যে মাটির ওপর আর শৈশবের উচ্ছ্বলতা নেই

(গাজা ভূখণ্ড— ২০২৩ থেকে ২০২৬) 

৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলে সংগঠিত ঘটনার উপর UN Human Rights Council-এর নিযুক্ত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ২৩ জুন ২০২৬-এ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটিই কথা: ফিলিস্তিনি শিশুরা ইচ্ছাকৃত টার্গেট। কমিশন সরাসরি ‌‘গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধ’ এবং ‌‘যুদ্ধাপরাধ’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেছে। UNICEF-এর ১৯ জুন ২০২৬-এর সতর্কবার্তায়  গাজায় বর্তমান পরিস্থিতি .সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‌‘হাঁচি দিলেও বাচ্চারা গুলি খেতে পারে’। কমিশন শুধু সংখ্যা নয়, নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে যা ‌‘ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যবস্তু’ করার দাবিকে সমর্থন করে।

এই রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভাবে UN Independent International Commission of Inquiry-এর 23 জুন 2026-এর রিপোর্ট, UN News এবং 19 জুন 2026-এর UNICEF প্রকাশিত নথির উপর ভিত্তি করে তৈরি। ‌‘গর্ভবতী নারীকে টার্গেট করে জেনারেশন গ্যাপ তৈরি’ — এই নির্দিষ্ট অভিযোগটির উক্ত UN রিপোর্টের প্রকাশিত অংশে সরাসরি উল্লেখ নেই। তাই তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইজরায়েল এই সমস্ত অভিযোগ ‌‘পক্ষপাতদুষ্ট ও মানহানিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইজরায়েল সরকারের এই অভিযোগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত নেই। 

কমিশনের চেয়ার শ্রীনিবাসন মুরলীধর ২৩ জুনের (২০২৬) প্রেস ব্রিফিংয়ে যে তথ্য দেন

বিষয় সংখ্যা সূত্র

নিহত শিশু ২০,০০০+ UN Commission Chair

আহত শিশু ৪৪,০০০+ UN Commission Chair

সাম্প্রতিক নিহত ২৬৫ শিশু UNICEF Alert, UN News

যখন আকাশ থেকে মৃত্যু নামে

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের বাতাসে বারুদের গন্ধ মিশে যাওয়ার পর, গাজার আকাশ আর আকাশ থাকেনি। সে হয়ে উঠেছিল এক নিঃশব্দ শিকারি। তার চোখ ছিল ক্যামেরা, তার ডানা ছিল প্রপেলার, তার নাম কোয়াডকপ্টার। UN Independent International Commission of Inquiry তাদের ২৩ জুন ২০২৩-এর রিপোর্টে লিখেছে, এই যন্ত্রগুলিই ছিল নতুন যুদ্ধের ভাষা। স্নাইপারের নল, নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, আর উচ্চ-ক্ষমতার বোমা — অপারেটর দূর থেকে বোঝে  তার লক্ষ্য,  শিশু, না সৈন্য।‌ ‘এটা আর পার্শ্ব-ক্ষতি নয়’, কমিশন বলেছে। ‘এটা একটা রণনীতি’।

সংখ্যার চেয়েও ভারী নীরবতা

কাগজে-কলমে হিসাবটা সহজ। ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ২০,০০০-এর বেশি শিশু নিহত এবং ৪৪,০০০ আহত। মোট মৃতের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কিন্তু সংখ্যা কখনও সন্তানহারা মায়ের বুকের হাহাকার বোঝে না। কাগজ কি কখনও রক্তের গন্ধ পায়? পায় না। 

