আমি সম্ভাব্য বহু অস্তিত্বহীনদের একজন, যে আজও বেঁচে আছে

(তৃতীয় পর্ব)

প্রিজনার্স ডিলেমা:  দুই বন্দীর গল্প ও মানুষের চেতনার বিবর্তন

মানব সভ্যতার ইতিহাসকে যদি একটি মাত্র প্রশ্নে সংকুচিত করা যায়, তবে সেই প্রশ্নটি সম্ভবত হবে – মানুষ কেন সহযোগিতা ও সহমর্মিতায় একে অপরের কষ্ট, যন্ত্রনা ভাগ করে নেয়, স্বার্থ ত্যাগ করে, আবার কেন নিতান্তই সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার নির্বোধ তাড়নায় একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে? কেন একই প্রজাতির সদস্যরা কখনও সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্মাণ করে, নতুন নতুন সৃষ্টিকে সর্বজনীন করে তোলার আনন্দে মাতোয়ারা হয়, আবার কখনও যুদ্ধ, নৃশংস দমন ও ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়? এই দ্বৈত প্রবণতার উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আধুনিক গেম থিওরি আমাদের সামনে একটি অসাধারণ শর্ত -আরপিত কাহিনি হাজির করে।  ‘প্রিজনারস ডিলেমা’ বা ‘দুই বন্দীর সংশয়’ নামে পরিচিত সে গাণিতিক ধাঁধার গল্প, এখন বলা যাক। 

কল্পনা করা যাক, এক শহরে দুই বন্দী ধরা পড়েছে। তারা একে অপরকে চেনে, একই সমাজের অংশ, একই ভাষায় কথা বলে এবং তাদের ভবিষ্যৎও একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু এখন তারা আলাদা কক্ষে বন্দী। তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগের উপায় নেই। প্রহরী প্রত্যেককে একই প্রস্তাব দেয়: 

১) যদি দু’জনই নীরব থাকে, তবে উভয়েই সামান্য শাস্তি পাবে; 

২) যদি একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় এবং অপরজন নীরব থাকে, তবে সাক্ষ্যদানকারী মুক্তি পাবে এবং নীরব ব্যক্তি কঠোর শাস্তি ভোগ করবে; আর 

৩) যদি উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়, দু’জনই মাঝারি শাস্তি পাবে।

এই পরিস্থিতিতে দুই বন্দীই একটা মৌলিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়। যদি সে বিশ্বাস করে, অন্য বন্দীর কথা ভেবে নীরব থাকে কিন্তু অন্যজন যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে সে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে,  যদি সে আগে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে অন্তত নিজের ঝুঁকি কমাতে পারবে। দুই বন্দীই সর্বাধিক শাস্তির সম্ভাব‍্য আশঙ্কায় একে অপরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের  ফলে উভয়েই নিরাপদ বিকল্প হিসেবে একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। ফলাফল—দু’জনেই এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যা তাদের যৌথ সহযোগিতার সম্ভাব্য ফলাফলের তুলনায় খারাপ।

প্রবাবিলিটি-তাড়িত ‘এই  আসে তো— এই চলে যায়’ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল, কেবল দুই বন্দীর নয়; এটি মানব চেতনার গভীরে নিহিত এক অস্তিত্বগত দ্বন্দ্বের সংকট। এখানে বন্দী দু’জন আসলে মানুষের দুই বিপরীতমুখী প্রবণতার প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে রয়েছে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচ্ছিন্ন আত্মপরিচয় —যা মানুষকে বিশ্বাস করতে শেখায় যে ‘নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অন্যকে নিয়ন্ত্রণ, বাতিল বা পরাজিত করতেই হবে’। এই প্রবণতাই ইতিহাসে লিঙ্গ-বৈষম্য, জাত ও জাতি বিদ্বেষ, যুদ্ধ, ধর্মীয় নিপীড়ন, উপনিবেশবাদ, কর্পোরেট একচেটিয়া ক্ষমতা এবং আজকের প্রযুক্তিগত অস্ত্র প্রতিযোগিতার হিংস্রতম  রূপ ধারণ করেছে।

এই প্রবন্ধে একে বলা হয়েছে  বাতিল-প্রবণ-আগ্রাসন (Exclusive Aggression)। অন্যদিকে রয়েছে এমন এক চেতনা, যা উপলব্ধি করে যে ‘ব্যক্তির অস্তিত্ব কখনও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত’। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় সহযোগিতা, সহমরমিতা, পারস্পরিক আস্থা, আত্মসংযম, আত্মত্যাগ এবং বৃহত্তর কল্যাণের জন্য, দূরাগত আগামী প্রজন্মের জন্য—ত্যাগের মানসিকতা। এই প্রবণতাই সমাজ, সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা এবং দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে। এই প্রবন্ধে একে বলা হয়েছে   অন্তর্ভুক্তিমূলক-সহযোগ (Inclusive Cooperation ) । 

