গান্ধী ও জায়নবাদ

জাতি পরিচয়ের নৈকট্য

বিশ শতকে ইথিওপিয়ার ইহুদি গোষ্ঠীর মানুষদের সেখান থেকে উদ্ধারের ঘটনা বেশ চমকপ্রদ।  ঐতিহাসিকভাবে ঐ গোষ্ঠীটি ‌‘বিটা ইজরায়েল’ নামে পরিচিত। ধর্মযাপনে তারা অতি প্রাচীন ‘জুডা’ তন্ত্র বা জুডাবাদে অভ্যস্ত। ইথিওপিয়াতে গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় সেখানে বসবাসকারী এই গোষ্ঠী অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। ১৯৭৫-এ তৎকালীন ইজরায়েল সরকার তাদের ইহুদি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ইজরায়েল সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইথিওপিয়া থেকে ওই গোষ্ঠীর মহানিস্ক্রমণ সম্পন্ন হয়। অনেকগুলি গোপন ছদ্মবেশী অভিযানের মাধ্যমে ওই গোষ্ঠীকে ইথিওপিয়া থেকে ইজরায়েলে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। জাতিগত নৈকট্য এবং সেই নৈকট্য সঞ্জাত দায়িত্ব পালনের এই রকম উদাহরণ আর কোথাও দেখা গেছে বলে জানা নেই। 

বহু কষ্টে তারা সুদানে উপস্থিত হলে সেখান থেকে গোপনে তাদের বিমানে চাপিয়ে ইজরায়েল নিয়ে আসা হয়। ইজরায়েলে বর্তমানে এই গোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লক্ষ। ১৯৪৮ এর আগে ইজরায়েল নামক দেশ সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত ইহুদীদের কোন নিজস্ব দেশ ছিল না। সারা পৃথিবীতে তারা ছড়িয়ে ছিলেন নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের সফলতা নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপ বিশেষত জার্মানীতে ইহুদী বিদ্বেষের ঝড় বয়ে যায় আর তার পরবর্তীকালে জার্মানীতে ইহুদী গণহত্যার কথা সকলেই জানেন।  

গান্ধী উবাচ

১৯৩৮এ হরিজন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দ্য জিউস’ প্রবন্ধে গান্ধী বলেন ‘ইহুদীদের প্রতি আমার পূর্ণ সহানুভূতি আছে ……… তারা খ্রীষ্টধর্মের কাছে অচ্ছুত। খ্রীষ্টানদের ইহুদীদের প্রতি যে মনোভাব বা আচরণ এবং হিন্দু দলিতদের প্রতি হিন্দু উচ্চবর্ণের মনোভাব ও আচরণ প্রায় সমতুল’। হিটলারের নাজি শাসনকে তীব্রভাবে ধিক্কার জানিয়ে গান্ধী ইহুদীদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারকে বলেছেন –‘ইতিহাসে এই অত্যাচারের কোন নজির পাওয়া যায় না’। যদিও তিনি সর্বদা যে কোন রকম যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন তবু জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিনি ‘ন্যায় যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছেন যে ব্যক্তিগত ভাবে তিনি কোন যুদ্ধে বিশ্বাস করেন না। 

গান্ধী সারা জীবন যে কোন ধরণের হিংসাকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন এবং হিংসা পরিহার করবার আবেদন করেছেন। হিংসার বিরুদ্ধে একই নীতি, মনোভাব বা আচরণ তিনি ইহুদীদের কাছে থেকেও আশা করেছেন। সারা পৃথিবীর নিপীড়িত নির্যাতিত জনসাধারণের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের অদ্বিতীয় অস্ত্র হিসাবে তিনি অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের কথা প্রচার ও প্রয়োগ করেছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের এই অদ্বিতীয় অস্ত্রের প্রবক্তা হিসাবে তিনি সারা পৃথিবীতে পরিচিত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আন্দোলনের গঠন এবং ধরণ যেভাবে তিনি বদলে দিয়েছিলেন এবং ভারতের জনসাধারণকে সেই পদ্ধতির পক্ষে সংগঠিত করেছিলেন তার আর উদাহরণ নেই। তার ফলে তাঁর সেই অনন্যসাধারণ দক্ষতা সমগ্র পৃথিবীর জনমানসকে আন্দোলিত করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই জায়নবাদী নেতৃবৃন্দ ও তাদের দেশগঠনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে গান্ধীর সমর্থন আশা করেছিলেন। গান্ধীর সমর্থন তাদের আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে গতিময় করে তুলতে পারতো বা অন্যতর উচ্চতায় পৌঁছে দিত। 

