আলকাপ : মুর্শিদাবাদের এক বিলুপ্ত লোকসংস্কৃতি

বাংলা বিহার ওডিশার একদা রাজধানী মুর্শিদাবাদ নানান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিশ্রণে সমৃদ্ধ এক জনপদ। তবে ঐতিহ্য মানেই তো অতীত থেকে বয়ে আসা ধারা। কালের প্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে সেই সব ধারার অনেক সংস্কৃতি সময়ের মরুপথে বিলীন হয়ে গিয়েছে। কোথাও কোথাও নুড়ি পাথরের ফাঁকে ঝিরি ঝিরি বহমান স্মৃতি ক্ষীণকায় ধারা নিয়ে আজও জেগে আছে।

আজকের প্রজন্মের কাছে, শুধু আজকের কেন, যাদের বয়স ৪০ এর আশেপাশে তাদের সামনে আলকাপ, পঞ্চরস, গম্ভীরা, ভাদ্র মাসের কাহানী কথকতা, জারি গান, সারি গান, রায়বেঁশে, বোলান গান, মুসলিম  বিয়ের গীত, মহরমের কাসিদ, লাঠিখেলা ইত্যাদির কথা বললে তারা অবাক চোখেই তাকিয়ে থাকবে —  এসব যেন কবেকার প্রাগৈতিহাসিক ব্যাপার। এসবের মধ্যে যেগুলি যুগের ধারার সাথে তাল মিলিয়ে নিজস্ব মনোরঞ্জনী ক্ষমতা বজায় রাখতে পেরেছে, সেগুলি এখনো বেশ বহাল তবিয়তে জাগ্রত আছে। বাউল ফকিরদের গান, ঝুমুর গান, ভাদু, টুসু, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া প্রভৃতি গানের জগতটা সময়ের সাথে নিজেকে আধুনিক চেহারায় বদলে নিতে পেরেছে।

ফলে শুধু বহমান নয়, এই গান-বাজনার পুরনো সংস্কৃতিগুলি নবরূপে শক্তি সঞ্চয় করে তাদের ঐতিহ্যকে আধুনিকতার মোড়কে সাজিয়ে নিতে পেরেছে। মুর্শিদাবাদের বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি সমূহের প্রতিটিই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য। তাদের মধ্য থেকে  বিনোদনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী  লোকনাট্য ‘আলকাপ’ সম্পর্কে কিছু পরিচিতি, এখানে, এই নিবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আলকাপ 

প্রসঙ্গত বলা— আজকাল ‘ডিসক্লেমার’ বলে একটা শব্দের  বেশ চল হয়েছে, যার অর্থ তথ্যগত ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে আগে থেকে একটা স্বীকারোক্তি করে রাখা —  ঠিক যেন আগাম জামিন নিয়ে রাখা। সেই প্রথা মেনে উল্লেখ করে রাখি —লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা, পড়াশোনা, অধ্যাপনা এসব কোনো কেতাবি বিদ্যেই আমার নেই। সত্তর আশির দশকে মুর্শিদাবাদের গ্রামীণ জীবনে কৈশোর যৌবন উত্তীর্ণ সময়কালে চারিপাশে ঘটতে দেখা সেই সময়ের লোকসংস্কৃতি, বিনোদনের উদযাপন এবং তার ক্রমশ ক্ষীণ  হতে থাকা দৃশ্যাবলীর স্মৃতি থেকে তুলে আনা কিছু বিবরণ এখানে উল্লেখ করব। যা হারিয়ে যায় তাকে আগলে বসে থাকা যায় না সে কথা ঠিক, কিন্তু একদা সমৃদ্ধ কী কী সম্পদ আমাদের ছিল যা কালের প্রবাহে হারিয়ে গিয়েছে —সেগুলি জেনে রাখা ও মনে রাখা দুটোই দরকারি।

মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও নদীয়ার উত্তরাংশ জুড়ে একদা ভীষণ জনপ্রিয়, বলা ভালো লোকবিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই লোকনাট্য আলকাপ। সেকালে গ্রামীণ জনজীবনে অবসরকালীন গানবাজনার চর্চা, অভিনয় ইত্যাদি সৌখিনতা আবর্তিত হতো আলকাপকে ঘিরে। লোকনাট্য হিসেবে আলকাপ শব্দটি  যথেষ্টই সুপরিচিত। এই বিষয় নিয়ে অনেক লেখালেখি ও চর্চা হয়েছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ স্বয়ং আলকাপ থেকে উঠে আসা মানুষ। যৌবনে অনেকটা সময় তিনি আলকাপ লোকনাট্যের দলে যুক্ত থেকেছেন, অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন, দলে মাস্টারিও করেছেন। 

আলকাপ দলের নেতা অভিনেতা সকলেই খুব কম লেখাপড়া জানা মানুষ। বলতে গেলে দুতিন জন ছাড়া প্রায় সকলেই অক্ষরবিহীন। এরই মধ্যে মুস্তাফা সিরাজের মতো শিক্ষিত,  শিল্প-প্রতিভাসম্পন্ন এবং অভিজাত পরিবারের সুদর্শন যুবক আলকাপের দলে যোগ দিলে অল্পসময়েই দলের মাস্টার হয়ে উঠবেন— তাতে আশ্চর্য কী?  আলকাপ জীবনের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি  ‘মায়ামৃদঙ্গ’ নামে এক অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন। খুব নিপুণ ও সুচারুভাবে আলকাপের যাপনচিত্র এবং  অন্দরমহলের কথা তুলে ধরা হয়েছে এই জনপ্রিয় উপন্যাসে। তাঁর অন্যতম অনুজ কবি সৈয়দ খালেদ নৌমান সহ লোকসংস্কৃতির অনেক লেখকই আলকাপ নিয়ে নানান দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা ও লেখালেখি করেছেন।  