বিষয়টা কিন্তু এতটা সরল রেখায় দেখা যায় না। কারণ, মানুষের বাস্তব জীবন একবারের সিদ্ধান্তের খেলা নয়। আমরা পরিবারে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বংশ পরম্পরায় বারবার একে অপরের, এক  দল অন্য দলের মুখোমুখি হই—এই একই খেলার শর্তে । গেম থিওরির ভাষায় মানব সমাজ হলো একটি Iterated Prisoner’s Dilemma (পুনরাবৃত্ত-প্রবণ গোলক ধাঁধা) ।  যেখানে অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতে ঘটবার  সম্ভাবনার হিসেব নিয়ে বর্তমান সিদ্ধান্ত চালিত হয়। এই পুনরাবৃত্ত মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই ‘অন্তর্ভুক্তি-মূলক সহযোগিতা যুক্তিসঙ্গত হয়ে ওঠে। 

রবার্ট অ্যাক্সেলরড( Robert Axelrod) এর গবেষণায় দেখা গেছে, যখন ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে —যাকে তিনি “Shadow of the Future” বলে অভিহিত করেছেন —তখন পারস্পরিক সহযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সফল কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাঁর গবেষণা প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নেওয়া যাক।

Robert Axelrod একজন মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও গেম-থিওরিস্ট, যিনি ১৯৮০-এর দশকে “The Evolution of Cooperation” নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেন।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ:The Evolution of Cooperation(1984)। 

এর আগে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের দিয়ে Iterated Prisoer’s Dilemma টুর্নামেন্ট পরিচালনা করেছিলেন। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। সবচেয়ে জটিল কৌশল নয়, বরং Tit for Tat নামের একটি অত্যন্ত সরল কৌশল সবচেয়ে সফলভাবে জটিল ধাঁধার সমাধান করতে সমর্থ হয়। সেই কৌশলের চারটি বৈশিষ্ট্য ছিল:

১) প্রথমে সহযোগিতা করা

২) প্রতিপক্ষের আচরণের প্রতিদান দেওয়া

৩) অপ্রয়োজনীয় আগ্রাসন না করা, আর 

৪) পুনরায় সহযোগিতার সুযোগ রাখা। 

অ্যাক্সেলরডের  ভাষায়:

যখন ভবিষ্যতে আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে,  তখন বর্তমান সিদ্ধান্ত বদলে যায়। একবারের খেলায় যে ঠিক করে — 

“আমি আজ ঠকিয়ে লাভ করে ফেলি।” সেই একই ব্যক্তি কিন্তু বারবারের খেলায় মনস্থির করে — “আমি যদি আজ ঠকাই, কাল ও আমাকে ঠকাবে।”

অতএব ভবিষ্যৎ বর্তমানকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

এটিই “Shadow of the Future”

গাণিতিকভাবে, Iterated Prisoner’s Dilemma-তে একটি discount factor বা continuation probability ব্যবহৃত হয়, যাকে সাধারণত w বা d দ্বারা প্রকাশ করা হয়। 

এই discount factor (d) বা continuation probability (w) হল অ্যাক্সেলরডের ‘Shadow of the Future’ ধারণার গাণিতিক হৃদয়। 

‘Continuation Probability’ বলতে বোঝায়— 

ভবিষ্যতে খেলা চালু থাকার সম্ভাবনা। এই “আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা”কেই গেম থিওরিতে বলা হয়—  w বা d ; যদি,  d=0 হয় তাহলে মানে দাঁড়ায় – আজকের পর আর কখনও দেখা হবে না। অর্থাৎ, ভবিষ্যত নিয়ে একেবারে ভাবিত নয়। এটা একবারের Prisoner’s Dilemma। যদি , d= 0.3 হয় , তাহলে ভবিষ্যতে আবার দেখা  হওয়ার ও খেলা হওযার সম্ভাবনা 30% যদি , d= 0.9, তহলে সে সম্ভাবনা 90%, অর্থাৎ, প্রায় নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে আবার দেখা হবে।

এবার ‘Discount Factor’ কথাটার মানে সামাজিক আচরণে প্রতিবিম্বিত হলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়।  

