আমার প্রুফ্রক, আমি-প্রুফ্রক

(‘The Love Song of J. Alfred Prufrock’  T. S. Eliot)

একটি ব‍্যক্তিগত পাঠ

সেই যখন গ্রাম থেকে শহরে এলাম ইংরিজি পড়তে… তখন সবে নিয‍্যস বুঝলাম সব আসলে ওলোটপালোট; অক্ষর আর তার উচ্চারণ উড়ে বেড়াচ্ছিলো আমার চারপাশে… John Keats এর কবিতা পাঠ‍্য ছিল, ছিল ‘La Belle Dame sans Merci’; পড়তে গিয়ে ঠোক্কর, পড়ছিলাম একে একে, আমার পালা শেষ স্তবক, ‘And that is why I sojourn here’— পড়তে গিয়ে শব্দকল্পদ্রুম… আমার স‍্যার বললেন, উচ্চারণ শিখতে হবে আগে… এবার আমি এক আহত সমুদ্রে ফুটো নৌকায় একমাত্র অর্ধমৃত নাবিক, হাতে শুধু গোধূলি-আধুলি… হাঁসফাঁস ডোবা-ভাসা, পায়ের নীচে বালি পাওয়ার জেদ… বালি সরে গেলে ফের হাবুডুবু, জল-খাওয়া, আর ফেরত-সাঁতার, শুধু কবিতার কাছে হাঁটু-ছেঁচা মাটি চাওয়া…

জন কীটস, বা শেলী, ভালো কবি, অমর কবি, কিন্তু আমি তো ফুটো নৌকার যাত্রী, ভাল্লাগেনা অমরত্ব, আমি তো বুঝিই না —

‘Now more than ever seems it rich to die,

To cease upon the midnight with no pain’

 (‘Ode to a Nightingale’; John Keats)

কীভাবে আশ্লিষ্ট হতে হয়,  এভাবে ‘নেই’ হয়ে যেতে হয়, আমি তো চিনি না…

সে যাগ্গে যাক…মোদ্দা কথা হলো যে, আমি তখন ক্ষুধার্ত, খিদে পেলে মরে যাওয়ার সময় থাকে না কখনো; আমার চারপাশে তখন শব্দ, না-বোঝা শব্দ, উড়ে বেড়াচ্ছে, প্রতিটি উড়ন্ত শব্দের দাঁত আছে, কামড়াচ্ছে আমাকেই, ভাল্লাগছে না কিচ্ছু…

এমন এক— এখনকার মতো— ভাল্লাগে-না সময়ে পড়লাম,

‘Let us go then, you and I,

When the evening is spread out against the sky

Like a patient etherized upon a table;’

মনে হলো এই সেই ভাষা যা আমার শিকার পরাজয়, আমার সবুজ হলুদ ঘর; এলিয়টের ঘোরে পড়ে গেলাম…  বিদগ্ধজনের লেখায় জেনেছি এই ছিল বিংশ শতকের কবিতার নিজেকে আবিষ্কারের মুহূর্ত… আমি কি ছাই অতোকিছু জানি! আমার ছিল প্রুফ্রক, এক উটকো লোক, এক না-আমি যে বলতে পারে 

‘I grow old… I grow old…

I shall wear the bottom of my trousers rolled’ 

কেননা যখন পড়ছি তোমার আমার কমবয়সী মেঘ অথচ আমারো প‍্যান্ট গোটানো থাকতো কারণ বৃষ্টিতে জল আর শুকোলে ন‍্যাষ্টি কাদা অথচ আমার ইচ্ছে হাঁটবো পথের সঙ্গে ঘরে পৌঁছবো বলে, ‘বিষাক্ত জলাভূমি’ বা ‘চূণ লবণের খাদ’ না, হলুদ কুয়াশা-জর্জর ক্লান্ত এক নগর পেরিয়ে যাব বলে—

The yellow fog that rubs its back upon the window-panes,                    

The yellow smoke that rubs its muzzle on the window-panes,  

Licked its tongue into the corners of the evening,  

Lingered upon the pools that stand in drains,   

Let fall upon its back the soot that falls from chimneys,  

Slipped by the terrace, made a sudden leap, 

And seeing that it was a soft October night,   

Curled once about the house, and fell asleep. 