জায়নবাদের অস্তিত্ব

গান্ধীর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা এবং সেই ঘটনাবলী বিষয়ে আর একটু বিস্তারে যাবার আগে আমরা জায়নবাদ বিষয়ে জেনে নিতে পারি। জেরুসালেমের নিকটবর্তী একটি ছোট পর্বতের নাম জায়ন। সেই পর্বতের নাম থেকে জায়নবাদ শব্দটির উৎপত্তি। ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে নাথান বার্নবম এই শব্দটি তৈরি করেন। জায়নবাদ শব্দটি যে মতাদর্শ উপস্থাপিত করে সংক্ষেপে তা হলো –  নিজেদের জাতীয় বাসভূমিতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ইহুদীদের আছে। তাদের নিজস্ব জাতীয় সংস্কৃতি সৃষ্টি ও বিস্তার করবার অধিকার আছে। ইহুদীরা ইজরায়েল ভূমিখন্ডে জোশুয়ার (১২৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) সময় থেকে বসবাস করে আসছে। রোমানরা ইহুদীদের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করে ৭০ খ্রীষ্টাব্দে এবং ইহুদীদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে। বিতাড়িত হয়ে তারা ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে বসবাস শুরু করে। সেখানেও তারা তাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে বা রাখতে সমর্থ হয় এবং শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে নিজেদের দেশে ফেরার আকাঙ্খা বজায় রাখে। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক থিয়োডর হার্জল এর লেখা ‘ইহুদী রাষ্ট্র’ বইটির মাধ্যমে কার্যত আধুনিক জায়নবাদী আন্দোলনের শুরু। এই বইয়ে হার্জল বিংশ শতকে স্বাধীন ইহুদী রাষ্ট্র স্থাপনের ভবিষ্যত স্বপ্ন দেখেছিলেন। কার্যত তার পরই ইহুদী জাতীয়তাবাদ সারা বিশ্বে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং সেই আন্দোলনও দানা বেঁধে ওঠে। 

হার্জল এর উদ্যোগে সুইজারল্যান্ডের বাসেল-এ  ১৮৯৭ সালে প্রথম জায়নবাদী কগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৭ সালে ‘বেলফোর ডিক্লারেশনের’ মাধ্যমে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের জাতীয় ভূমি বা দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সাহায্য করার অঙ্গীকার জানায়। এই ঘোষণার আগে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জায়নবাদী আন্দোলন ইহুদীদের মধ্যেও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বেলফোর ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্ব থেকে ইহুদী মানুষজন অনেক বেশি সংখ্যায় প্যালেস্টাইনে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। একটি হিসেবে জানা যায় ১৯১৪ সালে যেখানে প্যালেস্টাইনে ইহুদী জনসংখ্যা ছিল ৯০,০০০ সেখানে ১৯৩৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৩৮,০০০ জন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মর্মান্তিক ইহুদী গণহত্যার পর জায়নবাদী আন্দোলন ইহুদীদের প্রধান আন্দোলনে পরিণত হলো। সেই আন্দোলনের ফলেই ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল নামে পৃথিবীর প্রথম এবং আধুনিক ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো।

গান্ধীজীর জড়িয়ে পড়া

জায়নবাদ সম্পর্কে গান্ধীর মতামত সাধারণ ভাবে বিতর্কের উদ্রেক করেছে। এটা মনে হতে পারে তিনি আরব জাতীয়তাবাদকে সমর্থন এবং জায়নবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ধারণার মূলে একটি মন্তব্য। গান্ধী মন্তব্য করেছিলেন – ‘ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের, ফ্রান্স যেমন ফরাসীদের তেমনই প্যালেস্টাইন আরবদের’। কিন্তু এই মন্তব্য দিয়ে জায়নবাদ সম্পর্কে গান্ধীর মনোভাব বোঝা ভুল হবে। তিনি যেমন আরবদের পক্ষে বলেছেন তেমনই ইহুদীদের অধিকার রক্ষার পক্ষেও মতামত প্রকাশ করেছেন। 