ধূলি ধূসরিত বর্ণহীন বিধ্বস্ত এক গলি। হানিফ, না ইউসুফ, না আজাহার, না রহিম, না অন্য কোনো নামের এক শিশু  ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। লাল, নীল, সাদা, হলুদ, সবুজ। হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে শব্দ। তারপর শুধু ধোঁয়া। আর বারুদের গন্ধ। এত তীব্র, যে চোখ জ্বলে যায়। UNICEF-এর ১৯ জুন ২০২৬-এর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও আট মাসে গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু মারা গেছে। মোট ২৬৫ জন শিশু নিহত। তারা মরেনি যুদ্ধক্ষেত্রে। তারা মারা গেছে  ফুটবল পায়ে নিয়ে। মাছ ধরার ছিপ হাতে নিয়ে। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে। ঘুড়ির সুতোটা খুঁজে পাওয়া গেল ধ্বংসস্তূপের নিচে। সুতোয় রক্ত। সেই রক্ত শুকিয়ে গেল। কিন্তু মায়ের কান্না? সে কান্না শুকায় না। 

প্রতিদিন শুধু শেষযাত্রার মিছিল। একের পর এক।  মিছিলের শেষ নেই, কারণ লাশেরও শেষ নেই। শিশু যন্ত্রণায় কুঁকড়ে কুঁকড়ে মাটি আঁকড়ে ধরে, আর মাটি তাকে নিজের গর্ভে লুকিয়ে নেয়।

লক্ষ্যবস্তু করার শিল্প — ড্রোন থেকে স্নাইপারের নল

‘লক্ষ্যবস্তু করার ধরন’ বোঝাতে গিয়ে কয়েকটি শব্দ রিপোর্টে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে— deliberate, systematic, identifiable। 

UNICEF-এর মুখপাত্র জেমস এল্ডারের সেই বিখ্যাত বাক্য — ‘Orange Line-এর কাছে আপনি হাঁচি দিলেও গুলি খেতে পারেন’। কারণটা? ‌‘জবাবদিহির সম্পূর্ণ অভাব’। ৯০%-এর বেশি ক্ষেত্রে দায়ী ইজরায়েলি বাহিনী। 

Orange Line শুধু নয়, আকাশ থেকে নিঃশব্দে নেমে আসা ঘাতক এই যন্ত্রগুলি ‘ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায়’  ব্যবহার করা হয়েছে। উপরে যে বসে আছে, সে  নিচে দেখতে পায়। কে দৌড়াচ্ছে, কে পড়ে গেছে, কার উচ্চতা কত। শিশু চেনা যায়। 

কমিশনার ক্রিস সিদোটি একটি ঘটনার কথা বলেছেন, ১৪ বছরের এক কিশোর। কোনো লড়াই ছিল না। টহলদারি দল গুলি করল। ছেলেটি ৪৫ মিনিট রাস্তায় পড়ে রক্তাক্ত হল। ইজরায়েলি সৈন্যেরা তার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। ভাবলেশহীন, নির্বিকার।

পরিকাঠামো ধ্বংস

এটা শুধু মানুষের শরীর নয়, ভবিষ্যতের শরীরকেও ভাঙা। কমিশন নথিভুক্ত করেছে নবজাতক ও মাতৃত্বকালীন কেন্দ্র, অনাথ আশ্রম, স্কুলের উপর হামলা। যখন একটা প্রসূতি কেন্দ্র ভেঙে পড়ে, তখন শুধু ইট-সিমেন্ট ভাঙে না। একটা প্রজন্মের প্রথম নিঃশ্বাসও আটকে যায়। কমিশন লিখেছে, শিশুদের সুরক্ষা, যত্ন ও বেঁচে থাকা ‘ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে অবিচ্ছেদ্য’। তাই শিশুদের খুন করলে, একটি জাতির ভবিষ্যতকে খুন করা হয়। 

শৈশবের মৃত্যু — মানসিক ও সামাজিক ধ্বংস

‘বোমা থেমে গেলেও, তারা এক রাতে সেরে উঠবে না’। কমিশনের চেয়ার শ্রীনিবাসন মুরলীধরের এই একটি বাক্যই যথেষ্ট। কমিশন একে নাম দিয়েছে “Occupied Psychology”— অধিকৃত মনস্তত্ত্ব। এর লক্ষণ কী?

