উন্নয়নের মানচিত্রে-দামোদর থেকে তিস্তা

দামোদর ও তিস্তা পূর্ব ভারতের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী, এদের দুই অববাহিকায় ভারত বাংলাদেশ মিলিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও, এই দুই নদীর ভাগ্য অদ্ভুতভাবে যেন একই সূত্রে গাঁথা। বর্তমান ভারতের আধুনিক উন্নয়নের কাহিনী গভীর ভাবে জড়িয়ে আছে এদের সঙ্গে। ভারতের জ্বালানি অর্থনীতিতে এরা প্রমাণ করে চলেছে ‘Jevons Paradox’ বা জেভনেস কূটাভাস যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে তিন কোটি মানুষের জীবিকা, জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় উপনিবেশের হাত ধরে আসা পুঁজিবাদ, ভারতবর্ষে এক অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও ভোগবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শুরু করে। গত দুশো বছরে, এর প্রভাব দেশের সাধারণ জনজীবনে, অর্থনীতিতে ও প্রকৃতি – পরিবেশের উপর এক গভীর পরিবর্তন এনেছে। অ্যাডাম স্মিথ ও কার্ল মার্ক্স দুজনের মতেই, সমস্ত উৎপাদন প্রক্রিয়া নির্ভর করে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর। অর্থাৎ পুঁজি বাড়ানোর জ্বালানী প্রাকৃতিক সম্পদ, আর প্রাকৃতিক সম্পদকে পুঁজিতে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন শক্তি (Energy) বা জ্বালানীর। অ্যাডাম স্মিথ দেখান যে শক্তির দক্ষ ব্যবহার কেমন করে দ্রুত উদ্বৃত্ত সম্পদ তৈরি করে। তিনি দু ধরনের পদ্ধতির কথা  বলেন; এক; শক্তির নতুন উৎস (যেমন—কাপড় তৈরিতে মানুষের পেশিশক্তির বদলে বায়ুশক্তি ও জলশক্তির ব্যবহার); এবং দুই; উৎপাদন ব্যবস্থায় তুনলনামূলক ভাবে বেশি শক্তি-বাঁচানো (যা যন্ত্রপাতির আবিষ্কার এবং শ্রমের specialisation এর দ্বারা সম্ভব হয়)। অর্থাৎ শক্তি বাঁচানোর সঙ্গে উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা দ্রুত প্রাকৃতিক সম্পদকে উদ্বৃত্ত পুঁজিতে পরিণত করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের প্রধান জ্বালানী ছিল কয়লা, Neo-Classical অর্থনীতির অন্যতম প্রবর্তক, উইলিয়াম স্ট্যানলি জেভনস ১৮৬৫ সালে  তার ‘The Coal Question’ বইয়ে শিল্পের শক্তিতে কয়লার ব্যবহার প্রসঙ্গে লেখেন ‘শক্তির দক্ষ ব্যবহার এক অভিশাপ’, পরবর্তীকালে যা ‘Jevons Paradox’ বা জেভনেস কূটাভাসের নামে বহুল প্রচলিত। এর মূল ধারণা হলো, শক্তি (ও বস্তুগত সম্পদ)’র ব্যবহারের দক্ষতার বৃদ্ধি হলে তা শক্তি বা সম্পদের সংরক্ষণের বদলে এর ব্যবহার বাড়িয়ে তোলে, অর্থাৎ প্রায়শই সামগ্রিক ভাবে তার ভোগ বা ব্যবহারের পরিমাণ কমার বদলে বেড়ে যায়, খরচ কমার কারণে চাহিদা বাড়ে। বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জেভনস কূটাভাস নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে তা আবার ফিরে এসেছে । অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে শক্তির জন্য বিভিন্ন ধরনের জ্বালানীর ব্যবহার যত দক্ষ হয়েছে তত তার উৎপাদন ও চাহিদা বেড়েছে। যেমন জ্বালানী সাশ্রয়ী গাড়িতে তেলের খরচ কমার সঙ্গে  গাড়ি বিক্রি বেড়ে যায়, একই সঙ্গে মানুষ লম্বা দূরত্বে গাড়ি চালাতে শুরু করে; এতে সামগ্রিক ভাবে তেলের ব্যবহার বেড়ে যায়। কাজেই জেভনস কূটাভাস কয়লা বা পেট্রলিয়ামের মতো জীবাশ্ম জ্বালানীর জন্য যেমন প্রযোজ্য তেমনই জলবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি বা সৌরশক্তির মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ  ‘দক্ষতার মাধ্যমে sustainability নিশ্চিত করার’ যে ধারণা Sustainable উন্নয়নে বলা হয়, সেই মতকেই জেভনস কূটাভাস সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।

একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি, শক্তি ও সম্পদের অতি দক্ষ ব্যবহার, সেই শক্তি বা সম্পদের সংরক্ষণ না করে মানুষের ভোগের প্রবণতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। পরিণামে ভোগ্য পণ্যের উৎপাদন বাড়ছে এবং দ্রুত  উদ্বৃত্ত সম্পদ বড় পুঁজি তৈরি করছে, যা বর্তমানের বাজার অর্থনীতিতে অল্প সংখ্যক পুঁজিপতির হাতে জমা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে বিশ্বজুড়ে লাগামহীন জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহারে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন দেখা দিয়েছে, যার পরিণাম, ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক বিপর্যয়। অন্যদিকে অল্প সংখ্যক মানুষের হাতে জমা সীমাহীন পুঁজি সমাজে বিশাল সম্পদ বন্টনের বৈষম্য সৃষ্টি করছে, যা বর্তমান সভ্যতাকে গভীর সঙ্কটের সামনে এনে ফেলেছে। বর্তমানে এই অপরিণামদর্শী শক্তির ব্যবহারের ধ্বংসাত্মক প্রভাব সমগ্র ভারতের সবুজ বনানী, শস্য শ্যামল চাষের জমি, বহমান নির্মল জল ও বাতাসের মতো সব প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করছে। দেশের শিল্পের শক্তির জোগান দিতে গিয়ে দামোদর ও তিস্তার মতো বড় নদী দুটিতে পরিকল্পনাহীন শক্তি উৎপাদনের ফলে, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস, এই দুই অববাহিকার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপদজনক ভাবে প্রভাবিত করছে। 

ধেয়ে এলো দামোদর

দামোদর নদ ছোটনাগপুরের পালামৌ পাহাড় অঞ্চল  থেকে বেরিয়ে, প্রায় ছয়’শ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কলকাতার দক্ষিণে হুগলী নদীতে পড়ে। কোটি কোটি বছর ধরে দামোদর ও তার প্রধান উপনদী বরাকর, তাদের অসংখ্য ছোট ছোট নদী ও নালার বিস্তীর্ণ জাল দিয়ে, ঘন ক্রান্তীয় অরণ্যে ঢাকা, ঢেউখেলানো জীব বৈচিত্র্যপূর্ণ ছোটনাগপুরের মালভূমিতে, এক বিশাল অববাহিকা তৈরি করে, যা ছিল অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের উৎস বা অবলম্বন। এখানকার পুরানো প্রস্তর থেকে নূতন প্রস্তর যুগের নানা নিদর্শন প্রমাণ করে এখানে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বসবাসের  কথা। হাজার হাজার বছর ধরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা এই অঞ্চল ভারতবর্ষের আদিবাসী সভ্যতার কেন্দ্র ছিল, দামোদর ছিল আদিবাসীদের পবিত্র নদী, আদিবাসী ভাষায় ‘দামু’ শব্দের অর্থ পবিত্র এবং ‘দা’ হচ্ছে জল। এখানে সহস্রাব্দ প্রাচীন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের  প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও পাওয়া যায়। 

এই অববাহিকার ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ভূ-প্রাকৃতিক  বৈশিষ্টে্যর কারণে নিম্ন অববাহিকার সমতল অঞ্চলে বন্যা ছিল এক স্বাভাবিক ঘটনা। বর্ষায় দামোদর নদীর সাড়ে সতের হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল ‘উচ্চ অববাহিকা’র বিপুল জলরাশি, গঙ্গার বদ্বীপের সমভূমিতে অবস্থিত নিম্ন অববাহিকায় দামোদরের নদীখাত উপচে দু-পাশের সমতল ভুমিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বছর বছর এই বন্যায় দক্ষিণ বাংলা ভাসত, তাই দামোদরকে বলা হত ‘বাংলার দুঃখ’। কিন্তু এই বন্যায় বয়ে আসা পলি মাটি দিয়ে তৈরি হয় দামোদরের ‘নিম্ন অববাহিকা’র  উর্বর সমতল ভুমি যা ঐতিহাসিক ভাবে, উর্বর, কৃষিপ্রধান অঞ্চল; দামোদরের দুই পাশের বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলী ও হাওড়া জেলা দেশের শস্য ভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত। 

এছাড়াও দামোদর নদী হুগলী নদীর নাব্যতা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করত। হুগলী নদীর মোহানায় জমা পুঞ্জীভূত  পলি মাটি জোয়ারের জলের সঙ্গে ঠেলে উঠে মোহনার মুখ বন্ধ করলে, বছর বছর দামোদরের বন্যার প্রবল জলের তোড়, সেই জমা পলিদের ধাক্কা দিয়ে পুনরায় সমুদ্রে ফেলে দিয়ে এসে হুগলী নদীর নাব্যতা রক্ষা করত। দামোদর নদ, ছোটনাগপুর ও গাঙ্গেয় উপত্যকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

কিন্তু দামোদরের আছে ‘প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধির অভিশাপ’, এর জঠরে লুকিয়ে ছিল শিল্প বিপ্লবের জ্বালানী কয়লা ও তার সাথে অন্যান্য খনিজ। জেভনসের বিখ্যাত বই ‘The Coal Question’ প্রকাশিত হবার ৯০ বছর আগেই, শিল্প বিপ্লবের আঁতুড় ঘর ব্রিটেন থেকে আসা ইংরেজরা দামোদর নদীর ধারে রানিগঞ্জে ভারতের প্রথম কয়লা খনি শুরু করে। এর পরের ২৫০ বছর ধরে দামোদর উপত্যকার এই বিশাল কয়লার ভাণ্ডার ক্রমাগত বিপুল পরিমাণ কয়লার জোগান দিয়ে চলেছে বিভিন্ন শিল্প ও কলকারখানায়।