       যেকোনো জনপদের ভৌগোলিক চরিত্র তার লোকসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। মুর্শিদাবাদ জেলার ভৌগোলিক প্রকৃতি আড়াআড়ি বিভক্ত। ভাগিরথীর পশ্চিম পাড়টি রাঢ় এলাকা, মাটি শক্ত, প্রকৃতি রুখুসুখু। পুব দিকটি পলিমাটি এলাকা। খাল বিল জলাভূমির আধিক্য। প্রকৃতি তুলনামূলক অলস, ঢিলেঢালা। আলকাপের সমৃদ্ধি রাঢ় এলাকায় বেশি হলেও সারা জেলাতেই এর ব্যাপক চর্চা চলত। রাঢ় এলাকায় বর্ষা নির্ভর ধানের চাষই ছিল মুখ্য। ফলত ভাদ্র মাসে ধান ওঠার পরে মানুষের হাতে থাকত অখণ্ড অবসর। আশ্বিন মাসে উৎসবের  মরশুম থেকে চৈত্রের মাঠে চৈতালীর ফসল ওঠা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় মেলা খেলা উপলক্ষে আলকাপের আসর বসত। তিন রাত, চার রাত থেকে সাত রাত পর্যন্ত কোনো দল বায়না পেতো। একটু বিস্তারিত বিবরণে আসি। 

আলকাপ ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি লোকনাট্যের আসর। কোনও একটা প্রচলিত বা আধা প্রচলিত কাহিনীকে মাঝখানে রেখে অভিনয় চলতে থাকে। সঙ্গে থাকে গান, গানের সঙ্গে নাচ, আর আসর জমানো রঙ্গ তামাশার কাপ বা কৌতুক দৃশ্য। প্রায় সারারাত ধরেই আসর চলতে থাকে। সন্ধ্যাবেলা খেয়েদেয়ে লোকজন ভিনগায়ে আলকাপ দেখতে বের হয়। সারারাত আর যাবে কোথায়— সামিয়ানার নিচে উন্মুক্ত চটের উপরে হয়তো এক ঘুম মেরে দিল। আবার যখনই বায়া-তবলায় জোরদার ধাঁই ধপাধপ্ বোল উঠবে, ঝাঁঝর ও করতালের ঝমাঝম আর গলা ফোলানো কাঁসর বাঁশির ভেপু বাজার সঙ্গে মঞ্চ কাঁপিয়ে গান আর নাচ শুরু হবে— তখন আরেকবার জেগে ওঠা। ভোরের আযানের সাথে আকাশ ফর্সা হয়ে গেলে আসরের সমাপন। আপন আপন ঘরে ফেরা।  

ওই যে ‘কাপ’ কথাটা, অর্থাৎ রঙ্গতামাশার কৌতুক দৃশ্য, সেখান থেকেই আলকাপ নামের উদ্ভব বলে অভিজ্ঞরা বর্ণনা করেন। বোঝাই যায়, কপট অভিনয় অর্থাৎ কাপট্য থেকেই কাপ কথাটি এসেছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমক্লান্ত মানুষজনকে রঙ্গতামাশার মাধ্যমে বিনোদন প্রদান করা। হ্যাঁ, নাটকের একটা কাহিনী থাকে। যেমন মনসা ভাসান, সতী রূপবান, সাবিত্রী সত্যবান, মধুমালা, বেদের মেয়ে ইত্যাদি ছাড়াও রোম শাহাজাদী শীত-বসন্ত ইত্যাদি রূপকথা ভিত্তিক কোন কাহিনী। চিৎপুরের যাত্রাদলের মতোই আলকাপের একজন অধিকারী বা মালিক থাকেন। দল গঠন করা, তার দেখভাল করা, সাজ-সরঞ্জাম কেনা, ছোকরাদের খাতির তদবির করা ইত্যাদি মুখ্যত সবই তাঁর  সৌখিন নেশা। মাঠ-ঘাট সংসার নিয়ে উদাসীন, ঘরে অশান্তি, তবু তিনি এই নিয়েই মত্ত। বাকি গানবাজনা অভিনয় দেখাশোনা, মঞ্চে আসর চালানো ইত্যাদি দায়িত্ব নিয়ে যিনি থাকেন তাঁকে সবাই মাস্টার বলে। ছোকরা ও অন্য কুশীলবদের হারমোনিয়াম ধরে তিনি গান শেখান, কাহিনীর সংলাপ সাজিয়ে দেন। কখন গান হবে, কখন কাপ হবে, কাপের বিষয় কী হবে এসব মাস্টারই ঠিক করে দেন। এই ঠিক করে দেওয়া মানে লিখিত কিছু নয়, আসরের আগে কুশীলবদের ডেকে ব্যাপার গুলো মুখোমুখি বুঝিয়ে দেওয়া। লেখাপড়া জানা মানুষই তো নেই, সেখানে সংলাপ কে আর লিখে রাখবে। ফলে প্রায়শই দেখা যেত অভিনেতা এমন সংলাপ বলে ফেলেছে যাতে পুরো কাহিনীটাই বদলে যাচ্ছে। হয়তো যুদ্ধ হবার কথা নয়, অথচ সেনাপতি খবর দিল যে রাজ্যে আক্রমণ হচ্ছে। কিংবা গরিবের মেয়ের প্রেমে পড়ার জন্য রাজপুত্রের বিচার হচ্ছে, মায়ের কাতর আবেদনকে উপেক্ষা করে মুঘলে আজমের মতো ভীষণ কড়া মেজাজে ফাঁসির আদেশ দেবেন। তা না করে হয়তো রাজা দয়া পরবশ হয়ে ‘বেশ, তবে এই শেষবারের মতো’ বলে পুত্রকে ক্ষমা করে  বসলেন। দলের মাস্টার ভাবগতিক বুঝে কাহিনীর অভিমুখ ঘোরাতে মন্ত্রী কিংবা বিবেক নামক চরিত্রকে পাঠিয়ে দিলেন। মন্ত্রী হয়ত রাজাকে তাঁর  ন্যায় বিচারের কথা স্মরণ করিয়ে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করতে থাকলেন ফাঁসির আদেশ দিতে হবে। সে আদেশ দেবো কি দেবোনা, কী করে কথা ঘোরাবো সেসব কথা ভাবছেন — তাহলে কি আমার পুত্রকে ফাঁসি দেওয়া উচিত!  তাইতো,  আমি রাজা, আমার বিচারে পুত্র নাই, কন্যা নাই ইত্যাদি বলে এগোতে থাকলেন। তক্ষুনি হয়ত আবেগ উস্কে বিবেক গাইতে শুরু করলেন ‘না না না, পাখিটার বুকে যেন তীর মেরো না’ ইত্যাদি।

