সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা: এক সাধারণ পাঠকের অভূতপূর্ব যাত্রা।

১০ই এপ্রিল, ২০২৬ 

আজ শেষ করলাম পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাস – ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’। ভালো, খুব ভাল, অসাধারণ, অনবদ্য — এরকম কতগুলো বিশেষণ দিয়ে দাগিয়ে দেবার উপন্যাস এটা নয়, অন্তত আমার কাছে। এই ‘আমার কাছে’ কথাটা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেন না, গত যে ক’টা দিন ধরে  আমার এই উপন্যাসের সঙ্গে যাপন নির্দিষ্ট হয়ে গেছিল, যাকে একার্থে নিয়তিনির্দিষ্টও বলা যেতে পারে, সেই দিনগুলিতে ছিলাম আমি আর এই উপন্যাস। আর কিছু ছিল না? ছিল। ছিল আমাদের জাপটে ধরা এই সময়টা। সেই সময়ের চাপে আর তাপেই এই উপন্যাসের রসগ্রহণ!  

অবভাস প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এই ছ’শো আটচল্লিশ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক উপন্যাসের প্রথম  সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারি, ২০২৫এ, আর দ্বিতীয় সংস্করণ, যেটি আমার হাতে আছে, তার প্রকাশকাল মে, ২০২৫! প্রথম সংস্করণের দাম ৭৫০টাকা, পরেরটির ৮২৫ টাকা! বইয়ের চতুর্থ প্রচ্ছদ জানাচ্ছে – এই উপন্যাসে “সাতশো বছর, একটি পরিবারের ন’টি প্রজন্ম ও ঊনপঞ্চাশটি মুখ্য চরিত্র” নিয়ে এক ‘কুহকী উন্মোচন’এর কথা! এগুলো তথ্য হিসেবে বাংলা সাহিত্যের পাঠকের সামনে তুলে ধরার মতো! 

কিন্তু আমরা বলছি এই সময়ের কথা।

৭ই এপ্রিল, ২০২৬ 

আজ সন্ধেবেলায় জানা গেল, আমার ছোটমামা, যাঁর বয়স ৭৫, যিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক,  যিনি ভারতের স্বাধীনতার বয়সের থেকে বয়সে সামান্য ছোট, যিনি প্রাপ্তবয়স লাভ করার পর থেকে দেশে অনুষ্ঠিত সবকটি ভোটে ভোটার হিসেবে মতপ্রদান করে ‘সুমহান ভারতীয় গণতন্ত্র’কে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁর নাম ভোটারতালিকা থেকে বাদ হয়ে গেছে! ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে তিনটি ডি এর কথা (detect, delete, deport) সদর্পে ঘোষণা করেছেন, তার প্রথমটির পরে দ্বিতীয়টিও (deleted) তাঁর নামের পাশে বসে গেছে! তাহলে কি এবার তৃতীয়টির অপেক্ষা? পুরোটা কল্পনাও করে উঠতে পারি না! শিউরে উঠি! আবার একই সঙ্গে মনের মধ্যে এক আত্মপ্রবঞ্চনাময় ভরসাও কাজ করে! হয়ত সবই ঠিক হয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত। বা, ওই পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ হয়ত সবটা ভেবে উঠতে পারছেন না এখনও! তাই ‘যা হবার হবে’ গোছের স্বস্তিতে আছেন!

পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাস – ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ পড়ে ফেলেছি অনেকটা। যত এগোচ্ছি, ততই যেন জাপটে ধরছি দুজন দুজনকে। এই উপন্যাস আর আমি। বা, আমি আর এই সময়!  এই সময় আর এই উপন্যাস। আমার ছোটমামা আর এই গণতন্ত্র! আমার ছোটমামা আর তার না-পড়া এই উপন্যাস! ঘোর লেগে যায়! বন্ধ করে রাখি বইয়ের পাতা। ভাবতে বসি, এর পর? এরপর কী? আমার? মামার? এই উপন্যাসের? ‘সুমহান ভারতীয় গণতন্ত্রের’? 

বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়। উপন্যাসের সম্পূর্ণ নির্মাণ গড়ে উঠছে তারই দেখতে থাকা এবং খুঁজতে থাকা সময়ের ভাষ্যে, গোটা উপন্যাসে সে ই যেন মনে হয় লেখকের বিকল্প অহং। উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি কি সেও হয়নি?  ঠিক এই প্রশ্ন তো তাকে করা হয়নি। উপন্যাসের শুরুতেই তাকে বিচারকের (মি’লেডি) যে প্রশ্নমালার সামনে পড়তে হয়, তার প্রধান কথা, এভিডেন্স কই? (‘মানে যা ঘটেনি তার এভিডেন্স?’) অসহিষ্ণু মি’লেডির সোজাসাপ্টা কথা, “ শুধু মুখে বললে হবে না, দেখান! শো, ডোন্ট টেল!”  

সেই চাহিদা মেটানোর তাগিদ থেকেই হয়ত নয়, বরং এক অন্তর্গত  জীবনজিজ্ঞাসার তাগিদ থেকে, এই প্রশ্নের সূত্র ধরে বাপ্পার অনুসন্ধিৎসু মন ঢুঁড়ে ফেলে সাতশ বছরের সপ্তগ্রামের ইতিহাস! সঙ্গে নেয় পাঠককে। আমাকে। শুধু ইতিহাস? না। ন’টি প্রজন্মের যাপনের সজীব চিত্রমালা। ইতিহাস,পুরাণ, ভূগোল, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, মিথ – সবকিছুরই  এক আশ্চর্য মিশেল! একেই কি এক কথায় জীবন বলে? সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পাঠশেষে এক গভীর অবগাহনের তৃপ্তি হয়! শুধুই তৃপ্তি? না, বিস্ময়! বিস্ময় এই, যে পাঠক হিসেবে এই যাত্রাপথে সামিল হলাম কীভাবে? ছোটবেলায় প্রাগুক্ত মামারই সাইকেলের রডে বসে যখন অনেকটা রাস্তা পার হয়ে নতুন এক জনপদে গিয়ে পৌঁছোতাম, তখন আলাদা করে হিসেব মেলানোর ভাবনা ছিল না, যে, কিভাবে, মামা চড়াই রাস্তা পার হয়ে গেল আমাকে নিয়ে, কীভাবে ঢালু রাস্তায় ব্রেক ধরে নিয়ন্ত্রণ করল, কখন গলিপথ, কখন রাজপথ ধরে এক সময়ে গন্তব্যে এসে পৌঁছোলো সাইকেল  চালাতে না-জানা আমাকে নিয়ে!

কিন্তু আজ, সাত তারিখের আগে, আমার মামা এতটা সরাসরি, আমার সঙ্গে, বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের যাত্রাপথে ঢুকে পড়েনি! এর বেশ কিছুদিন আগে আমি এই উপন্যাসটা পড়া শুরু করেছি, যার প্রথম অধ্যায়ের প্রথম লাইনটি এরকম, “মি’লেডি, হারানো স্বদেশভুমির স্মৃতিযাপনের মতো বিলাসিতা আর কিছুতে নেই”। কিন্তু শুরুরও তো একটা শুরু থাকে।  রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন, প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর মতো। এই উপন্যাসের  শুরুতে তেমন পেয়ে যাই এক বংশলতিকা, যেখানে বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের মাতুলবংশের নয় প্রজন্মের কথা বলা আছে। এটা আমাকে আবার ঘুরে পড়তে হয় উপন্যাস শেষ করার পরে, তখন তাঁরা আর শুধু টেবিলভুক্ত কিছু নামমাত্র নন, পাঠকের চেনা মানুষ!  আর এরপর এই বংশলতিকার সূত্র ধরে মি’লেডির সঙ্গে বাপ্পার কথোপকথন বাঁকানো (italics) অক্ষরে উদ্ধৃত করে শুরু হয় মূল উপন্যাস। 

