আমার বোন আমার সাথে বিরিয়ানি রাঁধার
প্রতিযোগিতায় নামে
“কী দারুণ রান্না করেছো, বিরিয়ানি টা”—
এই বাক্যটা হলো তাঁর কাঙ্খিত পুরস্কার।
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে বিরিয়ানি রেঁধে সে শুধু এইটুকু পুরস্কার পেতে চায় তাঁর স্বামীর কাছ থেকে! আমার বোন বুকার কিংবা পুলিৎজার এর নামই জানে না।
সে মনে করে
একজন মহিলা কবি হলো
বেশ্যা অথবা তসলিমা নাসরিন!
(ইংরেজি কবিতা I’m A Slut or Taslima Nasrin এর ভাবানুবাদ)
তখন ক্লাস সেভেন এ পড়ি। আমি ক্রিকেট পাগল এক মানুষ ছিলাম। দ্রাবিড়, আজহারউদ্দিন,কে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম। খালা অফিস থেকে ফিরে এলে খুব আনন্দের সাথে সেটা দেখাচ্ছিলাম। খালা খুব হেসে তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিল,“এলা হেলেন নুরি আজাদ হবো নাকি!”
হেলেন নুরি মানে হেলেন খালা। আমার খালার কেমন দূর সম্পর্কের বোন ছিল হেলেন খালা। আমার বাড়ির লোকেরা কিংবা গ্রামের তথাকথিত ভদ্র বাড়ির লোকেরা হেলেন খালাকে চরিত্রহীন মহিলা বলে মনে করতো। খালার অপরাধ ছিল চারটে—প্রথম তিনি নারী হয়ে লেখালেখি করতেন, দ্বিতীয়ত তিনি ডিভোর্সি, তৃতীয়ত তিনি রাজনীতি করতেন ও তখনকার প্রবল পরাক্রম সিপিএমের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন স্পষ্ট স্বর। হেলেন খালা যার স্কুটারে অথবা সাইকেলে চাপতো সেই পুরুষের সাথেই জুড়ে যেত তার নাম। সে সময় বাকালি মানে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে রাজনীতি করতে হলে শহরে যেতে হলে সাইকেল কিংবা স্কুটার ছাড়া গতি ছিল না। তাই খেলাকে প্রয়োজনে তার পার্টির লোকের সাথে যেতেই হত। তিনি কংগ্রেস করতেন। আমি যতদিন থেকে হেলেন খালাকে দেখেছিলাম খালা ছিলেন খুব প্রতিবাদী। সবাই বলতো যে কলকাতার কোন এক লোকের সাথে তার বিয়ে হয়, যে কিনা এত অহংকার ছিল যে তোয়ালা ছাড়া সে গা মুছতো না। সেই লোকটিও কবি ছিল এবং তার সাথে হেলেন খালার সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তাই আমার খালার মনে কোথাও না কোথাও একটা পূর্বসংস্কার জন্মেছিল যে কবি হলেই হেলেন খেলার মত অবস্থা হবে। বা সেই লোকটার মত।
আমি যখন সেই প্রথম ছড়াটা লিখেছিলাম সেই ছড়াটা লেখার আগেই আমার হাতে এসেছিল একখানা বই—খাঁটি ইস্পাতের তরবারি। সেই বইটার নিচে লেখক এর নাম লেখা ছিল—হেলেন নুরি আজাদ। আমি সেদিন প্রথম উপলব্ধি করি যে আমার গ্রামের আমার চেনা জানা কেউ কবি হতে পারে। লেখক হতে পারে। তার পূর্বে আমার ধারণা ছিল লেখক মানেই পাঠ্য বইয়ের কেউ। খুব দূরের কেউ, তাকে বাস্তবে ছোঁয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমার সেই ছড়াটা পড়ে খালার সেই মন্তব্যের পর আমি কিছুটা দমে যাই। আমি আর কোনদিন কোনো লেখা খালাকে দেখাইনি। যতটুকু মনে পড়ে ক্লাস টেনে পড়ার সময় একটি কবিতা লিখেছিলাম। তার কয়েকটি লাইন মনে আছে:
জীবন মানে সংগ্রাম
জীবন মানে গতি
জীবন মানে পিছুটান
ফেলে আসা স্মৃতির প্রতি
জীবন মানে হারিয়ে যাওয়া নীল আকাশের মাঝে
জীবন মানে বেঁচে থাকা সুখ দুঃখের সাথে
জীবন মানে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব
জীবন মানে সুখে থাকার অভিলাষ।
হেলেন খালার জীবনে বিস্তর সংগ্রাম ছিল। কংগ্রেস করতেন বলে সিপিএমের মিছিলে তাকে নিয়ে ভীষণ নারীবিদ্বেষী শ্লোগানও দিতে শুনেছি বহুবার। তার বাবার প্রচুর জমি অপারেশন বর্গার সময় বামফ্রন্ট সরকার দখল করে, এটা ছিল তাঁর সরকার বিরোধিতার একটা কারণ।
জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আমি হেলেন খালার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম কিন্তু আমার লেখালেখির জীবনের সাথে যেন জড়িয়ে গেছে হেলেন খালার নাম। যখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখা ছাপা শুরু হলো, বেশিরভাগ আত্মীয় বলতে লাগলো—ও আরেকটা হেলেন! আর ততদিনে হেলেনের সাথে আরেকটা মিল আমার খুঁজে পেয়েছিল অনেকে—দুজনেই আমরা ডিভোর্সি!