দামোদর উপত্যকার কয়লা ওঠানোর ইতিহাসের সঙ্গে ভারতবর্ষের আধুনিক পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও নদী উপত্যকার পরিবেশের ধ্বংসের ইতিহাস গভীর ভাবে জড়িয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে রানিগঞ্জে কয়লা তোলা শুরু করলে, কয়লার মুনাফার লোভে কেবল ইংরেজ কোম্পানিরাই নয়, প্রিন্স দ্বারাকানাথ ঠাকুরের মতো দেশীয় ধনীও ১৮৩৭ সালে, কার টেগোর এন্ড কোম্পানি তৈরি করে এখানে কয়লা তোলা শুরু করে৩। প্রথম দিকে, জঙ্গল ঢাকা এই দুর্গম অঞ্চল থেকে কয়লা পরিবহণের একমাত্র পথ ছিল দামোদর নদীর জলপথ, তাই এই কয়লা উৎপাদন সীমিত ছিল ও খনির প্রসার সীমাবদ্ধ ছিল। 

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, ভারতবর্ষে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও রেললাইনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে কয়লার চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে, একইসঙ্গে বাড়ে এই অঞ্চলে কয়লা খনির সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ে ঝড়িয়া ও গিরিডিতে। কয়লার মূল কেন্দ্র রানিগঞ্জকে ঘিরে জঙ্গল কেটে আধুনিক শহর ও পরিবহণ পরিকাঠামো গড়ে ওঠে, আসানসোলের রেল স্টেশন ও ওয়াগন ডিপো হয়ে ওঠে কয়লা পরিবহণের কেন্দ্রস্থল। ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে রানিগঞ্জ অঞ্চলে ক্রমশ কয়লার উৎপাদন বাড়তে থাকে, ১৮৫৮ সালের ২ লক্ষ ৯৩ হাজার টন উৎপাদন, ১৮৬৮ সালে বেড়ে হয় ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার টন। বেড়ে চলে কোলিয়ারির সংখ্যা, ১৮৮১ সালে রানিগঞ্জ কয়লা খনি অঞ্চলে ৩৭ টি কোলিয়ারি ছিল যা ১৯০৮ সালে বেড়ে হয় ২৭৪৪ ।  

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্টিম ইঞ্জিন প্রযুক্তির উন্নতিতে কয়লার ব্যবহার যত দক্ষ হতে থাকে, বিভিন্ন শিল্পে কয়লার ব্যবহার তত বাড়তে থাকে, আসতে থাকে বড় বিনিয়োগ। ইস্পাত শিল্পের কয়লার জন্য বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই টাটারা ঝড়িয়া, সিজুয়া এবং জামাডোবার বিস্তীর্ণ অঞ্চল কয়লা খনির জন্য লিজ নেয়। কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ, দামোদরের জল ও নিকটে কলকাতা বন্দরের উপস্থিতি, দামোদর উপত্যকাকে স্বাধীনতার আগে থেকেই এক শিল্পোন্নত এলাকায় পরিণত করে। দেশের দ্বিতীয় ইস্পাত শিল্পের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১৮ সালে, দামোদরের ধারে বার্নপুরে। ধীরে ধীরে দামোদর অঞ্চল পরিণত হয়  স্বাধীনোত্তর ভারতের শিল্প বিকাশের আঁতুড় ঘর, ভারতের ‘রূঢ়’ বা ভারী শিল্পাঞ্চল, এর প্রধান কারণ দেশের মোট কয়লার ৪৬% এখানে পাওয়া যায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ১৯৪৩ সালে দামোদরের ভয়ঙ্কর বন্যায় কলকাতা মহানগর সম্পূর্ণ বিছিন্ন হয়ে পড়ে বাকী বিশ্বের থেকে। স্বাধীনতার ঠিক পরেই ১৯৪৮ সালে, আমেরিকার টেনেসি ভ্যালী অথরিটির ধাঁচে বিশ্ব ব্যঙ্কের পয়সায় তৈরি হয় দামোদর ভ্যালী কর্পোরেশন (ডিভিসি),  এশিয়ার আধুনিক উন্নয়নের প্রথম মডেল।  শুরুতে ডিভিসির ৩ টি মূল উদ্দেশ্য ছিল ; ১) বন্যা রোধ, ২) কৃষির সেচ ও ৩) বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু বোকারো, দুর্গাপুর ও বার্নপুরের ভারী ইস্পাত শিল্প ও তাদের সঙ্গে উঠে আসা আনুষাঙ্গিক নানা শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বড়মাত্রায় বিদ্যুতের প্রয়োজন দেখা যায়। আর ধীরে ধীরে শিল্পের বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়ে ওঠে ডিভিসির প্রধান ব্যবসা, বাকী দুই উদ্দেশ্য সময়ের সঙ্গে তাদের গুরুত্ব হারায়।

দামোদরের সহজলভ্য কয়লা এবং জলের কারণে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের আদর্শ জায়গা। সেই কথা মাথায় রেখে ডিভিসি, ১৯৫১ সালেই তাপ বিদ্যুৎ তৈরির জন্য বোকারোর বারমোতে নিজস্ব কয়লা খনির মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়ে কয়লা উৎপাদনে। বিদ্যুৎ, জল ও খনিজ পদার্থের উপস্থিতিকে ঘিরে গড়ে উঠে ইস্পাত কারখানা, কয়লা ওয়াসারী, রাসায়নিক কারখানা, সিমেন্ট কারখানা, কোক ওভেন প্ল্যান্ট ইত্যাদি কলকারখানা। দামোদরকে ঘিরে গড়ে ওঠে দুর্গাপুর, আসানসোল, চিত্তরঞ্জন, কুলটি, কুমারডুবি, বার্নপুর, ধানবাদ, বোকারোর মতো একের পর এক শিল্প নগরী। ভারত সরকার ১৯৭৩ সালে দেশের সব কয়লা খনির জাতীয়করণ করে তৈরি করে কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড। কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড তার সহযোগী সংস্থা, যেমন ইসিএল (ECL), সিসিএল (CCL) ও বিসিসিএল (BCCL) এর মাধ্যমে এই দামোদর উপত্যকায় ব্যাপক পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করে, সঙ্গে যোগ দেয় ডিভিসি। 