৪ঠা জানুয়ারি ,২০২৬    

আজ খুব সকাল সকাল আমি আর আমাদের কালধ্বনির বন্ধু পার্থ (জয়া মিত্র দি বলেছিলেন, ‘শুধু কালধ্বনির? পার্থ কিসের নয়!’) আসানসোলের রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি। বেশ লাগছে। যুব আবাসের মোড়ে চা খেলাম। তখনও ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েনি, কিন্তু চায়ের দোকানের জটলায় ছাব্বিশের আসন্ন ভোটই আলোচ্য। সেই সঙ্গে ইতিউতি উঠে আসছে কাগজপত্র যোগাড়যন্ত্রের কথা, কার হেপাজতে কি আছে, কী নেই, তাই নিয়ে আলোচনা, বিহারে হয়ে যাওয়া ভোটের কথা।   

আসানসোলে এসেছি জয়া মিত্র সম্পাদিত ভূমধ্যসাগর পত্রিকার বার্ষিক অনুষ্ঠানে, কাল রাত্রে। এসে যে গভীরতর লাভ হল, তা বুঝেছি। সারাদিন গান, আলোচনা, বই পত্রিকার সঙ্গে মাখামাখি, সোমনাথ গুহ’র আলোচনায় বিশ্বসাহিত্যের পরিক্রমা, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’খ্যাত কল্লোল লাহিড়ীর সঙ্গে শুধু আলাপ নয়, বন্ধুত্ব করে ফেলা, এবং অবশ্যই নানা পদ সহযোগে উদরাত্মার তৃপ্তি ঘটানো! আর? আর, ফেরার সময় সঙ্গী হল, ভূমধ্যসাগর পত্রিকার দেওয়া উপহার হিসেবে বেশ কয়েকটা বইয়ের সঙ্গে আমার বহু কাঙ্ক্ষিত একটি সর্বার্থে মহার্ঘ বই, পরিমল ভট্টাচার্যের লেখা উপন্যাস – ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’! বইটার কথা এত শুনেছি নান জনের কাছে, বিভিন্ন জায়গায় এত মন্তব্য পড়েছি যে, ফিরতি ট্রেনপথে বইয়ের মোড়ক খুলতে না চাওয়াটা বিলাসিতাই হয়ে যাচ্ছিল, এবং সেই বিলাসিতা আমি করেছিলাম! বাড়ি এসে আমার কন্যার হাতে তুলে দিলাম সেই উপন্যাস।

আমিও নেড়েচেড়ে সে বইয়ের ঘ্রাণ নিই। আলগোছে পাতা উল্টাই। 

৬ই মার্চ ২০২৬

আজ উচ্চমাধ্যমিকের খাতা দেখা শেষ করেছি। আজই রাত থেকে – ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাস পড়া শুরু হল আমার। কয়েকদিন আগেই কন্যা বইটা পড়া শুরু করেছে। এরপর শুরু  হল এক আশ্চর্য খেলা। দিনের বেলায় বই থাকে মেয়ের দখলে, রাত্রে  আমার। দেখা গেল, অসম প্রতিযগিতায় নেমেছি। সে এগিয়ে গেছে। আমাকে কখনও জিজ্ঞেস করছে, অ্যান্টনিকে পেয়েছো? ধুলোর বাচ্চা হয়েছে? চিন্তামণি কীভাবে মারা গেল, দেখলে? ওরে, অতকিছু বলিস না, আমাকে পড়তে দে, বলতে বলতে তার উপন্যাস পড়া শেষ! এর বেশ কয়েক দিন পরে (প্রায় একমাস) আমার শেষ হবে। 

