ব্রিটিশসৃষ্ট হিন্দুধর্ম, হিন্দু ও হিন্দু বনাম মুসলমান

গৌরচন্দ্রিকা

এ লেখার প্রধান প্রতিপাদ্য হল, গোটা দেশ জুড়ে ‘হিন্দুধর্ম’, ‘হিন্দু’, ‘হিন্দু-মুসলমান’ ইত্যাদি শব্দ নিয়ে যে তোলপাড় চলেছে, সেগুলো যে আসলে উপনিবেশিক ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট সেটা দেখানো। ব্রিটিশই প্রথম ‘হিন্দুধর্ম’ শব্দটির সৃষ্টি করে, জনগণনার মাধ্যমে ‘শৈব’ থেকে শুরু করে ‘বৈদিক’, ‘শাক্ত’, ‘বৈষ্ণব’, ‘শিখ’ ইত্যাদি সমস্ত প্রধান ধর্মকে হিন্দু ধর্মের শাখা ধর্মে পরিণত করে, সেই সঙ্গে যারা এতদিন ভৌগোলিক পরিচয়ে হিন্দু নামে অভিহিত হত সেই হিন্দুদের ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দুতে পরিণত করে, এবং হিন্দু-মুসলমানের দ্বৈত মেরুকরণ বা Binary Polarisation করে। এসব কিছু জানার জন্যে অবশ্য গোড়ায় একটু কষ্ট করে ভারতেতিহাসের কিছু পাতা বারো ক্লাসের রচনা ভেবে উল্টে যেতে হবে।

কিন্তু তারও আগে কয়েকটা কথা। কেউ কেউ বলছেন, উপনিবেশিকতার ধুলো ঝেড়ে আমাদের সেই ভৌগোলিক পরিচয়কে উদ্ধার করতে হবে এবং এদেশকে ভৌগোলিক পরিচয়ে পরিচিত হিন্দুদের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, কারণ তাতে করে সব ধর্মের লোকেরই নাকি এদেশে ঠাঁই মিলবে। প্রথম প্রশ্ন, ঘড়ির কাঁটাকে পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় কি, বিশেষ করে ইতিহাসের বেলায়? আড়াইশো বছর আগে উপনিবেশিক ব্রিটিশ আমাদের অর্থাৎ হিন্দুদের যে ধর্মীয় পরিচয়ের কোটরে বেঁধে দিয়ে গেছে, আজ কি আমরা তাকে ঝেড়ে ফেলতে পারি? আর পারিই না যখন, ক্রমান্বয়ে প্রথম শতাব্দী, চতুর্থ থেকে নবম শতাব্দী এবং পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়ে খ্রিস্টানরা এদেশে আসার ফলে যে খ্রিস্টান সম্প্রদায় এদেশে গড়ে উঠেছে এবং একইভাবে ক্রমান্বয়ে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী, একাদশ শতাব্দী, দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী জুড়ে মুসলমানরা এদেশে আসার ফলে যে মুসলমান সম্প্রদায় এদেশে গড়ে উঠেছে, যাদের বাস এদেশে হাজার বছরের অনেক বেশি হয়ে গেল এবং যাদের ধর্মের আঁট খুবই শক্ত, তাদের আমরা কি করে বলতে পারি যে তোমরা ‘হিন্দু’ শব্দটিকে গ্রহণ কর, যখন নাকি ধর্মের ভিত্তিতে সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়? ‘হিন্দুদের দেশ’ এই যৌগিক শব্দটিকে গ্রহণ করার অর্থ তখন তাদের ক্ষেত্রে এই দাঁড়াবে না কি যে তারা বিদেশী, এদেশে থাকতে এসেছে মাত্র? সেটা কি সত্য? 

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘ভারতবর্ষ’ নামটা তো দীর্ঘকাল ধরেই ব্যবহৃত, তাকে হঠাৎ পাল্টাতে হচ্ছে কেন? খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন পারসিকরা এদেশে এসে সিন্ধু নদের সকল পারের অধিবাসীদের ‘হিন্দু’ নাম রাখার আগেও তো এদেশে মানুষ ছিল, ছিল সুপ্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা ও বৈদিক সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতার ব্যাপারে সব কিছু জানা এখনো অব্দি সম্ভব না হলেও, ‘ভারতবর্ষ’ নামটা আমরা গ্রহণ করব না কেন? অন্তত এই নামটার মধ্যে তো কোন নৃ-ধর্মীয় পরিচয়ের (ethno-religious identity) গন্ধ নেই, কারণ এই নামটি ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকলের বাসভূমিকে বোঝায়। যদিও প্রধান উপনিষদগুলির মধ্যে পড়ে না, তবুও সাম ও অথর্ব বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহা উপনিষদেই তো সেই বিখ্যাত কথাটা রয়েছে–‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, যার অর্থ ‘সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার’। 

ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে, ঋগবেদেই তো প্রথম অস্পষ্টভাবে ‘ভরত’ শব্দটির আবির্ভাব ঘটেছিল। ঋগবেদ ৭.৩৩.৬-এ পাই “ইন্দ্র যুদ্ধক্ষেত্রে ভরত জনকে রক্ষা করেছিলেন…।” প্রশ্ন উঠতে পারে, ভরত জনের সঙ্গে ভারতবর্ষের সম্পর্ক কি? উত্তর হচ্ছে, ভরত জন ছিল একটি বৈদিক জনজাতি, ঋগবেদে সরস্বতী নদীর নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ‘দশরাজন’এ (দশ রাজার যুদ্ধ) ভরতদের বিজয়ের বিশদ বিবরণ রয়েছে। পরবর্তীকালে আটশো খ্রিস্টপূর্বাব্দে রচিত ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (বাজসনেয়ী সংহিতা) একজন বিশ্বজনীন সম্রাট হিসেবে ভরতের বর্ণনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যাঁর বিশাল বিজয়ের ফলেই তাঁর নামে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নাম হয়েছিল। এরপর ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি পাই চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ সংকলিত হতে শুরু হওয়া মহাকাব্য ‘মহাভারত’এ, যদিও আখ্যানটি প্রাথমিকভাবে চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে থেকেই সুত নামক একদল চারণকবির মাধ্যমে মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল। মহাভারতের ষষ্ঠ সর্গে ভীষ্ম পর্বে পাওয়া যায়, সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন, 

“হে মহাঋষি, জম্বুদ্বীপে সাতটি বিখ্যাত বিভাগ রয়েছে; হে মনুষ্যশ্রেষ্ঠ, তাদের মধ্যে ভারত অন্যতম।” (অ ১০, শ্লোক ১)। 

বহু পরে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে কোনো এক সময় লেখা বিষ্ণুপুরাণ ভারতবর্ষের অবস্থানও নির্ণয় করে দিচ্ছে, 

উত্তরং য়ত্ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশচৈব দক্ষিণাণ | বর্ষণ তদ্ ভরতঃ নাম ভারতী যাত্রা সন্ততিঃ ||

সমুদ্রের উত্তরে এবং বরফাবৃত পর্বতমালার দক্ষিণে অবস্থিত দেশকে ভারত বলা হয়, কারণ সেখানে ভরতের বংশধরেরা বাস করেন।

এবং এগুলোর কোনোটিই মূলত ধর্মীয় গ্রন্থ নয়। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ–এইসব অনন্য সৃষ্টিগুলিকে আধ্যাত্মিক গণ্ডির বাইরে এনে আমাদের দেশের সে কালের ভূগোল, সামাজিক ইতিহাস ইত্যাদি হিসেবে দেখলে অমূল্য জ্ঞান লাভ করা যায়। পরিশেষে, সংজ্ঞায়িত ভৌগোলিক ধারণা হিসেবে ভারতবর্ষের প্রথম বাস্তব ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ২য়-১ম শতাব্দীতে খোদাইকৃত কলিঙ্গের সম্রাট খারভেলার হাতিগুম্ফা শিলালিপিতে যা এই ধারণাটিকে একটি বাস্তবায়িত ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।  

বারো ক্লাসের ভারতবর্ষের ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশ এক সুপ্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি। চার হাজার বছর আগে এই উপমহাদেশে বিশ্বের প্রাচীন ও অত্যন্ত উন্নত মানের নগর সভ্যতাগুলির অন্যতম যে সিন্ধু সভ্যতা তার জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয় এবং মনে করা হয় প্রায় দু’হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তা বিদ্যমান ছিল। সুসংগঠিত নগরী, জটিল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৃহৎ স্নানাগার, বৃহৎ সাম্প্রদায়িক শস্যভাণ্ডার, প্রমিত ওজন এবং বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্কের জন্যে এই সভ্যতা বিখ্যাত ছিল। সব থেকে বড় কথা, নগর পরিচালনার ব্যাপারে কোন প্রথাগত রাজতন্ত্র বা সেনাবাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায় নি। এবং সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের অভাব ইঙ্গিত করে এই নগর সভ্যতাটি শান্তিপূর্ণ ছিল। এখানকার মানুষ কি ধর্ম পালন করত সেটা আজো জানা যায় নি (কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত লিপিগুলির আজ অব্দি পাঠোদ্ধার করা যায় নি), কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে পশুপতি সীলমোহরটিকে ধরলে যোগাসনরত এক আদি-শিব মূর্তির পূজা সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল এবং সে হিসেবে শৈব ধর্মকেই আমাদের আদি ধর্ম হিসেবে মানতে হয়।

এর পরের যুগ হল বৈদিক যুগ। ব্যাপ্তিকাল আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই সময়কালের মধ্যে চার বেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদের মত গ্রন্থগুলি রচিত হয়েছিল। প্রাচীন ভারতীয়রা তাদের জীবনধারাকে কোন একক অখণ্ড ধর্মের অধীনে শ্রেণিবদ্ধ করত না, যদিও ঐসব গ্রন্থগুলি থেকে উদ্ভূত প্রথাগুলিকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবনধারা গড়ে উঠত। একেবারে গোড়ায় প্রথা এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলির অনুসরণের ক্ষেত্রে সমাজে হয়ত একটা সমানতা ছিল, এবং সেই যুগটিকে আমরা ‘বৈদিক ধর্ম’র পর্যায় বলে অভিহিত করতে পারি। কিন্তু ঋগবেদের ১০ম মণ্ডলের পুরুষসূক্তে (যদি না প্রক্ষিপ্ত হয়) বর্ণসৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের চতুর্মুখী বিভাজন ঘটে যাওয়ার পর এবং ক্রমশ জাতি গঠন (ইংরেজি ‘নেশন’ নয়) হওয়ার পর থেকে সমাজে উঁচু-নিচু ভাগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে পর্যায়ের উদ্ভব হয় তাকে আর ‘বৈদিক ধর্ম’র পর্যায় বলে অভিহিত করা যায় না, প্রকৃতপক্ষে সেটি হয়ে দাঁড়ায় ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’র বিকাশের কাল। এই ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’ প্রধানত ধর্মসূত্র ও ধর্মশাস্ত্র দ্বারা সংজ্ঞায়িত, কঠোর বর্ণপ্রথার প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার এবং এই সেই ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’ যার আশ্রয়ে ক্রমে ক্রমে পুরোহিত ও পণ্ডিত ব্রাহ্মণদের উদ্ভব। এর পর থেকে ‘বৈদিক ধর্ম’ মূলত দার্শনিক তত্ত্বকথা হিসেবেই থেকে যায়।

