যোগেন্দ্র যাদব লিখছেন,
‘শাসনব্যবস্থা — আর দীর্ঘদিনের নীরবতা’—আমাকে ভাবাত যে আমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছি— এই আশায় যে আবার দেখব… কিন্তু আজ — যে গণতান্ত্রিক স্পিরিটকে এতদিন চেপে রাখা হয়েছিল, সেটা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে —আমি আবার সম্পূর্ণ বোধ করছি। সাময়িকভাবে হলেও। সোমবার (২০/০৭/২০২৬) দিল্লির রাস্তায় যা দেখলাম, সেটা প্রসেস করতে রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। Vanya Vaidehi Bhargav X-এ যে লাইনগুলো পোস্ট করেছিলেন, তিনি একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, তিনি ঠিকই ধরেছেন কেন ২০ জুলাই ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে মনে রাখার মতো দিন।এই কলামে আমি বহুদিন ধরে বলে এসেছি, আমরা যখন প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ থেকে নির্বাচনী স্বৈরাচারের দিকে যাচ্ছি, তখন বিরোধীদের ভোটের রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে প্রতিরোধের রাজনীতিতে যেতে হবে। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ ঠিক সেই রাজনীতি কেমন দেখতে হয়, তার ৬টা উদাহরণ।
১. সংখ্যা, ঠিক কতজন ছিল কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু আয়োজকরা ১৫,০০-২০,০০০ আশা করেছিলেন, …ড্রোনের ছবি বলছে ১ লক্ষেরও বেশি। মূলত মিছিল হিসেবে শুরু হলেও তারপর সমাবেশ, তারওপর একটা বিশাল জনস্রোত। দুপুরের মধ্যে সংসদ এবং লুটিয়েন্স দিল্লির (Lutyens’ Delhi) প্রায় সব রাস্তা প্রতিবাদকারীদের দখলে। এটা ছিল ভারতের “Occupy” মুহূর্ত। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়: এটা ছিল একদম অর্গানিক। ভাড়া করা ভিড় বা সংগঠনের জৌলুস নেই। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ ছিল প্রায় পুরোটাই স্বতঃস্ফূর্ত যুবকদের, যারা সোশাল মিডিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের খরচে, দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে এসেছে। শেষবার এরকম স্পন্টেনিয়াস মবিলাইজেশন দেখেছিলাম ২০২১ এর কৃষকদের ট্র্যাক্টর মিছিলে।
২. একদম ‘অসম্ভব’ বৈচিত্র্য। একজন বন্ধু একে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বৈচিত্র্য’ বলল। আমি দেখলাম—অরুণাচল প্রদেশ থেকে আসা একজন, হিমাচলের ধরমশালা থেকে একদল প্রাপ্তবয়স্ক, হুইলচেয়ারে বসা স্প্যানিশ ছাত্র, দেরাদুনের মেয়েদের দল, UP, বিহার, MP-র ছেলে-মেয়েরা, এলিট প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জাতীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, “টাইমপাস” কলেজ, আর মুখার্জি নগরের মতো জায়গার ‘এস্পিরেন্ট’রা। মহিলাদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো।এরা আপনার চেনা প্রতিবাদী মুখ না। অধিকাংশই প্রথমবার রাস্তায়। আর তাদের পরিবার কাল পর্যন্ত হয়ত বিজেপিকে সাপোর্ট করত। এটাই শাসককে ভাবাবে।
৩. মূল ইস্যুটা অনেক বড়, হ্যাঁ, NEET বাতিল আর CBSE কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্র ছিল। সন্তান হারানো বাবা-মা ছিল। চাকরির জন্য, নিয়োগ দুর্নীতির শিকার মানুষ ছিল। কিন্তু সরাসরি ভুক্তভোগীর চেয়ে বেশি ছিল ‘সম্ভাব্য ভুক্তভোগী’— যারা বুঝেছে কাল তাদের পালা আসতে পারে, যারা বুঝেছে শিক্ষা-চাকরির ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়েছে।
