মিথ্যা কর্মটা কি? সহজ উত্তর — যে কাজে আমার মন ও মুখ ভিন্ন। সত্যের মুখ্য শর্ত তো এই — সৎ থাকা। কেন কর্মের প্রসঙ্গ? মার্কস-হাইডেগার ঝঞ্ঝাট মেনেও বলব — ব্যাখ্যারও পর আছে। সেটি হলো — সুচিন্তিত কাজ। এই দুই মিলেই সভ্যতার চাকা ঘোরায়।
তখন এই প্রশ্নটা উঠে আসে — কে এই আমি? তারও স্পষ্ট উত্তর হয়। আমি মানুষ। পৃথিবীর জল, মাটি, আলো (এটি অবশ্য আকাশদত্ত), হাওয়ায় আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, মৃত্যু। এটাই মুখ্য। এটাই প্রধান। পৃথিবীর আর সব প্রাণের মধ্যে আমিও এক প্রাণ।
এই আমি যখন সমাজে, সবিশেষ রাষ্ট্রে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে — তখন হয়ে যাই ফ্রাগমেন্টেড — আমি বাঙালি, আমি ভারতীয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। অতঃপর হিন্দু মুসলমান, উঁচু জাত নিচু জাত, বাঙালি অবাঙালি, ধলা কালা, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্রাগমেন্টেশন। কাম-কাঞ্চন সবকিছুকে যেমন ভোগ করবার আগুনে সুসিদ্ধ করে দুঃখ জাগায়, জাগিয়েই তোলে জন্ম জন্মান্তরে (কর্ম কর্মান্তরে তো বটেই) — ধরে রাখতে দেয় না ওই কথাটা যে, ‘মুক্তি তোরে পেতেই হবে’ — তেমনই ফ্রাগমেন্টেশন।
প্রকৃত অথচ অন্য। যে দেহের ওপর ভর করে মনে এত বিচিত্রতা, এত চাওয়া-পাওয়া এবং না পেলে এত এত ক্রোধ হিংসা হানাহানি — সেই দেহের মূল উপকরণ পৃথিবীদত্ত (একে আরো এক্সটেন্ড করা যায় অবশ্যই — মহাবিশ্ব, কোয়ান্টাম বিজ্ঞান, অদ্বৈত অনুভব ইত্যাদি চলে আসতেই পারে — কিন্তু সে নিয়ে এই আলোচনা নয়)।
তাহলে মিথ্যা নয় এমন কর্ম কি? কবি, গায়ক, কৃষক, শ্রমিক, ‘অবৈধভাবে’ ফুটপাত দখল করে থাকা হকার ইত্যাদি অগণন মানুষের?
এই অযুত নিযুত আমি, আমরা, পৃথিবীর ফসল। পৃথিবীর সঙ্গেই আমাদের সবিশেষ লেনদেন। পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করলে আমি একা নই, আমরা সবাই, উপকৃত হবো। তাই পৃথিবীকে প্রাণবন্ত রাখাই আমাদের প্রধান কাজ। অন্যদিকে, আমি সীমাবদ্ধ আমার এই মাটিতে, এই কোণে। তাই এখানে কাজ, সার্বিকের মঙ্গলভাবনা। এক্ট লোকাল থিঙ্ক গ্লোবাল। জল এল, যা নেবার নিলাম, তাকে লাঞ্ছিত (প্রধানত অজান্তেই রাসায়নিক পণ্য দিয়ে যা করি) যতটা কম করা যায় অথবা না-করে বইয়ে দেয়া। একই কথা হাওয়া, মাটি, রোদ প্রসঙ্গে। তাদের থেকে নিলাম, কারণ তারাই ‘ঈশাবাস্যমিদম্ যৎকিঞ্চ জগত্যাম্ জগতে’র ব্যক্ত রূপ, তাদের দানেই আমাদের জীবন — আমার দায় তাকে কালিমাগ্রস্ত না করা, যতটা কম না-করে থাকা। আমার ঘর, আমার বারান্দা, আমার ছাদ, আমার এলাকা — যা আমার কাছে তার মধ্যে তাকে শুদ্ধ করার আয়োজন। এভাবেই আমি পৃথিবীর সেবা করব এই বাংলা, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’র এক কোণে থেকেই।
মজা এও এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছি আমি, আমার পরিবার, আমার পড়শি, আমার রাজ্য, আমার রাষ্ট্র — আমরা সবাই!
