শ্রমিক শোষণ বাড়ানোর জন্য চারটি শ্রম কোড

১০০ বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসে মার্কোজ লিখেছিলেন মানুষ শ্রমিকদের আন্দোলন ভুলে গেছে। আজ এই কথাটা ভীষণ ভাবে সত্যি হয়ে উঠেছে। তবে কথাটা আজ একটু অন্যভাবে সত্যি। রাষ্ট্র শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে।   চিনের খবর বাইরে বেরোন নিয়ে এত কড়াকড়ি সত্ত্বেও ২০১২ সাল নাগাদ আমারা জানতে পেরেছিলাম চিনে বছরে শ্রমিক বিক্ষোভের সংখ্যা গড়ে ২ লক্ষের উপর। তবু চিনে শ্রমিক বিক্ষোভের সংখ্যা কেউ না কেউ হিসাব করে রেখেছিল বলে আমার জানতে পারি। আমাদের দেশে সেইটুকু পরিসরও নেই যে শ্রমিক বিক্ষোভের পরিসংখ্যান জানা যাবে।  আমাদের দেশে বড় বড় শ্রমিক বিক্ষোভের খবরও দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয় না। হরিয়ানা, নয়ডা বা পানিপথের শ্রমিক আন্দোলনের খবর খবরের কাগজের হেড লাইন হয় না। আন্দোলনের বেশ কিছুদিন পর শ্রমিকরা পাল্টা মার শুরু করলে এবং রাষ্ট্র বর্বর ভাবে দমন শুরু করলে ভিতরের পাতায় খবর হয়। তাও এটা বলার জন্য যে শ্রমিক আন্দোলনের পিছনে শহুরে নকশাল বা পাকিস্তানের চক্রান্ত আছে। 

স্বাভাবিক ভাবে মনে হতে পারে কৃষি বিল নিয়ে এতবড় কৃষক আন্দোলন হল, অথচ শ্রম কোড নিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভ কেন হল না। তাই আজ মালিক পক্ষের স্বার্থে ভারত সরকার শ্রম কোড লাগু করতে পারল। বিষয়টা এভাবে দেখলে হবে না। আমরা ২০০৬-২০০৭ থেকে কোলিয়ারি ঠিকা শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়নের কাজকর্ম করছি। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভ হয়ে চলেছে।
শুধু আসানসোল দুর্গাপুরশিল্পাঞ্চলেই এই বছর মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত ২০টা জায়গায় ধর্মঘট হয়েছে। না জানা ধর্মঘটের বা শ্রমিক বিক্ষোভের সংখ্যাও রয়েছে। কিন্তু তা অবশ্যই শ্রম কোডের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে শ্রমিক আন্দোলন নয়। শ্রম কোডের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুধু মাত্র প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা এবং তার বাইরে আমাদের মত অসংখ্য তৃতীয় ধারার শ্রমিক ইউনিয়নের ছোট ছোট বিক্ষোভের স্তরে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল সরকার মুখে শ্রম আইনের বিরোধিতা করলেও শ্রম কোডের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের বিরোধিতায় পুলিশ নামিয়ে ধর্মঘট ভেঙ্গেছে। পশ্চিমবঙ্গে শ্রমকোড লাগু হাবার আগেই ১৫ বছর ইন্সপেকশন বন্ধ থেকেছে, ১২ ঘণ্টা কাজ করাচ্ছে, ন্যূনতম মজুরি পায় না, ২০১৬-এর পর ১০ বছরেও ন্যূনতম মজুরি বাড়ে নি। কোন সংসদীয় রাজনৈতিক দলই শ্রম কোডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নি বা তাদের ভোটের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইসু করে নি। 

পুরোন ২৯ টি শ্রম আইনের জায়গায় চারটি শ্রম কোড আনা হয়েছে। চারটি শ্রম কোড হল 

১। দি কোড অন ওয়েজ, ২০১৯ – মজুরি সংক্রান্ত কোড। 

২। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশান কোড, ২০২০- শিল্প সম্পর্ক কোড। 

৩। দি অকুপেশানাল সেফটি, হেলথ এন্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশান কোড, ২০২০ – পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের শর্ত সংক্রান্ত কোড।

৪। দি কোড অন সোসাল সিকিউরিটি, ২০২০ – সামাজিক সুরক্ষা কোড।

এই চারটি শ্রম কোডের আওতায় কোন ধরনের শ্রমিকেরা আছেন?