প্রিজনার্স ডিলেমায় শুধু দুই বন্দী বা দু জন ব্যক্তি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতে লাভ-ক্ষতির সম্ভাবনা হিসেব করে তাদের আচরণের বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। কিন্তু যদি আমি, এই Discount factor কে Intergenerational Prisoner’s Dilemma  (আন্তর্প্রজন্ম বন্দীর দ্বন্দ্ব) বা Lineage Resource Game (বংশপরম্পরা বাহিত সম্পদ সংরক্ষণ খেলা) নামে একটা নতুন ধারনায় প্রসারিত করি, তাহলে বিষয়টা বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।

ধরা যাক, সমুদ্রের মাঝখানে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একশটি পরিবারকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পাঠানো হলো। দ্বীপে উর্বর জমি আছে, কিন্তু বাইরে থেকে আর কখনও কোনো খাদ্য বা বীজ আসবে না।

প্রত্যেক পরিবারকে সমান পরিমাণ জমি এবং সমান পরিমাণ উৎকৃষ্ট ধানের বীজ দেওয়া হলো।

বিজ্ঞানীরা হিসাব করে জানালেন —

“যদি প্রত্যেক পরিবার প্রতি বছর উৎপন্ন ধানের একটি নির্দিষ্ট অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে এবং আরেকটি নির্দিষ্ট অংশ পরের বছরের বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করে, তাহলে এই কৃষি ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারবে। শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যতের সব প্রজন্মও একইভাবে খাদ্য উৎপাদন করতে পারবে।”

অর্থাৎ, প্রতিটি পরিবারকে একটি টেকসই বীজ-সংরক্ষণ নীতি মেনে চলতে বলা হলো। কিন্তু সব পরিবার একই সিদ্ধান্ত নিল না।

একদল পরিবার ভাবল— 

“প্রতিদিন যতটা খিদে, ততটা খাব। লোভে পড়ে বেশি খাবো না । অপচয় করবো না । আর খেয়ে, না খেয়েও , কিছু বীজ অবশ্যই আলাদা করে রাখব। কারণ এই বীজই আগামী বছরের ফসলের ভিত্তি।” তারা জানত, আজকের সংযমই আগামী দিনের সমৃদ্ধি।

অন্যদিকে আরেকদল পরিবার ভাবল —

“আগামী বছরের কথা পরে দেখা যাবে। যতটা পারি ফেলে ছড়িয়ে খাবো। আজ যদি বেশি খেতে পারি, সেটাই ভালো।”

তারা সংরক্ষণের জন্য রাখা বীজেরও একটি অংশ খেয়ে ফেলতে শুরু করল।

প্রথম কয়েক বছর তাদের জীবন অন্যদের তুলনায় অনেক স্বচ্ছল মনে হলো। বাংলায় যাকে বলে, খানদানি ব্যাপার, আর কি!  তাদের কাছে খাবারও বেশি ছিল। তাদের সন্তানদেরও প্রথম দিকে বেশি বেশি খেতে দেওয়া গেল। অপচয় হলো । 

কিন্তু ধীরে ধীরে একটি পরিবর্তন শুরু হলো।

যেসব পরিবার প্রতি বছর বীজের ভাণ্ডার থেকে একটু একটু করে শেষ করে ভোগ ও অপচয় বাড়াচ্ছিলো, তাদের পরের বছরের বীজের পরিমাণ ক্রমেই কমতে লাগল। ফলতঃ, তাদের জমিতে কম বীজ বোনা হলো।

পরের বছর ফসলও কিছুটা কম হলো। কম ফসলের কারণে আবার বীজও কম জমল। এর ফলে পরের বছর আরও কম বপন করা গেল।

এইভাবে একটি ধনাত্মক প্রতিক্রিয়া চক্র (positive feedback loop) শুরু হলো —একবার বীজ-ভাণ্ডার ক্ষয় হতে শুরু করলে, পরবর্তী প্রতিটি বছর সেই ক্ষয় আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। দেশের  GDP  বৃদ্ধি  যেমন Positive feedback loop – ঠিক সেরকমই। 

অন্যদিকে, সংযমী পরিবারগুলোর বীজ-ভাণ্ডার স্থিতিশীল রইল। তাদের উৎপাদনও স্থিতিশীল রইল।

তিন-চার প্রজন্ম পরে —

অপচয়কারী পরিবারগুলোর উত্তরাধিকারীরা আর নিজেদের জমি থেকে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করতে পারল না। তারা ঋণগ্রস্ত হলো। কেউ জমি বিক্রি করল। কেউ দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র কাজের সন্ধানে চলে গেল।

অবশেষে  সেই  পরিবারগুলোর  অনেকেই  দ্বীপ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেল।

