মৌসুমী রায়-এর গুচ্ছ কবিতা

শব্দেরা যদি সাজঘরে যায়!

আসলে তোমার বলবার কিছু নেই।
নতুন কোন কথা,
অণুগল্প বা দীর্ঘকবিতা।
শব্দেরা সুদোকুতে ক্লান্ত এখন।

থামাও জাগলারি।
জানো, মানুষ বুঝতে শিখেছে
অবশেষে…

নদীর তীর ধরে সূর্যাস্ত বরাবর হাঁটতে জানলেই
গল্প হয় না, কবিতাও না।
তোমার সাজঘরে সেই পোষাক কি আছে?
যা পরিয়ে দিলে শব্দদের গল্প বা কবিতার মত দেখায়?

ঝরা বকুলের মান্দাস

বারুদের অমন গন্ধ পছন্দ নয় তোমার?
কিন্তু ওটাই এখন ট্রেন্ড।

তবে কি খোঁপায় গোলাপ সাজিয়ে সেই মোহব্বতের দিনকালের মত,
গলির অন্ধকারে অপেক্ষা করবো?
তুমি ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে উদ্ধার করবে পাষাণী কে!

ভিতরের মানুষ অনেকদিন মরেছে।
পচা মাংসের গন্ধ টের পাওনা?
তোমাকে কি সুরভিত ডিও ঘিরে থাকে?
জানো, বৃষ্টি শেষে এক আঁচল বকুল ফুল কুড়িয়েছিলাম।
কাকে দেব?

…বরং নদীতে ভাসিয়ে দিলাম উজানী স্রোতে।
কালচে রক্ত, ফুলে ওঠা শব,শেলের ফাঁপা খোলস এড়িয়ে,
দিব্বি দুলে দুলে ঝরা বকুলের মান্দাস হয়তো জীবনের দিকেই চললো…

খেলা ভাঙার পরে

চলে যাব চুপচাপ খেলা ভেঙে
সাগরের ঢেউ আদুল বুকে
কুয়াশা আদর আলজিভ শুষে
চাঁদের মীনার যখন তীক্ষ্ণ জেগে ওঠে
এক ফালি কোজাগর রাত মধ্যযাম
ক্ষয়ে এলে জীর্ণ শরীরের মোম
আলোর ফুলকি দাবানল হয়
সব কৌমার্য্য চিহ্ন ভষ্ম হবার আগেই
অন্তরঙ্গ চিতা নিভিয়ে দেব এক ফুঁয়ে
দগ্ধ নাভিকুণ্ডলী নির্লিপ্ত হাত
ক্ষুধা তৃষ্ণা ভয় কাম লোভ মোহজাল
ভাঙা শাঁখা সিঁদূরের ভান
শুধু আবছায়া জলছাপ
বিরহ বাঁশীর অবশ্যম্ভাবী সোহাগ মুছে
রাধিকা আয়ানের ঘরে ফেরে
মিথ্যে আলোর ফুলকি পিছু পিছু
রাতচরা চাঁদ ঝুপ করে ডুবে যায় উপেক্ষায়
তারপর অতর্কিত ছায়া সরে গেলে
চলে যাব চুপচাপ নিঃশব্দ বৈঠায়
বিপরীত কোন অসময়ের স্রোতে
কোন অপেক্ষা আমার জন্য নেই…

হাওয়ামোরগ

তুমি কি এখনো ঘন ঘন বদলাও ডিপি!
এখনো তুমুল বৃষ্টির চিলেকোঠা ঘরে
বসন্তবাহার নামে শরীরে তোমার?

কস্তুরী গন্ধ নাভিমূলে পথ হারায় কিশোর প্রেমিক?
হঠাৎ রেগে উঠে ভেঙে ফ্যালো কৃষ্ণচূড়া
ফুলদানি?
এখনো ও কি ঈশ্বরীপাটে
দোলের সংকীর্তন শেষে, ঘরে ফিরে
চুপিসারে আয়নায় দেখো
আবীরে রাঙানো সিঁথি?
বসন্তবিকেল ছাদ বাগানে গুনগুনিয়ে ভ্রমর শুনিয়ে যেত গান
শিমূলের এলোমেলো ফুলগুলো
তোমার কোলে আনমনে লুটোপুটি
সন্ধের সেই ফুচকার গাড়ি এলে
দু হাত ছড়িয়ে উছল হরিণীর মত
ছাদ থেকে তোমার নেমে যাওয়া
ঢেউ তুলে জিভে নেওয়া স্বাদ
এখনো আমার ঠোঁটে।

এতসব চিহ্ন তোমার পথরেখা জুড়ে
ভুলে যেতে চাই তবু পথভোলা নাই
অঝোর মল্লার থেকে বসন্ত বাহার।
হাওয়া মোরগ আমি শুধু
তোমার ঝড়ের পূর্বাভাসের
অপেক্ষায় থাকি।

ফুরিয়ে যাবার আগে

ছমছমে আর একটা দিন পেরোলেই
হিসেবের খাতা থেকে ফুরিয়ে যাবে
বস্তাপচা লাভক্ষতির হলদে পাতাটা।

অতর্কিত ঝঞ্ঝায় ভাসবে কথার আবর্জনা
স্তূপাকৃতি মিথ্যে মায়ামুখোশ
হিংসের সবুজ ডালপালা।

নিভু নিভু চেহারার মেয়েটির বুকে
দাঁত বসাবে সবল প্রেমিক
গভীর করুণার অভ্যেসে।

ফুরিয়ে যাবার আগে
দিনটাকে হাতের মুঠোয় পুরে
ভাবছি তাকেও ভালোবাসতে শেখাই।

চলো, ফুরিয়ে যাবার আগে
একবার দপ করে জ্বলে উঠে
আলো দিই মুমূর্ষু অন্ধকারে।

মায়াষ্টেশনের মেয়ে

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসে
সিগন্যালে গোধূলির রং
ছাতিমের গোল বেদী
ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে
ঝিম ধরা প্যাসেঞ্জার
ঘরমুখী।

চাওয়ালার হাঁক
ফিরিওলার চোরা চোখ
চেটে নেয় সাঁওতাল কামিনের
ঘেমো বিভাজিকা।

ওয়েটিংরুমে উন্মুখ মেয়ে
জানলায় চোখ
যদি থামে ট্রেন…
সময় পেরিয়ে যায়
বাঁশী বাজছে
বহুদূরে ।

মোরাম বিছানো প্ল্যাটফর্মে
ঝরছে পলাশ
আগুন রংএ অশোকের গুচ্ছ
বাতাসে মহুলের বিধুর গন্ধ
মাদল বাজছে ঝিনিঝিনি
সাঁওতাল বস্তিতে।

বাঁশীর শব্দ এখন কাছে
তীব্র থেকে তীব্রতর
ফাঁকা ওয়েটিংরুম
ছাতিমতলা ।

সন্ধে আসছে
ছাতিমের ভারী গন্ধ
ধীরে ধীরে

মায়াষ্টেশনে
সিগন্যাল গ্রীন
সেই ট্রেন আর থামেনা …