আমাদের দেশে শ্রমিকের বহু বিভাগ। মোটা দাগে সরকারি বিভাজন  অনুসারে তিন ধরনের শ্রমিক। 

১। সংগঠিত ক্ষেত্রের স্থায়ী শ্রমিক। 

২। সংগঠিত ক্ষেত্রের ঠিকা শ্রমিক। 

৩। অসংগঠিত শ্রমিক। 

সংগঠিত ক্ষেত্রের সংজ্ঞা পুরোন শ্রম আইন অনুসারে কোন কারখানা বা সংস্থায় ১০ জন শ্রমিক ও বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ২০ জন শ্রমিক ও বিদ্যুতের ব্যবহার নেই এই সব সংস্থা সংগঠিত ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে। বর্তমান শ্রম কোড অনুসারে সংগঠিত ক্ষেত্রের সংজ্ঞা বদলে হয়েছে কোন কারখানা বা সংস্থায় ২০ জন শ্রমিক ও বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ৪০ জন শ্রমিক ও বিদ্যুতের ব্যবহার নেই। 

সংগঠিত  ক্ষেত্রের ঠিকাদারদের ক্ষেত্রে পুরোন আইনে বছরের কোন একদিন ঠিকাদার ২০ জন বা তার বেশি শ্রমিক নিয়োগ করলে তবেই তাকে ঠিকাদার যে সংস্থায় কাজ করবে তার জন্য লেবার লাইসেন্স নিতে হবে ও শ্রমিক সংখ্যা উল্লেখ করতে হবে। ২০ জনের কম হলে কোন লাইসেন্স নিতে হবে না। নতুন আইনে এই সংখ্যাটা হয়েছে ২০ জায়গায় ৫০ জন শ্রমিক। উপরিউক্ত সংগঠিত ক্ষেত্রেও  ৫০ জন ও তার অধিক ঠিকাদারের শ্রমিক থাকলে সেই সংস্থার মালিক ও ঠিকাদারকে লেবার লাইসেন্স নিতে হবে এবং আইন অনুসারে তাদের শ্রমিক সংখ্যা সরকাররের কাছে নথিবদ্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের সব বিবরণ সহ রেজিষ্ট্রার, হাজরি খাতা রাখতে হবে ও পে-স্লিপ দিতে হবে। 

বাকি শ্রমিকেরা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক। এই অসংগঠিত ক্ষেত্রের মূল কথা হচ্ছে সরকারের কাছে বা মালিক, নিয়োগকর্তা বা ঠিকাদার কারও কাছে শ্রমিকদের নথিভুক্ত করার কোন আইনি বাধ্যতা নেই। পুরোন শ্রম আইনের সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরে অসংগঠিত শ্রমিক ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। নতুন শ্রম কোডে আমরা বুঝতেই পারছি সেই সংখ্যাটা আরো বাড়বে।

মজুরি সংক্রান্ত কোড সংগঠিত ও অসংগঠিত সব শ্রমিকদের জন্য: 

এই কোডে  শুধু ন্যূনতম মজুরি পাবার অধিকার, সপ্তাহের ৭ তারিখের মধ্যে আগের মাসের মজুরি এবং বোনাস পাওয়ার অধিকার এবং ব্যাঙ্কে পেমেন্ট করার কথা বলা আছে। পুরোন শ্রম কোডে শুধু সংগঠিত ও অসংগঠিত তালিকাভূক্ত (শিডিউলড) শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ছিল। অনেকে বাদ ছিল। যদিও নতুন শ্রম কোড দাবি করছে তারা সব ধরনের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করবে। আশ্চর্য পুরোনো আইনে এই শিডিউলড শ্রমিকদের বাইরে যারা ছিল তারা হল, গৃহ পরিচারিকা, সংবাদপত্রের কর্মী, সেলস ম্যান বা সেলস রিপ্রেজেন্টটেটিভস ও বর্তমানের গিগ শ্রমিকরা। মজুরি সংক্রান্ত কোডে শুধু সেলস ম্যান ও সংবাদপত্রের কর্মীদের শ্রমিক হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। তারা ন্যূনতম মজুরি পাবে। বাকি গৃহ পরিচারিকা ও গিগ শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত কোডে যুক্ত করা হয় নি। তাই তারা ন্যূনতম মজুরির আওতায় আসে নি। তাদের শ্রমিক হিসাবে গণ্যই করা হয় নি। 

  অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকেরা শিল্প সম্পর্ক কোড এবং পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত কোডের বাইরে। শুধু সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য এই কোড। শিল্প সম্পর্ক কোডে শ্রমিকদের ছাঁটাই, লে-অফ ক্লোজারের বিরুদ্ধে বিধি নিষেধ, নিয়োগের শর্ত, পে-স্লিপ পাবার অধিকার, ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে দ্বিগুণ ওভারটাইম পাবার অধিকার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং নিয়োগ কর্তা এই কোডের বিধি নিষেধ না মানলে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থার কথা বলা আছে। 

অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত নথিভুক্তির বিষয়টা বাদ গেছে।  প্রায় ৯০ শতাংশেরও অনেক বেশি অসংগঠিত শ্রমিক নিয়োগের শর্ত জানতে পারবে না। তারা জানতে পারবে না তাদের ন্যূনতম মজুরি বা নির্ধারিত মজুরি বা কাজের ঘন্টা কত। ফলে বোঝাই যাচ্ছে এই অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য মজুরি কোডে যে ন্যূনতম মজুরি পাবার অধিকার দেওয়া হয়েছে তা কতটা কার্যকর হবে! এতদিনের অভিজ্ঞতায় তা আমরা জানি।

পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত কোড: 

এই কোডে শ্রমিকের পেশাগত রোগ নিয়ন্ত্রণ, কাজের পরিবেশে সুরক্ষার ব্যবস্থা, সেফটি কমিটি, সেফটি অফিসার নিয়োগ, দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, কাজের ঘণ্টা বিষয়ে বিধি নিষেধের কথা বলা আছে। ২০ জনের কম শ্রমিক কাজ করে এমন লক্ষ লক্ষ সংস্থায় পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য বা কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেলে মালিকের কোন দায় নেই। কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত উপযুক্ত ব্যবস্থা যেমন বায়ু চলাচল, তাপ নিয়ন্ত্রণ, আলো, পানীয় জল, ক্যান্টিন, ক্রেশ, ড্রেন ইত্যাদির ব্যবস্থা থেকে ২০ জনের কম শ্রমিকের সংস্থার মালিককে ছাড় দেওয়া হল।

সামাজিক সুরক্ষা আইনের আওতায় লেখা হয়েছে সবার কথা:

কিন্তু অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে নির্মাণ কাজের শ্রমিক, অন্যান্য অসংগঠিত শ্রমিক ও গিগ কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের কথা বলা নেই। সংগঠিত ক্ষেত্রের স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের মত তারা প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশান ও গ্রাচুইটির আওতায় পড়বে না। কেন্দ্রীয় সরকার সময় সময় যেমন যেমন সামজিক সুরক্ষার প্রকল্প তৈরি করবে সেখান থেকেই এই শ্রমিকরা সুবিধা পাবে। 

এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধাভোগী হবার জন্য তাদের ডিজিটাল মাধ্যমে রেজিস্ট্রার করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে সমস্ত অসংগঠিত শ্রমিকদের নথিভুক্তকরণের কোনো ধারা চারটি শ্রম কোডের কোনোটাতেই নেই। শুধু বলা আছে সবাইকে নিয়োগ পত্র দিতে হবে। যে সংস্থায় ২০ জন ও তার বেশি শ্রমিক আছে তারা এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের আওতায় আসবে। যে সংস্থায় ১০ ও তার বেশি শ্রমিক আছে তারা এমপ্লইজ ইনসিওরেন্সের (ESI) আওতায় পড়বে। তবে বিপদজনক বা ঝুকিপূর্ণ কারখানায় একজন শ্রমিক থাকলেও ইএসআই-এর আওতাভুক্ত হবে। গ্রাচুইটি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা কারখানা, খনি, অয়েল ফিল্ড, বন্দরের সব শ্রমিক পাবে। শপস্ অ্যান্ড  এস্টাব্লিশমেন্টের আওতায় নথিভুক্ত সংস্থায় ১০ জন ও তার বেশি শ্রমিক থাকলে তারা গ্রাচুইটি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাবে। তার ফলে বহু শ্রমিক পিএফ ও ইএসআই-এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

পুরনো অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কাছে নতুন শ্রম কোডের এই পরিবর্তন কোন পরিবর্তন ঘটাবে না।  সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরে থাকা শ্রমিকরা নতুন শ্রম কোড নিয়ে চিন্তিত নয় বা চিন্তিত হবার কথাও নয়। আর বাস্তবত তারা বুঝতেও পারছে না এই নতুন শ্রম কোড কিভাবে তাদের আরও কোণঠাসা করবে। অসংগঠিত শ্রমিকদের লাইনে যুক্ত হবে পুরোন আইনে সুরক্ষা পাওয়া আরো বহু শ্রমিক। 

শ্রমকোডে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন  

ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট বা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক সংগঠিত ক্ষেত্রের ঠিকা শ্রমিকদের মধ্যে যারা স্থায়ী কাজ করে তারা ৯-এর  দশকের পর আর স্থায়ীকরণের সুবিধা পায় নি। কয়লা শিল্প, ইস্পাত, পেট্রলিয়াম শিল্প সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের জন্য নিষিদ্ধ কাজে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের ছাড়পত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে পেয়েছে। আমরা দেখলাম পানিপথের ইন্ডিয়ান অয়েলের সব শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিক। তাদের ক্ষেত্রে পুরোন শ্রম আইনও ভঙ্গ হয়েছে। বর্তমান শিল্প সম্পর্ক কোডে সব স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক যাকে আইনের ভাষায় ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট (fixed term employment )  বা নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক বলা হচ্ছে তাদের নিয়োগের ছাড়পত্র আইনেই পেয়ে গেল। চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে সে শ্রমিকদের মালিক আর নাও রাখতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিকদের চুক্তি সময় শেষ হলে কাজ থেকে বসিয়ে দিলে বা চুক্তি পুনর্নবিকরণ না করলে তা ছাঁটাই হিসাবে গণ্য হবে না। যারা এতদিন ঠিকা শ্রমিক বা ঠিকাদারের শ্রমিক ছিল তারা আসলে নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক ছিল। এবার প্রধান নিয়োগ কর্তা বা সংস্থা সরাসরি স্থায়ী শ্রমিকের বদলে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবে। ‘ease to doing business’ এর নামে স্থায়ী শ্রমিক বিষয়টাই উঠে গেল।