এই যে মঞ্চের কথা বলছি, সেটা হয়তো গোটা চারেক  চৌকি জোগাড় করে জোড়া দিয়ে উপরে চট বা কার্পেট জাতীয় কিছু বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। চারিপাশ খোলা। নিচে বাদ্যযন্ত্রাদি সহ মাস্টার ও কুশীলবরা বসে আছে। আসর ঝিমিয়ে পড়লে মাস্টারের নির্দেশে নায়ক হঠাৎই বলে উঠল, সখী একটা গান হয়ে যাক! ওমনি ছোকরা নায়িকা শুরু করে দিল ‘মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া, রঙ্গিলা দেশের নাইয়া’ কিংবা হিন্দি ফিল্মের একটা জম্পেশ গান ‘শুনো চম্পা শুনো তারা, কই জিতা কই হারা’। বাজনার ঝমাঝমে উত্তুঙ্গ নাচ— আসর চাঙ্গা হয়ে উঠলো। 

এই ছোকরা আসলে মেয়ে সাজা পুরুষ। অধিকারী মালিক অল্প বয়সী সৌখিন ছেলেদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে ধরে নিয়ে আসেন। মাস্টার তাদের গান শিখিয়ে নাচ শিখিয়ে ছোকরা তৈরি করতেন। এদের মধ্যে অনেকেই যথেষ্ট নিপুণ ও দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠত, খ্যাত হয়ে উঠত। কোথাও কোথাও শুধু  ছোকরার নামের আকর্ষণেই দর্শকের ভিড় জমতো। মাহাতাব, মোস্তাকিন প্রমুখ ছোকরাদের জনপ্রিয়তা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। জনপ্রিয়    মাহতাবকে আমরা যখন দেখি তখন তার একটু বয়স বেড়েছে। সে তখন একটু বয়সী, মায়ের বা রানীর ভূমিকায় অভিনয় করতো। কিন্তু মাস্টারের কায়দা কৌশলে তাকে কেন্দ্র করেই কাহিনী আবর্তিত হতো। সে যে আসলে একজন পুরুষ, প্রথম দেখার রাতে সেটা পাশের জন বলে না দিলে বুঝতেই পারিনি। শুনেছি বাজি ধরে চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোহন সিনেমা হলে লেডিসে টিকিট কেটে সে সিনেমা দেখে এসেছিল, কেউ ধরতে পারেনি।

       আলকাপে পালা শুরুর আগে ঘন্টাখানেক ধরে একটা ট্রেলার হতো। মুখ্যত স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, পরকীয়ার বিপদ ইত্যাদি রসাত্মক বিষয় থাকতো। পুজোর সময় মাহাতাবকে দেখেছি মহিষাসুরমর্দিনী করতে। অসুর নিধনে ত্রিশূল হাতে তার নৃত্য, মুগ্ধতা সৃষ্টি করা অপরূপ শৈলীর দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভাসে।  তবে ট্রেলারেরও আগে একেবারে শুরুটা কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবেই হতো। অধিকারী বা মাস্টার প্রথমে মঞ্চে উঠে স্বাগত নমস্কার দিয়ে দল ও পালা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেমে এলে চার-পাঁচ জন ( বা যে ক’জন আছে) ছোকরা ভদ্রস্থ শাড়ি পোষাক  পরে একসঙ্গে মঞ্চে উঠত — শুরু হতো আসর বন্দনা। একটি দুটি সাধারণ ভক্তিগীতি, যেমন ‘মাগো আনন্দময়ী নিরানন্দ কোরোনা’ ইত্যাদির সঙ্গে থাকত বন্দনার আসল বা বিশেষ গান। অনেক সময় দলের নিজস্ব বন্দনা রচিত থাকত। যেরকম কথা বা সুরই থাক,  আমরা কয়েকটা পদ প্রায় সব আসরেই কমন দেখতাম যেমন— উত্তরে বন্দনা করি হিমালয়ের চরণ, সেখানে কৈলাসে মহাদেব পার্বতীর বাস। দক্ষিণে সাগরের বন্দনা, সেখানে পাঁচ পীরের অবস্থান। পশ্চিমে মক্কা-মদিনা, ক্বাবা শরীফের প্রতি শ্রদ্ধা,  হজরত রাসুলের রওজা মোবারক, পূর্ব বন্দনায় কখনো জগতে আলো বিকিরণকারী প্রভাত, ভোরের আজান ইত্যাদি। বন্দনা শেষ হলে সুরের সামঞ্জস্য রেখে ওস্তাদদের চরণে প্রণাম জানিয়ে জয়ধ্বনি — জয় ওস্তাদ কাশেমের জয়, জয় ওস্তাদ ফটিকের জয়, জয় ওস্তাদ সিরাজ মাস্টারের জয়, জয় ওস্তাদ নইমুদিনের জয় এইরকম পরম্পরা ধরে বর্তমান ওস্তাদ, তাঁর ওস্তাদ, তাঁর ওস্তাদের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে তাঁরা আসর বন্দনা সমাপ্ত করতেন। এরপর সাধারণত কাপ্যালের প্রবেশ ঘটত। কিছু একটা হাস্যরসের বিষয় উত্থাপন করে আসরের মেজাজ হাল্কায় নামিয়ে আনার দরকার। হাঁকডাক করে অকারণে সখীদের ডেকে দু-একখানা গান হয়ত গাইয়ে দিলেন, নাচিয়ে দিলেন। শুরু হলো ট্রেলার। এইখানে বলে রাখি, উপরে যে ওস্তাদের যে পরম্পরা উল্লেখ করেছি, তা উদাহরণ মাত্র। সত্যিকারের নয়।

