স্বামী বাসুদেবানন্দর শিষ্য। ঠাকুর ঘরে বসে হাতে তালি দিয়ে গান ধরতেন- “ভব সাগর তারণ কারণ হে গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।”

আমি তখন ওঁদের বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা করতাম।

হোটেল পাড়ার উত্তরে কাঁসারি পাড়ায় একটি গলির ভিতর আশুতোষ ঘোষালের বাসাবাড়ি। বাড়িটা একতলা। কিন্তু বেশ বড়সড়। সামনে পাঁচিল ঘেরা চৌহদ্দির মধ্যে বড় উঠোন। সন্ধ্যায় সে বাড়িতে গিয়ে দেখলাম সেই উঠোনটা মানুষে ভরে গিয়েছে। শহরের সর্বস্তরের বিশিষ্ট হিন্দুরা উপস্থিত। উকীল, মোক্তার বাবুরা এসেচেন, জমিদাররা এসেছেন, সরকারি কর্মচারীরা এসেছেন, ব্যবসায়ীরা এসেছেন। অনেক বক্তৃতা, আলোচনা ও সমস্যার কথা শোনা গেল।

মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সত্যেন্দ্রভূষণ মল্লিক এসেছেন। তিনি বললেন, আজ চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগ করে দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিলাম, ভাইস চেয়ারম্যান আনসার রহিম শেখের কাছে। এখানে আরা থাকা সম্ভব নয়। কোন সুবাদে থাকব, কোন অধিকারে? ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে। মুসলমানরা পাকিস্তান পেয়েছে। সেখানে আমাদের স্থান কোথায়?

সামনেই বসেছিলেন মুন্সেফবাবু— তাঁর হাকিমের দল নিয়ে। ওঁদের দেখে সেদিনের গিরিন বাবুর বাসার পরিবেশের কথা মনে পড়ছিল। ওঁরা নিশ্চয়ই স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ভুগছেন।

বক্তৃতা দিলেন মুন্সেফ বাবু। তিনি যা বললেন, তার মোদ্দা কথা হচ্ছে— আমরা সরকারি কর্মচারীরা চলে যাচ্ছি। প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে চলে গেল ওদের হাতে। আপনাদের রক্ষাকবচ বলতে কিছু থাকল না। আপনারা এখানে নিরাপদে নির্ভয়ে থাকতে পারবেন না। যত শীঘ্র সম্ভব এ স্থান ত্যাগ করে যাওয়াই ভালো। আপনাদের অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে যাচ্ছি বলে আমরা দুঃখিত। তবু সৌভাগ্য এই যে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়েছে। হিন্দুদের জন্য একটা জায়গা মিলেছে। মুসলিম লীগতো গোটা বঙ্গদেশকেই পাকিস্তান হিসাবে চেয়েছিল।

আবার মশায়রা এক পরিকল্পনা উপস্থিত করলেন, যে দেশ ভাগ নয়। সভরেন বেঙ্গল— স্বাধীন বঙ্গদেশ করা হোক। হিন্দুস্থানও নয়, পাকিস্তানও নয়। স্বাধীন বঙ্গদেশ। বাইরে থেকে ভাবতে খুব ভালো। কিন্তু সেতো এক মরণফাঁদ হতো। দুদিন পরেই সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানরা বলত যে তারা পাকিস্তান ভুক্ত হবো। তখন আর কিছু করার থাকত না। অমাদের রক্ষা করেছে ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনিই দেশ ভাগের দাবী তুলেছিলেন। তাই বিপন্ন হিন্দুরা অন্তত পালাবার একটা মাটি পেয়েছে। তাঁকে নমস্কার। আপনারা সতর্ক থাকুন। দেশ ত্যাগ করতেই হবে আপনাদের। ভালোয় ভালোয় যেতে পারলেই বালো। বসে বসে যেন দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের দিনের বাজনা শুনলাম। চল দুর্গা জলে চল।

আশুতোষ ঘোষালের বাড়ি মেহেরপুর থানা অন্তর্গত বল্লভপুর গ্রামে। জমিদার পরিবার। তাঁদের সেই বাড়ির সামনে ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে কৃষ্ণনগর তথা নদীয়ার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদারের বসতবাড়ি। পাশে দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ মন্দির। মোগল সেনাপতি মানসিংহ এই মন্দিরে এসেই বিগ্রহের পুজো দিয়েছিলেন আর মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ভবানন্দকে আনিয়ে দিয়েছিলেন রাজ সনদ। রাজা হয়েছিলেন ভবানন্দ মজুমদার। সেটা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দশকের কথা। এখন বিশ শতকের মধ্যভাগে সেই বল্লভপুরের মানুষ- আশুতোষ ঘোষালের মেহেরপুরের বাসা বাড়িতে সন্ধ্যা সাতটায় ঘোষিত হলো- দেশ ত্যাগের- পলায়নের পরামর্শ। আমিও উপস্থিত সেখানে।

মনের ভিতর কেমন এক আশ্চর্য ইতিহাস ভাবনা আর রোমাঞ্চ শিহরণ। 

KALODHVANI VOL. XXX NO. 1-2 AUGUST 2026  REG. NO. 48309 PRICE RS. 125 

ত্রিংশ বর্ষ প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যা আগস্ট ২০২৬ কালধ্বনি  রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ৪৮৩০৯ মূল্য: ১২৫ টাকা