৪. ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে রাগ শুধু টিপ অফ দ্য আইসবার্গ। আসল দাবী—সমতাপূর্ণ, অর্থপূর্ণ, মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং চাকরির সার্বিক অধিকার। ‘জয়প্রকাশ’ আন্দোলনের পর আধা শতাব্দী পর আবার কোনো যুব আন্দোলন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে জাতীয় এজেন্ডার কেন্দ্রে আনল।
৫. প্রতিরোধের ভাষা নাম-লেবেলের বাইরে সোনাম ওয়াংচুক নিশ্চিতভাবে তাদের হিরো, কিন্তু হিরো-ওয়ার্শিপ Anna আন্দোলনের মতো তীব্র না। যুবকরা CJP ও তার নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু সুস্থ সমালোচনা করতেও পিছপা না। তারা মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কথা শুনেছে, চিয়ার করেছে, কিন্তু একজনের ব্যক্তিত্বে ভোলেনি। এই গণতান্ত্রিক স্পিরিট ভবিষ্যতের জন্য ভালো লক্ষণ।
৬. “Godi media, go back”— স্লোগান মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ন্যারেটিভের বাইরে যাওয়ার রাস্তা যুবকরা খুঁজে পেয়েছে। গত ১ মাস ধরে Noida-র চ্যানেল আর জাতীয় প্রেস যন্তর মন্তরের প্রতিবাদকে এড়িয়ে গেছে, না ব্যঙ্গ করেছে না খারাপ বলেছে।
(I was part of the protest march in Delhi, saw a democratic politics take a new turn,
Yogendra Yadav
The Indian Express, 22/07/2026 রচনার কিছু অংশ)
‘গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা প্রতিবাদ না।
রাষ্ট্র কিভাবে সাড়া দেয় সেটা’
তারুণ্যের প্রতিবাদ-সমাবেশ CJP – Cockroach Janata Party-র ডাকে। হাতে প্ল্যাকার্ড। ‘NEET বাতিল করো’। ‘শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করো’। ‘শিক্ষা বিক্রির জিনিস নয়, অধিকার’। ১২ বছরের জমা ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন, কারণ স্বপ্নের দরজা বন্ধ।
প্রথম কারণ: শিক্ষার বাজারিকরণ —২০১৪-র পর JNU, HCU, জামিয়া, TISS – সব ‘দেশবিরোধী’ হয়ে গেল। ফেলোশিপ বন্ধ। গ্রান্ট কাটা। ফি বাড়ল ৩০%। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইচ্ছে করে রুগ্ন করে দেওয়া হল। যাতে বেসরকারি কোচিং আর কর্পোরেট কলেজ ব্যবসা করতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ: NTA এবং NEET-এর মৃত্যু। NTA তৈরি হয়েছিল স্বচ্ছতার জন্য। আজ সে দুর্নীতির প্রতীক। ২০২৪— ২৪ লাখ ছাত্র। পেপার ফাঁস বিহার, গুজরাট। ১৫৬৩ জনকে ‘গ্রেস মার্ক’। সুপ্রিম কোর্ট। CBI। কিছুই হল না। ২০২৬— ২ লাখ ভবিষ্যৎ ডাক্তার। পরীক্ষার ২ দিন পর খবর: ‘সততা নষ্ট। পরীক্ষা বাতিল’।
The Wire লিখল। The Hindu সম্পাদকীয় লিখল। Indian Express স্টিং করল। কিন্তু জবাবদিহি? শূন্য।
তৃতীয় কারণ: লাশের সারি। সুইসাইড নোটে এক লাইন: ‘লাখ লাখ টাকা নেই। তাই ভবিষ্যৎ নেই’
স্লোগান: ‘যব যব মোদী ডরতা হ্যায়, হিন্দু-মুসলমান করতা হ্যায়’
Parliament Street-এর ৩ নম্বর ব্যারিকেড। ২০০-২৫০ জন ছাত্রছাত্রী বসে আছে। হাতে মোমবাতি, মুখে স্লোগান। দাবী একটাই — সংসদের সামনে ১০ মিনিটের জন্য দাঁড়াতে দেওয়া হোক।
প্রথমে এল ১৫ জন পুলিশ। খাকি ইউনিফর্ম। তার পিছনে ৮-১০ জন সিভিল ড্রেস। মাথায় হেলমেট নেই, হাতে লাঠি। লাঠির মাথায় পেরেক বাঁধানো। অজিত সিং সামনে দাঁড়ালেন। গলা কাঁপছে কিন্তু কথা স্পষ্ট: ‘স্যার, আমরা ৪৮ ঘন্টা অনশনে। বাচ্চা ছেলেমেয়ে আছে। দৌড়াতে পারব না। আমাদের ১০ মিনিট সময় দিন। আমরা শান্তিতে ফিরে যাব।’ উত্তর এল লাঠি দিয়ে। প্রথম বাড়ি অজিতের বাঁ কাঁধে। দ্বিতীয়টা মাথায়। তিনি পড়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে পিছন থেকে “চলো চলো” চিৎকার। টিয়ার গ্যাসের ৩টে শেল। সাদা ধোঁয়ায় ১০ সেকেন্ডে সব অন্ধকার। ১৬ বছরের ‘জন’ দম বন্ধ হয়ে বসে পড়ল। ওর পাশের মেয়েটা বমি করতে লাগল।