এখানে একটা কথার পুনরুক্তি দরকার যে, ‘বৈদিক ধর্ম’ বা ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’ জাতীয় যৌগিক শব্দগুলো কিন্তু সেকালে চালু ছিল না। আগেই বলা হয়েছে সেকালে মানুষ জীবনধারাকে কোন একক অখণ্ড ধর্মের অধীনে শ্রেণিবদ্ধ করত না। ক্লাউস ক্লোস্টারমায়ার এবং অরবিন্দ শর্মার মত ভারততত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী নাগাদ গুপ্ত যুগে ‘বৈদিক ধর্ম’ নামক এই যৌগিক শব্দটির প্রথম আবির্ভাব হয়। অন্য সূত্র থেকে পাওয়া যায়, ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’ শব্দটির আবির্ভাবও এইসময় নাগাদই হয়েছিল। আপাতদৃষ্টে ব্যাপারটা বুঝতে একটু অসুবিধে লাগে যে একই গুপ্ত যুগে যুগপৎ দুজোড়া যৌগিক শব্দের আবির্ভাব হচ্ছে। ঘটনা হচ্ছে এই যে, গুপ্ত শাসকরাই বৈদিক যুগের আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’র মেলবন্ধন করেছিলেন। একদিকে তাঁরা বৈদিক যুগের অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান, যেমন পাক, হবি, সোম ইত্যাদি বজায় রেখে শুধু পশুবলির জায়গায় বৈষ্ণবীয় ভক্তিকে (ভাগবত) আনেন, অন্যদিকে তাঁরা স্বতন্ত্র পাথরের মন্দির নির্মাণ শুরু করেন, যেমন, দশাবতার মন্দির, যার ফলে বৈদিক যুগের যজ্ঞের অগ্নি থেকে সাধারণ মানুষের সমাজ ব্যক্তিগত দেবদেবীর পূজার দিকে মোড় ফেরে যেটা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকাশের পথ প্রশস্ত করে। তাছাড়া গুপ্ত যুগের আনুকূল্যে তখনকার ‘ব্রাহ্মণ্য ধর্ম’ ক্রমবিকাশমান ছিল, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীগুলির অসংখ্য আঞ্চলিক ও লোকায়ত দেবদেবীকে বিষ্ণু বা শিবের অবতার হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের তারা আত্মস্থ করত। তবে একথা ঠিক যে ঐতিহাসিকভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অন্যান্য ধর্ম যেমন শৈব, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ বা জৈনের মত একটি একক অখণ্ড ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় না, বিবেচিত হয় ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি হিসেবে।

পরবর্তী প্রসঙ্গ ‘সনাতন ধর্ম’, এই যৌগিক শব্দটা নিয়েও ইদানিং জোর শোরগোল চলেছে। ঋগ্বেদের মণ্ডল ৩, সূক্ত ৩, মন্ত্র ১-এ ‘ধর্মানি সনাত’ পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ ছিল ‘শাশ্বত কর্তব্য’ বা ‘প্রাচীন বিধান’, কোন একক অখণ্ড ধর্ম পরিচয়ের উৎস নয়। অগ্নি (বৈশ্বানর)-কে উৎসর্গীকৃত এই নির্দিষ্ট স্তোত্রে, ঋষি প্রার্থনা করেন যেন মানুষ এই শাশ্বত বিধানগুলি অনুসরণ করে। অথর্ববেদের কাণ্ড ১০, সূক্ত ৮, মন্ত্র ২১-২৩-ও পরম সত্তাকে ‘সনাতনম’ (শাশ্বত সত্তা) বলে উল্লেখ করে, যা এক কালহীন বিশ্বব্যবস্থার দার্শনিক ভিত্তিস্বরূপ। মহাভারতে, শ্রীমদ্ভাগবতগীতায় এবং কোন কোন পুরাণে শব্দটার দেখা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে। শব্দদুটি মহাজাগতিক নৈতিক আইন বা একটি সর্বজনীন জীবনধারা বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হত, একটি সংগঠিত, স্বতন্ত্র সাম্প্রদায়িক পরিচয় হিসাবে কখনওই নয়।

ইয়ে চ বেদাভিদো বিপ্র ইয়ে চধ্যাত্মবিদো জনঃ

তে বদন্তি মহাত্মানম্ কৃষ্ণম ধর্মম সনাতনম্

–মহাভারত, বন পর্ব, অধ্যায় ৮৬, শ্লোক ২২

(যাঁরা বেদে পারদর্শী এবং যাঁরা আধ্যাত্মিক সত্তাকে জানেন, তাঁরা মহাত্মা কৃষ্ণকে শাশ্বত ধর্ম বলে অভিহিত করেন।)

প্রকৃতপক্ষে ‘সনাতন ধর্ম’ বা ‘সনাতনী’ এই সব শব্দের উৎপত্তি ঊনবিংশ শতাব্দীতে ও ক্রমবিকাশ ঊনবিংশ হয়ে বিংশ শতাব্দীতে। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রসার বা আর্যসমাজ বা ব্রাহ্মসমাজের মত সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলির বিপরীতে একটি স্ব-সচেতন, ঐক্যবদ্ধ পরিচয় হিসেবে ‘সনাতনী’ (সনাতন ধর্মের অনুসারী) ধারণাটি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। প্রথম ১৮৩০ সালে রাধাকান্ত দেব এই কোলকাতাতে গোঁড়া, ঐতিহ্যবাদী হিন্দুদের নিয়ে ‘ধর্মসভা’র সূত্রপাত করেন। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দি লেখক পণ্ডিত শ্রদ্ধারাম ফিলৌরি ১৮৭০ সাল নাগাদ গোঁড়া, ঐতিহ্যবাদী হিন্দুদের একটি একীভূত ধর্মীয় পরিচায়ক হিসেবে ‘সনাতনী’ এই পরিভাষাটিকে গড়ে তোলেন এবং এক দশক ধরে লেখালেখি করে পরিভাষাটিকে জনপ্রিয় করেন। এর পর ১৮৭৩ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সনাতন ধর্ম রক্ষিণী সভা’। সনাতন বিশ্বাস প্রচারের জন্য এই সংগঠনটি পুস্তিকা, প্রচারপত্র এবং সাময়িকী প্রকাশ করতে থাকে। প্রসিদ্ধ শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক আর শিবশঙ্কর পাণ্ডিয়া ১৮৮৭ সালে দক্ষিণ ভারতে প্রধানত খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রসারের প্রতিরোধকল্পে মাদ্রাজে (অধুনা চেন্নাই) প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু ট্র্যাক্ট সোসাইটি। এই সোসাইটিও নানা প্রচারপুস্তিকার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় কাঠামোর রক্ষক হিসেবে সনাতনী পরিচয়কে সুদৃঢ় করেছিল। অবশেষে ১৯২১ সালে লাহোরে (পাঞ্জাব) ‘সনাতন ধর্ম প্রতিনিধি সভা’র জন্ম হয়, যার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় ইত্যাদি। রায়বাহাদুর লালা রামশরণ দাস ছিলেন এই সংগঠনের সভাপতি।

কাস্পিয়ান ও আরল সাগরের উত্তরে মধ্য এশীয় স্তেপ অঞ্চল থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রথম দারিয়ুসের নেতৃত্বে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে, বাণিজ্যপথ ও সীমান্ত সুরক্ষিত করতে এবং এদেশের বিপুল সম্পদ আহরণ করতে পারসিকরা যে এদেশে এসেছিল, এবং সিন্ধু উপত্যকাকে পারস্য সাম্রাজ্যের (অধুনা পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ) অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, এ কথা আজ আমাদের সকলের জানা। চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ আলেক্সজান্ডার পারস্য সাম্রাজ্য জয় করার আগে পর্যন্ত সিন্ধু উপত্যকায় এই পারস্য শাসন স্থায়ী ছিল। তারপর তারা হয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায় অথবা পারস্য মালভূমিতে ফিরে যায়। তবে তাদের অনেকেই যে এদেশে থেকে গিয়েছিল তার সবথেকে বড় প্রমাণ আলেক্সজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরুর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তারা আলেক্সজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরুর সৈন্যদের পাশাপাশি লড়েছিল। 

এই সেই পারসিকরা যারা সিন্ধু উপত্যকায় বসবাসকারী অত্যন্ত বিকেন্দ্রীভূত এবং আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে গভীরভাবে স্তরবিন্যস্ত সকল মানুষকে বোঝাতে ‘হিন্দু’ (‘সপ্ত সিন্ধু’ থেকে ‘হপ্ত হিন্দু’ থেকে ‘হিন্দু’) শব্দ ব্যবহার করত। ধর্মের দিক থেকে তারা ছিল জরথুস্ত্রবাদী। সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলমানরা পারস্য জয় করলে সে দেশের প্রধান ধর্ম ইসলামে পরিবর্তিত হয়ে যায়। রয়ে যায় ইরানে কিছু ছোট ছোট জরথুস্ত্রবাদী সম্প্রদায়, আর অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে কোন একটা সময় তাদেরই একদল এদেশে পালিয়ে আসে, যারা ‘পার্সি’ নামে পরিচিত। প্রাচীন পারস্য উপস্থিতি প্রাচীন ভারতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল, যা এই অঞ্চলের মুদ্রা, লিপি (যেমন খরোষ্ঠী) এবং স্মৃতিস্তম্ভমূলক স্থাপত্যে এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। 

গ্রিকদের বেলায় এদেশে আসাটা ছিল চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এবং ইন্দো-গ্রিকদের বেলায় দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। গ্রিকরা আলেক্সজান্ডারের নেতৃত্বে প্রথম এদেশে আসে। আলেক্সজান্ডারের এদেশ জয় করতে আসার নানা কারণ ছিল, তবে প্রধানতম কারণ ছিল এই যে তিনি নিজেকে পারস্য (আখেমেনিড) সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ভাবতেন। সে হিসেবে সিন্ধু উপত্যকা পুনরুদ্ধার করা তাঁর কর্তব্য ছিল। আলেক্সজান্ডারের সঙ্গে যেসব গ্রিকরা এদেশে এসেছিল তারা অনেকেই নিছক বিজয়ী সেনাদল হিসেবে এখানকার অঞ্চলগুলো দিয়ে যায় নি, বরং তারা স্থায়ী শহর গড়ে তুলেছিল, সেসব শহরে বসতি স্থাপন করেছিল এবং কালক্রমে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশেও গিয়েছিল। আলেক্সজান্ডার ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে (অধুনা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান) যেসব সামরিক ঘাঁটি বা শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের মধ্যে দুটি উদাহরণ হল, ঝিলম নদীর তীরে আলেকজান্দ্রিয়া বুকেফালা ও সিন্ধু অঞ্চলের আলেকজান্দ্রিয়া। এইসব অঞ্চলের শাসনভার পরিচালনার জন্য তিনি অনেক সৈন্য, ভাড়াটে যোদ্ধা ও প্রশাসককে রেখে দিয়েছিলেন, যারা স্থানীয় ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে ক্রমে এখানকারই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ওঠে। ধর্মের দিক থেকে গ্রিকরা ছিল হেলেনীয় বহুদেববাদী। শুরুতে বসতি স্থাপনকারীরা জিউস, অ্যাথেনা, অ্যাপোলো এবং হেরাক্লেসের মতো চিরায়ত দেবতাদের উপাসনা করত। তারা স্থানীয় ভারতীয় দেবতাদেরও নিজেদের দেবতাদের সমতুল্য মনে করত—শিবকে ডায়োনিসোসের সাথে এবং কৃষ্ণকে হেরাক্লেসের সাথে অভিন্ন বলে মনে করত। কিন্তু তাদের ধর্মও অচিরে এ দেশের স্থানীয় ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যায়, যার ফলে জন্ম হয় গ্রেকো-বৌদ্ধ ধর্মের, উদাহরণ, বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের সঙ্গে গ্রিক সম্রাট প্রথম মিনান্দারের (মিলিন্দ) কথোপকথন, বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘মিলিন্দপঞহ’তে যা লিপিবদ্ধ আছে। গ্রিকরা শৈব এবং বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গেও মিশে গিয়েছিল, উদাহরণ, গ্রিক রাষ্ট্রদূত হেলিওডোরাস, যিনি একনিষ্ঠ বাসুদেবভক্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ মধ্য ভারতের বিদিশায় হেলিওডোরাস স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন। আলেক্সজান্ডারের মৃত্যুর কয়েক শতক পর দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ নিকটবর্তী ব্যাক্ট্রিয়া (অধুনা আফগানিস্তান/মধ্য এশিয়া) থেকে আর একবার গ্রিকরা–যাদেরকে ইন্দো-গ্রিক বলা হয়–এসে ভারতীয় উপমহাদেশের আরো গভীরে প্রভাব বিস্তার করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই ইন্দো–গ্রিকরা পাঞ্জাবের কিছু অংশে শাসনকার্য চালায় এবং গঙ্গা অববাহিকার সমভূমি পর্যন্ত তাদের ইন্দো–গ্রিক রাজ্য বিস্তৃত হয়। শত শত বছর ধরে এই গ্রিক বসতি স্থাপনকারীরা ভারতীয় সমাজের সাথে পুরোপুরি মিশে যায়। নিজেদের স্বতন্ত্র গ্রিক রাজনৈতিক পরিচয় আর ধরে রাখতে না পারলেও তারা স্থাপত্যকলা (যেমন—গান্ধার শিল্পরীতি) ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব রেখে গেছে।