অন্যদিকে, যারা প্রথম থেকেই বীজ সংরক্ষণ করেছিল, তাদের উত্তরাধিকারীরা একই জমিতে কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারল। উল্টে দেখা গেলো,  যে জমিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেল, সেগুলোর একটি অংশ পরে টিকে থাকা পরিবারগুলোর হাতে এল। ফলত, তাদের উৎপাদনক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেল।  গাণিতিক নিয়মে পারিবারগুলির পরিণতি নির্ধারিত হলো। 

এখানে কোনো সরকার কাউকে পুরস্কৃত করেনি। 

কোনো আদালত কাউকে শাস্তি দেয়নি। কোনো বাহ্যিক শক্তিও হস্তক্ষেপ করেনি। শুধু একটি বিষয় দুই দলের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে— ভবিষ্যৎকে কে কতটা মূল্য দিয়েছিল।

Discount Factor ব‍্যাখ‍্যা করতে Robert Axelrod দেখিয়েছিলেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি ভবিষ্যতের লাভকে বর্তমানের তুলনায় খুব কম মূল্য দেয়, তাহলে সে তাৎক্ষণিক লাভের জন্য সহযোগিতা ভেঙে দিতে বেশি আগ্রহী হয়।

এই কাহিনীতে সেই সহযোগিতা হলো-বীজ সংরক্ষণ। আর Defection হলো— সংরক্ষিত বীজ খেয়ে ফেলা।

যেসব পরিবারের কাছে ভবিষ্যতের মূল্য কম ছিল, তারা তাৎক্ষণিক খাদ্যের জন্য ভবিষ্যতের উৎপাদনক্ষমতা বিসর্জন দিল।

যাদের কাছে ভবিষ্যতের মূল্য বর্তমানের কাছাকাছি ছিল, তারা আজ কিছুটা কম খেয়েও ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখল।

এ বার, যে দ্বীপের কাহিনি বললাম – সেটাকে যদি পৃথিবী আর আলাদা পরিবারগুলোকে ভেবে নিই – বিভিন্ন গোষ্ঠী, সমাজ, জাতি, দেশভুক্ত মানুষ;তাহলে, Defection factor এর শেষ বিচারে, পশ্চিমী হাওয়ায় ধ্বজা ওড়ানো উত্তর-উপনিবেশিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রবাদ, সভ‍্যতা যে অপচয়-লাঙ্ছিত ভোগবাদী সংস্কৃতিকে নির্বিকল্প উন্নততর ও প্রগতিশীল ব্যবস্থা বলে প্রতিদিন প্রচার করে, তা সর্বৈব মিথ্যে।

এ  প্রসঙ্গে  Optimal Foraging Theory স্মরণ  করতেই  হবে। Optimal foraging theory-এর মূল প্রশ্ন হলো— একটি জীব কীভাবে এমনভাবে সম্পদ আহরণ করবে যাতে দীর্ঘমেয়াদে তার মোট প্রাপ্তি  সর্বাধিক হয়?

অধিকাংশ প্রাণীই সব খাবার একবারে খেয়ে ফেলে না। তারা কিছু খাবার রেখে দেয়। কিছু ফল অক্ষত রাখে যাতে বীজ ছড়ায়।

কিছু শিকারকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে না। কারণ, সম্পদের উৎসটিকে বাঁচিয়ে রাখাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি প্রাপ্তিযোগ ঘটায়। 

মানুষের যে গোষ্ঠী প্রকৃতি থেকে যত বিচ্ছিন্ন,  সে গোষ্ঠী তত তার আগামী   প্রজন্মকে বঞ্চিত  করে নিজের বর্তমানকে উজ্জ্বল করতে বেশি  উদ্যোগী  হয়েছে।  বীজ-সংরক্ষণ ঠিক একই  নীতি অনুসরণ করে।

প্রকৃতির ভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকা সকল জীবের জন‍্য যে জীবন-দায়ী সংস্থান  ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রাপ্য হিসেবে রাখা ছিলো, সেখান থেকে আমরা কে, কতটা চুরি করে নিজে ভোগ করতে পারি; পরবর্তী কততম নিকট প্রজন্মেকে— তার প্রাপ্য টিঁকে থাকার অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করতে পারি – এমন এক যযাতি-বাদী প্রতিযোগিতায় প্রতিদিন ব্যস্ত থাকার বাতিকে মানব-অস্তিত্বের প্রাণ হারিয়ে ফেলেছি।

অ্যাক্সেলরডের ধারণার গভীরে একটি অসাধারণ  দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। তিনি দেখালেন, একবারের খেলায় 

কেবল বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেলার পুনরাবৃত্তি যত হবে—

