রাত্রিকুসুম

– গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা সবুজ মানুষ নদীর পাশে শেকড় ছড়িয়ে আকাশে হেলান দিয়ে মিটিমিটি হাসতো; মাথায় পাতার মুকুট আর চুঁইয়ে নামা আলোর ঝিরিঝিরি নকশা সারামুখে, ডালেডালে তার পাখি আর পরীদের বাসা; পাখিরা রোজ ওর ঘুমভাঙার আগে উড়ে যেতো ভোরবেলার ভেতর, আর বিকেল-কণিকা ঠোঁটে নিয়ে ফিরে আসতো ওর চোখের কোটরে আর শিশির-ভেজা গল্প বলতো, সে তখন গোধূলি আদরে ঢেকে দিতো সারাদিন-ধুলো-ওড়া ক্লান্ত কোলাহল যতো… পরীরা ওর আঁকিবুঁকি বেয়ে নেমে যেতো  জলের সন্ধ্যায়, ওরা না ফিরলে ঘুম ভাঙতো না তার…পরীরা বলতো প্রবাহ আসলে নদীর গভীরে রাখা রূপোলী শস্যের গল্প আর এক রাত্রিকুসুমের পাপড়ি-বিলাস…

নদীর সঙ্গে খুব ভাব ছিল লোকটার… যেমনতেমন দুপুরে নিজের শিকড় বেয়ে সে নেমে যেতো নদীতে, তখন সে-নদী ঝমঝম কুসুমনূপুর; শস্যের অক্ষর নিয়ে সে উঠে আসতো শরীর ভিটেয়, ছড়িয়ে দিতো বুকের উঠোনে… প্রাচীন দেউল জুড়ে সেসময় শুধু পাখি আর পরীদের গান আর পরাগমিলন…

একরাত্তিরে, নদীতে যখন জোয়ার, পুরনো লবণ-গন্ধ-ঢেউ উঠে আসছিল হু-হু শিকড় বেয়ে আর বহুদিন আগে ভুলে যাওয়া একটা সুর ভাসছিল মাতাল হাওয়ায়… লোকটা উঠে দাঁড়ালো, চশমার কাঁচে জমা রোদ্দুর ভাসিয়ে দিলো সেই কামোদ হাওয়ায়, দুহাত তার ডানা, সবুজ লোকটা উড়ে চলে গেলো পাতাঝরা নিশিত অন্ধকার পেরিয়ে… রয়ে গেলো নদীর পোশাক আর পাখিদের শোক আর শিকড়ের চিহ্ন আর এক অনাহত রাত্রিকুসুম।

সে এক বিচিত্র আলাভোলা গাছ ছিল
প্রতি ওপড়ানো শিকড়ে তাহার
এলোমেলো সুখ ছিল

ফুল যদি ঝরে সেও এক পথের প্রমাণ
যতখানি গাছ, গান তার
শিকড়-সমান