আরবদের আসা-যাওয়া শুরু হয় আরো অনেক পরে। ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে আরব বণিকদের যখন এদেশে যাতায়াতের শুরু হয়েছিল, তখনো ইসলাম ধর্মের জন্ম হয় নি। কিন্তু সপ্তম খ্রিস্টাব্দে ইসলাম ধর্মের জন্ম ও বিকাশের পর থেকে যেসব আরব বণিকরা এদেশে এসেছিল তারা সবাই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ছিল। ভারতে ইসলাম ধর্মের আগমন ও বিস্তার এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত ছিল, তিনটি পর্যায়ের মাধ্যমে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

১। শান্তিপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য

২। সামরিক বিজয়

৩। সূফি ধর্মপ্রচার

সপ্তম শতাব্দীতে শান্তিপূর্ণ আরব সামুদ্রিক বাণিজ্যের মাধ্যমে শুরু হয়ে এই ইসলাম ধর্ম মুঘল সাম্রাজ্য পর্যন্ত সামরিক বিজয় ও সুফি ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে এদেশে প্রসারিত হয়েছিল। আনুমানিক ৬২৯-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে আরব মুসলিম বণিক ও নাবিকেরা ভারতের পশ্চিম উপকূলে, বিশেষ করে কেরালা ও গুজরাটে বসতি স্থাপন করে। কেরালায় এইসব আরব মুসলিম বণিক ও নাবিকরা মালাবার উপকূলে বসতি স্থাপন করে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে কেরালার সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায় এবং মাপ্পিলা নামক জনগোষ্ঠীর জন্ম দেয়। মালাবারের এই মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এক গভীর ও অনন্য সাংস্কৃতিক একীকরণ বা আত্তীকরণ ঘটেছিল। সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল ছিল এদের ঐতিহ্যবাহী পেশা, মসলার সংগ্রহ, পরিবহন এবং উপকূলীয় জাহাজ চলাচল পরিচালনা করত, যে জাহাজ চলাচলে পর্তুগীজরা প্রথম ব্যাঘাত ঘটায়। সম্প্রদায়ের বিকাশের আর একটি প্রধান চালিকাশক্তি ছিল প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় কেরালার বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যন্ত নিপীড়নমূলক ও কঠোর বর্ণপ্রথা। এছাড়া, বহু নিম্নবর্ণের স্থানীয় বাসিন্দা এবং নিপীড়িত কৃষক সামন্ত জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। সামুদ্রিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ায় বহু মুসলমান এতদিনকার পেশা ত্যাগ করে ধীরে ধীরে কৃষি প্রজা, বর্গাচাষী ও শ্রমিকে পরিণত হয়। নিম্নবর্ণের ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা বয়ন, ছুতোরের এবং রাজমিস্ত্রির কাজে তাদের ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা দিয়েও কেরালার সমাজকে সমৃদ্ধ করেছিল। রাওথার, থাঙ্গাল (বা সৈয়দ), কেইস, পুসালান বা লেব্বাইসের মত আরো বেশ কিছু অ-মাপ্পিলা মুসলিম সম্প্রদায় কেরালায় রয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলির বৈচিত্র্যময় উৎস রাজ্যের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কাঠামোকে সমৃদ্ধ করেছে, যার ফলে কেরালার মুসলিম জনসংখ্যা একাধিক জাতিসত্তার এক মিশ্রণে পরিণত হয়েছে।

গুজরাটে মুসলিম সম্প্রদায়ের গড়ে ওঠা অবশ্য কৃষির চেয়ে সমুদ্র ও স্থলপথের বাণিজ্যের সঙ্গে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিল। তুর্কি বিজয়ের অনেক আগে থেকেই আরব ও পারস্য বণিকরা গুজরাট উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছিল। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা দাউদি বোহরাদের (শিয়া) মত সম্প্রদায়ের ভিত্তি স্থাপন করে। মধ্যযুগীয় বিজয় ও অভিবাসনের ফলে গুজরাটি জনসংখ্যার একটা বড় অংশ স্থানীয়ভাবে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পারস্পরিক যোগাযোগের ফলে খোজা (লোহানা হিন্দু ব্যবসায়ী জাতি) এবং মেমন  (সিন্ধু থেকে আগত) এর মত গোষ্ঠীগুলি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মূলত পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলে ক্ষত্রিয় প্রশাসক ও শাসক হিসেবে উদ্ভূত লোহানারা (খোজা) বহু শতাব্দী আগে গুজরাটে চলে আসে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে টিঁকে থাকার জন্য, তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং নিজেদের আদি যোদ্ধা গৌরব (রঘুবংশী বংশ) না হারিয়েই একটি অত্যন্ত সফল বণিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। এই সম্প্রদায় রাম, কৃষ্ণ ও শক্তির মত প্রধান দেব-দেবীর উপাসনা করার পাশাপাশি জালরাম বাপার মত সম্প্রদায়-নির্দিষ্ট সাধুদেরও অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। উপকূলীয় গুজরাট ও কচ্ছে যাদের সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক শিকড় রয়েছে, দরিয়ালালের (সমুদ্রের অধিপতি) মত জলদেবতাদের উপাসনা আর এক সাংস্কৃতিক অভিযোজনের উদাহরণ। মেমনদের উৎস পঞ্চদশ শতাব্দী এবং তারাও লোহানাদের থেকেই উদ্ভূত। তারাও বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে উদ্ভূত ‘গোত্র’ ব্যবস্থা ও আত্মীয়তাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো আজো বজায় রাখে। অন্যদিকে মোলেসালামের (মুসলিম রাজপুত সম্প্রদায়) মত কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠীগুলি তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখে (১৯০৮ সালে আর্য সমাজ শুদ্ধিকরণ করে তাদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে সর্দার নরহারসিংজি ঈশ্বরসিংজির নেতৃত্বে মোলেসালাম সম্প্রদায় শুদ্ধিকরণ-বিরোধী একটি সম্মেলন করে)। বোহরা এবং মেমন সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে দক্ষ বণিক এবং নাখোদা (জাহাজের ক্যাপ্টেন) হিসেবে কাজ করত। তারা ভারত মহাসাগর বরাবর বস্ত্র, মশলা এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা করত। অনেক উপ-সম্প্রদায় নির্দিষ্ট হস্তশিল্প ও শৈল্পিক পেশায় উত্তরাধিকারসূত্রে নিয়োজিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ‘ছিপা’রা ঐতিহ্যগতভাবে কাপড় রংকারী ও মুদ্রণকারী, অন্যদিকে ‘ঘানচি’রা ঐতিহাসিকভাবে তেলকলের মজুর হিসেবে কাজ করত। মুঘল ও মারাঠা শাসনকালে বহু ভাড়াটে সৈন্য ও প্রশাসক–পাঠান, বেলুচ ও মাকরানি মুসলমান সৈনিক, প্রহরী ইত্যাদি– গুজরাটে বসতি স্থাপন করেছিল। 

এর অল্প কিছুদিন পরেই উমাইয়া সেনাপতি মুহম্মদ বিন কাসিম কর্তৃক সিন্ধু অঞ্চল (অধুনা পাকিস্তান) জয়ের পর এই উপমহাদেশে প্রথম ইসলামী শাসনের প্রবর্তন ঘটে। দশম শতাব্দীর শেষভাগ–একাদশ শতাব্দী জুড়ে মধ্য এশিয়া থেকে আসা তুর্কিরা—বিশেষ করে গজনীর মামুদ—উত্তর ভারতে আক্রমণ চালিয়ে পাঞ্জাব দখল করে নিলে আরও গভীর মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মুহম্মদ ঘোরী উত্তরের রাজ্যগুলোকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করলে উত্তরেও মুসলিম সাম্রাজ্যের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। কুতুবুদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে সুলতানি আমলের সূত্রপাত করেন এবং ক্রমে ক্রমে  মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে মুসলিম রাজনৈতিক শাসন বিস্তৃত হয়। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে পারস্যের সুফি সাধকদের ধর্মপ্রচারের প্রচেষ্টা এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার দ্বারা ব্যাপকভাবে চালিত হয়ে, বিশেষত বাংলা ও পাঞ্জাবের মত কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলিতে ব্যাপক স্বেচ্ছাধর্মান্তর ঘটেছিল। রিচার্ড ইটন অবশ্য বাংলার ক্ষেত্রে অন্যরকম তত্ত্ব পেশ করেছেন, সেকথায় জায়গামত আসা যাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই সামরিক বিজয়গুলির অনুষঙ্গ হিসেবে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরণই কি আমাদের দেশে ব্যাপক সাধারণ মানুষের মুসলমান হয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ? কেরালা ও গুজরাটের উদাহরণ দিয়ে ইতিমধ্যেই দেখানো হয়েছে ব্যাপারটা তা নয়। উত্তরের রাজ্যগুলিতে কিভাবে কী ঘটেছিল একটু দেখা যাক। উত্তর ভারতে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর উত্থান মূলত স্বেচ্ছাধর্মান্তর, মধ্য এশীয় কারিগরদের অভিবাসন, রাষ্ট্রীয় অঙ্গীভূতকরণ এবং আন্তঃবিবাহের মাধ্যমে ঘটেছিল। এই ক্রমবর্ধিষ্ণু সম্প্রদায়ের সিংহভাগই গঠিত হয়েছিল স্থানীয় ধর্মান্তরিত মানুষদের নিয়ে, বহিরাগত অভিবাসীদের নিয়ে নয়। হিন্দু সমাজের নিম্নবর্গ ও সুবিধাবঞ্চিত জাতিরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথার বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি পেতে, সামাজিক সমতা অর্জনের আশায় কিংবা জিজিয়া (অ-মুসলিমদের ওপর ধার্য কর) থেকে অব্যাহতি পেতে প্রায়শই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করত, তাদের সঙ্গে ছিল কিছু আদি-বাসী গোষ্ঠীও (গখর, খোখর, জাঠ, রাজপুত, বালোচি)। মুসলিম বিজেতারা বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও শহর গড়ে তুলেছিল, যেখানে স্থানীয় কারিগর, তাঁতি ও শিল্পীরা এসে স্থানীয় শ্রমিকদের সাথে মিশে যেত। অর্থনীতির প্রসারের ফলে উন্নত জীবিকা ও পেশাগত সুযোগের আশায় অনেকেই শাসকগোষ্ঠীর ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। এছাড়া সরকারি চাকরি ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ধর্মান্তরকে আরও জনপ্রিয় করেছিল।