খেলার মৃত্যু: যে শিশু খেলতে ভুলে যায়, তার শৈশব মরে গেছে।

কল্পনার অবসান: কল্পনা মানে ভবিষ্যৎ। যে শিশুর কল্পনা নেই, তার ভবিষ্যৎ নেই।

আশাহীনতা: ২১,০০০ শিশু স্থায়ী প্রতিবন্ধী। ৪,০০০-এর অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে। গাজায় এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক শিশু—অ্যাম্পুটি। কমিশন তার রিপোর্টের নামই রেখেছে— ‘The essence of childhood has been destroyed’। বর্ণময় শৈশবের উচ্ছ্বলতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। WHO আর UNICEF বলছে, এই অঞ্চলের ১৫ লক্ষের বেশি শিশু ‘গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত’ পেয়েছে। এটা একটা গোটা প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের উপর বোমা ফেলা।

আইনের ভাষায়— এটা কী? 

UN কমিশন দ্বিধা করেনি। তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের ভাষা ব্যবহার করেছে। তাদের যুক্তি — শিশু মানে ‘জনসংখ্যার ধারাবাহিকতা, সাংস্কৃতিক পুনরুৎপাদন ও সম্মিলিত ভবিষ্যৎ’। তাই ‘শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা’ হল ‘গণহত্যার অভিপ্রায়ের একটি প্রধান সূচক’। ‘ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব বজায় রাখার ক্ষমতার’ ওপর আঘাত।। রিপোর্টে আরও আছে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ।

দখলদারিত্বের ছায়ার এই গল্প শুধু গাজার নয়। কমিশনের ১৯ জুন ২০২৬-এর আরেকটি রিপোর্ট বলছে, ফিলিস্তিনিরা ‘দুই দিক থেকে চাপে’। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, আর গাজায় হামাসের ভয়-ভিত্তিক শাসন।

একই সঙ্গে আরও একটি অভিযোগ: ইজরায়েলি বাহিনী যৌন সহিংসতাকে ‘যুদ্ধের পদ্ধতি’ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

রিপোর্টের সমাপ্তি কথা  

জবাবদিহি কোথায়? মিশন শুধু অভিযোগ করেনি। তারা রাস্তা দেখিয়েছে। 

জবাবদিহি — দায়ী সামরিক ইউনিট চিহ্নিত করে ইজরায়েল ও সমস্ত রাষ্ট্রকে আইনের আওতায় আনার সুপারিশ। 

দখলদারিত্বের অবসান — ICJ-এর পরামর্শমূলক মতামত মেনে পূর্ব জেরুজালেম সহ পশ্চিম তীর থেকে ইজরায়েলের উপস্থিতি শেষ করতে হবে। 

আন্তর্জাতিক ভূমিকা — শত্রুতা বন্ধ, ন্যায়বিচার, এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার।

ইজরায়েল এই সমস্ত অভিযোগ ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও মানহানিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

আরো কিছু কথা 

UN কমিশন ১৯৪৮-এর গণহত্যা কনভেনশন সূত্র বলছে, ‘এটা অভিপ্রায়’। কারণ শিশু মানে একটা জাতির ধারাবাহিকতা। শিশুকে মারলে ইতিহাসের পরের পাতাটাই ছিঁড়ে ফেলা হয়।

শ্রীনিবাসন মুরলীধর বলেছেন, ‘ক্ষতি অপরিবর্তনীয়’।

হ্যাঁ। কারণ যে মাটিতে ২০,০০০টা ছোট ছোট কবর, সে মাটিতে আর ফসল হয় না। শুধুই সমবেত বিদায় অনুষ্ঠান। প্রতিদিন। প্রতিক্ষণ। 

কমিশন সবচেয়ে নিষ্ঠুর যে কথাটা লিখেছে, সেটা হল নবজাতক ইউনিট, মাতৃত্বকালীন কেন্দ্র ভাঙার কথা। 