ধোঁয়া একটু কাটতেই শুরু হল আসল তাণ্ডব। প্রত্যক্ষদর্শী হাম্মাদ বলেন— ‘যারা মারছিল তাদের মধ্যে ৫ জন ইউনিফর্মে ছিল। বাকি ১০-১২ জন জিন্স, টি-শার্ট। মুখে কাপড় বাঁধা। ওদের হাতে লাঠি ছাড়াও রড ছিল।’ ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সিভিল ড্রেসের লোক হাম্মাদকে পিছন থেকে লাথি মারছে। হাম্মাদ মুখ থুবড়ে পড়েন। তারপর আরও ৩-৪ ঘা পিঠে। আলফাজুরের পা লক্ষ্য করে মারা হল। ‘উদ্দেশ্য ছিল যাতে আমরা দৌড়াতে না পারি,’ সে পরে বলেছিল। মেয়েদের দিকেও লাঠি গেছে। ১৯ বছরের এক ছাত্রী চিৎকার করে বলছিল: “ম্যাডাম আমি মেয়ে”। উত্তর: আরও জোরে লাঠি।
কিছু স্বেচ্ছাসেবক আহতদের Jantar Mantar-এর অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই রাস্তাটাও ছাড়ল না পুলিশ। নরেন্দ্র বলছিলেন— ‘আমরা ৪ জন ধরাধরি করে ‘জন’কে নিয়ে যাচ্ছিলাম। ওর মাথা ফেটে রক্ত। হঠাৎ পিছন থেকে আবার লাঠি। আমার পিঠে, হাঁটুতে লাগল। জনকে ফেলে দিল।’এই সময় শুরু হল ‘উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া’। কালো জিপ। কোনো নাম্বার প্লেট নেই। ৭-৮ জন ছেলেমেয়েকে জোর করে তোলা হল। কোথায় নিয়ে গেল কেউ জানে না। ৬ ঘন্টা পর Parliament Street থানার সামনে ছেড়ে দেয়। ইন্টারনেট বন্ধ। ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ বুথের বাইরে ২ ঘন্টা— সবচেয়ে বর্বর অংশটা এখানে। হাম্মাদ অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন Parliament Street-এর একটা পুলিশ বুথের বাইরে। জ্ঞান ফিরল রাত ২টোয়। চারপাশে কেউ নেই। মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। তিনি উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না।‘আমি ২ ঘন্টা ওখানে পড়ে ছিলাম। ৩-৪ বার পুলিশের গাড়ি গেল। কেউ জল দেয়নি, কেউ হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। শেষে ৩টে নাগাদ ২ জন অটো ড্রাইভার দয়া করে Lady Hardinge-এ দিয়ে এল,’ হাম্মাদ বলেন। অজিত সিং চোখে টিয়ার গ্যাসের জন্য কিছু দেখতে পাননি। প্রায় ঘন্টা ছ’য়েক। ডাক্তার বললেন “Corneal irritation”। Lady Hardinge-এর জরুরি বিভাগে রাত ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ১১ জন ভর্তি। ৩ জনের মাথায় সেলাই। ২ জনের হাত ফ্র্যাকচার। বাকিদের আঘাত।
প্রমাণ লোপাট
ভোরের দিকে পুলিশ এসে রাস্তা ধুয়ে দেয়। রক্তের দাগ, ভাঙা প্ল্যাকার্ড, জুতো— সব তুলে নেয়। CCTV ফুটেজ ‘টেকনিক্যাল কারণে’ পাওয়া যাচ্ছে না বলে থানা থেকে জানানো হয়। সকাল ৭টায় যখন প্রথম আলো ফোটে, Jantar Mantar আবার ফাঁকা।
পুলিশের বয়ান বনাম বাস্তবতা
সরকারি প্রেস নোট: ‘বেআইনি জমায়েত। নিয়ম মেনে ন্যূনতম বলপ্রয়োগ। ১০ জনকে প্রতিরোধের জন্য আটক। কেউ গুরুতর আহত নয়।’
বাস্তবতা: লাঠি: সাধারণ লাঠি না। পেরেক বাঁধানো, রড। টার্গেট: যারা জল বিলি করছিল, যারা আহতদের ধরছিল তাদেরই বেশি মারা হয়েছে। সিভিল ড্রেস: পুলিশ অস্বীকার করলেও ৭টা আলাদা ভিডিওতে সিভিল ড্রেসের লোকদের মারতে দেখা গেছে। চিকিৎসা: “কেউ গুরুতর নয়” বলা হলেও Lady Hardinge-এ ২ জনকে ২৪ ঘন্টা observation-এ রাখতে হয়।
The Indian Express-এর প্রথম পাতা: “Day after injured, back at Jantar Mantar protest site: ‘Weak in body, not in resolve’
এই সনয়কালের তিনটে প্রশ্ন তুলেছেন ওঁরা
প্রশ্ন ১: সমাবেশের অধিকার — সংবিধানের ১৯(১) (বি) । শান্তিপূর্ণ সমাবেশ মৌলিক অধিকার। সরকারের দয়া না।