পাঞ্জাব ও বাংলাকে দিয়ে এই প্রসঙ্গে ইতি টানি। পাঞ্জাবের বাসিন্দারাও রাতারাতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। এই পরিবর্তন ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা একটি ধীর প্রক্রিয়া; দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মুহম্মদ ঘোরীর বিজয়াভিযানের মাধ্যমে যার সূচনা হয়, সূফি সাধকদের আর্থ-সামাজিক প্রভাবের ফলে যা গতি পায় এবং পরবর্তীকালে দিল্লির সুলতানি আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে যা সুদৃঢ় হয়। সিন্ধু অববাহিকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে ঘোরীর বাহিনী এবং পরবর্তীকালে দিল্লির সুলতানি শাসকরা স্থানীয় যোদ্ধা ও পশুপালক আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির সমর্থনের ওপর নির্ভর করতেন। নতুন শাসকগোষ্ঠীর সাথে তাল মিলিয়ে চলা, নিজেদের জমি ধরে রাখা এবং সামরিক বিশেষাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গখর ও খোখরদের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক আদি-বাসী গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তবে পাঞ্জাবের গ্রামীণ ও পশুপালক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি মূলত সূফি সাধকদের উদ্যোগেই ঘটেছিল। লাহোরে দাতা গঞ্জ বখশ এবং পরবর্তীতে চিশতি তরিকার সাধকরা (যেমন পাকপত্তনের বাবা ফরিদ) বিভিন্ন খানকা বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সূফিবাদের উদার, আধ্যাত্মিক ও সাম্যবাদী আদর্শ নদীবিধৌত সমভূমিতে বসবাসকারী সাধারণ কৃষিজীবী সম্প্রদায় ও আদি-বাসী গোষ্ঠীগুলির কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পাঞ্জাবের অনেক আদি-বাসী ও পশুপালক গোষ্ঠী—যেমন জাঠরা—ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর বর্ণপ্রথার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল না। সামাজিকভাবে প্রান্তিক এই গোষ্ঠীগুলি ইসলামের সাম্যবাদী বার্তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল; কারণ ইসলাম তাদের বৃহত্তর সামাজিক গতিশীলতা এবং ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক উচ্চ-নিচ ভেদাভেদপূর্ণ কাঠামো থেকে মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ ও পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল আর একটি বড় কারণ। দিল্লির সুলতানি এবং পরবর্তী মুঘল সাম্রাজ্যের আমলে পাঞ্জাবের বিশাল এলাকা সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চলে পরিণত হয়। মুসলিম শাসকরা কৃষি ও যাযাবর গোষ্ঠীগুলিকে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন ও কৃষিকাজে উৎসাহিত করতেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের সম্পত্তির অধিকার ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হত, যার ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদী-তীরবর্তী বিভিন্ন গোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাদের ক্ষেত্রে সামাজিক অভিযোজনের উদাহরণ, বহু শতাব্দী আগে ধর্মান্তরিত হওয়া সত্ত্বেও তারা কৃষি জমির উত্তরাধিকার, গোত্রের মধ্যে বিবাহ (গিল, সিধু, সান্ধু, ব্রার এবং ধিলন) এবং স্থানীয় আদি-বাসী গোষ্ঠীগত এবং প্রথাগত আইন (রেওয়াজ-ই-আম) মেনে চলে।  

বাংলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো অভিনব। বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠী বিষয়ে রিচার্ড ইটনের (The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760) মূল যুক্তিগুলো ‘তরবারি’ ও ‘নিপীড়নমূলক বর্ণপ্রথা’ তত্ত্বকে প্রত্যাখানের সাথে সাথে দুটি প্রধান স্তম্ভকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে—কৃষি সম্প্রসারণ ও সাংস্কৃতিক একীকরণ। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে গঙ্গা নদীর সক্রিয় গতিপথ পূর্বদিকে (পদ্মার দিকে) সরে যায়, যার ফলে পূর্ব বাংলার ঘন অরণ্যময় অঞ্চলে নতুন পলিমাটি এসে জমা হয়। মুঘল রাষ্ট্র ধান চাষের জন্য এই জঙ্গল পরিষ্কারের ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করার জন্যে সূফি ধর্মপ্রচারকদের উদ্বুদ্ধ করে। সূফি ধর্মপ্রচারকরা এলাকার আদি-বাসী গোষ্ঠীগুলিকে উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলস্বরূপ এই সীমান্তে ক্রমে ক্রমে নতুন কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে এবং তারা ব্যাপকভাবে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং এই অঞ্চলে ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির প্রচলন করে। জনগণের উপর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বিদেশী মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে, ইসলামকে ‘স্বদেশীয় আঙ্গিকে’ আত্মস্থ করা হয়েছিল। দেশীয় দেব-দেবী, স্থানীয় আত্মা এবং গ্রামীণ অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলো ক্রমান্বয়ে স্থানীয় ইসলামী বিশ্বতত্ত্বের সাথে মিশে যায়। স্থানীয় লোকসাধু ও পীরদের (যেমন গাজী পীর ইত্যাদি) প্রতি শ্রদ্ধা একটি খাঁটি ও স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলিম পরিচয় গঠনে সহায়তা করেছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ‘হিন্দু’ শব্দটি (‘সপ্ত সিন্ধু’ থেকে ‘হপ্ত হিন্দু’ থেকে ‘হিন্দু’) যে প্রাচীন পারসিক ভৌগোলিক পরিভাষা হিসেবে উদ্ভূত হয়েছিল সেকথা আজ ঐতিহাসিকভাবে সত্য। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে পারস্য সাম্রাজ্যের শেষ পর্বে সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর প্রথম শাপুরের ‘নকশ-ই-রুস্তম’ শিলালিপিতে প্রথম লিখিতভাবে ‘হিন্দুস্থান’ শব্দটা পাওয়া যায়। অধুনা আফগানিস্থান, পাকিস্থান ও সিন্ধু নদের উত্তর–পশ্চিমের কিছু অংশ প্রথম শাপুরের সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। দ্বিতীয়বার ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তবাকত-ই-নাসিরি’ গ্রন্থে শব্দটির দেখা মেলে। তারপর থেকে সুলতানি ও মোঘল আমলে শব্দটিকে বিশেষত প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। 

পারসিকদের দুশ বছর পরে এদেশে পদার্পণ করে গ্রিকরা। তা সত্ত্বেও গ্রিক ঐতিহাসিক মেগাস্থেনিস তাঁর ‘ইন্ডিকা’য় ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করেন নি। কেন? কারণ প্রাচীন পারসিকরা যেমন সংস্কৃত শব্দ ‘সিন্ধু’র ধ্বনিগত রূপান্তর ঘটিয়েছিল এবং ‘স’কে ‘হ’ উচ্চারণ করেছিল (ফার্সি ভাষায় ‘স’ ধ্বনির পরিবর্তে ‘হ’ ধ্বনির ব্যবহার হয়), ঠিক তেমনি গ্রিক মেগাস্থেনিস পারসিকদের কাছ থেকে পাওয়া ‘হিন্দু’র মহাপ্রাণ ‘হ’ বাদ দিয়ে শব্দটিকে ইন্দোস-এ (Indós) প্রতিবর্ণীকরণ করেন। এই ‘ইন্দোস’ শব্দটিই কালক্রমে ইয়োরোপীয়দের হাতে পড়ে ‘ইন্ডিয়া’য় পরিণত হয়। 

পারসিক, গ্রিক ও আরবি পর্যটকরা এবং পরবর্তীকালের ইসলামী শাসনকর্তারা এদেশের অধিবাসীদের ‘হিন্দু’ নামে অভিহিত করলেও এবং তাঁদের লেখাপত্রে শব্দটা কদাচিৎ পাওয়া গেলেও (যেমন একাদশ শতাব্দীতে আলবিরুনির ‘কিতাব-অল-হিন্দ’এ) এদেশের লোকেরা কিন্তু নিজেদের পরিচিতির বেলায় এই শব্দ ব্যবহার করত না। তারা নিজেদের চিহ্নিত করত হয় ভৌগোলিক পরিচয়ে (গৌড়, মগধ, কলিঙ্গ, কাশ্মীর, কনৌজ, সিন্ধু কিংবা গুজরাট), বা ধর্মীয় পরিচয়ে (শৈব, বৈদিক, শাক্ত, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, জৈন বা এগুলির কোন শাখার পরিচয়ে), বা ভাষাগত পরিচয়ে (মগহি, বাংলা, মারাঠী, ফার্সি, উর্দু, ব্রজভাষা, অওধি, অহমিয়া, ওড়িয়া, তামিল, তেলেগু), বা পেশার পরিচয়ে (আচার্য, শাস্ত্রী, পণ্ডিত, আয়ুধজীবী, নায়ক, শ্রেষ্ঠী, সার্থবাহ, কর্ষক, কর্মকার, তন্তুবায়, তক্ষন, বপ্তা, চর্মণ)। সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ অঞ্চলভিত্তিক ও স্থানীয়। মন্দির-মসজিদ, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভিন্ন ছিল। 

চতুর্দশ শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্য ও অন্ধ্র অঞ্চলের শিলালিপি (যেমন দ্বিতীয় হরিহর রায়ের আমলের শিলালিপিগুলিতে) ও খোদাইচিত্রে ‘হিন্দু’ শব্দটি প্রধানত একটি রাজনৈতিক ও সভ্যতামূলক পরিচয় হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। দেশ জুড়ে তুর্কিদের সামরিক বিস্তারের প্রতিরোধস্বরূপ আঞ্চলিক শাসকেরা একটি সম্মিলিত পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। আর ব্যবহারের প্রমাণ আছে ঐ চতুর্দশ শতাব্দীরই কবি বিদ্যাপতির অবহটঠ ভাষায় রচিত ‘কীর্তিলতা’ কাব্যে এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর সাধক কবিরের দোহায়। প্রথমে বিদ্যাপতি– 

হিন্দু তুরুক্ক এক ঠাঁউ রহি, আপনি কারি ঝগড়া…

‘তুরুক্ক’ অর্থে তুর্কি। অনেকে বলেন, বিদ্যাপতির ঐ কাব্যে ‘হিন্দুধর্ম’ শব্দটিও প্রথম উল্লেখিত হয়। কথাটা ঠিক নয়। তিনি ‘হিন্দু’ নামক নির্দিষ্ট একক সুসংহত গোষ্ঠীটির ধর্ম হিসেবে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র কতকগুলো প্রথার (যেমন বেদপাঠ, কর্ণবেধ এবং পূজা) বিবরণ হিসেবেই দেখিয়েছেন।

হিন্দু আর তুর্কিরা একসাথে বাস করে,

আর একে অপরের ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা করে।

কোথাও আযান, কোথাও বেদ পাঠ।

কোথাও বাসমালা, কোথাও কর্ণবেধ…

‘বাসমালা’ একটি ইসলামি শব্দ—বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে)। 

আগেই বলা হয়েছে ‘হিন্দু’ শব্দটি পাওয়া যায় কবিরের দোহাতেও। 

হিন্দুয়া মুয়া পীর ঔলিয়া মুসলামানা।

লড়ে লড়ে মরা দোনোউ কোউ না জানা।।

প্রশ্ন উঠতে পারে যদি তখনকার মানুষজন নিজেদের ‘হিন্দু’ বলে পরিচয় না-ই দিত, তাহলে বিদ্যাপতি বা কবিরের লেখায় শব্দটা এল কি করে? এর উত্তর হচ্ছে, উত্তর ভারতের একটি বিশিষ্ট সুলতানি কেন্দ্র জৌনপুরের সঙ্গে বিদ্যাপতির এক বহুমুখী সম্পর্ক ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মিথিলার (বিদ্যাপতির রাজ্য) ঐনীবর রাজবংশ তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে ঐনীবর রাজা গণেশ্বরের হত্যার পর দখলদার তুর্কি সেনাপতিকে উৎখাত করার জন্য বিদ্যাপতি জৌনপুরের সুলতানের সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন। সুলতানের সাহায্যে গণেশ্বরের পুত্ররা সফলভাবে মিথিলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এই সময় বিদ্যাপতি বেশ কয়েকবার জৌনপুর সফর করেন এবং জৌনপুরের রাজদরবারে তাঁর যাওয়া-আসা ছিল। তাঁর ‘কীর্তিলতা’ কাব্যে জৌনপুরের শার্কি সুলতানের ভূয়সী প্রশংসা আছে। জৌনপুরের রাজদরবারে ‘হিন্দু’ শব্দটি প্রায়ই উচ্চারিত হত। মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘হিন্দু’ শব্দটিকে স্থানীয় কথ্য শব্দভাণ্ডারেও প্রবেশ করতে দেখা যায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় কখনো কখনো এর প্রয়োগ ঘটতে শুরু করে। কবিরের দোহায় সেইভাবেই শব্দটা ঢুকেছিল। কিন্তু সে ‘হিন্দু’ ব্রিটিশ সৃষ্ট ‘হিন্দু’ নয়। 

পঞ্চদশ শতাব্দীতে কৃষ্ণদাস কবিরাজ কর্তৃক লিখিত ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’এ আরো একবার ‘হিন্দু’ শব্দটা পাওয়া যায়, কিন্তু সেও এক চাঁদ কাজী কর্তৃক উচ্চারিত। সারা নবদ্বীপ জুড়ে নগর সংকীর্তন করে ফিরছিল লোক, যবনদের বিরক্তি লাগায় তারা কাজীর কাছে গিয়ে নালিশ জানায়—    