Repeated Game-এ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বর্তমান সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করবে। গাণিতিক সূত্রের হাত ধরে এক নতুন বিশ্ববিক্ষার দিগন্ত উন্মোচিত হলো:  ভবিষ্যৎ এখনো ঘটেনি, কিন্তু তার সম্ভাবনা বর্তমান আচরণকে গঠন করছে।

   অ্যাক্সেলরডের ভাষায়, বাস্তব সমাজে d=1 কখনো পুরোপুরি ঘটে না।

কারণ, মানুষ মরে, প্রতিষ্ঠান ভেঙে যায়, সভ্যতা বদলে যায়।

তাই  তিনি   সাধারণত  0< d <1  ধরে প্রবাবিলিটির হিসেব করেছিলেন। 

বাস্তব Iterated Prisoner’s Dilemma-তে d=1 সাধারণত একটা আদর্শ সীমা (idealized limit) ধরা হয় । এটা বাস্তব পরিমাপ নয়।  একইভাবে d = 0 কে বলা যায় একটা অধঃপতিত সীমা (devaluated limit) । এখন, d -> 0  ইঙ্গিত করে মানব চেতনার দুটো বিপরীতমুখী প্রবণতার এমন একটি প্রবণতা যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে  দায় মুক্ত থাকার  ও তাৎক্ষণিক লাভ বৃদ্ধির দিকে ঝোঁক ক্রমবর্ধমান । আবার d -> 1 ঠিক তার উল্টো দিকে অগ্রসর হতেই থাকা— দূর ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধ একটা মানবিক প্রবণতা। আত্মপরিচয়ের পরিসর যত প্রসারিত হয়, পরকে আপন করতে থাকে -d তত বাড়ে। একজন যদি ভাবে:”শুধু আমি এবং আমার তা‌ৎক্ষণিক সুখ গুরুত্বপূর্ণ” তাহলে d -> 0

  আর, যদি ভাবে: “আমার পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ’ তাহলে d বাড়ে। যদি ভাবে: “আমার সমাজও গুরুত্বপূর্ণ” তাহলে আরও বাড়ে। যদি ভাবে: 

“ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আমার অস্তিত্বের অংশ”তাহলে d আরও বড় হয়। তাখন, এখানে d -> 1 হয়ে ওঠে । শুধু ব্যক্তির প্রসঙ্গে নয়, সমষ্টি ও সভ‍্যতার সংকট ব্যাখ্যা করারও দার্শনিক সংকেত।  

সম্প্রতি, প্রকৃতি পরিবেশ, জলবায়ু সংকটের মূল সমস্যাটিকে একই রকম ভাবে প্রকাশ করা যায়— বর্তমান সভ্যতার প্রবণতায় d খুব ছোট। কারণ, আজকের এই বেআব্রু  মুনাফা, ক্ষমতার হিংস্র আস্ফালন, অমেরুদণ্ডী বুদ্ধি-বৃত্তি-জীবিদের অশ্লীল আনুগত্য—এই নরভূক সভ্যতার কাছে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, ভবিষ্যত প্রকৃতি, প্রজন্ম, সমাজের ক্ষতি, গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে Defection স্পষ্ট।

‘ভবিষ্যতের ভাবনায় যে সম্ভাব্য ঘটনার প্রেক্ষিত তৈরি হয়, সেটাই অস্তিত্বের অতীত ও বর্তমানকে তার অভিমুখ স্থির করার ঘটনা প্রবাহ সংঘটিত করতে প্রভাবিত করে’— সমাজ বিজ্ঞানী অ্যাক্সেলরডের এই দর্শন প্রতিফলিত হতে দেখা গেলো – জ্ঞান-চর্চার সম্পূর্ণ  ভিন্ন পরিসরে ।  Quantum    পদার্থবিজ্ঞানের বেশ কিছু তত্ত্বে প্রশ্ন উঠেছে — সময়ের চলনে দিক নির্ধারণ নিয়ে। অর্থাৎ, 

অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভ‍বিষ্যতের দিকে সময়ের যে সরলরৈখিক চলন— কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিশ্লেষণ তাকে  চ্যালেঞ্জ করলো। 

কোয়ান্টাম জগতে কণাগুলো নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না। তারা সম্ভাবনার সুপারপজিশনে থাকে। পরিমাপ (measurement) ঘটলে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল দেখা যায়।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে— পরিমাপের আগেই কি কণার সম্ভাব‍্য অবস্থা   নির্দিষ্ট ছিল? John Archibald Wheeler তাঁর বিখ্যাত পরীক্ষায় কণার কোয়ান্টাম আচরণ পর্যবেক্ষণ করে  একটা অশ্রুতপূর্ব  সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন।   