এই যে ট্রেলার, মূল পালার বাইরে হলেও এটাই ছিল দর্শকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এবং সে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত ‘কাপ্যাল’ এর ভূমিকা। হিন্দি সিনেমার জনি ওয়াকার, মেহমুদ বা আসরানিদের মতো ছিল এই কাপ্যালের ভূমিকা — মানুষকে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তায় বিনোদন যোগান দেওয়া। নামি ছোকরা অপেক্ষা নামী কাপ্যালের আকর্ষণ এমন কিছু কম ছিল না। বরং কোন কাপ্যাল দলে আছে সেটাও দর্শক আকর্ষণের অন্যতম কারণ হতো। ট্রেলারসহ সারারাত নানা কসরতে মানুষকে হাসিয়ে জাগিয়ে রাখাটাই ছিল তার কাছে চ্যালেঞ্জ। নায়ক ট্রেনে চেপে দূরে যাবে, স্টেশনে টিকিট কাটতে গিয়ে কাউন্টারে হয়ত দরাদরি করছে। কিংবা সেলুনে দাড়ি কাটার পরে আস্ত একটা ইঁট গালে ঘষতে যাচ্ছে, বলে ফিটকিরি নাই, তাই ইটকিরি— সেসব সংলাপ শুনে মানুষ হেসে গড়াগড়ি। তবে উল্লেখ করতেই হয়, এই ট্রেলারগুলির ভিতর দিয়েই আলকাপ মাস্টার ও তাঁর টিমের মননশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটতো। রঙ্গব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে সমাজের নানান অনাচার, দুর্নীতিকে তীব্র কষাঘাত করা হতো। দারোগার ঘুষ খাওয়া, উলটে কেস দেওয়া, পাড়ার মোড়লের অন্যায় দাপট, শিক্ষিত বৌমার দাপট, স্টাইলিশ স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদিকে হাস্যরসের মোড়কে উলঙ্গ করে তোলা হতো। পাশাপাশি নারীর স্বাধীনতার গুরুত্বকেও তুলে ধরা হতো। আর শুধু তো সংলাপ নয়, গানের যোগান থাকতো ভিতর ভিতর। মাস্টারেরা সেসব গান রচনা করে দিতেন। আমাদের পাড়ার আলকাপ দলের মাস্টার আয়েজ সরকারের শেখানো গানের ক’লাইন মনে পড়ছে। শিক্ষিত আধুনিকা স্ত্রী স্বামীকে জানাচ্ছে —

‘স্বামী গো, আধুনিকে তুমি আমি এক সমান।

আবার, ধর্ম কর্ম বুদ্ধি সাহস,  মূর্খ নই হচ্ছি বিদ্বান।

আধুনিকে তুমি আমি এক সমান।’

কথায় কথায় স্ত্রী তুলে ধরছে যে সারাদিন ঘরের যে সমস্ত কাজ তাকে করতে হয়, তার মজুরি হিসেব করলে স্বামীর চেয়ে বেশি। স্বামী খোঁটা দেয়—

‘শুনো রে নির্লজ্জ নারী বুদ্ধি সাহস খুব ভারী

পরকে নিয়ে থাকো মেতে হয়েও তোমরা কুমারী।’

স্ত্রী বলে—

‘বিয়ের বৌ পায়না খেতে খেয়াল তোমার নাই সেটা,

আবার বিয়ে করতে ছোটো পুরুষের মুখে ঝাঁটা’

ইত্যাদি। 

নব্য পঞ্চায়েতী রাজ এসেছে। গ্রাম্য সাধারণ মানুষ অঞ্চল প্রধান হয়েছে— তাদের নানা রকমের দায়িত্ব আর বিড়ম্বনার ফাঁকে দুর্নীতি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলি নিয়েও মজাদার দৃশ্য রচনা হতো। সেই অর্থে আলকাপে সমাজের নানান দিকের নোংরামি ও অনাচারের দিকগুলির একটা চিত্র ফুটে উঠত।

আলকাপের নাট্য রীতি নিয়ে  বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও আলোচনা হয়েছে।  ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে (সম্ভবত ১৯৮২) সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আলকাপের নাট্যরীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আলকাপকে তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য ধারার থার্ড থিয়েটারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দর্শক যখন বুঝতেই পারছে যে আমরা রাজা-রানীর অভিনয় করছি, সত্যিকারের রাজা রানী নই — তাহলে সত্যিকারের রাজা-রানীর মতো হুবহু সাজ-পোশাক পরতে হবে কেন?  এতো মেকআপই বা করতে হবে কেন। পোষাক-আশাক, অডিটোরিয়াম ভাড়া, আলোকসজ্জা ইত্যাদির জন্য এতো খরচাপাতির আদৌ কী দরকার— মিনিমাম ব্যবস্থা হলেই তো হলো। থার্ড থিয়েটারের এই আধুনিক  উপস্থাপনা ছিল বাহুল্য বর্জিত। মঞ্চের দরকার নেই।  বাজারে, মেলায় বা রাস্তার মোড়ে খানিকটা ফাঁকা জায়গা গোল করে দখল করে নিলেই হলো। এখনই যে ছিল সাধারণ প্রজা, খানিক পরে সেই হয়তো রাজার ভূমিকা অভিনয় করছে। খানিক আগে ছিল দাসী, সে এখন হয়তো রানী। খুব বেশি হলে একটা রঙিন ওড়না জড়িয়ে নিয়েছে গায়ে। বিংশ শতকের শেষার্ধে এসে মুখ্যত বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের পথ ধরে এদেশে থিয়েটারের রীতিতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল— গ্রাম বাংলায় আলকাপ লোকনাট্যের রীতিতে বহুকাল আগে থেকেই সেই রীতি প্রচলিত ছিল। সত্তরের দশকে বাদল সরকার এই নতুন নাট্যরীতি প্রয়োগ করে শহুরে রুচির প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ধারাটাকেই বদলে দিয়েছিলেন। কম খরচে, কম ঝামেলায় বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। নাটকের ভাষায় দেশ, সমাজ ও লোকশিক্ষার বার্তা মাঠ-ঘাটের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