শুনিয়া যে ক্রুদ্ধ হইল সকল যবন। কাজী পাশে আসি সবে কৈল নিবেদন।।

ক্রোধে সন্ধ্যাকালে কাজী একঘরে আইল। মৃদঙ্গ ভাঙ্গিয়া লোকে কহিতে লাগিল।।

এতকাল কেহ নাহি কৈল হিন্দুয়ানি। এবে যে উদ্যম চালাও কেন বল জানি।।

কেহ কীর্তন না করিও সকল নগরে। আজি আমি ক্ষমা করি যাইতেছি ঘরে।। 

আর যদি কীর্তন করিতে লাগি পাব। সর্বস্ব দণ্ডিয়া তার জাতি যে লইব।। (পৃষ্ঠা ১০২)     

ইয়োরোপ ও দ্বৈততা (Binary)

খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস মূলত ‘দ্বৈততা’—যেমন ভালো বনাম মন্দ, পরিত্রাণ বনাম অভিশাপ, এবং আত্মা বনাম দেহ-র উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর কারণ হল মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মতত্ত্ব, যা নৈতিক দ্বৈততার উপর জোর দিত, তার সঙ্গে গ্রেকো-রোমান বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের এক মৌলিক সংমিশ্রণ, বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য তৎকালীন ইয়োরোপীয় দার্শনিকরা যার প্রয়োগ করতেন। গ্রেকো-রোমান যুগের খ্রিস্টান চিন্তাবিদগণ, যেমন সন্ত অগুস্টাইন, প্লেটোনিক দর্শনের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতেন। প্লেটোর চিন্তাধারা মহাবিশ্বকে দুটি বিপরীত জগতে বিভক্ত করেছিল: নিখুঁত, অপরিবর্তনীয় রূপের জগৎ এবং ভৌত অস্তিত্বমূলক ত্রুটিপূর্ণ, বস্তুগত জগৎ। এটি বিমূর্ত ধারণাগুলোকে (আত্মা বনাম বস্তু) কঠোর দ্বৈত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করার মতন একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। বাইবেলের আখ্যানের উপর ভিত্তি করে খ্রিস্টধর্ম নৈতিকতার কঠোর ও চূড়ান্ত শ্রেণিবিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরিত্রাণপ্রাপ্ত ও অভিশপ্ত, ঐশ্বরিক বিধান ও পাপ, এবং অনুগ্রহ ও অপরাধবোধের মতো ধারণাগুলোর একটি কঠোর মহাজাগতিক কাঠামো তৈরি করেছিল। ইউরোপীয় মধ্যযুগে গোঁড়া চার্চ যখন ক্ষমতা সুসংহত করছিল, তখন জ্ঞানবাদের (যা মঙ্গলময় ঈশ্বরকে মন্দ বস্তু সৃষ্টিকর্তা থেকে আলাদা করে) মত দ্বৈতবাদী ধর্মদ্রোহীদের কঠোরভাবে নিন্দা করার মাধ্যমে নিজস্ব দ্বৈততাকে শক্তিশালী করেছিল, যেমন সৃষ্টিকর্তা বনাম সৃষ্টি এবং অভ্রান্ত সত্য বনাম ধর্মদ্রোহিতা (বাস্তব উদাহরণ, গ্যালিলিও গ্যালিলি বা জিওদারনো ব্রুনো)। রাজনৈতিকভাবে, ইউরোপীয় ইতিহাস ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্বৈততাকে ব্যবহার করত। মধ্যযুগীয় ‘দুই তরবারি’ ধারণাটি পোপ (আধ্যাত্মিক শক্তি) এবং সম্রাট বা রাজা(জাগতিক শক্তি)র মধ্যে ক্ষমতাকে সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত করেছিল। ইউরোপের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ঐতিহ্য এই দ্বৈততাকে আরও বিধিবদ্ধ করেছিল। রেনে দেকার্তের মত চিন্তাবিদরা মন ও দেহের পৃথকীকরণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, যা সরাসরি খ্রিস্টীয় আত্মা ও দেহের পৃথকীকরণের প্রতিচ্ছবি ছিল এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে এক গভীর দ্বৈতবাদী চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয়দের আধুনিক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ছিল না, কিন্তু তারা বিদেশের মাটিতে ‘খ্রিস্টান বনাম পৌত্তলিক’ এবং ‘সভ্য বনাম দানবীয়’—এই ধর্মতাত্ত্বিক দ্বৈত বিভাজন আরোপ করেছিল। মধ্যযুগে, খ্রিস্টানদের তৈরি মানবজাতিকে বিভক্তকারী প্রধান দ্বৈত বিভাজনটি ছিল পরিত্রাণপ্রাপ্ত বনাম অভিশপ্ত। অ-খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে শেষোক্ত শ্রেণিতে ফেলা হত, যার ফলে চার্চের দৃষ্টিতে তাদের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস, শাসনব্যবস্থা এবং সম্পত্তির অধিকার অবৈধ বলে গণ্য হত। এই যুগে একটি দানবীয় ভূগোল গড়ে ওঠে, যার জন্ম দেন খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও ঐতিহাসিক জেরাল্ড অফ ওয়েলস (১১৪৬-১২২৩)। বিশ্বের অ-খ্রিস্টীয় অঞ্চলগুলোর মানচিত্র তৈরি করতে ‘মানুষ বনাম পশু’ এই দ্বৈত বিভাজন ব্যবহার করা হয়। গ্রন্থ ও চিত্রকলায় অপরিচিত সংস্কৃতিগুলোকে প্রায়শই দানবীয় বা অতি-যৌন আবেদনময়ী হিসেবে বর্ণনা করা হত, যেগুলোর দখল কোন অন্যায়ের মধ্যে পড়ত না। পোপের ফরমানগুলো খ্রিস্টানদের ‘পৃথিবীর তত্ত্বাবধায়ক’ এবং বাকি অঞ্চলের অধিবাসীদের, বিশেষত প্রান্তিক অঞ্চলবাসীদের ‘স্বাভাবিক সেবক’ হিসেবে গণ্য করত। এইভাবে একটা ‘দ্বৈত শ্রেণি’র জন্ম হয়। ‘সেবক’দের সম্পত্তির বৈধ মালিকানার অযোগ্য বলে গণ্য করা হত এবং তাদের ভূখণ্ড বাজেয়াপ্তকরণকে একটি ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হত। এই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় দ্বৈততাই সেই মৌলিক যুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা পরবর্তী ইয়োরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোকে (যেমন ব্রিটিশ ও স্প্যানিশ) আধুনিক ঔপনিবেশিক যুগের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক দ্বৈততা তত্ত্ব, যেমন, ‘সভ্য বনাম বর্বর’, প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

সংক্ষেপে, ইয়োরোপীয়রা যখন এদেশে আসে, তখন তারা ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল স্তরেই ‘সভ্য বনাম বর্বর’ তত্ত্ব মজ্জাগত করেই এসেছিল। পরবর্তীকালে এদেশের সঙ্গে তাদের পরিচয় যত নিবিড় হতে থাকে, অন্য ক্ষেত্রেও তারা দ্বৈততার প্রয়োগ করতে শুরু করে। যেহেতু ব্রিটিশরা মধ্যযুগের শেষার্ধে এদেশে আসে, যখন নাকি মোঘল সাম্রাজ্যের সূর্য মধ্যগগনে, একদিকে তারা ইসলাম ধর্মের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক, সেই আব্রাহামীয়দের শাখা মুরদের (Moores) অর্থাৎ মুসলমানদের পেয়ে যায়, দ্বৈততা সূত্র অনুযায়ী অপরদিকে তারা জেন্টাইলদের (Gentiles) স্থাপন করে। আমরা জানি বিধর্মী, পৌত্তলিক, অবিশ্বাসী ইত্যাদি বোঝাতে ইয়োরোপীয়রা জেন্টাইল, হিদেন, প্যাগান, ইনফিডেল ইত্যাকার শব্দ ব্যবহার করত। এই জেন্টাইলরাই হল তাদের পরবর্তীকালের ‘হিন্দু’। এ কারণেই শুরু থেকেই ব্রিটিশ সৃষ্ট ‘হিন্দু’ শব্দটি ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলঃ জেন্টাইল ও মুর

বলা হয় প্রথম যে ইংরেজ বণিক-অভিযাত্রী সম্রাট আকবরের সময় ভারতে এসেছিলেন তাঁর নাম র‍্যালফ ফিচ, সময়কাল ১৫৮৩-৯১। তিনি ভারতের বেশ কিছু জায়গায় ঘুরেছিলেন, এই বাংলাও তার মধ্যে ছিল। কিন্তু তাঁর লেখায় ‘হিন্দু’ শব্দটি পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় ‘জেন্টাইল’ (বিধর্মী বা পৌত্তলিক অর্থে) শব্দ—

এখানে বহু মুর ও বিধর্মী বাস করে; রাজার নাম জেলাবদিম একবর, তবে প্রজারা তাঁকে সাধারণত ‘গ্রেট মোগর’ বলে অভিহিত করে। (র‍্যালফ ফিচ, ইংল্যান্ড’স পায়োনিয়ার টু ইন্ডিয়া, ১৮৯৯, জে. হর্টন, হিজ ন্যারেটিভ, সেকেন্ড পার্ট, p. 97) 

প্রথম ‘হিন্দু’ (Hindoes) এবং ‘হিন্দুস্থান’ (Indoftan) এই দুটি শব্দের ব্যবহারই দেখা যায় এর কিছুদিন পরে ইংরেজ ধর্মযাজক হিসেবে ভারতে আসা এডওয়ার্ড টেরির (১৬১৬-১৯) লেখায়। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিক ও নাবিকদের মধ্যে ধর্মপ্রচারের জন্য সুরাতে এসেছিলেন। পরে তিনি মুঘল দরবারে প্রথম আনুষ্ঠানিক ইংরেজ রাষ্ট্রদূত হয়ে আসা স্যার টমাস রো-এর ধর্মযাজক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ভারত থেকে ফিরে যাওয়ার পর ১৬২৫ সালে তাঁর লেখার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ বেরোয় Samuel Purchas সম্পাদিত Purchas His Pilgrimes গ্রন্থে। পরে ১৬৫৫ সালে তিনি নিজে আরো বহু তথ্য যোগ করে A Voyage to East India-র একটি স্বকৃত সংস্করণ বের করেন। নিচের উদ্ধৃতিগুলি সেই স্বকৃত সংস্করণ থেকে নেওয়া। 

প্রাচীনকালে হিন্দুস্তানের অধিবাসীরা মূলত ‘জেন্টাইল’ বা বিধর্মী—যাদের সাধারণত ‘হিন্দু’ বলা হয়—ছিল; তারা সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত যাদের ‘হিদেন’ বা পৌত্তলিক হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং যারা সমগ্র পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে। (আ ভয়েজ টু ইস্ট ইন্ডিয়া, p.120)

তাঁর একশো বছর বাদে ১৭৫০ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন জুনিয়র ক্লার্ক হিসেবে ভারতে আসেন। তবে, শাসক হিসেবে তাঁর দ্রুতগতি উত্থান ঘটে ১৭৭২ সালে, যখন বাংলার গভর্নর হিসেবে তাঁর কার্যকাল শুরু হয়। পরের বছরই অর্থাৎ ১৭৭৩ সালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যাক্ট (রেগুলেটিং অ্যাক্ট) হেস্টিংসকে প্রথম গভর্নর-জেনারেল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং তাঁকে অন্যান্য প্রেসিডেন্সিগুলোর (মাদ্রাজ ও বোম্বে) ওপর নিয়ন্ত্রণ দান করে।