বর্তমানে দামোদরের দুই ধারের প্রায় ৪,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা—এই অববাহিকার মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ — জুড়ে প্রায় ৩০০-রও বেশি সচল কয়লা খনি বছরে ২০ কোটি টনের বেশি কয়লা উৎপাদন করে। এই সব খনি  মূলত ঝড়িয়া, রাণীগঞ্জ, পূর্ব বোকারো, পশ্চিম বোকারো, উত্তর করণপুরা, দক্ষিণ করণপুরা এবং রামগড়ের মতো সাতটি অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে, ১০০ বছর আগেও যা ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। এই সব খনির মধ্যে অনেকগুলো ভূগর্ভস্থ খনি কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া খনিগুলোর একটি বড় অংশ হলো মুখ খোলা খনি (ওপেন-কাস্ট মাইন) যাদের অনেকেই দামোদর নদী খাত সংলগ্ন। বর্তমানে দামোদর উপত্যকায় মোট কয়লা উৎপাদনের ৬০ শতাংশই আসে এই সব খোলামুখ খনি থেকে৫ । 

এই পুঁজিবাদী অপরিণামদর্শী শিল্পায়নের প্রথম শিকার এই অঞ্চলের বিশাল অরণ্য, হাজার হাজার একর ঘন জঙ্গল ও বনজ সম্পদকে ধ্বংস করা হয়। বর্তমানে সেই বনভুমি, অববাহিকার মাত্র ২২% শতাংশ জুড়ে এর পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমান, যেখানে সমগ্র ঝাড়খণ্ডে বনভুমি, রাজ্যের ২৯%, এর সঙ্গে হারিয়ে গেছে অমুল্য জীব বৈচিত্রে্যর জগত। দ্বিতীয় শিকার হয়েছে অঞ্চলের ভূমিপুত্র, এখানকার আদিবাসীরা। গত দু’শ বছরে ক্রমাগত আধুনিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, এখানকার আদিবাসী জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। এখনকার জন বিন্যাসের পরিবর্তনে আদিবাসীরা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণত হয়,  বনভুমি ধ্বংস করে এখনকার স্বাধীন আদিবাসীদের রাষ্ট্রের অধীনস্থ প্রান্তিক জনজাতিতে পরিণত করা হয়। এর তৃতীয় শিকার হয় হুগলী নদীর নাব্যতা, ডিভিসির বাঁধের কারণে দামোদরের বন্যার প্রভাব কমার কারণে হুগলী নদী ক্রমশ তার নাব্যতা হারিয়েছে। 

এই উন্নয়নে যখন দেশের মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, উচ্চবর্ণ গোষ্ঠী সব থেকে লাভবান হয় তখন আদিবাসীদের জীবন সম্পূর্ণরূপে তাদের কোন অনুমতি ছাড়াই অর্থনৈতিক, সামজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই অঞ্চলে  বাইরে থেকে আসা প্রভাবশালী সংস্কৃতির আধিপত্য এখানকার আদিবাসী সংস্কৃতিকে এক সংখ্যালঘু সংস্কৃতিতে পরিণত করে। এর প্রভাবে এখানকার আদিবাসী সমাজ জীবনের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক ও তাদের স্থানীয় অর্থনীতি সম্পূর্ণ রূপে ভেঙে পড়ে। বিগত ২৫০ বছরে বিদেশ থেকে আসা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি আদিবাসীদের কখনো অনুন্নত, অশিক্ষিত, অসভ্য, এমনকি অপরাধী জাতি হিসাবেও দেখাতে ছাড়েনি। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) ১৯৫৩ সালে যখন ধানবাদ, জামতারা, পুরুলিয়া এবং তৎকালীন বর্ধমান জেলার—মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মালিকানাধীন কয়েক’শ আদিবাসী গ্রামকে তুলে দিয়ে ৪১,০০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে, প্রায় ৭০,০০০ আদিবাসী মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন৬। দামোদর উপত্যকায় ১৯৫০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে কয়লা খনির কাজের ফলে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন৭।

এই ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন দামোদর অববাহিকার পাহাড়, জল, জঙ্গল, পরিবেশকেও সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে চলেছে। দামোদর আজ ভারতের সবচেয়ে দূষিত নদীর একটি,  দামোদর ও তার উপনদীরা দুই পাড়ের কয়লা খনি ও ২৫ টির বেশি শহর ও অসংখ্য গ্রামের জল নিষ্কাশনের পথ। নদীর জলে খনির মাটি ও পাথর (ওভারবার্ডেন), ফ্লাই অ্যাশ, তেল, বিষাক্ত ধাতু এবং কয়লার গুঁড়োর সাথে যোগ হয়, শিল্পের নিকাশি জল ও শহরের বর্জ্য। বায়ু দূষণের পরিমাণও ভীষণ পরিমাণে বেশি, বাতাসে ভাসমান কঠিন পদার্থ, তেল এবং গ্রিজজনিত দূষণের সিংহভাগই ঘটে কয়লা খনি ও অন্যন্য শিল্পের কারণে।  অববাহিকার মানুষেরা ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন, কারণ দামোদর নদ ও তার উপনদীগুলোই ছিল ওই এলাকার অধিকাংশ মানুষের পানীয় জলের উৎস। ত্রুটিপূর্ণ খনন এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসাধারণের উদাসীনতা। 