কিন্তু ঘরে ফেরার পথে শুধু তো কুয়াশা থাকে না, পথ নিজেই পিছু নেয় নাবিকের, 

‘… like a tedious argument

 Of insidious intent’, 

এবং তার সব ‘sawdust restaurants with oyster-shells’— জীবন্ত ঝিনুক-খোল গানের জন্মভূমি যতক্ষণ না সে শহর-খাদ‍্য হয়ে যায় আর নিয়নভূমির এঁদো উল্লাস তাকে রেস্তোরাঁয় দেওয়াল-সজ্জা করে দেয় — এবং সব সাজানো সাজানো ঘর যেখানে 

‘… the women come and go

 Talking of Michelangelo’, 

সব পেরিয়ে আমি যদিও বা বাড়ি ফিরে যেতে পারি কিন্তু প্রুফ্রক ফিরবে কীভাবে এবং কোথায়? ওর তো ছিল মাইকেলেঞ্জেলো ঘরে আনকা আড়াল খুঁজে লুকিয়ে থাকা, কী হবে ওর যদি শীত করে খুব? কী হবে ওকে যদি বাদ দিয়ে দেয় লিস্ট থেকে? এলিয়টের ওপর খুব রাগ হয়…

আমার বাড়িই বা কোথায়? সেই যে শহর থেকে লন্ঠনজ্বলা অন্ধকারে যাওয়া– প্রুফ্রককে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও… অথচ ওর কোনো ভ‍্যালিড ডকুমেন্ট নেই, শুধু আত্ম-অপনোদন, শুধু বারে বারে ফিরে ফিরে চাওয়া, আর নিজের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার নাদান আমিত্ব।

জানি, প্রুফ্রক জানতো ঐ আলো-জ্বলা ঘরের সুবেশা রমণীরা আসলে মুখোশ-বিলাস, জানতো, 

‘There will be time, there will be time

To prepare a face to meet the faces that you meet;’…

ঐ মাইকেলেঞ্জেলো-বলা মুখোশ-নারীরা ঘরে আসতেই থাকে ওদের সুগন্ধি-অশরীর উড়তেই থাকে প্রুফ্রক আর আমার ভুল-দশানন ঘিরে আর ধীরে ঘনিয়ে আসে এক অনিবার্য নির্বাচন মুহূর্ত, 

‘And indeed there will be time 

To wonder, “Do I dare?” and, “Do I dare?’… 

এক অতীত-ঈগলের ছুমন্তর ছোঁ, আর আমাদের অনিবার্য existential choice —

‘Time to turn back and descend the stair,

With a bald spot in the middle of my hair’…

উপরে যে আছে সে আমাদের নেমে আসতে বলে, ফিরে আসতে বলে, বলে

‘… যা চাও দেবো

শুধু ফিরে যাও, ফিরে যাও, যে যার ঘরে’, 

আর উপরে এতো হাওয়া যে আমার যত্ন করে সজ্জামোহন কেশবাস এলোমেলো হয়ে যায় লুকানো টাক বেরিয়ে পড়ে আর তোমরা তো জানোই আমি টাক আর মেরুদণ্ড খুব অপছন্দ করি কেননা আমারও তো ইচ্ছে করে…

প্রুফ্রক আমার, এবং হয়তো আপনার, অসুখ এবং শুশ্রূষা—

‘For I have known them already, known them all: 

Have known the evenings, mornings, afternoons 

I have measured out my life with coffee spoons; 

I know the voices dying with a dying fall 

Beneath the music from a further room.’