কিন্তু মাঝখানে, এবং তারপরে এই বঙ্গদেশে অনেককিছু ঘটে চলেছে। পরপর। 

 যাপনের দিনগুলি 

২০২৫ সালের শেষ থেকেই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে এই রাজ্যে।  সময় গড়িয়ে যায়। ফর্ম বিলি। শুনানি।  তালিকায় নাম যোগ। নাম বাদ। হৈ হৈ ব্যাপার, রৈ রৈ কাণ্ড! কর্তাব্যক্তিরা পারলে হাতে মাথা কাটেন! দিল্লি থেকে হুঙ্কার আসছে মুহুর্মুহু।  তাদের কাঙ্ক্ষিত হিসেব না মেলাতে এবার এল ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’র মতো অশ্রুতপূর্ব শব্দবন্ধ।  পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোট ঘোষণা হল। চালু হল ‘আদর্শ আচরণবিধি’। নির্বাচন কমিশনের হা রে রে রে করে নির্দেশ পাঠানো। সুপ্রিম কোর্ট অব্দি দৌড়াদৌড়ি। সওয়াল, জবাব। এই লেখা যখন লিখছি, তখন ট্রাইবুন্যালের কাজ শুরু করার কথা।  সেই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসা হয়েছে আমার মামার আবেদন! 

তার আগে আমরা আসামের কথা বিস্তারিত শুনেছি সেই ২০১৯ সাল থেকে। উনিশ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ। শুনছি ডিটেনশন ক্যাম্পের কথা। আসামের বন্ধুরা শোনাচ্ছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।  

এই সময়কালের মধ্যে চলছে আমার উপন্যাস পড়া। খানিকটা ঢিমে গতিতেই। সাতশ’ বছরের পরিক্রমায় মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলছি। ফিরে পড়ছি কিছু জায়গা। তবে বুঝতে পারছি, ক্রমশ আমাকে টেনে ধরছে এই উপন্যাস। 

সপ্তগ্রামের চক্রবর্তী বংশের সাতশ’ বছরের পথ পেরিয়ে এ উপন্যাস হয়ে ওঠে আমার সমকালীন। শুধু কালের বিচারে নয়, এ আমার যন্ত্রণাতে সামীপ্যবোধ করে। বা, আমি তার। আসাম এবং এই বাংলা সেই বেদনার সুতোর মালায় এক হয়ে যায়।

চরিত্রের সমাবেশ, প্রেম এবং মৃত্যু …

অজস্র চরিত্র এসেছে এই উপন্যাসে। সে কথা বইয়ের পরিচিতিতে বলাও আছে। শাকম্ভরী দেবী,  সরোজা, আদরিণী, বনলতা, শিউলি, নতুনবউ, তিতলি, মোমবুচান, হিরন্ময়ী, মান্দাস, রাধারাণী, গাঙী, মিঠু, ছবি, গায়ত্রী এরকম নানা  নারীচরিত্র, আবার রামপ্রাণ চক্রবর্তী, পাগলরাম, রথীন, চিনিকাকা, হেমন্ত, বসন্ত, বিশুকা, অভয়চরণ ঘোষাল, বাঁটুল, কানাই, দরপ খান, দুফে, শার্ল – এরকম পুরুষ চরিত্রেরা। স্বদেশী, বিদেশী। বাপ্পাদিত্য তো আছেই। আসবে তার প্রবাসী পুত্র সিধুর কথা।  পটভূমি বদলে বদলে যাচ্ছে সপ্তগ্রাম থেকে কলকাতা, প্যারিস, লন্ডন, আবার সপ্তগ্রাম। হুগলী নদী, সরস্বতী নদীর বেড়ে আগলে রাখা ভুমিখণ্ডের বহতা সময় ও জীবন। এই বিরাট ক্যানভাসের ওপর অনায়াস তুলি চালান ঔপন্যাসিক। পাঠককে নিয়ে যান ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন ভিন্ন স্থানে। 