একটা বোমা যখন প্রসূতি ওয়ার্ডে পড়ে, তখন শুধু দেওয়াল ভাঙে না। ভাঙে একটা সম্ভাবনা। একটা নাম, যা রাখা হয়নি। একটা প্রথম কান্না, যা শোনা হয়নি। শিশুকে মারলে একটা জীবন যায়। আর যে ঘর ভাঙে, যেখানে জীবন তৈরি হয়, সেটা ভাঙলে একটা সময় বয়ে যায়। এবং একটা ভবিষ্যৎ মৃত্তিকাগর্ভেই। হ্যাঁ, জন্মানোর আগেই।

কোয়াডকপ্টার। এই শব্দটা এখন গাজার শিশুদের কাছে “আজরাইল”। আকাশ থেকে নেমে আসা একটা চোখ। যে চোখ চিনে নেয়, কে ছোট, কে লম্বা, কে শিশু।

৪৪,০০০ আহত। এর মধ্যে ৪,০০০ শিশুর পা নেই। গাজা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রাচের বাজার।  লায়লা নামের যে মেয়েটা  নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসত। ঢেউ গুনত। এখন তার একটা পা-ই নেই। ঢেউ গোনার লোকটাই সেখানে নেই। সে আর পুকুরে ঝাঁপাবে না। কারণ জল দেখলেই মনে পড়বে, ‘আমি আর দৌড়াতে পারব না’। তার বন্ধুরা যখন মাঠে ছুটে যাবে, লায়লা জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।  তার চোখের জল গরাদের ফাঁক গলে মাটিতে পড়বে। মাটি সেই জল শুষে নেবে। কারণ মাটি কাঁদতে শিখে গেছে।

ইজরায়েল বলে, ‘এটা পক্ষপাত’। 

কিন্তু আকাশ তো পক্ষ নেয় না। সে শুধু উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। আর কাঁদে। নিঃশব্দে। কারণ আকাশও জানে, এই নদীর জল আর কখনও পরিষ্কার হবে না।

লেখা শেষে মনে পড়ে গেল একটি ডায়েরির কথা—

সময়টা ছিল ১৯৩৭-১৯৪৫ সালের  দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধ। জাপান, চিন দখল করতে এসেছিল। এর পরপরই সেই যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হয়ে যায়। 

Henry Norman Bethune ১৯৩৮ সালের জানুয়ারি মাসে চিনে যান। তিনি কানাডা ও আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টির পাঠানো মেডিক্যাল টিমের নেতৃত্বে ছিলেন। মাও সে-তুং-এর Eighth Route Army-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ১৯৩৮-এর বসন্তে ইয়েনানে আসেন, তারপর Shanxi-Chahar-Hebei সীমান্ত অঞ্চলে ফ্রন্টলাইনে কাজ করেন। দেড় বছরেরও কম সময়ে তিনি ১১টি যুদ্ধ দেখেছেন, ফ্রন্টলাইনের খুব কাছে অপারেশন করেছেন। ১৯৩৮ সালের ১২ নভেম্বর অপারেশন করতে গিয়ে আহত সেনার ক্ষত থেকে সেপসিস হয়ে মারা যান। 

ডায়েরির শেষ পাতার এলামেলো অংশবিশেষের ভাবানুবাদ

 WOUNDS

অংশ ১

মাথার উপর ঝুলছে কেরোসিনের ল্যাম্প। তার একটানা ভনভনানি — যেন একটা জ্বলন্ত মৌচাকের গুনগুনানি। চারদিকে কাদা। কাদার দেওয়াল, কাদার মেঝে, কাদার বিছানা। জানালায় সাঁটা সাদা কাগজ। বাতাসে রক্তের গন্ধ। ক্লোরোফর্মের গন্ধ। আর হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঢোকা ঠাণ্ডা।  রাত তিনটে। ১ ডিসেম্বর। উত্তর চিনের লিন চু। অষ্টম রুট আর্মির তাঁবু…।  আর সামনে পড়ে আছে শুধু মানুষ নয়, মানুষের ছিঁড়ে যাওয়া টুকরো।