অনুষঙ্গে বেজে ওঠেন অরুন্ধতী রয়, যিনি বলছেন ‘Mother Mary Comes to Me’ গ্রন্থে, ‘On the occasions when I am toasted or applauded, I always feel that someone else, someone quiet, is being beaten in the other room’, 

মনে হয় আমাদের সমবেত চৈতন্য-যাত্রা এক দীর্ণ সাঁকো বেয়ে যার বিস্তার অতীত থেকে দিনান্ত অবদি, যার প্রতিটি মুহূর্ত জায়মান বর্তমান

কিন্তু আমার কী হবে এখন? আমি তো দেখেছি আমার সহজ দিগন্তলোভী গ্রাম যার অনন্তপশ্চিমে বৃষ্টিতে সমুদ্র আর শরতে আকাশ-উদাস ‘বিপুল তরঙ্গ’ মাখা সূয‍্যিডোবা মাঠ কিন্তু ফিরবো কীভাবে সেই জন্মমাঠে? ফিরতে তো হবে প্রুফ্রককে নিয়ে, এক রাংতা-শহর আর তার অন্তর্গত এক ওয়েস্ট ল‍্যাণ্ড পেরিয়ে, কে দান্তে হবে আমাদের কে-ই বা বীয়াত্রিচে? ওকে বললাম তোমার শহর ছেড়ে একবার আমার গ্রামে এসো… তোমাকে দেবো ম‍্যাজিক-সবুজ চোখ, তুমি দেখবে সজ্জাবিহীন এলোমেলো মাঠে কীভাবে মাইকেলেঞ্জেলো-ছবি ফোটে ফুলের মতো ধানের বুকের দুধের মতো… ও বললো, 

‘I have known the eyes already, known them all— 

The eyes that fix you in a formulated phrase

And when I am formulated, sprawling on a pin,

When I am pinned and wriggling on the wall, 

Then how should I begin

To spit out all the butt-ends of my days and ways?’.

হেলেবেলে প্রুফ্রক বুঝতেই পারলো না আমি আর ও একই… আমিও তো তালিকা মেলাই, নিজের আগুন মাড়িয়ে নেভাই নিজেকে, লুকিয়ে থাকি, নিজেকে সন্তর্পণে গুটিয়ে আনি ‘আমি আছি’র সরকারি আড়ালে… প্রুফ্রক যেন ‘ক্রমে সরে-সরে’  যাচ্ছিল আমার থেকে নিজের ‘নেই’ থেকে ফন্দি আর সন্ধির যে যুগল মালিন‍্য ‘তারো দূরে’… 

নিয়নজ্বলা প্রতিটি গলিপথ চেনে প্রুফ্রক, চেনে সব কুকুর-কুণ্ডলী ধোঁয়া যে কখনো শুয়ে থাবা চাটে কখনো লাফিয়ে ওঠে  কেননা কিছু আলো হয়তো জ্বলে আছে এই অসময়েও, জানে সমস্ত একাকী মানুষের গবাক্ষ-যাপন, তাই ওর মনে হয়, 

‘I should have been a pair of ragged claws 

Scuttling across the floors of silent seas’… 

প্রুফ্রক তো সেক্সপীয়র পড়েছে তাই জানে এ জগৎ এক রঙ্গমঞ্চ আর প্রতিটি প্রুফ্রক এক শহর-নির্মিত অভিনেতা। প্রুফ্রক জানে অনেক অনীহা-মুহূর্ত দিয়ে তৈরী আমি-প্রুফ্রক, আপনি-প্রুফ্রক সব-প্রুফ্রকের বেঁচে উঠতে হলে বিরাগ থেকে সংঘাত অবদি এগোতে হয়,  ক্ষণকে উদ্ধার করতে হলে তাকে দাঁড় করাতে হয় তারই অন্তর্লীন সঙ্কটের মুখোমুখি, কিন্তু মুহূর্ত কি মুহূর্ত-মানুষকে এতটা পোঁছে?— 

‘Should I, after tea and cakes and ices

Have the strength to force the moment to its crisis?’…

ফলে ক্রন্দন উপোস আর প্রার্থনা দিয়ে বাঁচতে থাকি প্রুফ্রকরা, নিজের ছিন্নমুণ্ড থালায় নিয়ে নিবেদন করি ছিন্নমস্তাকে…  

‘But though I have wept and fasted, wept and prayed

Though I have seen my head (grown slightly bald)brought in upon a platter,

I am no prophet — 

and here’s no great matter;’… 

সেই সেদিন থেকে আজ এখন—একই সেই মৃত্যু-যাপন, নাহলে প্রুফ্রক তোমার-আমার না-বন্ধু হয়?