যদিও কোডে বলা হয়ছে মজুরি, ছুটি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা স্থায়ী শ্রমিকদের মত হবে। কিন্তু স্থায়ী শ্রমিক বিষয়টাই না থাকলে স্থায়ী শ্রমিকদের সমান মজুরির প্রশ্নই আসে না। আবার এটাও প্রচার হচ্ছে শ্রমিককে স্থায়ীভাবে নিয়োগের বাধ্যতা না থাকলে মালিক  বেশি শ্রমিক নিয়োগ করবে। 

আসল ঘটনা সব ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে ও একজন অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ক্ষেত্রের স্থায়ী শ্রমিকের থেকে দ্বিগুণ তিনগুণ কাজ করাচ্ছে। শ্রম কোডে মালিককে সুবিধা দিলে কর্মসংস্থান বাড়বে এমন মিথ্যা প্রচার ২০১৪ থেকে শুরু হয়েছে। স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের ছাড়পত্রই আসলে নতুন শ্রম কোডের মালিকের কাছে বিজেপি শাসিত সরকারের প্রধান উপহার।

ইন্সপেক্টরের বদলে ফেসিলিটেটর কাম ইন্সপেক্টর

এতদিন অসংগঠিত শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিক, স্থায়ী শ্রমিক এবং সে সব সংগঠিত শিল্পের শ্রমিকদের বেতন চুক্তি নেই তাদের ন্যূনতম মজুরি না দিলে, পে-স্লিপ না দিলে শ্রমিকদের অভিযোগ ছাড়াও লেবার ইন্সপেক্টররা নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিজে থেকে বিভিন্ন সংস্থায় তদন্ত করত। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে মালিকের বা ঠিকাদারদের জেল বা জরিমানার মত শাস্তির বিধান ছিল। মালিককে না জানিয়ে তদন্ত করার বিধান পুরোন আইনে ছিল।

বর্তমান আইনে শ্রমিকদের নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোন তদন্ত হবে না। নতুন কোডে এই ইন্সপেক্টররা ফেসিলিটেটর কাম ইন্সপেক্টর। প্রথমে ফেসিলিটেটরের কাজ মালিক ও শ্রমিক উভয়কে শ্রম আইন সম্বন্ধে সচেতন করা, মালিককে অনুরোধ করা সব আইন মানার জন্য। তারপরেও মালিকপক্ষ শ্রম আইন না মানলে তদন্ত করবে। পুরো প্রক্রিয়া খুবই জটিল। 

বর্তমান আইনে একজন শ্রমিককে অভিযোগ অনলাইনে জানাতে হবে। সেই শ্রমিক লেখাপড়া না জানলেও পয়সা খরচ করে কমপিউটার সেন্টার থেকে অভিযোগ জানাতে হবে। সেই শ্রমিকের আবার ফোন নম্বর ও ইমেল আইডি বাধ্যতামূলক। অন্যের দিলেও চলবে। কিন্তু তাকে পরের উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। তারপর দিল্লিতে চিফ লেবার কমিশনারের কাছে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সংস্থার নাম যাবে। আবার ডিজিটাল প্লাটফর্মেই তথ্য আদান প্রদান করে তদন্ত প্রাথমিক ভাবে চলবে। চিফ লেবার কমিশনার অনুমতি দিলে তারপর সেই সংস্থায় তদন্ত হবে। অনলাইনের বাধ্যতা বাদ দিয়ে এই পরিবর্তন শ্রম কোড লাগু হবার ১০ বছর আগেই হয়ে গেছে।  কোডের স্পিরিট, আগে ফেসিলিটেটর মালিককে সহায়তা করবে আইন সম্বন্ধে সচেতন করবে। কারণ মালিকরা আইন জানে না! সহায়তা করবে ইন্সপেকসানে যাবার আগে মালিককে তিনদিন আগে বাধ্যতামূলক চিঠি দিয়ে  জানিয়ে। অথচ শ্রমিকদের জানানোর বিষয়ে কোডে কিছু বলা নেই।  ইন্সপেক্টর কারখানা বা খনিতে গেলে শ্রমিকদের সেদিন কাজে আসা মালিক বন্ধ করে দেয়। শ্রমিকদের পে-স্লিপ না পাওয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালে মালিকরা ৫০০ জন শ্রমিকদের মধ্যে পাঁচজন শ্রমিকের জাল পে-স্লিপ নিয়ে এসে দেখিয়ে দেয়। আসানসোল রিজিয়নের কেন্দ্রীয় সরকারের হেড ডেপুটি চিফ লেবার কমিশনারকে আমাদের ইউনিয়ন থেকে পে-স্লিপ না দেওয়ার অভিযোগের উত্তরে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কয়লা শিল্প ইসিএল-এর কর্তৃপক্ষ তিনজন ঠিকাদারের জাল পে-স্লিপ আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। অভিযোগ জানালেও ঠিকাদার ও কোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি।