বললেন,  পর্যবেক্ষক কী মাপবে, সেই সিদ্ধান্ত যেন কণার পূর্ববর্তী আচরণের ব্যাখ্যার মধ্যে নিহিত আছে ।

অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ যেন অতীতকে প্রভাবিত করছে।

তবে এ কথা ঠিক যে, অধিকাংশ পদার্থবিদ এটিকে প্রকৃত “backward causation” হিসেবে গ্রহণ করেন না। এর পর Transactional Interpretation তত্ত্বে  পদার্থবিদ John G. Cramer একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

সেখানে বলা হলো—একটি তরঙ্গ ভবিষ্যতের দিকে যায়  (offer wave) অন্যটি ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে আসে  (confirmation wave) ফলে  বর্তমান বা ঘটমান বর্তমান গঠিত হয় দুই দিকের মিথস্ক্রিয়ায়। এই ব্যাখ্যায় ভবিষ্যৎ এবং অতীত দুই বিপরীত দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে কার্য – কারণের সরলরৈখিক   সমীকরণকে বদলে দেয়। এ প্রসঙ্গে Two-State Vector Formalism তত্ত্ব প্রণিধানযোগ্য। এই তত্ত্বের প্রণেতা যাকির আরোনভ (Yakir Aharonov)।    তাঁর কাজেও একই ধরনের ধারণাকে গুরুত্ব দেন। একটি সিস্টেমকে বর্ণনা করতে গিয়ে অতীত থেকে আসা wave function ভবিষ্যৎ থেকে আসা boundary condition— দুটিকেই বিবেচনা করলেন তিনি। 

এখন অ্যাক্সেলরড ও কোয়ান্টাম ধারণার মধ্যে একটা সাঁকো তৈরি করাই যায়। জ্ঞান-চর্চার দুটি ভিন্ন জগতের ভাবনা হলেও  এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সাদৃশ্য আছে।

অ্যাক্সেলরড বলছেন —অতীত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতে ফিরে আসার সম্ভাবনায় বর্তমান আচরণকে বদলে দেয়।

এ দিকে কোয়ান্টাম ব্যাখ্যা বলছে— ভবিষ্যৎ boundary conditions ছাড়া বর্তমানের পূর্ণ বর্ণনা অসম্পূর্ণ হতে পারে।

উভয় ক্ষেত্রেই ভবিষ্যৎ কেবল পরে আসা কোনো ঘটনা নয়; ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও বর্তমানকে সংগঠিত করছে। 

আধুনিক সভ্যতার সংকটকে বোঝার জন্যই আমাকে  আপতত অপ্রাসঙ্গিক এই —ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে হলো। অর্থাৎ, যে প্রশ্ন তুলতে চেয়ে, এতো তত্ত্ব চর্চা করলাম, দূর ভবিষ্যৎকে দেখতে না পাওয়ার বা না চাওয়ার লক্ষণ যে ভাবে আধুনিক সভ্যতায় প্রকট হয়ে উঠেছে — সেটাই কি সভ্যতা সংকটের প্রধান কারণ নয়?  মোটামুটিভাবে- গত চার’শ বছরের পাশ্চাত্য সভ‍্যতার বিশ্ববিক্ষায় যে ‘আধুনিক’ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হলো এবং ভুবন-ময় ছড়িয়ে পড়লো, তার প্রভাব ক্রমশ মানুষের ভাবনা থেকে এই ‘ভবিষ্যতের ছায়া’কে সংকুচিত করে চলেছে। সম্পর্কগুলোকে ক্ষণস্থায়ী, লেনদেনগুলোকে এককালীন এবং প্রতিযোগিতাকে সর্বব্যাপী করে তোলা হয়েছে । দূর ভবিষ্যত তো কোন ছার, নিকট-ভবিষ্যৎও দেখতে ভুলে গেছে   ব্যাক্তি ও সামাজ, বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে মানুষকে। ফলত মানুষ আবার সেই বন্দীর মতো ভাবতে শুরু করে—“আমি যদি আগে আঘাত না করি, তবে আমাকেই আঘাত করা হবে।” এই মানসিকতার পুনর্জাগরণের  মধ্য দিয়েই Exclusive Aggression বারবার ফিরে আসে। সভ্যতার সংকট এখন মানব অস্তিত্বের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। 

এর থেকেও আরও ভয়ঙ্কর সংকট হলো আমরা নিজেদের অস্তিত্ব-অবলুপ্তির ছায়াকে নির্বিকল্প ‘বাস্তব’ বলে গ্রহন করেছি আর শরীর ও মনকে এলিয়ে দিয়ে বিবেক-বুদ্ধি- অন্তরাত্মাকে সমর্পণ করার মধ্যে  ‘আরাম’ খুঁজে নিচ্ছি। 

এই বাস্তবতা কে নিয়েই আমার  পরের প্রশ্ন । যেটাকে আমরা ‘বাস্তব’ বলে জানছি — সেটা অবাস্তব নয় তো?! 