গান্ধীর মন্তব্যর লুকনো অর্থ বুঝতে চেষ্টা করলে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই কিছু অসঙ্গতি বা সামঞ্জস্যহীনতা লক্ষ্য করতে পারি। সেক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে গান্ধীর নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেছে প্রতি মুহূর্তে তাঁর মানুষের সঙ্গে অন্তহীন নিবিড় যোগাযোগ এবং চারপাশে ঘটে চলা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে। জায়নবাদ বিষয়ে তাঁর মতামতের ক্ষেত্রেও সেটা লক্ষ্য করা যায়।

আমরা জানি দক্ষিণ আফ্রিকাতে সফল অহিংসা আন্দোলন পরিচালনা করবার পর গান্ধী ভারতে ফেরেন ১৯১৫ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই অটোমান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধানকে তাদের নিজেদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা হিসাবে মানতেন।  ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ বিরোধী খিলাফত আন্দোলনকে গান্ধী ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে সংযুক্ত করবার অন্যতম সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং তিনি ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। তিনি বলেন – ‘ব্রিটেন জায়নবাদীদের সাহায্য করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। জায়নবাদীদের স্বাভাবিকভাবেই ওই ভূমিখণ্ডের জন্য পবিত্র আবেগ বর্তমান। যদিও বিতর্কিত তবুও ইহুদীরা প্যালেস্টাইনের অধিকার না পেলে যাযাবর জাতি হিসাবে থেকে যাবে। আমি ইহুদীদের প্যালেস্টাইন ভূমিখণ্ডের অধিকার বিষয়ক তত্ত্ব বা প্রস্তাবের বিষয়ে বিচার বিশ্লেষণ করতে চাই না। যা আমি বলতে চাই তা হলো ইহুদীরা কোন রকম কূটকৌশল প্রয়োগ করে বা অনৈতিক ভাবে প্যালেস্টাইন দখল করতে পারে না। একজন মুসলিম সৈনিককেও ব্রিটিশ সরকার তার মুসলিম ভাইদের দখলে থাকা প্যালেস্টাইন ছিনিয়ে নিয়ে ইহুদীদের হাতে তুলে দেবার আদেশ করার সাহস দেখাতে পারেন না। ইহুদীদের ধর্মস্থান হিসাবে প্যালেস্টাইনের প্রতি তাদের যে আবেগ, তাকে সম্মান জানানো উচিত। মুসলিমরা যেরকম শঙ্কাহীনভাবে প্যালেস্টাইনে প্রার্থনা করতে পারে সেরকম যদি ইহুদীরাও শঙ্কাহীন ভাবে তাদের প্রার্থনা না করতে পারে সেক্ষেত্রে ইহুদীদের মুসলিম আদর্শবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবার ন্যায্য কারণ আছে’। 

‌‘…এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে খলিফার ধর্মীয় সার্বভৌমত্বের অধীনে ‘জাজিরাত-উল-আরব’ পুনরুদ্ধারে খিলাফতই উপায়’।

গান্ধীজীর এই মতামতের পিছনে অবশ্যই তৎকালীন ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রধান অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছিল। ভারতের খিলাফত আন্দোলনের সময় তিনি সর্বান্তকরণে ভারতে হিন্দু মুসলমানের ভিতর বন্ধন দৃঢ় করবার চেষ্টা করছিলেন। সেই উদ্দেশেই তাঁর তৎকালীন সমস্ত মতামত বিবৃতি আরব ঘেঁষা ছিল। তাঁর মনে হয়েছিল ভারতীয় মুসলমানদের আবেগ সাধারণভাবে প্যালেস্টাইনের সমমতাবলম্বীদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই তিনি আরবদের শর্তহীন সমর্থনের পক্ষে ছিলেন। তিনি সে কথা খোলাখুলি স্বীকারও করেছেন বারবার। 

তিনি লিখেছেন – ‘আমি তুরস্কের যুদ্ধের বিষয়ে আলাদা করে উৎসাহিত হতাম না, যদি না আমি ভারতীয় মুসলমানদের বিষয়ে উৎসাহিত হতাম। কিন্তু ভারতীয় হিসাবে আমি আমার সহ-নাগরিকদের দুঃখ-দূর্দশা কষ্টভোগের দায়ভাগ নিতে বাধ্য। আমি যদি ভারতের মুসলমানদের আমার ভাই বলে মনে করি তবে তাদের বিপদের মুহূর্তে তাদের সাহায্য করা আমার কর্তব্য’। এবং ‘ভারতের মুসলমানদের ঐতিহাসিক সংকটকালে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমি তাদের বন্ধুত্ব অর্জন করতে চাই’। 