শাসন করতে গিয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস একটা ব্যাপার হৃদয়ঙ্গম করতে শুরু করেন, বিলিতি অভিন্ন বিধিবদ্ধ আইন দিয়ে এদেশ শাসন করা যাবে না, কারণ তাতে প্রতিরোধ দেখা দেবে। তার জন্যে প্রয়োজন এদেশের গ্রন্থাদিকে ব্যবহার করেই গোটা দেশের জন্যে অনুরূপ অভিন্ন বিধিবদ্ধ আইন প্রণয়নের (এখন যে চেষ্টাটা আর একবার হচ্ছে)। যদি তা করে নিজেদের এদেশের ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে চিত্রিত করা যায়, তাহলে নবপ্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাবে। বাংলার গভর্নর হবার কয়েক মাস পরেই অর্থাৎ ১৭৭২ সালেই হেস্টিংস প্রতিটি জেলায় দেওয়ানি আদালত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু না তাঁর নিজের প্রাথমিকভাবে আঞ্চলিক ও স্থানীয়  আইন-কানুন এবং সেগুলির বৈচিত্র্য সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছিল, না তিনি যেসব জেলা কালেক্টরকে নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁদের কোন জ্ঞান ছিল। কাজে লাগার পর এইসব জেলা কালেক্টররা একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলেন, স্থানীয় ও আঞ্চলিক সমাজগুলোতে জেন্টাইলদের মধ্যে যাঁদের শাস্ত্রজ্ঞান আছে ‘পণ্ডিত’ হিসেবে অভিহিত সেইসব মানুষজন এবং মুরদের মধ্যে যাঁদের কোরাণ ও শরিয়তের জ্ঞান আছে ‘কাজী’ হিসেবে অভিহিত সেইসব মানুষজন সর্বাধিক সম্মান পান। জেন্টাইলদের বেলায় শাস্ত্রগুলি ‘সংস্কৃত’ ভাষায় লেখা (অবশ্য ব্রাহ্মণরা ছাড়া সাধারণ মানুষের সংস্কৃতের জ্ঞান তেমন ছিল না, সংস্কৃতে তারা কথাও বলত না, তারা কথা বলত বাংলায়)। মুর বা মুসলমানদের বেলায় তাদের ধর্মগ্রন্থগুলি ‘আরবি’তে লেখা (যদিও তাদের বেলায় একটু ব্যতিক্রম ছিল, যেহেতু মুসলমানদের ক্ষেত্রে ধর্মের বাঁধন বড় শক্ত, ‘আরবি’ ভাষায় তাদের পড়াশোনা করতে হত, কিন্তু কাজী, মুফতি বা মুতাসিবরা ছাড়া সাধারণ মুসলমান আরবিতে কথা বলত না, তারা কথা বলত বাংলায় বা দোভাষীতে। অতঃপর বিশেষত বিয়ে, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, পারিবারিক বিবাদ, জাতপাতের মত বিষয়ের নিষ্পত্তি করার জন্য জেলা কালেক্টররা পণ্ডিত ও কাজীদের সাহায্য নিতে থাকেন। কিন্তু তাঁদের সাহায্য নিলেও সেসব বিচার অধিকাংশ সময়ই ঠিকঠাক হত না, কারণ গৌতম বা বৌধায়ন বা আপস্তম্বর মত ধর্মসূত্রগুলির এবং মনুস্মৃতি বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি বা নারদস্মৃতির মত ধর্মশাস্ত্রগুলির প্রয়োগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পার্থক্যগুলি মূলত ভৌগোলিক অভিবাসন, স্থানীয় রীতিনীতি এবং নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষ্য (নিবন্ধ)-র উত্থানের দ্বারা গঠিত হয়েছিল, যেগুলি প্রাচীন গ্রন্থগুলিকে স্থানীয় সামাজিক অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। 

ধর্মসূত্রগুলির ক্ষেত্রে, বৌধায়ন ও আপস্তম্ব দুইই কৃষ্ণযজুর্বেদের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্ধ্র অঞ্চল (অধুনা অন্ধ্রপ্রদেশ/তেলেঙ্গানা) থেকে উদ্ভূত। এদের মধ্যেও আবার আঞ্চলিক সূক্ষ্মতা রয়েছে, যেমন বৌধায়ন স্পষ্টভাবে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের রীতিনীতির উল্লেখ করেন এবং সেগুলোর অনুমোদন দেন, বিশেষত মামার মেয়েকে বিয়ে করার দক্ষিণী প্রথাকে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র একটি পুরোনো ও অধিক উদার সামাজিক ভিত্তিরেখাকে প্রতিফলিত করে, যা এগারো প্রকারের বিকল্প পুত্র দত্তক গ্রহণ এবং দেবর প্রথাকে (নিয়োগ) স্বীকৃতি দেয়। গৌতম সামবেদের অনুসারী ছিলেন এবং সম্ভবত একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে (যা সাধারণত আরও উত্তর বা পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত) কাজ করছিলেন। তিনি শাসনব্যবস্থার উপর বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেছেন এবং তাঁর গ্রন্থের বৃহত্তম অংশ রাজার কর্তব্য, কর, বিচারপদ্ধতি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের বর্ণনায় উৎসর্গ করেছেন। আপস্তম্ব রীতিমত কঠোর ছিলেন। তিনি বিধবাদের পুনর্বিবাহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন, বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান সীমিত করেন এবং সুস্পষ্টভাবে একবিবাহের পক্ষে সমর্থন জানান। তিনি নিঃসন্তান দম্পতির জন্য এগারো প্রকারের ‘বিকল্প পুত্র’কেও স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন।

ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে, মনুস্মৃতির কথায় ঢুকব না, কারণ ভারতীয় সংস্কৃতিতে মনুস্মৃতি, আন্তোনিয়ো গ্রামশির ভাষা ধার করে, কালচারাল হেজিমনির দ্যোতক, যা দীর্ঘ আলাদা আলোচনার দাবি রাখে, তাছাড়া, মহাত্মা গান্ধীর ভাষায়, 

আমি মনুস্মৃতিকে শাস্ত্রের অংশ বলেই মনে করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ‘মনুস্মৃতি’ নামে পরিচিত বইটিতে মুদ্রিত প্রতিটি শ্লোকেই আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। মুদ্রিত সংস্করণটিতে এত বেশি পরস্পরবিরোধী কথা রয়েছে যে, এর কোনো একটি অংশ মেনে নিলে তার সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য অংশগুলোকে বর্জন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। … মূল পাঠ্যটি কারও কাছেই নেই। (হিন্দুয়িজম অ্যাকর্ডিং টু গান্ধী, ওরিয়েন্ট পেপারব্যাকস, ২০১৩ সালের পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ, p.129) 

আর ডেভিড বক্সবমের কথায়, 

“[I]n the opinion of the best contemporary orientalists, it [Manusmriti] does not, as a whole, represent a set of rules ever actually administered in India. It is in great part an ideal picture of that which, in the view of a Brahmin, ought to be law”. –David Buxbaum (1998), Family Law and Customary Law in Asia: A Contemporary Legal Perspective, Springer Academic, p. 204)

যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির বিজ্ঞানেশ্বরকৃত ভাষ্যের উপর ব্যাপকভাবে ভিত্তি করে, যে আইনটি গড়ে উঠেছিল তার নাম ‘মিতাক্ষরা’। মিতাক্ষরা ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে প্রচলিত ছিল। স্থানীয় দেশাচারকে অন্তর্ভুক্ত করে এটি আরও আঞ্চলিক উপ-দর্শনে বিভক্ত হয়েছিল, যথা, বারাণসী উপ-ধারা, মিথিলা উপ-ধারা, মহারাষ্ট্রীয় ও দ্রাবিড়ী উপ-ধারা। বারাণসী উপ-ধারা উত্তর ও মধ্য ভারত জুড়ে বিস্তৃত; রক্ষণশীলতা এবং বংশানুক্রমিক বংশধারার কঠোর অনুসরণের প্রতি ঝোঁক ছিল। মিথিলা উপ-ধারা বিহারের কিছু অংশে প্রচলিত; আঞ্চলিক পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত প্রভাবশালী হলেও এর স্বতন্ত্র স্থানীয় প্রথাও স্বীকৃত। মহারাষ্ট্রীয় ও দ্রাবিড়ী উপ-ধারা যথাক্রমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত; সাধারণত নারীদের উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে অধিকতর প্রগতিশীল নিয়মকানুন গ্রহণ করেছিল। বাংলা ও আসাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল মনু ও যাজ্ঞবল্ক্য সহ বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রের সংকলনের জীমূতবাহনকৃত ভাষ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ‘দায়ভাগ’। দায়ভাগের সঙ্গে মিতাক্ষরার তফাৎ এই ছিল যে, মিতাক্ষরা মতবাদ অনুসারে সম্পত্তি জন্মসূত্রে যৌথ মালিকানাধীন হয়, দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে পিতার মৃত্যুর পরেই সম্পত্তির অধিকার উদ্ভূত হয়। মিতাক্ষরা আইনের তুলনায় দায়ভাগ বিধান বিধবাদের পারিবারিক সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে অধিকতর অধিকার দিয়েছিল। নারদ স্মৃতি ছিল অন্য দুজনের থেকেই সর্বার্থে স্বতন্ত্র, কারণ এই স্মৃতিটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে অত্যন্ত বাস্তববাদী। এটিই প্রথম স্মৃতিগ্রন্থ যা প্রায় একচেটিয়াভাবে আইনি প্রক্রিয়া, আদালত এবং বাণিজ্যিক আইনের উপর আলোকপাত করেছিল। এবং তিনটি স্মৃতিশাস্ত্রেই এই বিধান ছিল যে, যদি স্থানীয় রীতিনীতি (চরিত্র বা দেশাচার) সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার চেয়ে প্রাধান্য পাবে। ফলে, মনু ও যাজ্ঞবল্ক্যের প্রকৃত প্রয়োগ গ্রামভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন ছিল, যেখানে জাতি পরিষদ (জাতি) এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠী (শ্রেণি) কঠোর গোঁড়া ধর্মগ্রন্থগুলোকে পরিবর্তন করে স্থানীয় প্রথা প্রয়োগ করত।

এই যে অঞ্চলভেদে ও স্থানভেদে প্রয়োগের ভিন্নতা, যা প্রকৃতপক্ষে এই বিশাল দেশের বৈচিত্র্যের এবং নমনীয়তার উদাহরণ ছিল, হেস্টিংসকে চিন্তায় ফেলেছিল। এই সমস্যার নিরসনকল্পে প্রথমে তিনি একটি বিচারব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিকল্পনা (Judicial Plan of 1772) নেন এবং তারই অংশ হিসেবে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে নবদ্বীপ থেকে আনা ১১ জন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে রেখে তাঁদের দিয়ে জেন্টুদের জন্যে একটি অভিন্ন বিধিবদ্ধ আইন তৈরির কাজ শুরু করেন। মূল সংস্কৃত ধর্মসূত্রগুলি, ধর্মশাস্ত্র অর্থাৎ স্মৃতিগ্রন্থগুলি (বিশেষ করে মনুস্মৃতি) ও মিতাক্ষরা-দায়ভাগ-বিবাদচিন্তামণি ইত্যাদি ভাষ্যের সাহায্যে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাস নাগাদ এইসব পণ্ডিতরা সংস্কৃতে ‘বিবাদার্ণবসেতু’ নামক একটি সংকলন প্রস্তুতের কাজ শুরু করেন এবং শেষ করেন। অতঃপর সেই সংকলনটির মৌখিক বাংলা সংস্করণ থেকে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ ফার্সি ভাষায় একটি ভাষান্তর প্রস্তুত করেন জৈদ-উদ্দিন-আলি-রসাঈ। সেই ফার্সি ভাষান্তর থেকে গ্রন্থটিকে ‘A Code of Gentoo Laws’ নামে ইংরেজি ভাষায় আবার অনুবাদ করেন ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড। ১৭৭৬ সালে গ্রন্থ আকারে আইনটি প্রকাশিত হয়। লক্ষ্যণীয়, এখনো পর্যন্ত কিন্তু ‘হিন্দু’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে না, ব্যবহার করা হচ্ছে ‘জেন্টু’ শব্দ, মূলে পর্তুগিজ ‘Gentio’ শব্দটির নিজেদের ভাষায় ‘জেন্টু’তে রূপান্তর ঘটিয়েছিল ইংরেজরা। যদিও এই দলিলের মুখবন্ধে হ্যালহেড ‘হিন্দু’ শব্দটি বেশ কয়েকবার ব্যবহার করেন, এমনকি ‘হিন্দু রিলিজিয়ন’ শব্দবন্ধটিও তাঁকে একবার ব্যবহার করতে দেখা যায়, কিন্তু মূল দলিলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করেন নি, সর্বত্রই তাঁদের ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়।  