সবথেকে বড় কথা যে শ্রমিকরা মাত্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজে নিযুক্ত তার সব সময় ভয় থাকবে তার উপর অসন্তুষ্ট হলে মালিক তার সাথে পরের টার্মের কাজের চুক্তি করবে না। তার ফলে শ্রমিকরা অভিযোগ জানাতেও যাবে না। 

ধর্মঘটের অধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে শ্রমকোডে:

প্রথমে ওয়েজ সংক্রান্ত কোড, ২০১৯ শে বলা হয়েছে ১০ জন বা তার বেশি শ্রমিক তার সাথে মালিকের চুক্তি মোতাবেক বিনা নোটিশে একসাথে কাজে না আসলে বা কোন সংগত [ব্যাখ্যা নেই] কারণ না দেখাতে পারলে কাজে অনুপস্থিত দিনের মজুরির থেকে বেশি মজুরি কেটে নেওয়া হবে। সেই অতিরিক্ত মজুরি কাটার পরিমাণ আট দিনের মজুরির থেকে বেশি হবে না।  কোডে বলা আছে ধর্মঘট নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ব্যবস্থা, পুরোন আইনে শুধুমাত্র পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিসে বা জনস্বার্থে পরিষেবা যেমন জল সরবরাহ, হসপিটাল এবং সামরিক ক্ষেত্রে ধর্মঘটের জন্য আগাম নোটিশ দিতে হত। এখন সব কারখানা ও সংস্থায় আগাম নোটিশ দিতে হবে। কোন শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হতে পারবে না যদি

১। ধর্মঘটের দিনের ৬০ দিন আগে নোটিশ না দেয়,

২। নোটিশ দেবার ১৪ দিনের মধ্যে,

৩। নোটিশের ধর্মঘটের দিন পেরিয়ে না গেলে এবং

৪। মীমাংসা বা কনসিলিয়েশান চলাকালীন ও মীমাংসা প্রক্রিয়া শেষ হবার ৭ দিনের আগে।

লেবার কমিশনার বা নিয়োগ কর্তার অনুমতি ও সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে শ্রমিকদের ধর্মঘট। ধর্মঘটের নোটিশ দেওয়ার পর মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ছাঁটাই বা শ্রমিক বিরোধী কোন পদক্ষেপ নিলে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে পারবে না।

ছাঁটাই, লে-অফ ও ক্লোজার সহজে করতে পারবে

পুরোন আইনে যে সংস্থায় ১০০ জন বা তার থেকে বেশি শ্রমিক কাজ করে সেই শিল্পে শ্রমিকদের ছাঁটাই করতে হলে কিছু বিধি নিষেধ নিয়োগকর্তাকে মানতে হত।

১। কোন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আগে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার দ্বারা নির্ধারিত সরকারি প্রতিনিধির (appropriate government) কাছে লিখিত ভাবে আবেদন করে অনুমতি নিতে হত।

২। তিন মাস আগে শ্রমিককে নোটিশ দিয়ে জানাতে হত কেন ও কোন পরিস্থিতিতে তাকে ছাঁটাই করা হবে। শ্রমিককে ছাঁটাই-এর বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হত।

শিল্প সম্পর্ক কোডে ছাঁটাই এর ক্ষেত্রে শিল্পে শ্রমিক সংখ্যার সীমা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে। খুব কম সংস্থাতেই ৩০০ জন ও তার বেশি শ্রমিক রয়েছে। এই সংখ্যাটা স্থায়ী শ্রমিকদের। মালিক স্থায়ী শ্রমিকদের সংখ্যাই নথিভুক্ত করে। কোন কারখানায় ১০ হাজার ঠিকা শ্রমিক থাকলেও কোন একজন ঠিকাদারের অধীনে ৩০০ বা তার বেশি শ্রমিক থাকলেই সে ঠিকাদারকে ছাঁটাইয়ের জন্য এই বিধি নিষেধ মানতে হবে। অধিকাংশ সংস্থা বা খনিতে আজ বড় ঠিকা সংস্থা খুব কম স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ করে এবং পেটি ঠিকাদার দিয়ে কাজ করায়। তার ফলে কোন একজন ঠিকাদার বা নিয়োগ কর্তার অধীনে ৩০০ জন বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করে না। এর ফলে প্রায় সব সংস্থার মালিক শ্রমিকদের বিনা বাধায় স্থায়ী শ্রমিকদের ছাঁটাই করতে পারবে। 