আবার ১৯২২ কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। কামাল পাশা তুরস্কে ধর্ম নিরপেক্ষতা কায়েম করেন। ফলত খলিফা বা খিলাফত-এর ধারণার আর অস্তিত্ব বজায় থাকে না। সুতরাং গান্ধীজীও ওই বিষয়ে কোন আলোচনাতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন, তিনি শুধুমাত্র ভারতবর্ষের সমস্যার বিষয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কিন্তু ১৯৩১ সালে গোল টেবিল বৈঠকে এই বিষয়ে আবার জড়িয়ে পড়েন। ইহুদী সাপ্তাহিক সংবাদপত্র জিউয়িস ক্রনিকল-এ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন – ‘আমার বহু ইহুদী বন্ধু আছেন। আমি মনে করি ইহুদী ধর্মমত একটি খুবই সুন্দর ধর্মমত এবং তা খ্রীষ্টধর্মের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, কেননা ওল্ড টেষ্টামেন্টের সমস্ত ভবিষ্যদ্বক্তা সাধুরা সকলেই ইহুদী ছিলেন, তা ছাড়া যীশুখ্রীষ্ট নিজেও একজন ইহুদী ছিলেন’।

জায়নবাদ বিষয়ে তাঁর মতামত ছিল – ‘জায়নবাদীরা জেরুসালেম অধিকারে আনতে চায় যা আসলে তাদের নিজেদের মধ্যেই আছে। জায়নবাদের অর্থ যদি প্যালেস্টাইন পুনর্দখল হয়, তাতে আমার কোন আকর্ষণ নেই। একজন ইহুদীর প্যালেস্টাইনে ফেরার তীব্র বাসনা আমি উপলব্ধি করতে পারি। তাদের নিজেদের বা ব্রিটেনের অস্ত্রের সাহায্য ছাড়া তারা প্যালেস্টাইনে ফিরতেই পারেন। তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে, আরবদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে প্যালেস্টাইনে যেতেই পারেন। আমার কাছে জায়নবাদ এমন এক আদর্শ যার জন্য একজন ইহুদী গভীর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে এবং তার জন্যে প্রাণপাত প্রচেষ্টা করতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে জীবনও দিতে রাজী থাকতে পারেন। জায়ন তার অন্তরে অবস্থান করে। এটি ইশ্বরের আবাসস্থল। সুতরাং সে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে থেকেই জায়নবাদ অনুভব করতে পারে’।

গান্ধীজীর এই সাক্ষাৎকার তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। আমেরিকার জায়নবাদী সংগঠনের রাজনৈতিক কমিটি বিশেষত গান্ধীজীর করা মন্তব্য ‘পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে থেকেই জায়নবাদ অনুভব করতে পারে’ এবং ‘প্রকৃত জেরুসালেম হল ধর্মীয় জেরুসালেম’ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। বহু চিঠি গান্ধিজীর কাছে পৌঁছতে থাকে। তাদের মধ্যে আমেরিকাবাসী জুডাবাদী চিন্তাবিদ এবং ‘জিউয়িস ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকার সম্পাদক গ্রীণবার্গকে ২২ মে ১৯৩৯ গান্ধীজী তাঁর জবাব লিখে পাঠান। 

‘জার্মানীতে একজন “ইহুদী গান্ধী” কে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গিলোটিনে নিয়ে যাওয়া হবে – লেখকের এই বক্তব্যের সম্ভাবনা খুবই প্রবল। কিন্তু তাতে অহিংসার কার্যকারিতা বা নিশ্চিত ফলদানের ক্ষমতাকে ভুল প্রমাণ করে না বা অহিংসার কার্যকারিতার উপর আমার বিশ্বাস নড়ে যাবে না। তাছাড়া শুধুমাত্র আজকের জন্য আমি আমার প্রবন্ধ লিখিনি। আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি যে আমার কিছু লেখা আমার পরেও বেঁচে থাকবে এবং যে বিষয়ে সেগুলি লেখা সেইক্ষেত্রে সেগুলি কার্যকর হবে’। 