প্রিজনারস ডিলেমার বন্দী কেন “বিশ্বাসঘাতকতা” বেছে নেয়, আর কেন  অন্য  কেউ “বিশ্বাস” বেছে নিতে পারে — তার উত্তর শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে বাস্তবতাকে নির্মাণ করে, সেই প্রশ্নে। 

বাস্তবতা কি শুধু বাইরে থাকে,

নাকি মস্তিষ্কের ভিতরে তৈরি হয়?

মানুষ কখনও সরাসরি বাস্তবতাকে দেখে না। 

চোখ, কান, ত্বক কিংবা অন্যান্য ইন্দ্রিয় কেবল বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে। এই সংকেতগুলোকে অর্থপূর্ণ বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে মস্তিষ্ক। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের মস্তিষ্ক মূলত একটি Reality Construction System—যা বহির্জগতের সমস্ত তথ্যকে নির্বাচন, ব্যাখ্যা এবং পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি অভিজ্ঞ বাস্তবতা তৈরি করে।

এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ব্রেইনস্টেমের ভেতরে অবস্থিত Reticular Activating System (RAS)। RAS-কে অনেক সময় মস্তিষ্কের “attention gatekeeper” বলা হয়। প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি সংবেদনগত সংকেত আমাদের শরীরে প্রবেশ করলেও RAS সিদ্ধান্ত নেয় কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন তথ্য উপেক্ষা করা হবে। ফলে মানুষ     বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমন দেখে না; বরং সে  বাস্তবতার এমন একটি সংস্করণ দেখে, যা তার মস্তিষ্ক তার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা, ভয়, বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে নির্মাণ করে। ব্যাপারটা আর একটু ভেঙে বলা যাক। 

ধরা যাক, দুই ব্যক্তি একই বনপথে হাঁটছে।

একজন ভাবছে—“এই পথ বিপজ্জনক; এখানে নিশ্চয়ই কোনো বিপদ লুকিয়ে আছে।”অন্যজন ভাবছে—“এই পথ নতুন সুন্দর কিছু দেখার ও শেখার সুযোগ এনে দিতে পারে।”দু’জনই একই পরিবেশে আছে, কিন্তু তাদের RAS সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য নির্বাচন করবে।

প্রথম ব্যক্তি শব্দ, অন্ধকার, সম্ভাব্য বিপদ এবং অস্বাভাবিক গতিবিধির দিকে বেশি মনোযোগ দেবে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি নতুন দৃশ্য,  সম্ভাবনা এবং সুন্দর কিছু অনুসন্ধানের সুযোগের দিকে বেশি মনোযোগ দেবে।

অর্থাৎ বাস্তবতা একই হলেও perceived reality ভিন্ন।

RAS কীভাবে হতাশাবাদী বাস্তবতা তৈরি করে?

যেসব  মানুষের  দীর্ঘ  অভিজ্ঞতার  মধ্যে  একই ঘটনা  বারবার   

ঘটতে থাকে, যথা —শৈশবের অবহেলা, দীর্ঘস্থাযী বিপন্নতা;

সামাজিক অবিচার, অপমান; যুদ্ধ, দারিদ্র‍্য, অনাহার, সন্ত্রাস; ক্ষমতার আস্ফালন ও অবদমন এবং 

বারবার বিশ্বাসভঙ্গ— তাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে একটি “Threat Prediction Model” তৈরি করে। তখন RAS-এর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়— খুঁজতে থাকা— বিপদ কোথায়? ফলে বাস্তবতার ইতিবাচক দিকগুলো ফিল্টার হয়ে যায় এবং নেতিবাচক সংকেতগুলো অস্বাভাবিক গুরুত্ব পায়। নিউরোসায়েন্সে এটিকে প্রায়ই Negative Attentional Bias বলা হয়। এই অবস্থায় একজন ব্যক্তি প্রায়শই মনে করেন— মানুষ বিশ্বাসযোগ্য নয়,

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত,সহযোগিতা বিপজ্জনক, আত্মরক্ষা সর্বাগ্রে প্রয়োজন।

প্রিজনারস ডিলেমার ভাষায় এই ব্যক্তি Defection বা Exclusive Aggression-এর দিকে ঝুঁকবেন। 

এর বিপরীতে RAS কীভাবে আশাবাদী বাস্তবতা তৈরি করে? 