আর ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্টের মাধ্যমে কত শ্রমিক নিয়োগ হবে তার কোন সীমা বলে দেওয়া নেই। লে-অফ  এবং ক্লোজারের ক্ষেত্রেও ৩০০ জনের কম শ্রমিকের নিয়োগকর্তা এই ছাড় পেয়েছে। কেন্দ্র বা কোন রাজ্য চাইলে বিশেষ পরিস্থতিতে শ্রমিক সংখ্যার সীমা ৩০০-এর থেকে আরও বাড়াতে পারে।

শ্রমিক ছাঁটাই-এর অবাধ ছাড়পত্র পাওয়ার ফলে শ্রমিকদের মালিক শ্রেণি যে কোন শর্তে কাজ করাতে বাধ্য থাকবে। শ্রম কোডে শ্রমিকদের যেটুকু অধিকাররে কথা বলা আছে তা শ্রমিকদের ধারে কাছেও পৌছবে না।

শ্রম আইন না মানলে মালিকের সাজার বদলে আগে জরিমানা পরে সাজা

শ্রম আইন না মানলে বা ন্যূনতম মজুরি না দিলে, পে স্লিপ না দিলে পুরোনা আইনে মালিকের  বিরুদ্ধে প্রথমেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যেত এবং এর ভিত্তিতে মালিককে জেল খাটতে হত। এখনকার শ্রম কোডে  মালিককে প্রথমবার তার ভুল শুধরে নেওয়ার  সুযোগ দেওয়া হবে। জরিমানা হবে। পরের বার সাজা হবে। ৫০ হাজার টাকা প্রর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে শ্রম কোড ভঙ্গ করলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে।

শ্রমিকদের যেহেতু কিছু সময়ের চুক্তিতে নিয়োগ হবে, স্থায়ী ভাবে কাজে নিয়োগ হবে না তাই প্রথম বারেই মালিক শ্রমিককে ছাঁটাই করে দেবে। নতুন শ্রমিক এনে তাকে বুঝিয়ে দেবে মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালে তার এই শাস্তি হবে। ।

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের এক জটিল প্রক্রিয়া

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ সংক্রান্ত নিয়মাবলি খুবই জটিল। এখন ঘণ্টা হিসাবেও ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হবে। ভৌগলিক অঞ্চলের বিভিন্নতা ও অঞ্চল ভিত্তিক জীবন ধারণের খরচের পার্থক্য বিচার করে অনেকগুলো ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হবে। আগে তিনটি অঞ্চলের জন্য তিন ধরনের ন্যূনতম মজুরি ছিল। নতুন কোডে তা তিনের থেকে বেশি হবে। 

তাছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য ফ্লোর ওয়েজ নির্ধারণ হবে। কোনো রাজ্য তার থেকে কম ন্যূনতম মজুরি ঠিকা করতে পারবে না। কেন্দ্রীয় সরকার এখনও শ্রম কোড অনুসারে ফ্লোর ওয়েজ নির্ধারণ করেনি। তারপর বোঝা যাবে কোন রাজ্যে মজুরি বাড়বে এবং প্রকৃত মজুরি বাড়বে না কমবে।

নিয়োগের শর্ত অনেক শ্রমিকের জন্য নেই

পুরোন আইন দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এমপ্লয়মেন্ট (স্ট্যান্ডিং অর্ডার) অ্যাক্ট ১৯৪৬ অনুসারে নিয়োগ কর্তা, নিয়োগের শর্ত শ্রমিককে জানাতে বাধ্য। যেমন কাজের ঘন্টা, মজুরি, ছুটি ও অন্যান্য কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়মাবলি, শাস্তির বিধান ইত্যাদি। তার জন্য স্ট্যান্ডিং অর্ডার তৈরি করে শ্রমিককে জানানোর পাশাপাশি কারখানার মধ্যে নোটিশ বোর্ডে নোটিশ টাঙানো ও সরকারি প্রতিনিধিকে জমা করতে হত। পুরোন আইনে ১০০ জন বা তার বেশি শ্রমিক থাকলে নিয়োগ কর্তা এই আইন মানতে বাধ্য ছিল। 

শিল্প সম্পর্ক কোডে এই সংখ্যা ১০০ থেকে বেড়ে ৩০০ জন হয়েছে। শুধু তাই নয় সরকার চাইলে যে কোন সংস্থাকে বিশেষ পরিস্থিতিতি এই নিয়মের ছাড় দিতে পারে।