২
এবার কেজো কথা। এক, আত্মনির্ভর হতে হবে। বাজার ও টাকার দাপট, পুরোপুরি নির্ভরতা, অস্বীকার করে। টাকা, যা আছে, যতটা আছে, পরিবারের জন্য যতটা দরকার রেখে, বাকিটা, সে দশ শতাংশ নাহয় হলো, সেটিকে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা। দুই, ধরিত্রীর সঙ্গে সম্বন্ধ আরো আরো নিবিড় করা। তিন, মানুষের সঙ্গে মানবিক সম্বন্ধে লিপ্ত হয়ে নিজেদের দৃঢ় এবং নম্র হতে হতে থাকা।
তৃতীয়টি দিয়ে শুরু করা যাক। মানবিক সম্পর্ক বলতে কি বুঝি? অনেক ধরনের কথা এসে পড়বে। আসুক, তর্ক করি, গ্রহণ করি অথবা বর্জন করি, অস্বীকৃতি-গ্রহণে মুক্ত করি নিজেদেরকে — এই কথাটা আমরা যেন বলতে পারি, আমি-আমরা আজ কি দিতে পারব? এমন কি দিতে পারব যা নিজের স্বার্থের বাইরে? মানুষ মানুষের সঙ্গে — ‘কি দিতে পারা যায়’ — তাই নিয়ে কথা বলুক, কাজ করুক। শুধু কথা নয়, কাজও, সঙ্গে সঙ্গে। আত্মনির্ভরতার ভাষা যেখানে, ‘আজ কিছু কিনব না, হাতে হাতে নিজেদের প্রয়োজন নিজেরা মিটিয়ে নেব’ — মানবিক সম্বন্ধের ভাষাটা সেইখানে, ‘আজ কিছু কিনব না, হাতে হাতে মিটিয়ে তো নেবই এবং আরো আরো প্রাণ, সেটি মানুষ না-মানুষ দুয়েরই জন্য, যাতে উপকৃত হয় সেই কাজটি শুরু করে দেব। এতে করে যে সম্পর্ক স্থাপিত হলো বা হবে, তাকেই বলছি — নিখাদ মানবতা। এখানে শুধু মানুষ নয়, না-মানুষ, সমস্ত প্রাণ সমস্ত জীবনকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। মান্যতা দেয়া হচ্ছে যার যার নিজের নিজের ভালো থাকার অধিকারকে। ‘কি দিতে পারি’ — এই চিন্তাটি আমাদের জড়িয়ে রাখুক।
প্রথম দুটি নিয়ে এবার কথা হোক। দুটোই একে অপরের সঙ্গে মিশে রয়েছে। বাজার টাকার চক্করের বাইরে দাঁড়িয়ে স্বনির্ভর হতে গেলে ধরিত্রীকে পাশে পেতে হবে। গা পরিষ্কার করার সাবান নাহয় কিনলাম না, গা তো পরিষ্কার রাখতে হবে, নিম হলুদ বলি কি ঘৃতকুমারী বলি, তাদের তো আনতে হবে। অর্থাৎ ধরিত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক যত নিবিড় হবে তার সহচর্যে নিজের হাতে নিজেরটা করে নেয়া যাবে। এ নিয়ে একটি গ্রন্থ আমরা অনেক আগেই পেয়েছিলাম — ‘সহজ জীবনের পাঠ’ — হাতে কলমে পরখ করার মানুষ এই শহরে বড় একটা কম নেই।
৩
‘যার যার শান্তিনিকেতন’ নিবন্ধে (লেখাটি Academia.edu-তে রাখা আছে, পড়ে দেখতে পারেন) বলা হয়েছিল যে, এই কাজগুলো ঘরে বসেও করা যায়। দেবার ইচ্ছে যার আছে তিনি তার গণ্ডিতে থেকেই কাজ করতে পারেন। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন দশ-পনেরো জন মানুষ। শহর কলকাতায় আমার পড়শি হয়ত আমাকে চেনেন না জানেন না, কিন্তু আমার প্লাম্বার আমাকে চেনেন আমার ইলেকট্রিশিয়ান আমাকে চেনেন। আমি যাদের থেকে মাছ সবজি ফল কিনি, তারা আমাকে চেনেন। এদের সঙ্গে আমি সর্বহিতে সেবাকর্ম শুরু করতেই পারি। করা যায়। করা হচ্ছে। শুধু যে অর্থ দিতে হবে তা কেন, আমার স্পেস সঙ্গ সময় মেধা সম্পদ — দেবার আছে অনেককিছু, শেয়ার করবার আছে অনেককিছু। যার সঙ্গে শেয়ার করলাম তিনি তার পরিধির মধ্যে আরো দশজনের সঙ্গে এমনই সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন। এখানে সমস্যা একটাই এবং এটাই প্রধান সমস্যা, তা হলো সদিচ্ছার অভাব।