হেলেন খালা মারা গেছেন বছর তিনেক হলো। অব্যবহৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া তার কাঠের ঘর। শেষ জীবনে কাঠ কুড়িয়ে চুলোয় নিজে রান্না করতেন তিনি। সেই রান্নার ঘর আছে বলে আমার মনে হয় না। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম তার পান্ডুলিপি, তার লেখা তার বই কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তার মৃত্যুর পর ট্রাঙ্ক খুলে যখন সবাই ভাবছিল অনেক টাকা পয়সা পেয়ে ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে, কিছু না পেয়ে ঝামেলায় কেউ একজন ট্রাঙ্ক জ্বালিয়ে দেয়। ইতি হয়ে যায় হেলেন খালার সব কাজ।
কিন্তু হেলেন খেলার ভূত আমার গায়ে ঘাড়ে ঝুলে থাকে। সেই যে আমার খালার দাঁত খিচরিয়ে বলা—
“হেলেন হবো!,”
বারবার লুপে বাজতে থাকে। অবশ্য এখন হেলেন খালার জায়গা নিয়েছে তসলিমা নাসরিন। তসলিমার লেখা বাংলার মুসলমান পড়ুক আর না পড়ুক কিন্তু তার নাম বাঙলার মুসলমানের ঘরে একটি সিম্বল স্বরুপ। মেয়ে মুখরা হলেই, প্রতিবাদী হলেই বলে—তসলিমা নাকি!
তসলিমার নামে নিন্দিত হই যখন উপমহাদেশের মুখরা, প্রতিবাদী, নিয়মভাঙা মুসলমান মেয়েরা তখন তসলিমা হতেই পারতেন আমাদেরও কলম। তসলিমা কিন্তু ইসলামিক মৌলবাদের বিরূদ্ধে লড়াই করে আশ্রয় নিলেন আর এক মৌলবাদের ছায়ায়, যে ছায়া আশ্রয় দেয় বিলকিস বানোর ধর্ষকদের। মৌলবাদের সামনে যে ধর্মের নামই বসুক না কেন মৌলবাদের মূল চরিত্রের তাতে কোনো ফারাক হয় না। এপার বাংলা ও ওপার বাংলা দুই দেশের দুই সংখ্যাগুরু মৌলবাদ সমান ভাবেই পিতৃতান্ত্রিক চরম নারী বিদ্বেষে ভরা। যে মৌলবাদকে তিনি কলমের খোঁচায় রক্তাক্ত করেছেন, অন্য নামে সেই মৌলবাদ এর হতেই তিনি নিজেকে সঁপে দিলেন।
তিনি কলকাতায় ফিরছেন। প্রশ্ন একটাই তিনি কি বাঙালি মুসলিম নারীদের কাছে ফিরবেন? আমরা যারা লড়াই করছি নিজের সমাজ পরিবারের পিতৃতন্ত্রের সাথে ও ক্রমশ ফ্যাসিস্ট হতে চলা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। যে রাষ্ট্র এবার এক খোঁচায় লক্ষ লক্ষ মুসলিম মহিলাকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। আমাদেরকে আমাদের দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত যাঁরা তাঁদের সাথে এক মঞ্চে বসে তসলিমা কি একবারও বলবেন রুনি খাতুন এর কথা। আমার গ্রামের এক পোয়াতি রুনি খাতুন যে কিনা মা হবে ভাদর মাসে। সে চিন্তিত কারণ তাঁর নাম মুছে গেছে ভোটার লিস্ট থেকে, রুনিরা ছয় ভাই বোন এই অপরাধে। তসলিমা কি রুনি খাতুন এর কথা বলবেন?
হেলেন নুরি আজাদ কিংবা আমি বা আমরা যারা রান্নাঘর এর বাইরে বেছে নিয়েছি কলম। আমরা আপোষ করিনি। করব না।
হেলেন এর লেখা সব মুছে গেছে। আমার প্রকাশিত লেখার কাগজে আমি পটি করতে দেখেছি আমার সন্তানকে। আমার পরিবারের কাছে আমার লেখার মূল্য ওটাই। তাদের কাছে আমার লেখা অতটা দামী হয়ে উঠতে পারেনি যে তারা সেটা সংরক্ষণ যোগ্য মনে করবে।
তবুও সাহিত্যিকদের বেছে নিতেই হয় কঠিন পথ। কলম সোজা পথে না চললে উপেক্ষিত থেকে যায় সমাজের প্রান্তিকদের ভাষা, লড়াই। আপনি সহজ পথ বেছে নিলেন। আর আপনার নামে নিন্দিত হয়েও বেছে নিয়েছি আমরা প্রতিরোধের ভাষা। তসলিমা আপনি আমাদের হতে পারতেন, কিন্ত আপনি হলেন না। আপনি শুনতে পেলেন না পুশ ব্যক করা ছিটমহলে বসে থাকা কিশোরীর আর্তনাদ। আপনি শুনতে পেলেন না আমাদের সম্মিলিত আর্তনাদ। আমি আপনার নামের বেশ্যা কিন্তু আপনি আমার ঈশ্বরী নন তসলিমা।