৫১ শতাংশের সমর্থনের ভিত্তিতে ইউনিয়নের মান্যতা

কোনো সংস্থার মোট শ্রমিকের ৫১ শতাংশের সমর্থন থাকবে যে ইউনিয়নের সেই একমাত্র দরকষাকষির ক্ষমতা পাবে বা নিয়োগকর্তার মান্যতা পাবে। কোন সংস্থায় কোন ইউনিয়নেরই যদি ৫১ শতাংশ সমর্থন না থাকে তবে ২০ শতাংশের শ্রমিকের সমর্থন আছে এমন একাধিক ইউনিয়ন নিয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল তৈরি হবে। এর ফলে নিয়োগকর্তা নিজেই ইউনিয়ন তৈরি করে নেবে। বাকি ইউনিয়নের কোন কার্যকারিতা থাকবে না। মালিকের স্বার্থরক্ষার ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও কেউ দাঁড়াতে পাড়বে না। 

শ্রমিকদের বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে

চারটি কোডে সেন্ট্রাল অ্যাডভাইসারি বোর্ড (CAB) সহ অনেক কেন্দ্রীয় বোর্ডের কথা বলা আছে। সেই বোর্ডে শ্রমিকদের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মাত্র। বোর্ড তৈরি হবে কেন্দ্রীয় সরকারের আমলা ও কর্মকর্তাদের নিয়ে। মালিক ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধিকে সরকার মনোনিত করবে। পুরোন আইনের খনি, ডক ও নির্মাণকর্মীদের জন্য শিল্পভিত্তিক ত্রিপাক্ষিক বোর্ডের কোন উল্লেখ নেই এই কোডে। স্বাভাবিকভাবেই বোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সম্পূর্ণ সরকারের হাতে।

পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের নিরাপত্তা অবহেলিতৎ’:ঽ;

সবথেকে বড় বঞ্চনা পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কাজের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোড, ২০২০–এর ক্ষেত্রে হয়েছে। এই আলোচনায় যাবার আগে একটা কথা বলা দরকার পুরোন আইনে পেশাগত সুরক্ষার দুটি প্রধান বিষয় – পেশাগত রোগ ও দুর্ঘটনায় মারা গেলে বা কর্মক্ষমতা হারালে ক্ষতিপূরণ ৯৯ শতাংশ শ্রমিকের কাছে অজানা এবং নাগালের বাইরে। এমন কি সরকারি সংস্থার শ্রমিক ও কর্মচারিদের পেশাগত রোগের নির্ণয় হয় না ও ক্ষতিপূরণ পায় না। এবার দেখা যাক মালিকরা  শ্রম কোডে কিভাবে আইনি কড়াকড়ি কমে যাবার সুবিধা পেল।

১। পুরোন আইন অনুসারে ছোট খাটো সব ধরনের দুর্ঘটনার রিপোর্ট শিল্প সংস্থার চত্বরে নোটিশ বোর্ডে টাঙানো ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হত। নতুন কোডে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে ও এমন শারীরিক আঘাত লেগেছে যাতে ৪৮ ঘন্টা বা তার বেশি কাজ করতে পারে নি – শুধু সে ক্ষেত্রে রিপোর্ট করলেই হবে। আমরা জানি কিভাবে এতদিন রাতের অন্ধকারে বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের দেহ হাপিস করে দেওয়া হয়। তার জন্য সব রাজ্য স্থানীয়দের নিয়োগ না করে বাইরের শ্রমিক নিয়োগ করে। ভারতে ২০১৫ সাল থেকে বছরে গড়ে ৫০ হাজার শ্রমিক শিল্প দুর্ঘটনায় মারা যান। গুজরাটের রিলায়েন্সের সমুদ্রের ধারের রিফাইনারিতে দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে তাকে হোস পাইপের সাহায্যে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।

২। পুরোন আইনে ১০০ জন শ্রমিক থাকলেই সেফটি কমিটি ও সেফটি অফিসার নিয়োগ করতে হত। বর্তমানে ফ্যাক্টরিতে ৫০০ ও তার বেশি; বিপদজনক ফ্যাক্টরিতে ২৫০; খনিতে ১০০; বিল্ডিং ও নির্মাণ কাজে ২৫০ জন বা তার বেশি হলেই সেফটি কমিটি ও সেফটি অফিসার নিয়োগ করা হবে। তাও কোন সংস্থায় থাকবে বা থাকবে না, সরকারই ঠিক করে দেবে।

৩। এই কোডের ষষ্ট অধ্যায়ে শ্রমিক কল্যাণের বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের কথা বলা থাকলেও মালিক বা নিয়োগকর্তা না মানলে তাদের শাস্তির কথা বলা নেই।

৪। পুরোন আইনে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার বিধি মালিক ঠিক মত পালন করছে কিনা তদন্ত করতে জেলা শাসক যেতেন। বর্তমানে জেলা শাসক শুধু খনি পরিদর্শন করতে পারবেন। বাকি ক্ষেত্রে সরকারের ইন্সপেক্টর কাম ফেসিলিটেটর এই কাজ করবে। তিনদিন আগে চিঠি দিয়ে ইন্সপেকশনে যাওয়া এখন বাধ্যতামূলক। 

৫। কোন সংস্থায় এমনকি বিপজ্জনক সংস্থাতেও সরকার ঠিক করবে সেখানে মেডিকাল অফিসার নিয়োগ হবে কিনা। 