তিস্তা পাড়ের কথা 

পূর্ব হিমালয়ের কোলে, ছোট্ট রাজ্য  সিকিমই হচ্ছে তিস্তা নদীর ঘর, এর বিস্তীর্ণ উচ্চ অববাহিকা জুড়ে এই রাজ্য।   দামোদর নদ ও তিস্তা নদীর যত মিল ততই যেন এরা আলাদা; প্রথমজন প্রাচীন মালভুমি থেকে বেরিয়ে প্রবল পরাক্রমে গাঙ্গেয় উপত্যকার পূর্বে হুগলী নদীতে মিশেছে, দ্বিতীয় জন হিমালয় পর্বতমালার, বরফ ঢাকা অঞ্চলের হিমবাহ থেকে বেরিয়ে বড় বড় পাহাড়ের ঢাল ও গভীর খাদ পেরিয়ে সেই গাঙ্গেয় উপত্যকার উত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলেছে। তিস্তা ও তার প্রধান উপনদী রঙ্গিতের তৈরি সিকিম হিমালয়ের উচ্চ অববাহিকাও দামোদরের উচ্চ অববাহিকার মতোই বিশাল এবং এখানেও নিম্ন অববাহিকা ছোট হবার কারণে বছর বছর বন্যা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। লেপচা ও লিম্বু আদিবাসীরা কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তিস্তার দেশ সিকিমকে কতদিন আগে  নিজেদের দেশ করে নিয়েছে কেউ জানেনা, ধীরে ধীরে এখানে ভুটিয়া, গোর্খা ও তিব্বতীরাও বসতি বানায়।

কিন্তু তিস্তার দামোদরের মতো (খনিজ) ‘সম্পদের অভিশাপ’ না থাকায় তিস্তা তীরের বাসিন্দারা শান্তিতে বসবাস করছিল। মাঝে মাঝে হিমালয়ের ভূমিকম্প, পাহাড়ের ধ্বস ও তিস্তার বন্যা তাদের শান্তির বিঘ্ন ঘটালেও সেখানকার মানুষ সেসব মানিয়ে নিয়ে বসবাস করত। বহু লক্ষ বছর ধরে, তিস্তাকে ঘিরে দার্জিলিং-সিকিম হিমালয়ের ও ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল ও নানা রকমের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে পূর্ব হিমালয় জীববৈচিত্র্যের হটস্পট। এখানে ৫৫০ প্রজাতির অর্কিড এবং ৬০০ প্রজাতির প্রজাপতি ছাড়াও অগণিত প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায়। 

হিমালয়ের উঁচু পাহাড় থেকে দ্রুত বেগে পড়া জলের শক্তি ব্যবহার করে মানুষ নানান কাজ অনেকদিন ধরেই করছে, এটা কোন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু তার ব্যবহার সীমিত থাকতো স্থানীয় মানুষের মধ্যে। সিকিমে ১৯২৭ সালে গ্যাংটকের কাছে ‘রানি খোলা’-র ওপর ৫০ কিলোওয়াটের প্রথম ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়, এর পর ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ১৯৬৫ সালে গ্যাংটকেরই কাছে তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালে (১৪ এপ্রিল) সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে  ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।  এমনকি ১৯৭৮ সালেও সিকিমে তিনটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে মাত্র ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো। 

সমস্যার শুরু হয় ১৯৯০এর দশকে ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক উদারীকরণের সময় থেকে। হিমালয়ের উঁচু পাহাড়ের তিস্তা, রঙ্গিত ও তাদের উপনদীরা যে বিপুল পরিমাণ জল নিয়ে দুর্বার গতিতে পাহাড় থেকে নামে তাকেই আধুনিক প্রযুক্তি সস্তায় জলবিদ্যুতে পরিণত করে। ধীরে ধীরে পরের চার দশকে জীবাশ্ম শক্তির পরিবর্ত বা বদলি শক্তি হিসাবে সৌর, বায়ু ও জল শক্তির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  সিকিমে ক্রমাগত জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে থাকে এবং ২০০০ সাল থেকে উচ্চ তিস্তা অববাহিকা সবুজ শক্তির একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তৈরি হতে থাকে মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ২০০৮ সালে তৈরি হয় ৫১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘তিস্তা স্টেজ-৫’ এবং ২০১৭ সালে উত্তর সিকিমের চুংথাং-এ নির্মিত হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার, ‘তিস্তা স্টেজ-৩’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। 

বর্তমানে সরকারি হিসাবে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে তিস্তা ও রঙ্গিতের বিভিন্ন উপনদীতে প্রায় ৩২ টির মতো ছোট বড় জল বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে, ৭টির কাজ চলছে এবং আরো ১৭টি প্রস্তাবিত প্রকল্প হবার কথা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ এজেন্সি (CEA)-র ২০২৪ সালের সমীক্ষায় জানিয়েছিল সিকিমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬,০৫১ মেগাওয়াট; এর মধ্যে ২,২৮২ মেগাওয়াট ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, ১,০৩৭ মেগাওয়াট নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ২,৭৩০ মেগাওয়াট বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে৮। যদিও সিকিমে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ জাতীয় গড়ের কম। এখানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার পরিমাণ মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের মতো, তবুও রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের নামে এখনকার বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সিকিমে বড় বড় ২৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, মূলত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয় কোম্পানিদের মুনাফা এবং  রাজ্যের রাজস্বের জন্য। 