গান্ধীজীর বিরুদ্ধে আরবদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবার অভিযোগের জবাবে তিনি লিখেছেন – ‘আমি প্রায়শই বলেছি যে এমনকি ভারতের মুক্তির জন্যও আমি ‘সত্য’কে পরিত্যাগ করতে পারবো না। মুসলমান ভাইদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তো অনেক দূরের কথা’। 

বিংশ শতকের শুরু থেকেই পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গাতে জাতীয়তাবাদের সংস্কার এবং পুনর্গঠনের আন্দোলন লক্ষ্য করা যায়। এই জাতীয়তাবাদের চেতনা উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই আসে মানুষের তার নিজস্ব ভূমির প্রতি আকর্ষণ ও অধিকারের আবেগ। এটা মনে হতে থাকে যে বড় বড় সাম্রাজ্যের দিন ফুরিয়ে আসছে। এই বড় বড় সাম্রাজ্যগুলির মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সর্ববৃহৎ ছিল। সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ভারতবর্ষ ছিল উজ্জ্বলতম মণিখণ্ড। স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ যন্ত্রণাময় সময় পেরিয়ে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭-এ। ভারতের জনগণের জন্য আন্তরিক কোন উদ্বেগ বা চিন্তা ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে কোন দিন লক্ষ্য করা যায় নি। উল্টোদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে প্যালেস্টাইন এবং ইহুদীদের জন্য বরাবরই উদ্বেগ বা চিন্তা প্রচ্ছন্ন ছিল। যদিও ‘বেলফোর ঘোষণাকে’ ব্রিটিশ শাসকদের পশ্চিম এশিয়াতে নিজেদের সম্প্রসারিত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবার উপায় হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে তবুও অন্তত এই ঘোষণার মাধ্যমে প্যালেস্টাইনের ইহুদীরা তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের আশা খুঁজে পেয়েছিলেন। তার আগে পর্যন্ত যে আশা অসম্ভব স্বপ্ন হিসাবেই পরিচিত ছিল তাই জায়নবাদীদের কাছে বাস্তব হিসাবে দেখা দিল এবং ভারতের স্বাধীনতার এক বছর বাদে ইজরায়েল নতুন দেশ হিসাবে দেখা দিল। 

দর্শন ও সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক মার্টিন বুবের এবং মহাত্মা গান্ধী প্রায় সমসাময়িক ছিলেন। বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপে ইহুদী বিদ্বেষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। ফলত ইহুদী রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউটোপীয় আদর্শ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সর্বত্রই বিদেশী আখ্যা পাওয়া থেকে ইহুদীদের উদ্ধার পাবার চেষ্টার ছবি স্পষ্ট হতে থাকে। যাতে পৃথিবীর আর সমস্ত মানুষের মতো তারাও বলতে পারে এটা আমার দেশ। ইহুদীরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রনের জন্য নিজস্ব ভূমিখণ্ডের অধিকার চাইছিল।

হরিজন পত্রিকায় গান্ধীজীর লেখা প্রবন্ধ ‘দ্য জিউস’ এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্টিন বুবের মার্চ ১৯৩৯-এ একটি চিঠি লেখেন। ১৯৩৯ সালের মধ্যে সারা পৃথিবীতে মহাত্মা গান্ধী রাজনৈতিক কার্যক্রমের অহিংস পদ্ধতির জন্য উদাহরণস্বরূপ হয়ে উঠেছিলেন। গান্ধীজী জার্মানীর ইহুদীদের, তাদের বিরুদ্ধে নাজী অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন হিসাবে সত্যাগ্রহ পালনের উপদেশ দিয়েছিলেন। তাছাড়াও তিনি ইহুদী আরব সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন যে জায়নবাদীদের উদ্দেশ্য পরিপূরণ সম্পূর্ণভাবে আরবদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হবে। মার্টিন বুবের প্যালেস্টাইনে এসেছিলেন ১৯৩৮ সালে। তিনি আরব ও ইহুদীদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি জার্মানী ছাড়তে দেরী করেছিলেন, গান্ধীর সত্যাগ্রহ মেনে প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রচার করবার জন্য। কিন্তু এখন তিনি গান্ধীর এই প্রবন্ধের বিষয়ে একেবারেই সহমত হতে পারেন নি। তার মনে হয়েছে গান্ধী আরব ইহুদী সমস্যার সামগ্রিক গভীরতা এবং সেই সমস্যা তৈরি হবার অজস্র কারণের সামগ্রিকতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। গান্ধীর দর্শনের তিনি পরম ভক্ত ও তাঁর বিষয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সুতরাং এই প্রবন্ধ দেখে বুবের খুব আশাহত ও বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি সবসময়ই প্যালেস্টাইনে ইহুদী পুনর্বাসনকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এসেছেন। ‘আমরা ইহুদীদের দাবী কখনই ত্যাগ করতে পারিনি এবং তা পারবও না’ – তিনি গান্ধীজীকে চিঠিতে লিখেছিলেন। বুবের অবশ্য গান্ধীর কাছ থেকে তার চিঠির কোন জবাব পাননি।     