প্রুফ্রক, এবার তোকে বলতে হবে আমাকে যে প্রুফ্রক বানালি সে কি আমি-প্রুফ্রক না তুই-প্রুফ্রক! কেননা, আমার এখন মনে হয় যদি বলতাম আমরা যতটা জানি, মৃত নগরীর পুনর্জন্ম-লাগা মৃতরা যতটা জানে ততটা নাহয় একটু আগুপিছু করেই বলতাম তাহলে কেমন হতো– আমারও তো কোনো বিলোল সন্ধ্যায় দ্বিধাথরোথরো ইচ্ছে হয় বলেই দি—

“Would it have been worth while, 

To have bitten off the matter with a smile,

To have squeezed the universe into a ball  

To roll it towards some overwhelming question,  

To say, ‘I am Lazarus, come from the dead,

Come back to tell you all, I shall tell you all—, 

ঠিক সেই সময় আসল-প্রুফ্রক বন্ধু-প্রুফ্রক যে চেকভের নাটকের কোনও চরিত্র হতেই পারতো যে জানে যে-কোনো সাজানো মঞ্চে প্রতিটি দ্বন্দ্বের নিরসন-মুহূর্তে মঞ্চের অধিকার নেয় তাসের রাজার মন্ত্রীসান্ত্রীপারিষদরা, সেই মাইকেলেঞ্জেলো-লাগা ঘরের কসমেটিক রমণীরা, অমীমাংসিত রয়ে যায় সব অনপনেয় প্রশ্ন, 

“If one, settling a pillow by her head

Should say: ‘That is not what I meant at all;

That is not it, at all'”…

এবং যে বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ শহরের নিজস্ব স্বাক্ষর, ‘I shall tell you all’ থেকে ‘That is not it, at all’ অবদি বিস্তীর্ণ সেই যাপন-তামাশা উঠে আসে কবিতার শব্দ-শরীরে, Bathos হয়ে; ‘Do I dare disturb the universe’-এর সুরে (বা বেসুরে) প্রুফ্রক বলে ওঠে, “Do I dare to eat a peach?”

প্রুফ্রক তবে কী করবে এখন? সাজঘরে রাজা বা ল‍্যাজারাস হওয়া তো ওর ভাগ্যে নেই তাই বেরিয়ে পড়বে আমার সঙ্গে আমার সুয‍্যিডোবা মাঠে যাবে বলে; সেখানে যাবার জন্য আগে, নষ্টভূমি(Waste Land) পেরোনোরও আগে, ওকে তো সমুদ্রে নামতে হবে, যদিও মৎসকন‍্যা-বিলাস ওর জন্য নয় তবুও তো সমুদ্র-আগাছারাও সমুদ্রের পরী তাদের লালনীল মায়া তো প্রুফ্রককেও, হয়তোবা প্রুফ্রককেই, স্বপ্ন দিয়ে ঘিরে রাখবে যতক্ষণ না মানুষের কন্ঠস্বরে স্বপ্ন ভেঙে যাবে আর তারপর ডুবে যেতে হবে সেই সমুদ্র সবুজে নিজের সবটুকু ‘কিছু-না’ নিয়ে—    

“I have heard the mermaids singing, each to each.

I do not think they will sing to me.

I have seen them riding seaward on the waves

Combing the white hair of the waves blown back

When the wind blows the water white and black.We have lingered in the chambers of the sea 

By sea-girls wreathed with seaweed red and brown 

Till human voices wake us, and we drown.”    

এলিয়টেরই কথায়, ‘After this, silence’…