শিল্পী শৈবাল দাস

শৈবালদা আজ আর নেই। নেই মানে নেই-ই! অনেকগুলো স্বপ্ন অনেকগুলো ভাবনার অবসান হয়ে গেল। সেই কবে থেকে চিনি। সেটা ১৯৭৮ সাল। আমার কলেজের অগ্রজ ছাত্র হিসাবে শিল্পী শৈবালদা ( জন্ম সাল ১৯৫৭ ) ছিল দমদম অঞ্চলের বাসিন্দা। উত্তর কলকাতার নাগরিক জীবনের মধ্যেই তাঁর চলাফেরা বেড়ে ওঠা। ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে তৃতীয় বর্ষেই শিল্প শিক্ষা পাঠ চুকিয়ে দিয়ে শৈবালদা কতকগুলি সাংগাঠনিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। তার মধ্যে পট নামক শিল্পকলার পত্রিকা ও পেইন্টার্স ইউনিটি নামক শিল্পীদল গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং দু’তিন বছরের মধ্যে দল উঠে যাবার পর চিত্রকর নামে শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরবর্তীতে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অন্যান্য নানা শাখা প্রতিষ্ঠান গড়ার ব্যাপারে লেগে পড়ে শৈবালদা। জলরঙ ও তেলরঙ চিত্রচর্চায় ছিল অসাধারণ নৈপূণ্য। সারাটা জীবন ধরে প্রচুর বই, মূলতঃ শিল্প সংক্রান্ত, গান ও সিনেমার ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডি  কিউরিও আর্টিফ্যাক্টস, পট পাটা সংগ্রহ করা থেকে অনুজ শিল্পীদের আঁকা ছবি ও মূর্তি ইত্যাদি কিনত শৈবালদা। চিত্রকর ছিল তাঁর অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান যা প্রায় চারটি দশক অতিক্রম করে তার অবর্তমানে আজও টিঁকে আছে। আশির দশকের শেষদিকে শৈবালদার নেতৃত্বে প্যানআর্ট পত্রিকা প্রকাশ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় শিল্পকলা জগতের অনেক বিশিষ্ট মানুষজনের লেখাপত্র প্রকাশিত হতে থাকে। এমন কি এই পত্রিকাকে সামনে রেখে কতকগুলি শিল্পকলার প্রদর্শনীর আয়োজন হয় এই শহরে। এর পাশাপাশি লুপ্ট-কাল্ট (লেট আস পেইন্ট টুগেদার) নামক আর একটি শিল্পীদের গ্রুপ গঠন ও প্রদর্শনী অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আয়োজন করার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। উত্তর কলকাতার বড়সড় বন্ধুবৃত্ত, কলেজ জীবনের সঙ্গীসাথী বন্ধুদের সঙ্গে অবিরাম সম্পর্ক বজায় রাখত শৈবালদা। প্রবীরদা (প্রবীর মিত্র) ছিল সহপাঠী। বাবুদা (দেবীপ্রসাদ বসু), এরিনার তাপসদা, প্রশান্তদা, টুটূদা, মানসদা, সমীর ও আরও অনেকে — এরা সবাই ছিলেন ঘনিষ্ট। শৈবালদা ছিল উদ্যোগী, কর্মঠ, বন্ধু বৎসল, অভিনব ভাবনার অধিকারী। বিপদে আপদে কারুর পাশে দাঁড়ানো ছাড়াও যে জিনিসটা তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যেত সেটা হলো অপূর্ব সাংগাঠনিক ক্ষমতা এবং আত্মনির্ভরতা। প্রথাগত মধ্যবিত্ত জীবনের ছক বাঁধা ধ্যানধারণার বাইরে গিয়ে কিভাবে নিজের ক্ষমতার জোরে কিভাবে অনেক কিছু গড়ে তোলা যায় তার অনন্য নিদর্শন শিল্পী শৈবালদা রেখে গেছে। এই কৃতিত্ব তাঁরই। এত কিছুর পাশাপাশি তাঁর চিত্রকলা চর্চা অব্যাহত ছিলো।