ক্ষত। হাজারটা ক্ষত। 

কালচে-বাদামি মাটি জমে শুকিয়ে যাওয়া ছোট ছোট পুকুরের মতো ক্ষত। কালো গ্যাংগ্রিনে বুটিক, ছেঁড়া প্রান্ত বরাবর ক্ষত। কিছু ক্ষত দেখতে শান্ত, ভদ্র। অথচ তার গভীরে লুকিয়ে আছে ফোড়ার পুঁজ। সে সুড়ঙ্গ কেটে ঢুকে পড়েছে মানুষের সবচেয়ে শক্ত পেশির ভিতর। বাঁধ দেওয়া নদীর মতো, রাগী স্রোত হয়ে পেশির পাশে পাশে, পেশির ফাঁকে ফাঁকে বয়ে যাচ্ছে। কিছু ক্ষত বাইরের দিকে ফুলে উঠেছে — পচে যাওয়া অর্কিড, পায়ের তলায় পিষে যাওয়া গাঁদা। মাংসের ভয়ঙ্কর ফুল। 

আর সেই ক্ষতের মুখ থেকে গাঢ়, কালো রক্ত বমির মতো উঠে আসছে। সঙ্গে  বিষের বুদবুদ। এখনও যে রক্তক্ষরণ থামেনি, তার টাটকা বন্যার উপর সেই বুদবুদগুলো ভাসছে। পুরনো ব্যান্ডেজ। নোংরা। রক্তের আঠায় চামড়ার সাথে এক হয়ে গেছে। 

আস্তে। আগে ভিজিয়ে নাও। উরু কেটে দাও। পা-টা তুলে ধরো। এটা কী? একটা থলে। একটা লম্বা, ঢিলে, লাল মোজা। কীসের মোজা? বড়দিনের উপহারের মোজা? হাড়ের সেই শক্ত দণ্ডটা গেল কোথায়? এক ডজন টুকরো হয়ে গেছে। যত্ন করে আঙুল দিয়ে খুঁটে খুঁটে তুলে ফেলো। কুকুরের ভাঙা দাঁতের মতো সাদা। ধারালো। বাঁকা। আর আছে? আছে। সব? না, এই তো আরেকটা। 

এই পেশিটা কি মরে গেছে? চিমটি কাটো। হ্যাঁ, মৃত। ফেলে দাও। এটা আর জোড়া লাগবে? যে পেশি একদিন গর্বে টানটান হত, লাফাতো, দৌড়াতো..

টানো। ছাড়ো। টানো। ছাড়ো। কী আনন্দই না ছিল ওর! আজ সব শেষ। একেবারে শেষ। আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে দিলাম।

এবার? এবার আমরা কী নিয়ে বাঁচব? গ্যাংগ্রিন। ও একটা ধূর্ত শত্রু। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে আসে। লোকটা কি বেঁচে আছে? হ্যাঁ, ডাক্তারি মতে সে জীবিত। শিরায় স্যালাইন চালিয়ে দাও। হয়তো ওর শরীরের অগণিত কোষ মনে করবে, মনে পড়বে সেই আদিম, গরম, নোনা সমুদ্রের কথা। ওদের প্রথম বাড়ির কথা। প্রথম খাবারের কথা। এক লক্ষ বছরের ঘুম ভাঙা স্মৃতি নিয়ে ওরা হয়তো মনে করবে আরেকটা জোয়ার। আরেকটা সমুদ্র। মনে করবে কীভাবে সমুদ্র আর সূর্য  মিলে জীবনকে জন্ম দিয়েছিল। 