এই সেই ‘জেন্টু আইন সংহিতা’ যা আইনের ব্রাহ্মণ্যকরণ করে কঠোর বর্ণপ্রথার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল, এই সেই ‘জেন্টু আইন সংহিতা’ যা বিভিন্ন স্থানীয় রীতিনীতিকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল এবং সর্বোপরি এই সেই ‘জেন্টু আইন সংহিতা’ যা আধুনিক সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বীজ বপন করে ভারতীয় সমাজের মারাত্মক ক্ষতি করে দিয়েছিল, যে ক্ষতির ফল আমরা এখনো ভুগছি। যে এগারোজন পণ্ডিতকে হেস্টিংস নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই আইনের এমন ব্যাখ্যা করেছিলেন যা তাঁদের নিজেদের অভিজাত মর্যাদার অনুকূলে ছিল। নিজেদের আধিপত্য টিঁকিয়ে রাখার জন্যে এমন সব গোঁড়া প্রথাকে তাঁরা আইনের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যেগুলির কোন প্রকৃত শাস্ত্রীয় ভিত্তি ছিল না। এই ‘অ্যাংলো-ব্রাহ্মণ্যবাদী’ কাঠামোটি নিম্নবর্ণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পক্ষপাতকে বিধিবদ্ধ করে একদা নমনীয় সামাজিক কাঠামোকে একটি অনমনীয়, আইনত বাধ্যতামূলক বর্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে পরিণত করেছিল। জোর করে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি একক, অখণ্ড আইন বলবৎ করেছিল। আইনি কাঠামোকে সম্পূর্ণরূপে অভিজাতদের সংস্কৃত গ্রন্থের উপর কেন্দ্র করে গড়ে তোলার ফলে বিভিন্ন আদি-বাসী সম্প্রদায়, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখদের স্বতন্ত্র স্থানীয় প্রথাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেক সম্প্রদায়ের প্রাক-ঔপনিবেশিক প্রথাগত রীতিতে নারীর সম্পত্তির অধিকার, পুনর্বিবাহ এবং স্বাধীনতার বিষয়ে মাঝে মাঝে নমনীয় ব্যবস্থার অনুমতি ছিল। অত্যন্ত রক্ষণশীল, শতবর্ষ-প্রাচীন গোঁড়া ধর্মগ্রন্থগুলোকে আধুনিক আইন হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে, এই আইন সংহিতা উত্তরাধিকার ও বিবাহ সংক্রান্ত পিতৃতান্ত্রিক রীতিনীতিকে সর্বজনীন করে তোলে, যা সার্বিকভাবে নারীর স্বায়ত্তশাসনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সর্বোপরি এই দলিলে এমন এক প্রশাসনিক কৌশলের আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল যার সাহায্যে জনসাধারণকে দুটি নির্দিষ্ট ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা যায়। ভারতীয় সমাজে ব্রিটিশসৃষ্ট সেই দ্বৈততা হল ওয়ারেন হেস্টিংসের ১৭৭২ সালের বিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ‘কোরান দ্বারা পরিচালিত মহমেডান’ ও ‘শাস্টার দ্বারা পরিচালিত জেন্টু’ (“the laws of the Koran with respect to Mahomedans, and those of the Shaster with respect to Gentoos”)। জেন্টু আইন সংহিতার প্রাথমিক প্রকরণে হ্যালহেডও এই দ্বৈততাকে ন্যায্য বলে মনে করেছেন। 

উপনিবেশিক ইতিহাসের এই পর্বে প্রথম যে প্রাচ্যবিদের সাক্ষাৎ মেলে তাঁর নাম আলেক্সজান্ডার ডাও। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন মিলিটারি অফিসার হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন নাট্যকার, ছিলেন একজন অনুবাদকও। তিনি ফার্সি ঐতিহাসিক ফিরিস্তার লেখা ‘তারিখ-ই-ফিরিস্তা’র ইংরেজি অনুবাদ করেন। ওয়ারেন হেস্টিংস যখন তাঁর ‘বিচারব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিকল্পনা’ তৈরি করছিলেন তারও আগে ১৭৬৮ সালে ডাও তাঁর অনূদিত গ্রন্থের (হিস্ট্রি অফ হিন্দোস্তান) প্রথম খণ্ডে হিন্দুস্তান, ব্রাহ্মণদের ধর্ম ও ব্রাহ্মণ্য দর্শন নিয়ে তাঁর নিজের পড়াশোনা, বোধবুদ্ধি ও উপলব্ধিপ্রসূত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। সেই সময়কার ইয়োরোপে ব্রাহ্মণদের ধর্মকে একটি আদিম বহু ঈশ্বরবাদী বা মূর্তিপূজক ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ডাও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে প্রাচীন ব্রাহ্মণরা এক ও সর্বশক্তিমান পরম সত্তায় বিশ্বাস করতেন। ইয়োরোপীয়রা যে এই কথাগুলো বুঝতে পারেনি তার কারণ হল হিন্দুদের সমস্ত গ্রন্থই সংস্কৃত ভাষায় লেখা, যে ভাষাটা ইয়োরোপীয়দের অজানা। আমাদের যে দেব-দেবীর প্রতি ভক্তিভাব তাকে ডাও সীমিত বুদ্ধি সাধারণ ভারতীয়দের মনে এক ধরনের ‘অধীনস্থ বা গৌণ সত্তা’র (subaltern intelligences) ধারণার শেকড় গেড়ে যাওয়ার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং বলেছেন, বিদ্বান ব্রাহ্মণরা এধরনের নিম্নস্তরের দেবদেবীর অস্তিত্ব স্বীকার করেন না এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলিও তাঁদের মতকেই সমর্থন করে।  

ভারতসহ আরও অনেক দেশেই দুটি ভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায়; একদল যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন, আর অন্যদল প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সমস্ত পবিত্র উপাখ্যান ও রূপক কাহিনীকে অবিচল বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। হিন্দু ধর্মের একটি মূল বিশ্বাস হল—ঈশ্বরই বিশ্বজগতের আত্মা এবং তিনি সমগ্র প্রকৃতিজুড়ে পরিব্যাপ্ত; এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সাধারণ মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান এবং বিশাল সব প্রাকৃতিক বস্তুকে ঈশ্বরেরই অংশ হিসেবে গণ্য করে ও ভক্তি নিবেদন করে। বস্তুত, পরম সত্তার অসীম ও নিরাকার স্বরূপটি সাধারণ মানুষের সীমিত বুদ্ধিতে এমন ভুল ধারণা বা বিভ্রান্তি ছাড়াই অনুধাবন করা কঠিন। বিভিন্ন বস্তুর প্রতি এই ভক্তিভাব নিঃসন্দেহে সাধারণ ভারতীয়দের মনে একধরণের ‘অধীনস্থ বা গৌণ সত্তা’র (subaltern intelligences) ধারণার জন্ম দিয়েছে; অথচ বিদ্বান ব্রাহ্মণরা একবাক্যে এই ধরণের নিম্নস্তরের দেবদেবীর অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এবং তাঁদের প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থসমূহও এই মতকেই সমর্থন করে। (হিস্ট্রি অফ হিন্দোস্তান, প্রথম খণ্ড, ১৭৬৮, আলেক্সজান্ডার ডাও, আ ডিসার্টেশন ইত্যাদি, p.lxviii-lxix) 

******

যাদের এ ধরনের গবেষণার প্রতি ঝোঁক রয়েছে, তারা নিরুৎসাহিত হন মূলত দুটি কারণে: প্রথমত, হিন্দু জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল আধার যে ভাষা, তা আয়ত্ত করা অত্যন্ত কঠিন; দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাঁদের ধর্মীয় মতবাদ ও দর্শনকে এক দুর্ভেদ্য রহস্যের আবরণে ঢেকে রাখেন। (ঐ, p.xxii)

তবে এসবই তিনি করেছিলেন হিন্দুস্তানে ব্রিটিশ শাসন বজায় রাখতে। ঐ বইয়েরই প্রথম খণ্ডের ১৭৭২ সালের সংস্করণে আগেকার খোলনলচে বদলে তিনি শুরুতে ‘হিন্দুস্তানে স্বৈরাচারের উৎপত্তি ও প্রকৃতি বিষয়ক গবেষণাপত্র’এ যুক্তি দেন যে ভারতের জলবায়ু ‘অলসতা ও স্বাচ্ছন্দ্য’ সৃষ্টি করে। সেই কারণেই একটি মুক্ত, প্রজাতান্ত্রিক সমাজ টিঁকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নিরন্তর ও ক্লান্তিকর শ্রমের চেয়ে হিন্দুরা সাধারণত একটি স্থিতিশীল, স্বৈরাচারী সরকারের (এক্ষেত্রে মোঘল ও তার পূর্ববর্তী শাসকরা) শান্তি ও স্থিতিশীলতাকেই বেশি পছন্দ করে। একই সঙ্গে তিনি তৎকালীন বাংলার পরিস্থিতির ব্যাপারেও কিছু কথা বলেন ও বাংলার পুরোনো সমৃদ্ধি ও জাঁকজমক ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা পেশ করেন।

ডাওয়ের নিজস্ব প্রতিবেদন থেকে তিনটে ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা যায়। তাঁর ধারণা অনুযায়ী,

 ১. বাংলার অধিবাসীরা দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের, মুসলমান ও হিন্দু (p.cxliii); 

২. হিন্দু মানেই ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারী এবং হিন্দোস্তানে তারা মুসলমানদের থেকে সংখ্যায় ঢের বেশি (p.xxxv); ও 

৩. ইংল্যান্ডের আইন হিন্দোস্তানে বলবৎ হওয়া দরকার (p.cxliii)।

প্রথম দুটো ধারণার দিক থেকে তিনি তৎকালীন অন্যান্য ব্রিটিশ প্রশাসকদের থেকে একেবারেই আলাদা নন, বরং তিনিই প্রথম, সংখ্যার দিক থেকে ভাগ করে এই উপনিবেশিক ধারণার জন্ম দেন যে হিন্দোস্তানে হিন্দুরা সংখ্যাগুরু ও মুসলমানরা সংখ্যালঘু। শুধু হিন্দোস্তানে ইংল্যান্ডের আইন প্রয়োগ করা নিয়ে তাঁর মতামতের সঙ্গে ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধ ছিল। সে অন্য প্রসঙ্গ।

প্রায় সমসময়ে ১৭৬৭ সাল নাগাদ চার্লস গ্র্যান্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে বাংলায় আসেন। ধর্মপ্রচারমূলক খ্রিস্টধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একজন প্রধান সমাজ সংস্কারক হয়ে ওঠেন এবং ১৭৯২ সালে ‘অবজারভেশনস…’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন, যা ভারতে ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য ধারণা প্রবর্তনের প্রথম রূপরেখা হিসেবে কাজ করেছিল। তিনিই প্রথম ‘হিন্দুইজ্ম্’ শব্দটার জন্ম দেন, 

আমাদের ধারণা অনুযায়ী সত্যটি হল এই যে, খ্রিস্টধর্মের প্রসারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমস্ত আপত্তির মূল কারণ এর বাস্তবায়ন-অযোগ্যতা বিষয়ক কোন বিশ্বাস নয়, বরং বিষয়টির প্রতি এক ধরনের অনীহা। কেউ কেউ এই অজুহাতে এর বিরোধিতা করেন যে হিন্দুইজ্ম্ একটি অত্যন্ত ভালো ব্যবস্থা—অর্থাৎ, অসংখ্য অযৌক্তিক ও জঘন্য প্রথার ভিড়ে যে গুটিকয় নৈতিক উপদেশ সেখানে বিদ্যমান, তা-ই পরকালীন সুখলাভের জন্য যথেষ্ট। আবার অন্যরা রাজনৈতিক বিবেচনার কথা তুলে এর বিরোধিতা করতে পারেন; যেমন—বর্তমান স্থিতাবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিংবা এমন কোনো মনোভাবের উদ্ভব ঘটার ভয়, যা সেই আনুগত্য ও বশ্যতা-বোধকে ধ্বংস করে দিতে পারে, যার ফলে বাংলার অধিবাসীদের শাসন করা এত সহজ হয়েছে। (দ্য লাইফ অফ চার্লস গ্র্যান্ট, ১৯০৪, হেনরি মরিস, আর্লি এফোর্টস ফর মিশন, ১৭৮৩-১৭৯০, p. 110)