দক্ষিণ আফ্রিকাতে মহাত্মা গান্ধীর সফল আন্দোলনের অন্যতম সঙ্গী ছিলেন জার্মান ইহুদী কালেনবাখ। তিনি নিজেকে গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে মনে করতেন। প্যালেস্টাইনে ইহুদী রাষ্ট্রের জন্য তিনি গান্ধীর সমর্থন পেতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। ১৯৩৭এ তিনি এই উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত সেবাগ্রামে তিনি বেশ কিছুদিন থাকেন এবং জুলাই মাসে তিনি অনেক আশা নিয়ে ফিরে যান। যদিও গান্ধীর বক্তব্য ছিল ‘যদি ধরে নিই যে জায়নবাদ ইহুদীদের ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা সেক্ষেত্রে কিন্তু প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ এবং অস্ত্রশক্তির সাহায্যে অধিকার স্থাপন, আধ্যাত্যিকতার ধারণার সঙ্গে একেবারেই মেলে না’। 

এর পরেও কালেনবাখ তার চেষ্টা চালিয়েছেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। হতাশ অবসাদগ্রস্ত হয়ে ফিরে গেছেন। গান্ধীজী তাঁর মতামতে অনড় থেকেছেন। 

অবশ্য আরবদের প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়। সবকিছুতেই তারা ভারতের জিন্নাহর মতো না-বোধক থাকতো। আরবদের উচ্চতর নেতৃত্ব প্রায় স্লোগানের মতো উচ্চারণ করতো ‘ব্রিটিশদের স্থান সমুদ্রে আর ইহুদীদের কবরে’। আবার ইহুদীরাও তাদের আন্দোলনের অভিমুখ সম্পর্কে সবাই একমত ছিলেন না। তারা ভিন্ন মতামতে বিভক্ত ছিলেন। ‘জিউয়িস এজেন্সি’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড জায়নিষ্ট কংগ্রেসের’ মধ্যে। তারা জুরিখে ১৯৩৭ সালে জায়নবাদীদের ২০তম বিশ্ব কংগ্রেসে মিলিত হয়। সেখানে ২৯৯-১৬০ ভোটে প্যালেস্টাইন ভাগ করে ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। তার কিছুদিন বাদে ভারতে কংগ্রেস ভারত ভাগের প্রস্তাব মেনে নেয়।  

দেশভাগের প্রশ্নে গান্ধীজী চেয়েছিলেন যদি দেশ ভাগ করতেও হয় সেক্ষেত্রে ইংরেজরা ভারতবাসীর হাতে স্বাধীনতা দিয়ে যাবার পর ভারতের স্বাধীন জনগণ সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আদৌ ভাগ হবে কি হবে না বা ভাগ হলে কিভাবে ভাগ হবে। তিনি প্যালেস্টাইনের ক্ষেত্রে চেয়েছিলেন আরব এবং ইহুদীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে তাদের সমস্যা সমাধান করুক। দুক্ষেত্রেই তা ঘটেনি। ভারতবর্ষ খণ্ডিত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে আর প্যালেস্টাইন ভেঙে ইজরায়েলের জন্ম হয়েছে। ভারতের খণ্ডিত স্বাধীনতা তিনি দেখেছেন। পূর্বাঞ্চলের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বুক দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন আর ইজরায়েল রাষ্ট্র জন্ম নেবার ঠিক আগেই ধর্মোন্মাদের বুলেট তাঁর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।