পেশাদার মঞ্চ ছেড়ে সত্তর দশকের শুরুতে বাদল সরকার তাঁর ‘শতাব্দী’ নাট্যদল নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় নেমে এলেন। ধর্মতলার মোড়ে কার্জন পার্কে তাঁর নাটকের অভিনয় শুরু করলেন। লিখিত স্ক্রিপ্ট একটা আছে বটে, কিন্তু কুশীলবরা যখন তখন সেখান থেকে সরে যাচ্ছে, নাটকের গতি বজায় রেখে নিজেরাই কিছু দৃশ্য রচনা করে ফেলছে—একেবারে আলকাপেরই প্রতিচ্ছবি। আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, সংলাপের ভাষা অপেক্ষা শরীরী ভাষার প্রয়োগ বেশি। আলকাপে যেমন হতো, জঙ্গলের পথে নির্বাসিত রাণী বা রাজকন্যা হেঁটে চলেছে, চারিপাশে কয়েকজন গামছা নিয়ে দুহাত তুলে বন-বৃক্ষের দৃশ্য রচনা করছে। তোরণ দিয়ে রাজা প্রবেশ করছেন— দুজন সেপাই হয়ত হাত দিয়ে বা দুখানা লাঠি আড়াআড়ি ধরে ফটক বানিয়ে নিচ্ছে। ঝড় উঠেছে, নৌকা টালমাটাল, দুহাত উপরে তুলে একাৎ ওকাৎ হয়ে মঞ্চ জুড়ে ঝড়ের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলছে। এসবে শরীরের কসরতও কম হতো না। যুদ্ধোত্তর বিশ্বের বহু দেশেই নাটককে মঞ্চের বাইরে সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনার নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল। নিউইয়র্কের বিশিষ্ট  নাট্যতাত্ত্বিক রিচার্ড শেখনার এই ধারায় বেশ খ্যাত হয়েছিলেন। বাদল সরকার তাঁর কাছে গিয়েও বেশ কিছুদিন ছিলেন। ফিরে এসে এই রীতি নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন   দর্শক-সাধারণের ভিতরে গিয়ে, তাদেরকেও নাটকের সঙ্গী করে নেবার পথ খুঁজেছেন। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘মিছিল’, ‘ভূমা’ প্রভৃতি নাটক একসময় সাড়া জাগিয়েছিল। 

তবে সে যাইহোক, থার্ড থিয়েটারের এই রীতি শহুরে শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল। উদ্দেশ্যও ছিল সেইরকম। এতো খুঁটিনাটি ব্যাখ্যানের মূল উদ্দেশ্য যে কথা বলার জন্য, তা হলো — বহু দেশ ঘুরে বহু চিন্তন দিয়ে বাদল সরকার, সফদার হাশমি প্রমুখ বিশিষ্টজন যে তৃতীয় রীতির প্রয়োগ চালু করেছিলেন, অন্তত একশো-দেড়শো বছর আগে থেকেই মুর্শিদাবাদ ও তার আশেপাশে অশিক্ষিত সাধারণ লোকসমাজে তা প্রচলিত ছিল। বাদল সরকার এই লোকজ ধারা থেকেও প্রাণিত হতে পারেন। কারণ কিংবদন্তী ওস্তাদ  ঝাঁকসুর কল্যাণে আলকাপ তখন শিক্ষিত সুধীমহলেও বেশ পরিচিত। ওস্তাদ সিরাজ মাস্টারের ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসও ততদিনে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। 

      থার্ড থিয়েটারের অনেক গবেষণা ও ভাবনা চিন্তা করে আমদানি করা। কিন্তু  আলকাপের লোকজ নাট্যধারা আপন স্বাভাবিক পথেই সৃষ্ট এবং গতিমান ছিল। বাঁধাধরা কোনও স্ক্রিপ্ট নাই, থাকার কথাও নয়। লেখাপড়া জানা লোকই নেই তো স্ক্রিপ্ট কে লিখবে, আর কেইবা তা পড়বে।  তাৎক্ষণিক বোধবুদ্ধি দিয়ে একটা নাট্যদল সারারাত ধরে দর্শকের উপজীব্য দৃশ্য রচনা করে চলেছে — এখানেই তো এই শিল্পটির অনন্যতা। রাজা হয়ত হঠাৎ মঞ্চ থেকে ‘সেনাপতি, সেনাপতি’ বলে হাঁক দিয়েছেন। আগাম প্রস্তুতি নেই, তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে একজন কোমরে গামছা বেঁধে তাতে একটা লাঠি (তরোয়াল) গুঁজে নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করল — আজ্ঞে মহারাজ! রাজা হয়তো গামছাকে পাগড়ীর মতো  করে মাথায় বেঁধেছেন, কারো কাছ থেকে একটা শাল চেয়ে নিয়ে উত্তরীয়ের মতো কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছেন। কোমরে একটা বন্ধনী দিয়ে কিছুটা রাজকীয় আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছেন। অবশ্য এগুলি নিছকই দারিদ্র্যজনিত কারণে, কোনো দার্শনিক নাট্যরীতির তত্ত্ব-টত্ত্ব নেই। কিন্তু সাধারণ  কুশীলবদের যতই পারিপাট্যের অভাব থাকুক — নায়ক-নায়িকাকে অনেকটা কেতাদুরস্ত করে মঞ্চে তোলা হতো। নায়িকারূপী পুরুষেরা শাড়ি-ব্লাউজ স্নো-পাউডার লিপস্টিক আর চুলের বাহারে লাস্যময়ী সেজে যে ভঙ্গিমায় কথা বলত, নাচত, গাইত— তাতে মেয়েরাও অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখত। তাদের নারীসুলভ আচরণের অদ্ভুত প্রকাশ দেখে বহু ক্ষেত্রে নায়ক অপেক্ষা নারী-সাজা ছোকরা পুরুষটির প্রতি মহিলা মহলে আকর্ষণ বেশি দেখা যেতো। দিনের বেলা পাড়ায় বেরোলে মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরত, বিস্মিত চোখে দেখত —এই মানুষটিই কি কাল রাতের সেই সুন্দরী? এতো মেয়েলি ছলাকলা জানে!  প্রেমেও পড়ত কেউ কেউ। ফলে ভিনগাঁয়ে গান করতে গিয়ে ছোকরা আরেকটি বিয়ে করে ফেলেছে — এমন ঘটনাও ঘটে যেত। ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই দিনে পুরুষ রাতে নারীদের মনোজগতকে নিপুণ মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