বলতে ইচ্ছে করছে একটা দুটো চরিত্রের কথা, একটু বিশদে। 

অভয়চরণ ঘোষাল। চাকরি সূত্রে টিকিট পরীক্ষক। শাকম্ভরীদেবীর শ্বাস ওঠার খবর পেয়ে শিউলি যখন তাকে শেষ দেখার জন্য পড়িমরি করে ছুটছে, তখন ওদের টিকিট দেখতে চেয়ে পথ আটকায় অভয়চরণ। আতিপাতি করেও টিকিট মেলে না। অভয়চরণের “চোখে এক বিচিত্র ঝিলিক”। এই অভয়চরণ ছিল শিউলির পাণিপ্রার্থী। তার বিস্তৃত বিবরণ লেখক আমাদের দেন সময়ের চাকাকে অনেকটা পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে। আমরা সেসবে যাচ্ছি না। পাঠক সে বিবরণ পড়বেন। অনেক পরে, যখন শিউলি মারণরোগে আক্রান্ত, তখনও ছেলের সঙ্গে সাতগাঁ স্টেশনে টিসি অভয়চরণ ঘোষালের সামনে পড়তে হবে তাদের। বাপ্পার অভিজ্ঞতার অংশটুকে এরপর উদ্ধৃত করি।  

কিন্তু ঘোষাল কিছুই দেখতে চাইল না এদিন। কিছুদিন আগে, মায়ের অসুখটা ধরা পড়ার আগে, রবিবার বিকেলে কনে-দেখা আলোয় যেমন শিউলির মুখের দিকে দুর্জ্ঞেয় ব্যাকুল দৃষ্টিতে চেয়েছিল সেভাবেই চেয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তারপর হাত নেড়ে ওদের যেতে বলল। 

তারও কিছুদিন পরে, 

শিউলির পরের বারটাই ছিল শেষ বার। এরপর সে সাতগাঁয় আসবে একটি পোড়ামাটির ঘটে”। …

সেবার আর ঘোষাল টিকিট দেখতে চায়নি, উৎকণ্ঠায় বিহ্বল মুখে চেয়ে ছিল শিউলির মুখে। … 

ততদিনে মেটাস্টেসিস শুরু হয়েছে।…

 …. ঘোষাল কি কিছু টের পেয়েছিল? বাপ্পার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করবে, অভয়চরণ ঘোষালের মতো ওই তীব্র নিবিড় দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে হয়ত কেউ কোনোদিন তাকায়নি। 

এরপরের অনেক নিবিড় অনুভবী উচ্চারণের পর লেখকের মন্তব্য,

সেই মানুষটিকে এভাবে কল্পনা করে এক বিচিত্র উষ্ণ সমবেদনার প্রবাহে ভরে উঠবে বাপ্পার মন। 

আমরা উল্লেখ করব বিদেশী যুবক শার্ল লেবোর কথা। পারিবারিক ঝঞ্ঝায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই শিল্পরসিক, কবি যুবককে “বাংলায় নির্বাসনে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়” এবং এখানে এসে সে  প্রেমে পড়ে বেশ্যাপল্লীর ‘এক রোগা আড়ষ্ট ক্রীতদাসীর মেয়ে’ গাঙীর, যাকে গোরস্তানে দেখে শার্লের মনে হয়েছিল ‘যেন মৃত্যর দেবী সে’।   

প্রবল জ্বরে কাতর শার্ল গাঙীর নিরন্তর সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ঘুমের মধ্যে দেখবে —  

“…ওর বুক থেকে কলজে উপড়ে এনে ফালাফালা করে কাটছে গাঙী”। এরপর সে “কুয়াশার ভোর রাতে বিছানায় গাঙীর ওম থেকে নিজেকে ছিন্ন করে বাংলোর খিড়কি দরজা দিয়ে তিনকড়ির ঘাটে গেল”। “… গাঙী যখন জাগল, ততক্ষণে শার্লের ডিঙিটা ভাটার টানে তরতরিয়ে চলে গেছে অনেক দূর,”….।  

এই শার্ল স্বদেশভূমিতে ফিরে যাবার অনেকদিন পর তার পরিত্যক্তা প্রেমিকার জন্য  পাঠাবে এক উপহার, নাকি অনুতপ্ত প্রেমিকের স্বীকৃতি! 