যদি একজন মানুষের অভিজ্ঞতায় বারবার ফিরে আসে —

নিরাপদ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা,সামাজিক সমর্থন,

দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নীতি ও ন্যায় নিষ্ঠ সামাজিক পরিবেশ ও পারস্পরিক আস্থা, তাহলে মস্তিষ্কে ভিন্ন ধরনের prediction model তৈরি হয়। RAS তখন বিপদের পাশাপাশি সুযোগও দেখতে শেখে।

এই ব্যক্তি বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করেন — “সবাই  শত্রু  নয়। সহযোগিতা সম্ভব। ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়” —এই ভাবনার অনুসঙ্গে। 

একে বলা যেতে পারে Trust-Oriented Reality Construction।

প্রিজনারস ডিলেমার ভাষায় এই ব্যক্তি  cooperation-এর দিকে ঝুঁকবেন।

অনেকেই এক্ষেত্রে জিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জিনের ভূমিকা কতটা?এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন আসে —কেউ কি জন্মগতভাবে আশাবাদী বা হতাশাবাদী?

উত্তর হলো— আংশিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নয়।

বর্তমান আচরণগত জিনতত্ত্বের গবেষণা নির্দেশ করে যে ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রায় ৩০–৪০% পর্যন্ত জিনগত উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—

সেরোটোনিন পরিবহনকারী জিনের কিছু বৈচিত্র্য, ডোপামিন রিসেপ্টর জিনের কিছু রূপ, স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত জিনসমূহ— মানুষকে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক, উদ্বিগ্ন বা ঝুঁকিপ্রবণ করে তুলতে পারে। কিন্তু জিন কোনো চূড়ান্ত নিয়তি নয়। জিন কেবল একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করে। কিন্তু কোন বাস্তবতা RAS শেষ পর্যন্ত নির্মাণ করবে, তা নির্ভর করে—

শৈশবের অভিজ্ঞতা, পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, সংস্কৃতি, শিক্ষা,

এবং ব্যক্তির নিজস্ব পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতার ওপর।

আধুনিক Epigenetics দেখিয়েছে যে অভিজ্ঞতা নিজেই জিনের প্রকাশভঙ্গিকে পরিবর্তিত করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আধুনিক জীববিজ্ঞান চর্চায় এপিজেটিক্স (epigenetics) তত্ত্বের সম্পর্কে সংক্ষেপে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা জরুরি। ১৯৪২ সালে কনরাড হাল ভাডিংটন (Conrad Hal Waddington) প্রথম “Epigenetics” শব্দটি ব্যবহার  করেন। 

জিন আমাদের চেহারার ও আচরণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত সম্ভাবনাগুলোর  একটি মানচিত্র দেয়, কিন্তু পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা সেই মানচিত্রের কোন পথগুলোকে সক্রিয় করবে তা এপিজেনেটিক্সের প্রভাব স্থির করতে পারে।  অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি কোষে রাসায়নিক পরিবর্তন সৃষ্টি করে, যা জিনের প্রকাশভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন করতে পারে। তবে এটি DNA-এর মূল ক্রম পরিবর্তন করে না; বরং DNA কীভাবে ব্যবহৃত হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।

এখন, আমার আলোচনার প্রথম পর্বে যে, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করেছিলাম, সে প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। 

আত্মপরিচয়: RAS-এর সর্বোচ্চ ফিল্টার

জিন, পরিবেশ  ছাড়াও আমাদের সহযোগ ও বিদ্বেষ ধর্মী স্বভাবের গভীরে আরেকটি স্তর আছে। RAS-এর সবচেয়ে শক্তিশালী ফিল্টার হলো— আত্মপরিচয়ের চেতনা। 

“আমি কে?” যদি আমার আত্মপরিচয় হয়— “আমি একা। পৃথিবী বিপজ্জনক।আমাকে বাঁচতে হলে অন্যকে হারাতে হবে”— তাহলে RAS এমন তথ্য খুঁজবে যা এই বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করে।   

অন্যদিকে যদি আত্মপরিচয় হয় – “আমি একটি বৃহত্তর সমষ্টির অংশ।

আমার নিরাপত্তা অন্যদের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত ”—তাহলে RAS এমন তথ্যের প্রতি সংবেদনশীল হবে যা সহযোগিতা, পারস্পরিকতা এবং আস্থাকে সমর্থন করে।

অর্থাৎ আমরা শুধুমাত্র বাস্তবতার প্রেক্ষিত তৈরি করি না; আমরা আমাদের আত্মপরিচয় আনুসান্ধানের মাধ্যমে বাস্তবতাকে নির্বাচন করি।