প্রতি বছর ১৮ই সেপ্টেম্বর সিকিমে ‘বিপর্যয় মোকাবিলা করার দিন’ হিসাবে পালন করা হয়, কারণ ২০১১ সালের ঐ দিন সিকিম ৬.৯ মাপের ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের কবলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে, অনেক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ১০০’র কাছাকেছি মানুষের মৃত্যু হয়। এর ঠিক ১২ বছর পর ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ‘Glacial Lake Outburst Flood’ (GLOF) বা হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে এক আকস্মিক বিধংসী বন্যা, উত্তর সিকিম থেকে উত্তরবঙ্গের তিস্তার দুই পাশের জনজীবনে আছড়ে পড়ে, ১০০ জনের মতো মানুষ প্রাণ হারায়। উত্তর সিকিমে, ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে  অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ে অনেক ছোট বড় ধস নামে, তিস্তা নদীর জলস্তর বেড়ে যায়, ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে, রংপো থেকে মেল্লি পর্যন্ত এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, দেড় হাজারেরও বেশি পর্যটক আটকে পড়েন এবং নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ১০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ছাড়াও পূর্ব ও দক্ষিণ সিকিমের বিভিন্ন অঞ্চলেও মাঝারি থেকে বড় আকারের বেশ কয়েকটি ধ্বস নেমে জনজীবন বিপন্ন করে। সিকিমে ভূমিকম্প, বন্যা বা ধ্বস নামা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাহলে প্রশ্ন, এই সব বিপর্যয়, আকস্মিক দৈব দুর্বিপাক বলে মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এই সব বিপর্যয়ের বারংবার ঘটা বা সংখ্যার বৃদ্ধি, তীব্রতা ও ক্ষতির মাত্রা বিশ্লেষণ করলে এক বিশেষ ধরন লক্ষ্য করা যায়। বড় বড় প্রকল্প তৈরি হবার পর ভূমিকম্প বাদ দিলে বাকি দুই বিপর্যয়,  আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। 

কেবল ২০২৩ এর হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভাঙার ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা মানুষের অপরিকল্পিত কাজে কি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে। জলবায়ু উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ হিমালয়ের বরফ ঢাকা অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় উত্তর সিকিমে, হিমালয়ের উঁচু বরফ ঢাকা অঞ্চলে হিমবাহসমূহ গলে বিশাল বিশাল প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় অত্যাধিক জলের চাপে ভেঙে নীচে বন্যার সৃষ্টি করছে এবং আগামী দিনে এই রকম বন্যার সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। 

এই রকমই, দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ হ্রদ,  ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ফেটে গিয়ে তিস্তায় মিশে তৈরি করে তীব্র জলস্রোত, যার ধাক্কায় ভেসে যায় ১২০০ মেগাওয়াট ‘তিস্তা স্টেজ-৩’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুংথাং বাঁধ। বন্যা আঘাত করার সময় বাঁধের জলাধারটি পূর্ণ থাকায়, সেই ভাঙা বাঁধের বিপুল জলরাশি যোগ হয়ে তীব্র বেগে  বিধ্বংসী আকার ধারণ করে, নীচে পর পর ‘তিস্তা স্টেজ ৫’, তিস্তা স্টেজ ৬, ও পশ্চিম বঙ্গের তিস্তা লো ড্যাম-৩ ও ৪  মেগা জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উপর আঘাত করে তাদের বিধ্বস্ত করে। পরিণামে এই সব প্রকল্পের সাথে সাথে তিস্তার দুই পাড়ের জনজীবনে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়; সব মিলিয়ে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, জাতীয় সড়কের বড় বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং একাধিক গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেবল বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। সিংথাম থেকে গাজলডোবা পর্যন্ত সেই বিপর্যয়ের ক্ষতচিহ্ন এখনও দৃশ্যমান। এর পরেই ২০২৪ সালের এক ধ্বস তিস্তা স্টেজ ৫ এর পাওয়ার হাউসকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে। এছাড়াও ধ্বসের কারণে নাগা নাগমোরের মত ৩০০/৪০০ পরিবারের গ্রামের মানুষকে গ্রাম ছাড়া হতে হয়। 

প্রশ্ন ওঠে বাঁধের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে যথাযথ ব্যবস্থা থাকলে বন্যার তীব্রতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো। অথচ এই বিপদ অজানা ছিল না, ২০১৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার দুই বছর আগে, ২০১৫ সালে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের এক গবেষণায় হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল ‘তিস্তা-৩ মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’। এই বাঁধের ঝুঁকির বিষয় ২০০৫ সাল থেকে জানা থাকলেও সরকার এবং বাঁধটির মালিকানাধীন কোম্পানি বিষয়টিকে এড়িয়ে যায়৯।

তিস্তা অববাহিকায় বর্তমানে নীচের তিন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে এই সব বড় জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উপস্থিতি সমস্যাকে আরো জটিল করেছে যা ভবিষ্যতে এই অববাহিকার মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে; 