তবু আলকাপ দলের কর্তাদের প্রধান সমস্যা ছিল এই ছোকরা নায়িকাদের নিয়েই। গরীব ঘরের ছেলে, উঠতি বয়স, দেখতে মন্দ নয়, শিখিয়ে দিলে গানটাও গাইতে পারে। বহু কষ্টে তাদের ধরে এনে শেখানো পড়ানো, জামা-কাপড় কিনে দেওয়া, পান-বিড়ির হাত খরচ দেওয়া, রাতের পর রাত রিহার্সালে নাচ শেখানো হলো।  কালি পুজোর বায়নাতে কয়েক জায়গায় সফলভাবে আলকাপের আসরও হয়ে গিয়েছে। মানুষজনের কাছে দলের পরিচিতি হচ্ছে। এমন সময়    হঠাৎ হয়তো ছোকরা বেঁকে বসল— আমি আর মেয়ে সাজব না। বাবা-মা, পাড়ার অভিভাবকগণ কিংবা মসজিদের ইমাম-মৌলানাদের পক্ষ থেকে নিন্দামন্দ শুনতে হচ্ছে, বাধা আসছে। প্রথম প্রথম মঞ্চের নেশায় আগ্রহ নিয়ে মেয়ে সেজে নাচগান করেছে। এবার পরিচিতি বাড়লে চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা বাধাকে হয়ত আর উপেক্ষা করে উঠতে পারছে না।  শুধুমাত্র একজন ছোকরা বেঁকে বসার জন্য চালু একটা আলকাপের দল বসে গিয়েছে— এমন ঘটনা হামেশাই ঘটত। কিন্তু নেশাগ্রস্ত এই ‘গেনে’ মাস্টাররা হাল ছাড়তেন না। আবার শুরু হলো এই গ্রাম ওই গ্রাম ঘুরে ছোকরা জোগাড় করা।  আবার রিহার্সাল, আবার তাদের তদবির তোষামোদ।

এই ঘটনার উদাহরণ দিতে নেহাৎ ব্যক্তিগত হলেও তদানীন্তন রাণীনগর থানায় আমাদের বিষ্ণুপুর গ্রামে গজিয়ে ওঠা আলকাপ দলের কথাই অল্প করে বলি। খুবই ছোটোখাটো দল, নামডাক হয়ে উঠতে পারেনি — মূলত স্থায়ী ছোকরা তৈরি না হবার কারণে। পাশের কলাগাছি গ্রামের আয়েজ সরকার গানের মাস্টার,  অসম্ভব নেশা। সেইরকম নেশাগ্রস্ত আমাদের গাঁয়ের জুবের আলি।  হারমোনিয়াম, তবলা, করতাল, তরোয়াল, অল্পস্বল্প পোষাক তার নিজের খরচে কেনা। পনেরো ষোলো বছর বয়সী হোসেন ও আকবর নামের দুটো ছেলেকেও যোগাড় করে ফেলেছিলেন। আয়েজ সরকার যত্ন নিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে অল্পদিনেই ওদের দুজনকে তৈরি করে ফেললেন। গলাটা মিষ্টি,  নাচেও সাবলীল। স্কুলপড়ুয়া আমি যতটা সম্ভব দলের সঙ্গে ঘুরঘুর করি। মুখ্য আকর্ষণ ছিল কোন ফাঁকে একবার হারমোনিয়ামটা বাজানোর সুযোগ পাব। আমার কাজ ছিল রেডিও শুনে নাচের উপযোগী গান লিখে আনা। আয়েজ সরকার সেগুলো আকবরদের শেখাতেন। ভালো ভাষা দেওয়া অভিজাত কিছু সংলাপ যোগানেরও দায়িত্ব পড়ত। যতদূর মনে পড়ে,  ‘অরুণ-শান্তি’ এবং ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ এই দুটো পালা আমাদের দলের রেডি ছিল। যখন দল বেশ গুছিয়ে উঠেছে, কয়েক রাত আসরও হয়ে গিয়েছে, এরকম সময় আকবর ও হোসেন দুজনেই বেঁকে বসল — চারিদিকে নিন্দে হচ্ছে, মেয়ে সাজাটা তাদের পৌরুষেও লাগছে, আর তারা গান করবে না। তাদের ফিরিয়ে আনা গেল না, দল বন্ধ হয়ে গেল। আয়েজ সরকার পরে ‘রাজলক্ষ্মী অপেরা’ নামে একটি পঞ্চরস দল তৈরি করেছিলেন।  যাইহোক, সবই আজ স্মৃতির খাতায় ঝুরঝুরে বিলীন হয়ে গিয়েছে, সেসব মানুষজনও কালের গহ্বরে বিলীন হয়ে গিয়েছেন। তবে বহু আকর্ষণের  হারমোনিয়ামটা হারায়নি।  দখলীস্বত্ব হিসেবে সেই সব দিনের স্মৃতি আগলে এখনো সেটি আমার কাছে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে।

সাধারণত ভাদ্র মাসের ধান কাটাকাটি শেষ হলে আলকাপের দল নতুন উদ্যমে  আয়োজন শুরু করে।  একদিকে মাঠের কাজকর্ম কমে আসে, বিনোদনের অবসর মেলে। আরেকটা কারণ, ধান ঝাড়াই মাড়াইয়ের জন্য গ্রামের আশপাশে উপযুক্ত জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে খলেন বানানো হয়। সান্ধ্যকালীন রিহার্সাল আয়োজন করার আদর্শ জায়গা। তাই ভাদ্রের খলেনেই নতুন বছরে আলকাপের রিহার্সাল শুরু হয়। সন্ধ্যাবেলা সেই রিহার্সাল আসরের আকর্ষণও কম নয়। লোকজন সেখানেও বেশ ভিড় জমায়। হারমোনিয়ামে সুর উঠছে, তবলায় বোল উঠছে। মাসখানেক পরেই পুজোর মরশুম, উৎসবের মেজাজ। বিভিন্ন জায়গা থেকে বায়না আসবে। ভিনগাঁয়ের কালী পুজোয় সাত রাতের বায়না পেয়ে দশ-বারো জনের দল নিয়ে বারোয়ারি মণ্ডপে মাস্টারের আস্তানা। দিনের বেলা অনেকে বাড়ি গিয়ে মাঠ-ঘাটের কাজ সেরে বিকেলে আবার দলে এসে যোগ দেয়। ষাট-সত্তরের দশকে আলকাপের দলগুলিতে দেখতাম হিন্দু-মুসলমানের অবাধ অংশগ্রহণ। সাধারণত নিম্নবর্গের এবং তুলনামূলক দরিদ্র পরিবারের মানুষজনই আলকাপের দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। ওর ভিতরেই হিন্দু-মুসলমানে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কিছু বাছবিচারও চলছে। কিন্তু সেসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই, কারো কিছু যায় আসে না, ওগুলো অত্যন্ত  স্বাভাবিক ব্যাপার। অথচ শোওয়া-বসা, বন্ধুত্ব, ঝগড়া সব মিলেমিশে চলছে। আলকাপের কিংবদন্তী সম্রাট ঝাঁকসুর দলে অধিকাংশই ছিল মুসলমান। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ নিজেই তাঁর বাড়িতে কাটিয়েছেন অনেকদিন। ঝাঁকসু ওস্তাদ মণিরুদ্দিনকে নিজের গুরু মানতেন।