শহর কিউবা ছাদ করিডর ব্যালকনি বারান্দা জানলায় (কোথায় নয়!) সবজিবাগান করে (সঙ্গে আরও কিছুতে স্বনির্ভর হয়ে) দেখিয়েছিল কি প্রচণ্ড তার প্রভাব। ক্যুবানরা একে দ্বিতীয় বিপ্লব বলেছিলেন। সেই বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা যার যার ঘরে থেকে শুরু করা যায়। যদি সদিচ্ছা থাকে। একে বৈপ্লবিক প্রয়াস বলছি এই কারণেই যে, বিশ্বের প্রধানতম সমস্যা সম্ভবত এই চারটি। এক, গ্লোবাল ওয়ার্মিং। সেখান থেকে খাদ্যাভাব মৃত্যু ইত্যাদি পার করে ক্লাইমেট রেফিউজি হয়ে চলা আজ প্রকাশ্যে দৃশ্যমান। দুই, অসহিষ্ণুতা। আমরা সবাই সবাইকে সন্দেহ করছি ঘৃণা করছি। তিন, আরো এটি আরো আণবিক স্তরে চলে আসছে — যা খাচ্ছি তা দেখতে খাবারের মতন কিন্তু খাবার নয়। চতুর্থটি হলো, ত্যাগধর্মের নিদারুণ অভাব — আমাকে দিতে হবে — এই তাড়না আমাতে নেই, ফলে উজ্জীবন অসম্ভব হয়ে আসছে। সবচেয়ে দৃশ্য যে সমস্যাটি সেটার দিকে তাকানো যাক। দুনিয়া দখলদারদের যেখানে আমজনতার সঙ্গে কারবার, সেই কারবারি ইন্ডাস্ট্রি — পলিট্রিকাল ইন্ডাস্ট্রির — এজেন্টদের মুখে একেক ধরনের ভাষা থাকলেও সব ন্যারেটিভের ভেতরে একটা ক্রুড হিংস্রতা রয়ে আছে। তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে নানা কথা বলছে, কেউ কাউকে বলছে চোর, কাউকে বলছে ডাকাত, কাউকে বলছে মাফিয়া, কাউকে বলছে অমুক তারিখের পর দেখে নেব — ভিন্ন ভিন্ন এইসব সম্বোধনের ভেতরে রয়েছে প্রবল রকমের ঘৃণা আর হিংসা। আমাদের মধ্যে অবিরত কুৎসিত কথার এই আয়োজন এমনভাবে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, এক, ঐ সব কথায় রি-এক্ট না করাটা যেন প্রতিবাদী না হওয়া; দুই, সমর্থন করি কি বিরুদ্ধতা করি, তাদের ব্যবহৃত বয়ান দিয়েই আমাদের ভাবতে হচ্ছে। কটূকাটব্যে কন্ডোম পরাতে হচ্ছে! মনে পড়ে যাচ্ছে আমার প্রয়াত বন্ধু সুব্রত মজুমদারের একটি কথা — ‘রাজনীতি ক্রমশ প্রাত্যহিক জীবনের বিনোদন হয়ে উঠছে। কিন্তু এরই মধ্যে ক্রুঢ় ষড়যন্ত্র রয়েছে মনে হয়’। ঘৃণার বিরুদ্ধে আমরা ঘৃণ্য ভাষাই ব্যবহার করে চলেছি, যেন আমাদের নিজস্ব কোনো ভাবনা নেই ভাষা নেই। না। আছে। আমাদের ভাষা হোক সত্য শুভ সুন্দরের ভাষা। এর চর্চা আমার কাছে প্রধান। আর এই ভাষাটি হলো, হাতে হাত ধরে ধরিত্রীর সেবা করে সকলের মঙ্গল করা।
৪