এর ঠিক বিরাশি বছর পরে ১৮৭২ সালে নবগোপাল মিত্র কর্তৃক প্রবর্তিত হিন্দুমেলার অংশ ‘জাতীয় সভা’য় ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন রাজনারায়ণ বসু (সে হিসেবে ‘হিন্দুধর্ম’ শব্দটির বয়স মাত্র দেড়শো বছর)। কিন্তু এতে করে উপনিবেশিক শাসকসৃষ্ট ভাষাগত ফাঁদে পা রাখার ব্যাপারটা পাকা হয়ে গেল, ব্রিটিশ সৃষ্ট ‘হিন্দুধর্ম’ শব্দটি আমাদের গায়ে এঁটে বসে গেল। উপনিবেশিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে ভাগ্যের এ এক নির্মম পরিহাস। শাসকসৃষ্ট শব্দগুলো, ধারণাগুলো, আইনকানুনগুলো, আচার-আচরণগুলো, ব্যবস্থাগুলো, শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাদের গায়ে এঁটে বসে যায়। এবং শেষ পর্যন্ত বাকি ঘটনাসমূহ সেই শব্দটিকে সেই ধারণাটিকে ঘিরেই ঘুরপাক খেতে থাকে। একই ঘটনা ঘটেছে ‘নেশন’ শব্দের ক্ষেত্রেও।

হিন্দু-মুসলমান দ্বিমেরুকরণের কথায় আসি। সে সময়, কোম্পানি আমলে, ‘হিন্দু’দের বিষয়ে ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি সুস্পষ্ট ধারায় বিভক্ত ছিল। প্রাচ্যবিদরা প্রাচীন ‘হিন্দু’ সভ্যতার প্রশংসা করতেন, ইভানঞ্জেলিকাল/ইউটিলিটারিয়ানরা সমসাময়িক ‘হিন্দু’ সমাজকে বর্বর হিসেবে দেখতেন, ‘হিন্দু’দের ধর্মকে তাঁরা মনে করতেন ‘ডার্ক আইডোলেট্রি’, আর ব্রিটিশ প্রশাসকদের চেষ্টা হত কাউকেই না চটিয়ে না প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়ে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশটাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাতে করে মুনাফা সংগ্রহে কোনো বাধা দেখা না দেয়। সেই প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা–বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ক্ষেত্রে ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, মাদ্রাজ, বোম্বে ও আসামের ক্ষেত্রে ১৮২০ সালের ‘রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত’ ও উত্তর পশ্চিম প্রদেশ ও পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে ১৮২২ সালের ‘মহালওয়ারি বন্দোবস্ত’ গোটা ভারতবর্ষের আর্থ–সামাজিক কাঠামোটাকে আমূল বদলে দিল। জন্ম হল একদিকে একটি জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির, যারা সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও সম্পদে ও ক্ষমতায় অনেক বেশি শক্তিশালী, অন্যদিকে ঋণভারে জর্জরিত, চরম দরিদ্র ও প্রান্তিক হয়ে যাওয়া বিপুল সংখ্যক প্রকৃত কৃষকদের (রায়তওয়ারির ক্ষেত্রে অবশ্য প্রক্রিয়াটি কিঞ্চিৎ অন্যরকম ছিল)। লক্ষ্যণীয়, জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বেশির ভাগই হিন্দু ছিল।

বাংলার ক্ষেত্রে যেমন, শহুরে হিন্দু বানিয়ানরা, মহাজন এবং বণিকরা, যারা আগে থেকেই কোম্পানির সঙ্গে কারবার করত এবং সেই করে দু’পয়সার মালিক হয়েছিল, তারা লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর ‘সূর্যাস্ত আইন’এর সুবাদে (এই আইন অনুসারে, জমিদাররা নির্ধারিত তারিখে সূর্যাস্তের মধ্যে নির্দিষ্ট কর পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে, তাদের এস্টেটের মালিকানা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নীলামে বিক্রি করে দেওয়া হত) এস্টেটগুলি সস্তায় কিনে নিয়ে জমিদার বনে গিয়েছিল। উচ্চবর্ণের অন্যান্য হিন্দুরা (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য) একই প্রক্রিয়ায় ভূসম্পত্তি অর্জন করে কলকাতায় গিয়ে থাকতে শুরু করে। তাদেরই বলা হয় ‘অনুপস্থিত জমিদার’। তারা খাজনা আদায়ের দায়িত্ব যাদের ওপর অর্পণ করেছিল তারাই মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণিতে পরিণত হয়। এবং কি জমিদার কি মধ্যস্বত্বভোগী উভয় শ্রেণিই উদ্বৃত্ত আয়কে পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা গ্রহণে কাজে লাগিয়েছিল। তারা উপনিবেশিক প্রশাসনের জন্য সমর্থনের এক অনুগত স্তম্ভ হিসেবে কাজ করত, কারণ তাদের সম্পদ ও কর্তৃত্ব সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের উপর নির্ভরশীল ছিল। এ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহনের ভূমিকাও স্মর্তব্য। 

অপরদিকে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত ঘটল। বিশেষত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ক্ষেত্রে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের আগে অব্দি, যখন মোঘল ও স্থানীয় নবাবদের সঙ্গে ব্রিটিশের গা ঘষাঘষি চলছে, ভারতীয় মুসলমানদের ব্রিটিশরা অভিজাত সমকক্ষ ও শাসনের অংশীদার হিসেবে সম্মানের চোখে দেখত এবং তোষামোদ করেই চলত। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর প্রথমত মুসলিম অভিজাতবর্গ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ল এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে পৌঁছে অর্থাৎ ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসকৃত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত-এর অন্তর্গত ‘সূর্যাস্ত আইন’এর ফলে প্রাক্তন অধীনস্থ হিন্দু কর সংগ্রাহকরা স্বত্বাধিকারী ভূস্বামীর মর্যাদায় উন্নীত হয়ে গেল এবং মুসলিম শাসক ও অভিজাত শ্রেণীর হাত থেকে এস্টেটের মালিকানা ও সম্পদ সেইসব হিন্দুদের হাতে চলে গেল। সেইসব রায়তরা যাদের আগে ভূমির ওপর প্রথাগত অধিকার ছিল, রাতারাতি নিছক প্রজায় পর্যবসিত হল। উপরন্তু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলহানি নির্বিশেষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নগদে কর দিতে হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ঋণগ্রস্ততা এবং ব্যাপক গ্রামীণ দারিদ্র্য দেখা দেয়, যাদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যাই ছিল বেশি। এর পরে মুসলমানদের ওপর আরো এক আঘাত এল, যখন ১৮৩৫ সালে মেকলে সাহেবের কুখ্যাত ‘মিনিট অন এডুকেশন’এর প্রস্তাব অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংক অফিসের কাজে ফার্সির জায়গায় ইংরেজিকে আনলেন এবং সেই সঙ্গে ইসলামী আইনি পদগুলোরও চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটালেন। এর ফলে বেশ কিছু মানুষের চাকরি গেল, যারা ফার্সি ভাষা ও ইসলামি আইন জানা থাকার সুবাদে নবাবি দপ্তরে কাজ করতে পারত। ব্রিটিশ বাণিজ্য নীতি প্রায়শই ইংরেজ উৎপাদিত পণ্যের পক্ষে থাকত, যা স্থানীয় বস্ত্র ও হস্তশিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। যেহেতু বহু মুসলিম সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যবাহী তাঁতি অথবা হস্তশিল্পী ছিল এই কাজগুলোর চাহিদা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে তারা কর্মহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। নবাবী আমলে যারা সামরিক ও বেসামরিক সংস্থায় নিযুক্ত ছিল, তারাও কর্মহীন হয়ে যায়। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত ঊনবিংশ শতাব্দীতে কোম্পানির শ্রীবৃদ্ধির সাথে সাথে কর্তৃপক্ষ মুসলিমদের চলাচল, বৈশ্বিক ইসলামী নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় ‘জিহাদ’ আন্দোলন নিয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এর ফলে এই ব্যাপক ভয়ের সৃষ্টি হয় যে মুসলমানরা কোম্পানির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, যার পরিণতিতে ভ্রাম্যমাণ ধর্মপ্রচারকদের ওপর নজরদারি এবং দেশীয় অঞ্চলগুলো অধিগ্রহণ করা হয়। সর্বোপরি, নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী বিজয়কে ন্যায্যতা দিতে এবং ব্রিটিশ শাসনকে মুক্তির দূত হিসেবে তুলে ধরতে, ভিক্টোরীয়রা সচেতনভাবে পূর্ববর্তী মুসলিম শাসনকে স্বৈরাচারী ও পশ্চাৎপদ হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করে। বহু পরে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৭১ সালে ভাইসরয় লর্ড মেয়োর একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ নামে একটি  বই লেখেন এবং সেই বইয়ে তিনি মুসলমানদের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে তাদের বিক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে চিত্রিত করেন এবং ব্রিটিশকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। যদিও তিনিও মুসলমানদের ‘একটি যুদ্ধবাজ শ্রেণি’ এবং ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য এক স্থায়ী বিপদের উৎস’ বলতে পিছপা হননি।

জনগণনা প্রসঙ্গ দিয়ে আপাতত এ লেখার শেষ করি। জনগণনা নিজেই এক বিরাট প্রসঙ্গ, সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রবন্ধ দাবি করে। ব্রিটিশকৃত জনগণনা শুধু ‘হিন্দু ধর্ম’র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় নি, সমস্ত প্রধান ধর্মকে হিন্দু ধর্মের শাখা ধর্মে পরিণত করেনি, ভৌগোলিক পরিচয়ে হিন্দু থেকে তারা হিন্দুদের ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দুতে পরিণত করেনি, এই জনগণনাতেই জাতগুলির বর্ণভুক্তিও তারাই ঘটিয়েছিল। অতসব কথা যেহেতু এই মুহূর্তে লেখা সম্ভব নয়, তাই নিম্নলিখিত সারসংক্ষেপ। 

‘এ কোড অফ জেন্টু লজ’ লেখা শুরু হয়েছিল ১৭৭২ সালে। তার ঠিক একশো বছর পরে এইচ. এইচ. বিভারলির নেতৃত্বে ১৮৭২ সালে আমাদের প্রথম জনগণনা হয়। সেই জনগণনার প্রতিবেদনে ‘ধর্ম’ অধ্যায়ে বিভারলি লিখেছেন,

৩৩৯. ভারত সরকার কর্তৃক জনগণনার ফলাফল প্রদর্শনের জন্য নির্ধারিত ফরমে, জনসংখ্যা সরবরাহ করা হল অর্থাৎ, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য।… হিন্দু শব্দটির কোনো সংজ্ঞা না থাকায়, এটা সম্ভব যে কিছু উপজাতিকে হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদেরকে হয়ত আরও উপযুক্তভাবে ‘অন্যান্য’ শিরোনামের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা যেত। এই ক্ষেত্রে ‘হিন্দু’ শব্দটি একটি দ্বৈত অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা জাতি এবং ধর্ম উভয়েরই পার্থক্য বোঝায়। শব্দটির পুরোনো অর্থ ভারতীয় উৎস ছাড়া আর কিছুই বোঝাত না। ভারতের সমস্ত অধিবাসীকে সাধারণভাবে হিন্দু হিসেবে গণ্য করা হত। যখন এটি একটি ধর্মীয় অর্থ গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। জনগণের সেই বিশাল অংশকে চিহ্নিত করার জন্য যারা মুহাম্মদান ছিল না। যারা মুহাম্মদান ছিল না তারা সবাই হিন্দু। কিন্তু সম্ভবত জাতি সারণীতে আরও সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল, যেখানে ‘হিন্দু’ শব্দটি কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী… 

বিভারলির এই প্রতিবেদনে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, শিখ ইত্যাদি যে প্রধান ধর্মগুলি জনগণনার সূত্রে কিভাবে শাখা ধর্মে পরিণত হয়ে গেল, তার নমুনা স্বরূপ একটি উদাহরণ দেওয়া গেল।

The position of the Gosais is peculiar. They are Brahmans, and they would not eat food cooked by persons of the Baisnab sect. (p. 190)