প্রশ্ন ২: সংসদের ভূমিকা—রাস্তায় যখন লাঠি চলছে, তখন লোকসভা-রাজ্যসভায় আলোচনার নোটিশ খারিজ হচ্ছে। শশী থারুর লিখলেন: “যে রাষ্ট্র নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে ভয় পায়, সে নিজের কথার উপর আস্থা হারিয়েছে”
প্রশ্ন ৩: রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া— ৫৯ বছরের সোনাম ওয়াংচুককে “চিকিৎসার” নামে তুলে নিয়ে যাওয়া। বিরোধী সাংসদকে আটক। এটা সংলাপ না। এটা ভয়।
দিল্লি থেকে কোটা, পাটনা, কলকাতা—আগুন ছড়াল। কোটা: ১০ হাজার ছাত্র। কোচিং বয়কট। “No Paper Leak. No Death”। ১২ জন আহত।
পাটনা: রেল অবরোধ। ‘পরীক্ষা দেব। সিট কিনব না’।
কলকাতা, কলেজ স্কোয়ার: মোমবাতি মিছিল। পুলিশ বলল ‘অনুমতি নেই’।
মুম্বাই: মেডিকেল ছাত্ররা কালো ব্যাজ। ‘আমরা ডাক্তার হতে চাই, দালাল নয়’।
মিডিয়া: কে কথা বলবে? জাতীয় টিভি:৩০ সেকেন্ড। পাশে ‘ডিজিটাল শিক্ষা’”র বিজ্ঞাপন।
ছাত্ররা নিজেরাই মিডিয়া হল। WhatsApp, X, Instagram।
পোস্টার: ‘এটা পরীক্ষার লড়াই না। এটা স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই’।
আমরা আরশোলা। গ্যাস দিলে কাশব। মারলে উঠব। ব্যান করলে নতুন একাউন্ট খুলব।
আমাদের দাবী:
১. সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে SIT তদন্ত
২. শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক পদত্যাগ
৩. শিক্ষাকে পাবলিক গুড হিসেবে ঘোষণা
শেষ লাইনটা অজিত স্যারের: ‘সরকার চুপ। কিন্তু আমরা ছাত্রদের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।’
মঙ্গলবার (২১/০৭/২০২৬) যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থলে ফিরে এলেন অনেকে— ৩০ বছরের অজিত সিং থেকে ২১ বছরের আলফাজুর মহম্মদ, ১৮ বছরের জন থেকে ২২ বছরের নরেন্দ্র, ৩০ বছরের হাম্মাদ। কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন, কারও হাতে-মাথায় টাটকা ব্যান্ডেজ। স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের ছোট করে দেওয়া মঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যেটা এখন অস্থায়ী ত্রাণ শিবির।
অজিত সিং, ৩০ পশ্চিম বিহারে থাকেন। B.Ed এর ছাত্রদের কোচিং করান। সোমবার রাতে Lady Hardinge Hospital থেকে ছাড়া পেয়েই আবার প্রতিবাদে যোগ দিতে এসেছেন।
আলফাজুর মহম্মদ, ২১ গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ৩ দিন আগে ট্রেনে দিল্লি এসেছেন। পায়ে চোট নিয়েও তিনি আবার প্রতিবাদস্থলে ফিরেছেন।
জন, ১৮, সোমবার যন্তর মন্তর থেকে ফেরার সময় লাঠির আঘাতে মাথায় ব্যান্ডেজ। সে বলে— ‘আজ যদি লড়াই না করি, তাহলে দেশ ছেড়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
নরেন্দ্র, ২২, হরিয়ানায় একটি জেনারেল স্টোরে কাজ করেন। সোমবার Parliament Street-এ মিছিলের সময় পিঠ, হাঁটু ও হাতে চোট পান। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় Lady Hardinge Hospital থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা প্রতিবাদস্থলে চলে আসেন। হাম্মাদ বলেন— ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো বদল দেখছি না। তাই বদল চাইতেই এখানে এসেছি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরে আসব।’
(সংবাদসূত্র: The Indian Express, 22/07/2026)
উদিত মিশ্র এক লেখায় জানালেন