পুঁজি এবং পৃথিবী এখন ক্ষমতালোলুপ কতিপয় হাউসের হাতে, কতিপয় পরিবারের হাতে (তথ্য পাওয়া যায় যথেষ্ট)। কথার কথায়, এরা যদি এক শতাংশ হয় তাহলে নিচের ন’দশ শতাংশ হচ্ছে এদের সম্পত্তির ধারক বাহক। ব্যাংকার, হিসাবরক্ষক, সৈন্য, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক ইত্যাদি। বাদবাকি নব্বই শতাংশকে আমরা সর্বহারা বলে চিনতাম। বিভাজনটা ছিল হ্যাভ লট আর হ্যাভ নট। ক্ষমতালোভীদের এতদিনের অভিপ্রায় ছিল, যেমন তাদের দখলদারি আরো আরো বাড়ুক, সারা পৃথিবী আরো আরো তাদের কুক্ষিগত হোক; তেমনি এই সংখ্যাগুরুর জীবনযাপন যতটা কমে এনে কর্মক্ষমতা স্বাদু রাখা যায় ততটাই নামিয়ে রাখা। করোনা প্ল্যানডেমিকের ভাবনাপর্ব থেকে ওই ক্ষমতাধরেরা আরেকটু সরস ভেবেছেন। এক্সক্লুশন, লোপাট করে দাও। এর জন্য নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এই নব্বই শতাংশকে যেতে হচ্ছে এবং হবে। ভয়াবহ ভয়াবহ ভাইরাস এসেই চলেছে (অতি সাধারণ কিন্তু এই দৃষ্টান্ত)! এমনতর অগণ্য পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এই জনমানুষকে যেতে হচ্ছে (ল্যাব-ইঁদুর নিয়ে আমরা যেমন করতাম)। টিঁকে গেলে — ‘আধুনিক বিজ্ঞানের’ জয়, ভ্যাকসিন যেমন! টেঁসে গেলে — যাক। যতদিন টিঁকে আছে, ওই টিঁকিয়ে রাখার জন্য গুঁড়োপানি দাও, সঙ্গে ফ্রিতে দাও ঘৃণা হিংসা। ও’ থেকে আমার দানাপানিতে ভাগ বসাচ্ছে, ওকে সরিয়ে দিলে আমি আর দুমুঠো পাব — এই। সারা দুনিয়া জুড়ে এই বন্দোবস্ত।
প্রতিকার কি? তিনটি চরিত্র আমাদের সামনে। নিখিলেশ, সন্দীপ আর অমূল্য। আমরা কাকে বাছব? ‘পরের জায়গা পরের জমিন’এর স্বত্বাধিকারী অতএব সবাই মিলে ভাগ করে ভোগ করি — নিখিলেশ? না কি, দেহ যায় যাক, চিন্তার মরণ নেই, সেই চিন্তা সাক্ষ্য করে, এখনই, এই মুহূর্তে, শত্রুচক্রের দুনিয়া-বিছনো জালের অন্তত একটা নাটবোল্ট, তাই সই, ভেঙে ফেলার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিই — অমূল্য। অথবা, অথবা, আন্দোলনজীবী সন্দীপ। (রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা করবেন, নিখিলেশ কে একটু বাড়িয়ে দেখার জন্য সন্দীপকে একটু কমিয়ে আনার জন্য)। নির্বাচন যার যার।
এই লেখা নিখিলেশ পন্থার।
৫
এই ‘আমরা সবাই রাজা’র স্বরূপ। রাষ্ট্রক্ষমতা যার কাছেই থাকুক না কেন, লুটতন্ত্র যত ঘৃণা হিংসা বিভাজন বিদ্বেষ ছড়াক বা না ছড়াক —পৃথিবীরাজের ভালবাসা, সকলের সহাবস্থান, মর্যাদা এবং শান্তি রচনা করার রাজাধিকার আছে আমার, যত অকিঞ্চিৎকরই হই না কেন। এই দায়িত্ব আমি পালন করব। যে হকার ভাইয়ের ‘বেআইনি’ দোকান আজ ভেঙে ফেলা হলো তাকে আত্মনির্ভরতাহীনতায় ক্লিষ্ট যেন না হতে হয়। আরশোলা, প্যারাসাইট — যেই আসুক, যেই যাক, মহামন্ত্র এটাই — আমি দেব’, ধরিত্রীতে দেব’, সর্বপ্রাণে দেব’, মানবপল্লীতে দেব’। কে ঠেকাবে?
এই বিচারে এটাই সাহস, এটাই প্রতিবাদ, এটাই গণতন্ত্রের ভিত্তি, এটাই পল্লীসৃজন। এখানে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রকৃতি, ভোগের মধ্যে ত্যাগ, স্বার্থের মধ্যে পরার্থকর্ম সমুজ্জ্বল।
এমন কাজ এই বাংলায়, এই শহরে, এখানকার গ্রামে হয়ে চলছে।