আমরা দুটো আখ্যানের কথা বললাম। এরকম নানা সম্পর্কে প্রেমের ব্যঞ্জনা নানা ভাবে নানা মাত্রায় উপন্যাসে এসেছে। কাল থেকে কালে এই একটা অনুভুতিই তো স্বাভাবিক বাতাসের মতোই সব চরিত্রের জীবনের সঙ্গে, যাপনের সঙ্গে লেগে থেকেছে সহজ, স্বাভাবিকভাবে।

ঠিক যেমন এসেছে মৃত্যুর কথা। সাতশ’ বছরের কালভাষ্যে সেও একইরকম স্বাভাবিক, অনিবার্য। কত রকমের মৃত্যু! বয়সকালে স্বাভাবিক মৃত্যু, সহমরণ, আত্মহত্যা, অপুষ্টিতে মৃত্যু, কুয়োয় পড়ে যাওয়া, চিরতরে হারিয়ে যাওয়া, রোগভোগের শিকার হয়ে অকালমৃত্যু — সবই এসেছে এই ব্যাপ্ত সময়ের ধারাভাষ্যে। আমাকে বিশেষ ভাবে ছুঁয়ে যায়, থম মেরে বসিয়ে রাখে বাপ্পার চোখে শিউলির চলে যাওয়ার বর্ণনা! 

অনেকদিন আগে, বাপ্পার ছোটবেলায়, যেবার শাকম্ভরী দেবী কাশীবাসী হলেন, সেবার ‘মা দুর্গার দুঃখ’।

“ ‘এবারে মা দুর্গার দুঃখ?’ রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগে বাপ্পা জিজ্ঞেস করে মাকে।

‘হুঁ’। শিউলি বলে।

‘লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ?’

‘হুঁ, লক্ষ্মী ঠাকুরেরও দুঃখ’।

‘কার্তিক ঠাকুরের দুঃখ?’

হুঁ, তাঁরও দুঃখ’।

‘সরস্বতীর?’

‘হুঁ’।

‘গণেশ ঠাকুরের?’

‘হুঁ’।

‘ময়ুর পেঁচা ইঁদুরেরও দুঃখ?’

‘হুম’।

‘সিংহের দুঃখ?’

‘সিংহের রাগ।‘

‘মহিষের দুঃখ?’

‘মহিষ তো মরে গিয়েছে। মরলে কী আর দুঃখ হয়?’

অনেকদিন পরে, যখন মায়ের অন্তিম  দিনগুলির প্রতিটি ক্ষণ বাপ্পার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হচ্ছে, এক কিশোরের বোঝা-না-বোঝাসহ, এবং শেষ পর্যন্ত শিউলির অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে সে।

বহুদিন পরে ঠিক সেইরকম উৎকণ্ঠায় বাপ্পার ঘুম এল না। পাশের ঘরে বাবা একলা শুয়েছে প্রদীপের আলোয়, বারে বারে মনে পড়ে যায় হিমশীতল কেবিনের রাত, নীলাভ আলোয় মায়ের কেশবিহীন পান্ডুবর্ণ মাথা…. 

….তখন উপরের উদ্ধৃত কথাগুলো তার মনে হুবহু আবার উঠে আসে, “মহিষ তো মরে গিয়েছে! মরলে কী আর দুঃখ হয়?” 