হয়তো ওরা ক্লান্ত মাথাটা তুলবে। বুক ভরে শ্বাস নেবে। মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেকে আবার বাঁচাবে।… ফসল কাটার দিনে সে কি আবার খচ্চরের সঙ্গে মাঠের আল ধরে দৌড়াবে? হাসবে? চিৎকার করবে? না। সে আর কোনোদিন দৌড়াবে না। একটা পা নিয়ে মানুষ দৌড়ায়! তাহলে? বসে থাকবে। আর দেখবে অন্য ছেলেরা কীভাবে দৌড়ে চলে যায়। কী ভাববে সে? আমরাই যা ভাবতাম। ওকে করুণা কোরো না। প্লিজ, করুণা কোরো না। তোমার করুণা ওর ত্যাগকে অপমান করবে। 

সে নিজের পা-টা দিয়েছে চিনকে বাঁচানোর জন্য।… শরীরটা কী অসম্ভব সুন্দর। কী নিখুঁত ওর বর্ম। কী আশ্চর্য ওর চলন। কত বাধ্য। কত গর্বিত। কত শক্তিশালী। আর যখন ছিঁড়ে যায়… তখন কী ভয়ঙ্কর। জীবনের সেই ছোট্ট শিখাটা… নিভে আসে। কাঁপে। তারপর নিভে যায়। ঠিক মোমবাতির মতো। কোনো শব্দ নেই। কোনো হইচই নেই। নিভে যাওয়ার আগে একবার শুধু কেঁপে ওঠে। যেন শেষ প্রতিবাদ। তারপর চুপ। ওর সময় ফুরোল। সে নীরব হয়ে গেল। আর কেউ আছে?

জাপান থেকে এক লক্ষ শ্রমিক এসেছে। আরেক লক্ষ চিনা শ্রমিককে মারতে। পঙ্গু করতে। জাপানি শ্রমিক কেন তার নিজের ভাইকে মারবে? যে শুধু বাঁচতে চাইছে? চিনা শ্রমিক মরলে জাপানি শ্রমিকের পকেটে কী আসবে? কিছুই না। তাহলে কী জন্যে তার এই আসা? কার জন্য এই খুন? কে পাঠালো এই গরিব মানুষগুলোকে খুনের মিশনে? কীভাবে বোঝানো হল ওদের… ওদের দারিদ্র্যের ভাইকে, দুঃখের সাথীকে গুলি করতে? কয়েকজন ধনী মানুষ কি এক লক্ষ গরিবকে বুঝিয়েছে… আরেক লক্ষ গরিবকে মেরে ফেলতে?

যাতে ওই কয়েকজন আরও ধনী হতে পারে? কী ভয়ঙ্কর! কীভাবে রাজি করালো ওদের চিনে আসতে? সত্যি কথা বলে? না। সত্যি জানলে ওরা নিজের ঘরই ছাড়ত না। ওদের বলা হয়েছে এটা ‌‘জাতির ভাগ্য’। ‌‘সম্রাটের গৌরব’। ‌‘দেশের সম্মান’। ‌‘রাজা আর মাতৃভূমি’।

 সব মিথ্যে। জঘন্য, নরকের মিথ্যে!

এই হচ্ছেন Bethune। অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা মাংসের মধ্যে মানুষ খুঁজে পেতেন, আর যুদ্ধের মধ্যে অপরাধী।

অংশ ২

.আর আছে? 

একটা শিশু! মাত্র সতেরো। পেটে গুলি লেগেছে। ক্লোরোফর্ম দাও। তৈরি? পেটের পর্দা কাটতেই একটা শব্দ হল। ফুস্…। পেটের ভিতর থেকে গ্যাস বেরিয়ে এল। পচা মল-মূত্রের গন্ধ। আর সামনে পড়ে আছে গোলাপি, ফুলে ওঠা নাড়িভুঁড়ির পাক। হাত দাও। কাঁপছে। গরম। জীবন্ত। অথচ যে-ছেলেটার শরীরে এগুলো ছিল, সে আর নেই। বয়স ওর সতেরো।

ওর দাড়ি ওঠেনি ভালো করে। ওর মা ওকে হয়তো শেষবার ভাত বেড়ে দিয়েছিল। ও জানতো না পেটের ভিতরটা দেখতে এমন হয়। কেটে ফেলো। সেলাই করো। কিন্তু জানি। জানি এ ছেলেটা বাঁচবে না। পেটের গুলি মানে মৃত্যুর পরোয়ানা। শুধু সময়ের অপেক্ষা। ওর চোখ খোলা। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যথা নেই ওর চোখে। শুধু বিস্ময়। 

যেন বলছে, “ডাক্তারকাকু, আমি কি মরে যাব?” 