উপসংহার টানার আগে ঝাঁকসুর জীবনকথা উল্লেখ না করলে পুরো আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উত্তর মুর্শিদাবাদের রাঁঢ় ঘেঁষা জঙ্গীপুরের ধনপতনগর গ্রামের  বাসিন্দা ধনঞ্জয় সরকার ওরফে ঝাঁকসু ছিলেন অন্ত্যজবর্গীয় চাঁই সম্প্রদায়ের মানুষ। দল পরিচালনা, গান রচনা, কাহিনীতে নাটকীয়তা সৃষ্টি এবং অভিনয়ের বিস্ময়কর দক্ষতা ছিল তাঁর। সেই কালে আলকাপের অনেক মাস্টার মুখে মুখে গান রচনা করতেন, সুর দিতেন, মঞ্চে গাওয়াতেন। নারী বনাম পুরুষ, সোনা বনাম লোহা, কর্মকার-স্বর্ণকার, সেকাল-একাল ইত্যাদি পাল্লা দেওয়া তরজা লড়াইয়ের গান বা তার রূপরেখা তাঁরা রচনা করে দিতেন। শ্রোতাদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত। ৫০-৬০ এর দশকে ঝাঁকসুই ছিলেন আলকাপ জগতের সম্রাট, একচ্ছত্র অধিপতি। তার আগে আলকাপ স্থানীয় স্তরে নিম্নরুচির বিনোদন হিসেবেই প্রচলিত ছিল। ঝাঁকসুই বলতে গেলে আলকাপকে অনেকটা পরিকল্পিত ভাবে শিল্পমণ্ডিত এবং রুচিসম্মত করে তোলেন। 

মুস্তাফা সিরাজের মতো সুশিক্ষিত একজন প্রতিভাবান এই দলে ছিলেন। দলে গানের সঙ্গে তিনি বাঁশি বাজাতেন যা আলকাপের আকর্ষণকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ক্রমে তিনি নিজেও  সিরাজ মাস্টার নামে এলাকায় পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।  আমরা অনেক পরে বুঝেছিলাম ওদিকের লোকে যাকে সিরাজ মাস্টার বলত, তিনিই প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। 

ঝাঁকসুর আলকাপ-জীবন এবং তাঁর মননের টানাপোড়েনকে জীবন্ত রূপ দিয়েছেন তিনি তাঁর ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসে। সিরাজের ভাষায় বলতে গেলে — ছিঃ-ঘেন্না করা নিম্নরুচির আলকাপকে একটি রুচিশীল শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন ওস্তাদ ঝাঁকসু।  ঝাঁকসুর দল এসেছে শুনলে লেখাপড়া জানা শহুরে শিক্ষিত বাবুদেরও ভিড় জমতো। 

সত্তর দশক পর্যন্ত আলকাপের রমরমা চলেছে। সেইকালে মুর্শিদাবাদের প্রায় প্রতি এলাকাতেই খুচরো ছোটোখাটো আলকাপের দল ছিল, যেমন আমাদের গ্রামে। এরা দু-পাঁচ বছর চলত, তারপর নানা কারণে বসে যেত। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু  দল ছিল যাদের নাম দূরদূরান্তের মানুষও জানত। সব দলের গান শোনার সুযোগ ঘটেনি, কিন্তু মর্যাদার সাথে যাদের নাম শোনা যেতো সেইরকম কিছু ওস্তাদের নাম উল্লেখ করি, পরবর্তীতে এদের নামও আমরা ভুলে যাব। জঙ্গিপুরে ঝাঁকসুর পাশাপাশি ওস্তাদ সুবল কানার দল, গোকর্ণে সিরাজ মাস্টার, সাগরদীঘির ওস্তাদ সুধীর দাস, সাগরদীঘির ওস্তাদ নইমুদ্দিন, হরিহরপাড়ার কাশেম মাস্টার,   ওয়াসেফ মাস্টার(নশিপুর), কুমনগরের মজিদ মাস্টার, প্রদীপডাঙার সামশের শেখ, সুপারিগোলার বিদু ওস্তাদ বা কালান্দার খাঁন, ইসলামপুর কলাডাঙার ওস্তাদ ফটিক মৈত্র, লালবাগের ওস্তাদ  বনমালী দাস,  ইয়াকুব মাস্টার(এলাহিগঞ্জ), পাতু ওস্তাদ (শিঙা),  ডোমকলের ওস্তাদ কালীপদ দাস, আফাজুদ্দিন ওস্তাদ (পিরোজপুর) ,   বহরমপুরের মতলেব ওস্তাদ (বেজপাড়া), নিয়ামত ওস্তাদ (উস্তিয়া), দৌলতাবাদের আমির শেখ, রানীনগর মালিপাড়ার খোদাবক্স শেখ, নওদার সারু ওস্তাদ — এরকম আরও অনেক ওস্তাদ বা মাস্টারের নামে আলকাপের দল বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, সবার নাম বোধহয় কেউ লিখে রাখেনি, আমাদেরও কানে আসেনি।

আশির দশকে কালের প্রবাহে আলকাপের কদর কমতে থাকে। প্রত্যন্ত মফস্বলে সিনেমা হলের প্রসার, ভিসিআর মারফত ক্যাসেটে সিনেমার প্রবেশ মানুষের বিনোদনের রচিকে বদলাতে শুরু করেছে। পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে শিক্ষার প্রসার, লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়ের বৃদ্ধি— তাদের  বিনোদনের রুচিতেও পরিবর্তন এসেছে। আর লেখাপড়ার সঙ্গে বেড়েছে ধর্মীয় বাধা নিষেধ—  বিশেষত মুসলিম সমাজে নাচ-গান অভিনয় করে বেড়ানো, ছেলে হয়ে মেয়ে সাজা ইত্যাদিকে নিকৃষ্ট, ধর্মবিরোধী কাজ বলে প্রচার বাড়তে থাকলো। স্বাভাবিক ভাবেই  আলকাপের আকর্ষণ ও গুরুত্ব কমে যেতে থাকল। আশির দশকের মাঝামাঝি এরকম সময়েই আলকাপ সম্রাট ঝাঁকসু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ঐতিহ্যবাহী আলকাপও যেন তাঁর সঙ্গে বিদায় নিল।