জীবন বয়ে চলে।

“ইহাতে কোনো অপকারিতা নাই”।

বাপ্পা লঞ্চ পেরিয়ে নৈহাটি আসে। উত্তরবঙ্গ থেকে রথীন। শিয়ালদা যাবার ট্রেন দেরি আছে কিছুটা, তাই বাপ-ব্যটায় চা খেতে যে দোকানের সামনে আসে, সেই ‘চায়ের দোকানটা প্রাচীন’। এর দেওয়ালে ঝোলানো বোর্ডে চায়ের যে পাঁচটি উপকারিতার কথা বলা আছে, তার পঞ্চমটি হল, “ইহাতে কোনো অপকারিতা নাই”। এই বিজ্ঞাপনের স্মৃতি আমাদেরও কলেজজীবনে নিয়ে যায়! কলেজ-ফেরত আমরা নৈহাটি স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের নোটিশে এই অভিনব ‘উপকারিতা’র কথা পড়ে খুব একচোট হাসতাম। এখন বক্ষ্যমান উপন্যাসে সেই উল্লেখ পেয়ে চনমনে হয়ে উঠি! তবে তো সাতশ’ বছরের পথ পেরিয়ে বাপ্পাদিত্য আমাদের নৈহাটিতে এসে আমাদের আরও কাছের হলেন! অবশ্য উপন্যাসে এর আগে এসেছে নবেল লেখক রাজমোহন চ্যাটার্জির কথা, যিনি কাঁটালপাড়ায় থাকেন, ডেপুটির চাকরি করেন। তাঁর প্রেরিত পত্রবাহক যুবক প্রসাদ শাস্ত্রী রাজমোহনের ‘বিশেষ স্নেহভাজন’। কাঁটালপাড়ায় রাজমোহনের ‘বসতবাটির সন্নিকটে তাঁর ভিটে’। প্রসাদ শাস্ত্রীর কথায় আসে স্যার উইলিয়াম জোন্সের কথা। প্রসাদের মুখে আমরা শুনব, “চলিত বাংলা ভাষার আদিরূপের একটি আভাস খুঁজে” পেয়ে স্যার জোন্সের উৎসাহিত হওয়ার কথা! নৈহাটি! নৈহাটি! 

যদিও লেখক তাঁর সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধে জানিয়ে রেখেছেন, এই উপন্যাসের

 “কুশীলবেরা কাল্পনিক, অক্ষরপুঞ্জ দিয়ে গড়া। যদি বা কখনো তাদের কারোর ছায়া পৃথিবীতে পড়েও থাকে, দিনের শেষে তারাও এই টেক্সটের গন্ডিতেই বাঁধা”। 

তবে আমরা তো বিলক্ষণ জানি, কবির মনোভূমি, রামের জনমস্থান অযোধ্যার চেয়েও ঢের সত্য!

“অভুতপূর্ব কুহকী উন্মোচন”

বইয়ের ব্লার্বে লেখা আছে এ কথা। আমি ইংরেজি উপন্যাসের কথা জানি না। তবে নদীতে ডুব দিয়ে মেয়েদের দূরস্থিতা আত্মীয়াদের সঙ্গে কথা বলার ‘রহস্য’ ভেদ করতে আড্ডার ছলে ইস্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকদের শরণাপন্ন হই বটে, কিন্তু কোথাও অবিশ্বাস্য ঠেকে না সে বর্ণনা! কাকাতুয়ার পুর্বজন্মের পরিচয়ও বেশ উপভোগ্য লাগে! কয়েকটা বিড়ালছানা সমেত ইঁট গেঁথে গির্জার দেওয়াল উঠে যায়, আর তার ঘন্টাধ্বনিতে শোনা যায় সেই মার্জারসন্তানদের কান্না, তাই সে গির্জার নাম ম্যাওবিড়ালের গির্জা! এরকম আরও কত কী!

ইকমিক কুকার থেকে রসগোল্লা (রসগোলা), আলু বিরিয়ানি থেকে আয়ুর্বেদ ওষুধ — কতকিছুর  আদিকথা লেখকের দৌলতে আমার কাছে এসে পৌঁছায়। আসে চর্যাপদের কথা। অথবা কোনো চরিত্রের মুখে এই উক্তি –“ যে কোনো বড় শহরে নর্দমা, কসাইখানা আর আবর্জনার স্তূপ যেমন অপরিহার্য, বেশ্যালয়ও তেমনই। এবং প্রশাসনের কর্তব্য সেগুলিকে অবাধে চলতে দেওয়া”। 

লেখকের গভীর, গভীরতর পড়াশোনারও এক কুহকী উন্মোচনের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই, কিন্তু তার চাপ কখনও আমার মাথায় চেপে বসে উপন্যাসের পাঠে বা তার রসগ্রহণে বাধা দেয় না! 

