প্রুফ্রকের প্রেমের গান : টি এস এলিয়ট

[ টি এস এলিয়ট, ২৬ সেপ্টেবর ১৮৮৮ — ৪ জানুয়ারি, ১৯৬৫]

চলো তবে যাই আমরা দুজনে মিলে
সন্ধ্যা যখন বিস্তৃত সারা আকাশের নীলে
টেবিলে শায়িত ইথারিভূত রুগীর মতো;
চলো যাই, এক নির্জন-প্রায় রাস্তায়
সস্তা হোটেল, অস্থির রাত, অস্ফুট আশ্রয়
ঘুণধরা, আর ঝিনুক খোলায় সাজানো পান্থশালায় :
যে পথ চলে অভিসন্ধিতে
ক্লান্তিজনক তর্কের ঝোঁকে
নিয়ে চলে এক দুর্বহ প্রশ্নের দিকে
ওহ, জিজ্ঞেস করো না “ কী সে প্রশ্ন ভাই?”
বরং চলো, যাই, সারি সাক্ষাতটাই।

নারীরা ঘরের ভিতর আসে আর যায়,
মাইকেলএঞ্জেলো নিয়ে খালি বকে যায় ।

যে হলদে কুয়াশা পিঠ ঘষে যায় জানলার শার্সিতে,
যে হলদে ধোঁয়াটা নাক রগড়ায় জানলার শার্সিতে,
যার জিভ চাটে সন্ধ্যার আনাচ কানাচ,
নর্দমা জলে খানিক দাঁড়ায়
চিমনি থেকে গড়িয়ে নামা ঝুল কালি পিঠে গড়িয়ে পড়ে
ছাদ থেকে পিছলায়, ছোট্ট লাফায়,
অক্টোবরের নরম রাতের পেলব পরশ পেয়ে,
বাড়ির কোথাও গুটিয়ে থেকে অঘোরে ঘুমায়।

আর নিশ্চয় সময় থাকবে
হলদে কুয়াশা রাস্তা ধরে গড়িয়ে পড়ার জন্য,
জানলার শার্সিতে নিজের পিঠ ঘষার জন্য;
সময় থাকবে, থাকবে অনেক সময়
সাজবে তোমার মুখ অনেক মুখ দেখার জন্য;
সময় থাকবে ধ্বংস করে সৃষ্টি করার,
আর সময় সকল কাজের জন্য,
হাতে গোনা সব দিনের জন্য
প্রতি উঠে আসা প্রশ্নের জন্য
সময় তোমার জন্য, সময় আমার জন্য,
আর সময় থাকবে বহু সংশয়, দ্বিধা দ্বন্দ্বের,
সময় থাকবে শুধরে নেওয়া অজস্র স্বপ্নের,
যদি তার আগে এক কাপ চা বিস্কুট হয়।

নারীরা ঘরের ভিতর আসে আর যায়,
মাইকেলএঞ্জেলো নিয়ে খালি বকে যায় ।

আর সময় নিশ্চই থাকবে ভাবার,
“একটু সাহস করব?” “করব আমি সাহস?”
সময় থাকবে, পিছন ফিরে, সিঁড়ি বেয়ে নামতে
মাথার মধ্যে চুল সরিয়ে খোলা টাক ঢাকতে—
(ওরা তখন বলবে:”দেখ ওর চুল কত পাতলা হয়ে গেছে!”)
আমার মর্নিং কোট, বেষ্টিত কলার উন্নত চিবুকের কাছে,
আমার দামি, শৌখিন টাই, ছাপোষা পিনে আটকে আছে—
(ওরা বলবে: “কিন্তু ওর হাত পা জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেছে!”)
আমার স্পর্ধা হবে?
ব্রহ্মাণ্ড নাড়িয়ে দিতে?
মুহূর্তে মিলবে সময়
সিদ্ধান্ত নেবার, শুধরে নেবার,
আর পরমুহূর্তেই পাল্টি খাওয়ার

কারণ আমি এদের সবাইকে ইতিমধ্যে চিনে গেছি, জেনে গেছি সবাইকে—
জেনেছি সন্ধ্যা, সকাল, বিকেলগুলোকে,
কফির চামচে মেপেছি আমার জীবন;
চিনেছি ক্ষীয়মাণ স্বর, মৃত্যুকূপে লীন
দূর কক্ষ থেকে ভেসে আসা সুরের অতল হতে।
ভরসা তাই কোত্থেকে করি?

আমি এদের সবার চোখের দৃষ্টি চিনেছি, চিনেছি সবাইকে—
যে দৃষ্টি তোমাকে একটা বাক্যখণ্ডে বদ্ধ করে
তেমনই বদ্ধ আমি, লটকে আছি পিনে, দেয়ালে আটকে ছটফটাচ্ছি
তখন কেমন করে শুরু করব বলো?
উগরে দেবো কি দিন যাপনের পোড়া অবশেষ?
ভরসা তাই করি কোত্থেকে ?

আমি সব বাহু দঙ্গল ইতিমধ্যে চিনেছি, চিনেছি সবগুলি—
কঙ্কন পরা বাহু, শুভ্র, উন্মুক্ত
(দীপের শিখায় হালকা বাদামি কেশের ছায়ায় !)
করে তুলছে উদ্ভ্রান্ত?
টেবিলে, আলতো এলানো বাহু, উষ্ণ শালে জড়ানো বাহু,
তাহলে কি আমি ভরসা করতে পারি?