কালের নিয়মে আলকাপ তার জৌলুষ হারালো বটে, কিন্তু হারিয়েও যেন ঠিক হারালো না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চেহারায় পরিবর্তন এনে সে ‘পঞ্চরস’ নাম নিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করল। রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আমদানি হলো পেশাদারিত্বের। কলকাতার যাত্রাদলের মতো করেই সাজসজ্জা, বই ধরে তিন ঘন্টার পালা নামানো, ভাড়া করা পেশাদার বাজিয়ে, সর্বোপরি মঞ্চে সত্যিকারের মেয়েদের আবির্ভাব ঘটল।  শহরতলি ও গঞ্জ এলাকা থেকে কিছু মেয়ে গান-বাজনা ও মঞ্চে অভিনয়ের জন্য এগিয়ে এলো। এরা সবাই সাধারণ দরিদ্র ঘরের মেয়ে। সংসারে কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য কেউ কেউ সাহস করে মঞ্চে অভিনয় করাকে আংশিক পেশা হিসেবে গ্রহণ করল। আলকাপের দল একেবারে পেশাদার ‘পঞ্চরস’ নাট্যগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হলো। 

       আগের মতো আর মেলা খেলায় খোলা মঞ্চে চৌকি পেতে নাচগান নয়। রীতিমতো টিকিট কেটে প্যান্ডেলের ভেতর লাইট আর সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে সুন্দর করে সাজানো মঞ্চে ঘোষিত যত্রাপালা। চিৎপুরের যাত্রাদলের সাথে তফাৎ যা হলো —  আলকাপের ধরন ও রীতিনীতি অনেকটাই বজায় থাকল। আগের মতই ট্রেলার, ফিলমি গানের সঙ্গে নাচ, কমিকের কাপ ইত্যাদি গ্রাম্য রুচির বিষয়াদি থাকল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, একই মঞ্চে মেয়েদের পাশাপাশি আগের মতো ছোকরাদেরও উপস্থিতি রইল। আরও বড়ো ব্যাপার — অনেক কম খরচে কলকাতার দলের মতো যাত্রাপালা দেখার সুযোগ বাড়ল, তার সঙ্গে এতোদিনের গ্রাম্যরুচির স্বাদটাও বজায় রইল। হারিয়ে যাওয়া আগের আলকাপের মাস্টার-অধিকারীরাই এই পঞ্চরসে’র দল তৈরি করলেন। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁরা নিজেদের ধরনেও পরিবর্তন আনলেন।

কিন্তু সেই বা আর কতদিন। নব্বইয়ের দশকে গ্রামের ভিতরেও টিভির আগমন। তবু  ১০ থেকে ১৫ বছর,  অর্থাৎ নব্বই দশকের প্রায় পুরো সময় মুর্শিদাবাদ বীরভূমে পঞ্চরসের জমজমাট আসর বসার খবর পাওয়া যেতো। ক্লাব জাতীয় কিছু সংগঠন ব্যবসায়িক ভিত্তিতে আট-দশ রাত জুড়ে পঞ্চরসের আয়োজন করত। প্যান্ডেলের বাইরে খাবারের দোকান সহ মেলা বসত। সেখান থেকেও আয় হয়। তার সঙ্গে চলত জুয়া খেলা আসর। শোনা যায় এই জুয়াড়িরাই পঞ্চরস আয়োজনের অনেকটা অর্থের যোগান দিত। কিন্তু কালের প্রবাহের কাছে সবাইকেই হার মানতে হয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে আমূল বদলে দেওয়া টিভিও এখন জৌলুষ হারিয়েছে। বিংশ শতাব্দী শেষ হবার সাথে সাথে গ্রামীণ বিনোদনের বাজার থেকে  পঞ্চরসও সেকেলে কমদামি আকর্ষণহীন হতে হতে একসময় হারিয়ে গেল।  দ্রুত নগরায়নের ধাক্কায় শতাধিক বর্ষের ঐতিহ্যবাহী আলকাপ এবং তার পথবাহী পঞ্চরসের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটে গেল। 

শেষবেলায় আরেকবার সেই শুরুর কথাটি — যা হারিয়ে যায় তাকে আগলে রাখা অসম্ভব। তাকে জোর করে আগলে রাখার চেষ্টাও অর্থহীন। তবু আজ মনে হয় — সেইসব দিনগুলিতে শিক্ষা কম ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ ছিল, নগরায়নের জৌলুস কম ছিল, কিন্তু প্রতিবেশী মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছিল না। ধর্মীয় আচার নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিল না। পদে পদে ধর্মীয় বিধিনিষেধের নির্দেশিকা ছিল না, সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বড়োসড়ো কোনও প্রাচীর ছিল না। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষজন এই ধরনের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারত, যুক্ত হতো। চাষবাস ও মাঠ-ঘাটের সুখ-দুঃখের পাশাপাশি মেলা-খেলা, পুজো-পার্বণে বিনোদনও সবাই মিলে ভাগ করে নিতে পারত। না বললেও স্পষ্ট যে অধিকতর রক্ষণশীলতার ভিতরেও আলকাপের মতো লোকনাট্যের দলে মুসলমানের সংখ্যাধিক্য ছিল। অপরদিকে এই লোকনাট্যের মঞ্চায়ন বা উপস্থাপনও ছিল মূলত কালি পুজো উপলক্ষে বিভিন্ন বারোয়ারী মেলায়। এটাও উল্লেখ বাহুল্য যে মুসলমান প্রধান মুর্শিদাবাদে এইসব মেলায় দর্শনার্থীরাও সিংহভাগে ছিল মুসলমান। তারাও জানত এটা হিন্দুদের পূজা, ওদের প্রসাদ খেতে নেই, প্রতিমাকে নমো করতে নেই। এই বিপুল সহাবস্থানে নিজস্ব ধর্মীয় গণ্ডীর দূরত্ব ঠিকই ছিল, কিন্তু  আড়ালে কোনো বিদ্বেষ ছিল না। আলকাপ যারা করত আর যারা দেখত — তাদের মধ্যে ধর্মীয় পরিচিতি যে আদৌ একটা ভাবার বিষয়, সেই ভাবনাটাই তখন কারো মধ্যে দেখিনি— এখানেই আলকাপ লোকনাট্যের মহত্ত্ব।