আমি মিথ্যে বলতে পারলাম না। মাথা নাড়লাম। 

ও একবার হাসলো। খুব হালকা। তারপর চোখ বুজলো।

আরেকটা শিখা নিভে গেল। 

আর কেউ? না। আজ আর নেই। না না । আছে।

আর আছে? চারজন জাপানি বন্দি। 

নিয়ে এসো ওদের। এই যন্ত্রণার সমাজে কোনো শত্রু নেই।

Bethune লিখেছিলেন: ‌‘What is the cause of this cruelty?’

অংশ ৩

প্রথমজন। কাঁধটা গেছে। গুলিটা এসে কাঁধের হাড়, acromion process আর humerus-এর মাথা… সব চুরমার করে দিয়েছে। মাংস ঝুলছে। দ্বিতীয়জন। বুকের ভিতর গুলি। ফুসফুস ফুটো। প্রতিটা শ্বাসে রক্তের বুদবুদ উঠছে। তৃতীয়জন। পায়ের tibia ভেঙে গুঁড়ো। হাড় বেরিয়ে এসেছে। চতুর্থজন। শুধু উরুতে মাংসের ক্ষত। এক এক করে শোয়াও। ব্যান্ডেজ করো। চা দাও ওদের। গরম চা। ওরা সবাই কাঁপছে। ভয়ে। ঠাণ্ডায়। ব্যথায়। 

ওরা সবাই এত অল্পবয়সী। আমার ছেলের বয়সী। ওরা জানে না কেন ওরা এখানে। ওদের বলা হয়েছিল এটা‌ ‘সম্রাটের জন্য’। ওদের বলা হয়েছিল এটা ‌‘দেশের গৌরবের’ জন্য। ওদের বলা হয়েছিল এটা ‌‘রাজা আর মাতৃভূমির’ জন্য।

মিথ্যে। সব মিথ্যে।

কাঁধ-ভাঙা ছেলেটার হাত দেখো। কালশিটে। মাটির দাগ। কৃষকের হাত। ফুসফুস-ফুটো। ছেলেটার নখ দেখো। ভাঙা। কারখানার শ্রমিকের হাত। এরা পেশাদার খুনি নয়। এরা অস্ত্র হাতে শ্রমিক। ইউনিফর্ম পরা আমারই ভাই। ওদের পাশাপাশি শুইয়ে দাও। চিনা সৈনিকটার পাশে। দেখো, কী আশ্চর্য! মুখের কাটা দাগটাও একইরকম। ব্যথার চিৎকারটাও একই ভাষায়। রক্তে, পচনে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে… সবাই ভাই। এই ঘরে আজ কোনো জাপান নেই। কোনো চিন নেই।

শুধু আছে মানুষ। আর আছে ক্ষত…।


পশ্চিম এশিয়া না বুঝলে প্যালেস্টাইন-ইজরায়েল বোঝা যায় না।
ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি, ধর্ম — সবকিছু মিলিয়ে এই সংঘাতের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা
চলমান সন্ত্রাস : প্যালেস্টাইন – ইজরায়েল
শম্পা মিত্র
প্রথম প্রকাশ: জুন, ২০২৬
প্রকাশক :: কালধ্বনি, ২/১ এ, আশুতোষ শীল লেন, কলকাতা – ৯
পরিবেশক : সেতু প্রকাশনী, ১২ এ, শঙ্কর ঘোষ লেন, কলকাতা – ৬
প্রাপ্তিস্থান: সেতু প্রকাশনী, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা ৭৩
হার্ড বাউন্ড, পৃষ্ঠা ৪৬২ মূল্য: ৬০০ টাকা