গত তিন দিন ধরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর যথেষ্ট মনোযোগ কেড়েছে। কারণ তথাকথিত “Cockroach Janata Party”-র নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু হতাশ যুবক সেখানে জড়ো হয়েছে। তাদের দাবি কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ২০২৬ NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এই পরীক্ষা দেয়। এটাই প্রথমবার নয় যে NEET-এর প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, আর এটাই একমাত্র পরীক্ষা নয় যেখানে এমন ঘটনা ঘটেছে। রিপোর্ট বলছে গত এক দশকে ভারতে হওয়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্যে ১৫০টির বেশি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে কারণ এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে জবাবদিহির অভাব। The Indian Express-এর সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানে গত দুই দশকের ৪৫ টি বড় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষায় অন্তত ১ লক্ষ আবেদনকারী ছিল। এই ৪৫ টির মধ্যে মাত্র দুটি মামলায় দোষীদের সাজা হয়েছে। বেশিরভাগ মামলাই হয় আইনি জটিলতায় আটকে আছে, নয়তো একদম বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, পরীক্ষা ফাঁসের অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই এখন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার প্রতিনিধি।…Union Budget-এ শিক্ষা মন্ত্রকের জন্য বাজেট বরাদ্দ পরীক্ষা করা যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো বড় মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়বেই। কারণ একই জিনিস ও পরিষেবার দাম বছরে বছরে বাড়ে, অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি। কোনো মন্ত্রক বা দপ্তর নীতিগতভাবে গুরুত্ব হারালো নাকি বাড়লো সেটা বোঝার মাপকাঠি হল মোট বাজেটের কত % তারা পাচ্ছে।… এই বিশ্লেষণে শেষ অর্থবর্ষ পর্যন্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্যের শুরুর বছর ২০০৯। কারণ Centre for Monitoring Indian Economy-র Economic Outlook মডিউলে ওই বছর থেকেই তথ্য পাওয়া যায়। তথ্য জোড়া দিলে প্রথম ১২ বছরের NDA সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রকের আপেক্ষিক গুরুত্ব, বা গুরুত্বের অভাব, স্পষ্ট হয়ে ওঠে। … ২০০৯-১০ সাল থেকে Union Budget দেখলে স্পষ্ট যে গড়ে প্রতি বছর মোট বাজেটের আকার ১০.৪% করে বেড়েছে। এর মানে সরকার প্রতি বছর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বেশি খরচ করেছে। ফলে বেশিরভাগ মন্ত্রক ও দপ্তরের বাজেট বরাদ্দও বেড়েছে।… ফোকাস হল মোট বাজেটে সেই মন্ত্রকের অংশ বেড়েছে, কমেছে, নাকি একই আছে।… শিক্ষা আগে ছিল মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। এই মন্ত্রকের অধীনে থাকা দুটি দপ্তরের অংশও দেখা হয়েছে: School Education এবং Higher Education। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক এই দুটি মন্ত্রকের তথ্য প্রসঙ্গত এসেছে। কারণ সাধারণ মানুষজন স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দাবি করে আর রাস্তা ও মহাসড়ক বৃদ্ধির মডেলকেও তুলে ধরে। তথ্য দেখাচ্ছে যে Union Budget-এ শিক্ষা মন্ত্রকের অংশ ২০১৩-১৪ সালে ছিল ৪.৬% (কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UPA সরকারের শেষ বছর)। সেটা ২০২৫-২৬-এ নেমে হয়েছে ২.৫%। অন্য কথায়, PM মোদী ক্ষমতায় আসার আগে শিক্ষা মন্ত্রকের যে অংশ ছিল, এখন তা তার অর্ধেক। বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা — দুটি দপ্তরের ক্ষেত্রেই আপেক্ষিক অংশ কমেছে। School Education দপ্তরের অংশ ১২ বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। শিক্ষা মন্ত্রকের বাজেটের অংশ ২০১৩-১৪-এ ৪.