 শেষ নাহি যে …

আমরা উপন্যাসে শেষ অংশে চলে এসেছি। ততদিনে জেনে গেছি আমার ছোটমামার ভোটার লিস্টে নাম ডিলিটেড হয়ে গেছে। ব্যারাকপুরে সংশ্লিষ্ট অফিসে চৈত্র মাসের রোদ্দুর মাথায় নিয়ে তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মামা আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। 

উপন্যাসের একটা দীর্ঘ অংশ উদ্ধৃত করলেই লাগসই হয় এখানে, কিন্তু তা থেকে বিরত থাকছি। পাঠক এ উপন্যাস পড়ে তাঁর নিজের দেখা বা শোনা অথবা নিজেরই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এসে পৌঁছাবেন এখানে, যেখানে বলা আছে সেই মেয়েটির কথা, যাকে নিয়ে যাওয়া হবে FREEDOM CENTERএ ( ডিটেনশন ক্যাম্প? )। আমরা পড়ি  –

 “একতলায় করিডরে পোর্টিকোয় অসংখ্য জোড়া জোড়া চোখ এই দৃশ্য দেখছে। লাল ইঁটের বাড়িটায় কর্মব্যস্ততা হঠাৎ যেন থেমে গিয়েছে, নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে”। 

আরও একটু এগোলে পাব —- 

“এভাবে একে একে সিঁড়ির রেলিং, দরজার ফ্রেম, পোর্টিকোয় নোটিশ বোর্ডের ফ্রেম, গুলমোহরের কান্ড – ডুবে যাওয়ার আগে অন্ধ হাতে খড়কুটোর মতো একের পর এক ভুমিতে – গাঁথা অনড় বস্তুর থেকে তাকে উপড়ে নিতে নিতে, পোর্টিকোর ওপর দিয়ে তাকে টানতে টানতে, মেয়েটির মাথার ওড়না খসে লুটোতে প্রজাপতি-ক্লিপ কনস্টেবলের বুটে জড়িয়ে গিয়ে সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই টাল সামলে নিয়ে FREEDOM CENTER লেখা স্করপিওটার কাছে আসতেই চালক লাফিয়ে নেমে পেছনের দরজাটা খুলে ধরল”।

ব্যারাকপুরে যে আপ কল্যাণী লোকাল বেলা তিনটে নাগাদ আসে, সেটা ধরে ছোটমামা  ফিরলেন আবেদন পত্র জমা করে। আমরা দুজনে একটা রিকশ’য় চেপে বসি। মামার মুখের ওপর মরা বিকেলের আলো। স্বস্তি প্রকাশ করলেন, যাক। কাজটা হয়ে গেল!

– মানে?

– এবার নাম উঠে যাবে।

– এ তো সবে আবেদন করা হল! এরপর ডাক আসবে। ফিজিক্যালি ওখানে উপস্থিত হতে হবে। তারপর বিবেচনা করে নাম ওঠা না ওঠার প্রশ্ন।

– এ বাবা! তাই নাকি! আমি তো ভাবলাম, আর আমাকে কিছু করতে হবে না! যাক গে! আমার তো সব কাগজপত্রই জমা করেছি। আর একবার যেতে হলে যাব। তারপরে তো হবেই! 

আমি চুপ করে থাকি। এই কথার উত্তর হয় না! লেখক পরিমল ভট্টাচার্য আমাকে, মানে পাঠককে তার কিছু আগেই হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন উপন্যাসের শেষ লাইনগুলির কাছে, যেখানে বলা আছে –

“… এই একটিই জন্ম মানুষের হাতে আছে, এবং সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার, অর্থাৎ যা অসুস্থ করে, তাই সারিয়ে তোলে, এর এর একটিই মাত্র উপমান পৃথিবীতে আছেঃ তার নাম ভালোবাসা”। 

এই জাদু-শব্দই আমাদের আশ্রয়, আমাদের শক্তি।

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা
 পরিমল ভট্টাচার্য।
অবভাস প্রকাশন। মূল্য – ৮২৫ টাকা।
 (দ্বিতীয় সংস্করণ)।