১)  ভূতাত্ত্বিকভাবে এই নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালার এই অঞ্চল, ইউরেশীয় প্লেটের বিপরীতে ভারতীয় টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত চাপের ফলে ভূমিকম্প প্রবণ; Seismic Zone IV বা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল-৪ (তীব্র মাত্রার) এর অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হলো এখানে প্রায়শই অগভীর উৎসবিশিষ্ট মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ ছাড়াও এই অঞ্চলে ২০১১ র মতো বড় ভূমিকম্প আগেও দেখা গেছে এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আছে।

২) সিকিম হিমালয় অস্থিতিশীল পাহাড়ের ঢালের কারণে ধ্বস নামার জন্য এক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, এর সঙ্গে যোগ হয় এখনকার অল্প তীব্র ভূমিকম্প। কিন্তু সিকিমে বিগত তিন দশকে ভারী জল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও তার জন্য পাহাড়ের ভিতর দিয়ে তৈরি লম্বা সুড়ঙ্গ, ও ভারী পরিকাঠামো তৈরি শুরু হবার পর থেকে ক্রমাগত সিকিম হিমালয়ে ধ্বস নামা বেড়ে চলেছে। রেল লাইন তৈরি ও জাতীয় সড়ক পথের পাশের ভঙ্গিল পাহাড় কেটে রাস্তা চওড়া করার কারণে পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা কমছে, এর সঙ্গে সিকিম হিমালয়ের ভারী বৃষ্টিপাত পাহাড়ে ধ্বস নামাকে আরো ত্বরান্বিত করছে।    

৩) এবং সব শেষে যোগ হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ হ্রদের তৈরি হওয়া ও তার আকস্মিক বন্যা। এই বিপর্যয় সিকিমের তিস্তা অববাহিকার মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।  

এত সব বিপদ সত্ত্বেও বৃহৎ পুঁজি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে সিকিমের বড় বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এক লাভজনক উদ্যোগ। যদিও এর কারণে তৈরি হয় পরিবেশগত ও সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা, প্রান্তিক মানুষের বারবার ঘর বাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়া, নদী-কেন্দ্রিক ইকোলজির ক্ষতি, বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়া এবং নদী তীরের মানুষের জীবিকার ওপর বিপর্যয় নেমে আসা। মজার ব্যাপার হচ্ছে পরিচ্ছন্ন শক্তি’র উৎস হিসেবে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সবচেয়ে বিতর্কিত, কারণ এর তৈরির সময় ও পরবর্তীকালে যে সবুজ প্রকৃতিকে নষ্ট করে বসতি ও পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি করা হয় তা বড় পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরির কারণ হয়। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঁধের জমা জলের নীচে জমা মরা গাছপালা পচে যাওয়ায় মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়।

সময়ের সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সিকিমের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের ফলে তিস্তা অববাহিকার মানুষের ওপর দ্রুত গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব পড়ছে। বস্তুত, এখানে ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ু-জলবিজ্ঞানগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিস্তা অববাহিকায় দ্রুতগতিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ নানাবিধ পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত বিপদের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। সিকিম হিমালয় ভূমিকম্পপ্রবণ এবং ভঙ্গুর, সংবেদনশীল ইকোলজি অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এখানে এতো বড় বড় জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা ভাবার কারণ কী? কেবল কি জীবাশ্ম শক্তির ব্যবহার কমানোর সাথে সাথে সবুজ শক্তির ব্যবহার বাড়ানো নাকি বড় পুঁজির ব্যবহার?

ঘুরে দেখা

আধুনিক ভারতে দীর্ঘমেয়াদী sustainable উন্নয়ন এক বড় চ্যালেঞ্জ, বিশ্বের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ব্যবস্থা করার সঙ্গে সঙ্গে  জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ থেকে সেই নাগরিকদের সুরক্ষা এই মুহূর্তে দেশের সামনে এক জটিল সমস্যা। এই দুই নদীর বর্তমান অবস্থা প্রমাণ করে জেভনস্ কূটাভাসকে, একদিকে শিল্পে কয়লার মতো গতানুগতিক জীবাশ্ম জ্বালানীর দক্ষ ব্যবহারে দামোদরের ভয়ঙ্কর পরিণাম, অন্যদিকে জলবিদ্যুতের মতো জীবাশ্ম জ্বালানীর বিকল্প সবুজ শক্তির উৎপাদনের দক্ষ ব্যবহারের পরিণামে তিস্তার মতো নদীর বিধ্বংসী ভবিষ্যৎ। দুই ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে এই দুই উপত্যকার মানুষের প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত অত্যাধিক শক্তি উৎপাদনে এই দুই নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে এখানকার মানুষদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন।

দুই বছর আগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ২০১৩-১৪ সালে ভারতের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ৮৭৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১,৬২৩ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। এবং এখনো ভারতবর্ষ মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারে উন্নত দেশের থেকে অনেক পিছনে এবং তাতেই আমরা দামোদর আর তিস্তার মতো নদী অববাহিকার ধ্বংসলীলা দেখছি। যদি এই হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে তাহলে ভবিষ্যতের ভারতবর্ষের কথা ভাবলে ভয় লাগে। হয়ত এই সত্যকে উপলব্ধি করেই মহাত্মা গান্ধী প্রায় ১০০ বছর আগে  সতর্ক করে বলেছিলেন, ‌‘ইংল্যান্ডের মতো একটা ছোট দ্বীপ-রাজ্যের মানুষের ভোগের কারণে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আজ সারা বিশ্বকে শোষণ করছে। যদি ৩০ কোটি মানুষের একটি সমগ্র জাতি একই রকম অর্থনৈতিক শোষণের পথ বেছে নেয়, তবে তারা পঙ্গপালের মতো পৃথিবীকে নিঃস্ব ও উজাড় করে ফেলবে।’ দেখা যাচ্ছে বিশ্ব উজাড় হোক বা না হোক ভারতবর্ষ উজাড় হয়ে যাবে সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