৬। কাজের ঘন্টা বা ছুটি সংক্রান্ত বিষয়টি বেশ জটিল ভাবে উল্লেখ করা আছে। 

ক) সব মালিক বা নিয়োগ কর্তা কোন শ্রমিককে সংস্থার চত্বরে ৮ ঘন্টার বেশি রেখে দিতে পারবে। ফলত টিফিন ও বিশ্রাম ইত্যাদির নামে কাজের ঘন্টা বাড়ানো মালিকের পক্ষে সহজ হবে। আগে টিফিন এবং কাজের চরিত্র অনুসারে মাঝের বিরতি সহ দিনে ৮ ঘণ্টা বা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যেত না। 

খ) খনি মোটর পরিবহন ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে কাজের সময় ৮ ঘণ্টার বেশি বলা আছে। কিন্তু টিফিনের জন্য বিরতি ও হাজিরার সময় আলাদা করে হিসাব করা হবে। সব বিজেপি শাসিত রাজ্য অর্ডিনান্স জারি করে শ্রমিকদের ১২ ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি মালিকপক্ষকে দিয়ে দিয়েছে।

১৩০ বছরে আগের শ্রমিকদের আন্দোলনে শ্রমিকদের দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কাজের, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য বা নিজের মত করে সময় কাটানোর জন্য। সেই রক্ত ঝরা আন্দোলনে বহু শ্রমিকের প্রাণের বিনিময়ে দুনিয়ার শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা অধিকার হাসিল করার কথা যেমন সবাই ভুলতে বসেছে, তেমন চরম দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রবাদীরা শ্রমিকদেরকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগঠনের জন্য। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শ্রমিক কৃষকের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই বা সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রের পুলিশ ও সেনাবাহিনিকে আরও মজবুত করা। 

কর্পোরেট সংস্থা বা দেশী বিদেশী পুজিপতিদের স্বার্থে আরো মুনাফার জন্য শ্রমিক শোষণ বাড়িয়ে যাবার পথে পুরোন শ্রম আইনের সামান্য কিছু বাধা নতুন চারটি শ্রম কোডে দূর করে দিয়েছে কেন্দ্রের ফ্যাসিষ্ট বিজেপি সরকার।  

শ্রম আইন পরিবর্তনের যুক্তি পুরোন শ্রমিক আইন নাকি মালিক পক্ষের জন্য খুব কড়া আইন ছিল। সেই আইনও মালিককে শ্রম আইন না মানতে, শ্রমিককে ১২ ঘণ্টা দ্বিগুণ ওভারটাইম না দিয়ে কাজ করাতে, ন্যূনতম মজুরি না দিতে, যখন খুশি ছাঁটাই করতে, সুরক্ষার ব্যবস্থা না করতে, পেশাগত রোগে মারা যেতে বাধা হয়নি। যদিও মোট শ্রমিকের ২ শতাংশের কম সংগঠিত ক্ষেত্রের স্থায়ী শ্রমিকরা পুরোন আইনে সুরক্ষিত ছিল। এবার সব শ্রমিকই নতুন শ্রম আইনে আর কোন সুরক্ষা পাবে না। যতই বলা হক সব শ্রমিকরা নিয়োগ পত্র দিতে হবে বা পে স্লিপ দিতে হবে। 

কাজের স্থায়িত্ব কেড়ে নেওয়ায় শ্রমিকশ্রেণির দরকষাকষির ক্ষমতা কমে গেল। শ্রমিকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হলেন। 

এটাই শেষ কথা নয়। রাষ্ট্র যত শ্রমিকদের দমন করবে তত শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকবে। রাষ্ট্রের ঘুম কেড়ে নেবে। যেমন এই বছর মার্চ এপ্রিল মাসে রৌড়কেল্লা, পানিপথ হয়ে হরিয়ানা বা নয়ডার হাজার হাজার শ্রমিকের ধর্মঘট আন্দোলন এবং আন্দোলনকে বর্বর দমনের পালটা শ্রমিকদের হাতে একের পর এক কারখানার মালিকদের মার খেয়ে পালিয়ে যাওয়া ও কারখানা জ্বালিয়ে দেওয়া ভারত রাষ্ট্রের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও একটার পর একটা কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ হচ্ছে। আজ না হোক কাল এই সব ছোট ছোট শ্রমিক বিক্ষোভ এক বড় আকার নেবে। লেবার কমিশনারের ঘরে দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় নয় বা লেবার কোর্টের অন্তহীন প্রক্রিয়ায় আটকে থাকবে না শ্রমিকদের সংগ্রাম, তা পরিণত হবে মাঠে ময়দানে সংগঠিত সুশৃঙ্খল শ্রমিক শ্রেণির মালিকশ্রেণির বিরুদ্ধে এক অন্তিম বোঝাপড়ার লড়াইয়ে।