৬% থেকে কমে ২০২৫-২৬-এ ২.৫% হয়েছে। রাস্তা ও মহাসড়ক তৈরিতে অর্থের অংশ গত ১২ বছরে প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৫.৮% হয়েছে।… এই সব তথ্য থেকে যে ছবি উঠে আসে তা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেইথের কথারই প্রতিধ্বনি করে: ‘আমি জিনিসের উপর বেশি বিনিয়োগ এবং মানুষের উপর কম বিনিয়োগ করার আমাদের যে প্রবণতা তাই নিয়ে চিন্তিত।”
(সরকার কোথায় টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নিল/উদিত মিশ্র, CMIE, Indian Express Research ২২/০৭/২০২৬)
NEET এবং শিক্ষার উপর এক পদ্ধতিগত আক্রমণ
ডি রাজার লেখায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে, তাদের শিক্ষানীতি তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত লক্ষ্য দ্বারা চালিত হয়েছে: শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং কেন্দ্রীকরণ। ফল হয়েছে পাবলিক শিক্ষার পদ্ধতিগত দুর্বলতা এবং পরীক্ষা, নিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অভূতপূর্ব সংকট। ধর্মেন্দ্র প্রধানের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা মন্ত্রক এই ব্যবস্থায় আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র রাস্তায় নেমেছে, তার পদত্যাগ দাবি করছে। কর্মীরাও ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অনশনে বসে জবাবদিহি চাইছেন। আক্রমণ শুরু হয়েছিল দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দিয়ে; জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিল।
সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র ও শিক্ষকদের নিয়মিতভাবে ‘দেশবিরোধী’, ‘টুকড়ে-টুকড়ে গ্যাং’ বা ‘আরবান নকশাল’ বলে চিহ্নিত করা হত। এর সঙ্গে ছিল পাবলিক শিক্ষার উপর আর্থিক চাপ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনুদান কমা, ফেলোশিপে দেরি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং ফি বাড়ানোর চাপের কথা জানিয়েছে। বিজেপির শিক্ষানীতির প্রথম স্তম্ভ ছিল পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করা। দ্বিতীয় স্তম্ভ হল পরীক্ষা ও নিয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতার পতন। আর এই পতনের প্রতীক হল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি – NTA। NEET সংকটই এখন মূল উদাহরণ।
২০২৪ সালে— ২৪ লাখের বেশি প্রার্থী পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পেপার লিকের অভিযোগ, ১৫৬৩ জনকে বিতর্কিতভাবে গ্রেস মার্ক দেওয়া, একাধিক ‘পারফেক্ট স্কোর’, দেশব্যাপী প্রতিবাদ, CBI তদন্ত এবং সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ানোয় পরীক্ষা ব্যবস্থার উপর জনআস্থা ভেঙে পড়ল। NEET-UG ২০২৬— প্রায় ২ লাখ ভবিষ্যৎ ডাক্তারকে নিয়ে হওয়া পরীক্ষাটি বাতিল করতে হল কারণ পরীক্ষার সততা নষ্ট হয়েছিল। শুধুমাত্র NEET এবং NTA সংকটের মাত্রাই—প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে। প্রতিটি বাতিল পরীক্ষার পিছনে একটা মানবিক খরচ আছে। প্রতিটি বাতিল পরীক্ষার পিছনে আছে বছরের পর বছর প্রস্তুতি, পরিবারের সঞ্চয় এবং আবেগের বিনিয়োগ— যা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। ভারত বারবার দেখেছে পরীক্ষার চাপ ও নিয়োগের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছাত্রদের আত্মহত্যার হৃদয়বিদারক খবর।