অবিরাম বৃদ্ধি ও ভোগ নির্ভর উন্নয়ন আমাদের সেই অত্যাধিক সম্পদ উপভোগ করার দিকে নিয়ে যায় যার মূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেটাতে হবে। জেভনস কূটাভাস্ আমাদের দেখায় যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রাবল্যে ভোগ ও অসন্তুষ্টির চক্রে মানব সমাজ ঘুরছে, প্রয়োজন সংযম অনুশীলন যা এক ভিন্ন ধরনের কূটাভাস বা আপাত-বৈপরীত্যের সৃষ্টি করবে। প্রয়োজন অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত যা আমাদের উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে, আমাদের কাছে যা আছে তা-ই যথেষ্ট, কখনই ভাবা হচ্ছে না বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর কথা।

সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার পালামৌ প্রবন্ধে, দেড়’শ বছর আগে দামোদর অঞ্চলের বন জঙ্গল পাহাড় নদী ও সরল আদিবাসী জীবনের জায়মান জগতের এক বর্ণনা দিয়েছিলেন। তাকেই যেন বিংশ শতাব্দীর প্রথমের দিকে বিভূতিভূষণ তার অনন্য উপন্যাস আরণ্যকে  ধরেছেন এক অন্য মাত্রায়। আর সেখানেই হয়ত তিনি এই জগতের বিনাশের সুচনাও দেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেই দামোদর অববাহিকা যেন এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। ষাট সত্তর বছর আগেও এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লোভে আর স্বাস্থ্য ফেরাতে বাঙালিরা যেত, গিরিডি- হাজারীবাগ-রাঁচি-মধুপুরে। আজ সেই অরণ্যহীন মরুভূমির মতো, দূষণ পূর্ণ হতদরিদ্র দামোদর ছেড়ে, প্রকৃতির লোভে  শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সিকিমের পেলিং, গ্যাংটক, রাবাংলা যাচ্ছে। ভবিষ্যতই বলবে দামোদর পাড়ের বৃত্তান্তই তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত হয় কিনা?

টিকা: এই লেখায় নদী ও তার অববাহিকা প্রায় সমর্থক হয়ে গেছে। তাই পাঠকের সুবিধার্থে এটা বলে নেওয়া প্রয়োজন, যে লেখকের দৃষ্টিতে নদী কেবলমাত্র এক বিশেষ খাতে বয়ে যাওয়া জলধারা নয়, জলধারার সাথে সংযুক্ত এক বড় ভুখন্ড (নদীর অববাহিকা) নির্ভর গতিশীল উন্মুক্ত ব্যবস্থা যার কেন্দ্রে থাকে এই জলধারা।

তথ্যসূত্র:

১. The Relationship Between Energy and Capital: Insights from The Wealth of Nations by Simon Mair, Review of Radical Political Economics, First published online November 27, 2024. 

২. Capitalism and the Curse of Energy Efficiency: The Return of the Jevons Paradox by Brett Clark, John Bellamy Foster and Richard York, Monthly Review, Vol. 62, No. 06 (Nov. 2010). 

৩. COLONIAL SCIENCE PRACTICES AND HISTORY OF COAL MINING IN INDIA by Biman Patra  & Dr. Manisha Singh, in AGPE THE ROYAL GONDWANA RESEARCH JOURNAL OF HISTORY, SCIENCE, ECONOMIC, POLITICAL AND SOCIAL SCIENCE, Feb. 2023

৪. COLONIAL SCIENCE PRACTICES AND HISTORY OF COAL MINING IN INDIA by Biman Patra  & Dr. Manisha Singh, in AGPE THE ROYAL GONDWANA RESEARCH JOURNAL OF HISTORY, SCIENCE, ECONOMIC, POLITICAL AND SOCIAL SCIENCE, Feb. 2023

৫. Damodar Valley Corporation, the Missed Opportunity by-Sujit Choudhury, Journal of Infrastructure Development, Sage Publications, 2011

৬. Development and Displacement in the Damodar Valley of India,  by Shatabdi Das by Mahanirban Calcutta Research Group, 2021

৭. Kuntala Lahiri-Dutt, Radhika Krishnan, and Nesar Ahmad, “Land Acquisition and Dispossession: Private

Coal Companies in Jharkhand,” Economic and Political Weekly XLVII, no. 6 (February 11, 2012), 41-42.

৮. Economic Profiles of Sikkim Vol-II by NEDFI, 2025

৯. No early warning system and insufficient dam safety turned Sikkim flood deadly by Simrin Sirur in Mongabay link https://india.mongabay.com/2023/10/no-early-warning-system-and-insufficient-dam-safety-turned-sikkim-flood-deadly/

(পত্রিকা ছাপতে যাওয়ার ঠিক আগে আগে খবর পাওয়া গেল অনুমিত এক আশঙ্কা-কথা: ৪ দিন উদ্ধারকার্য শেষে, সিকিমের নামচি এলাকায় ২৪ জুলাই, ২০২৬ অব্দি জল-বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ধ্বসে মৃতের সংখ্য দাঁড়িয়েছে ২৫।)