আমি সম্ভাব্য বহু অস্তিত্বহীনদের একজন, যে আজও বেঁচে আছে

– কুণাল দেব
(উনত্রিংশ বর্ষ প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যা আগস্ট ২০২৫-এ প্রকাশিত প্রথম পর্বের পর )

দ্বিতীয় পর্ব

আমার আত্মপরিচয়ের যে সেট (ছক-বন্দী) অবস্থান, যেখানে আমি প্রতিদিন তাৎক্ষণিক ‘ভালো থাকা’র লাভ-লোকসানের হিসেব কষে বাঁচি । বলা ভালো, বহু মানুষের ভালো না থাকার বিনিময়ে। অনেক সময়ে না বুঝে। অনেক সময় বুঝেও না বোঝার ভান করে। এটাই ‘সভ্য’ হয়ে ওঠার খেলায়  মাননীয় নিয়ম । 

এই নিয়ম মেনে চলাতেই আমার ‘বাস্তব-বোধ’ – রাষ্ট্রীয় তথা বানিয়া-তন্ত্র চালিত শাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে- বর্ণ -হিন্দু-প্রভাবিত সমাজ ও বাজার তথা মিডিয়া-নিয়ন্ত্রিত আমার পরিবার এবং আমার অনুগত খণ্ড-অস্তিত্বের কাছে মান্যতা পায়। আমি মুখে কোথায় কি বলি- সেই বলা কথার সাথে আমার মনের মধ্যে থাকা বিশ্বাসকে কোথায় কতটা জুড়বো আর যা বিশ্বাস করি তা কতটা পালন করবো- সেগুলো এক সরল রেখায় বিন্যস্ত নয়। সুবিধাজনক ও ‘বাস্তব-বোধ’ সম্মত নানান আত্মপরিচয়ের খণ্ড জুড়ে থাকা রিং আমার অস্তিত্বের সেট (ছক বা খাপ) নির্মাণ করে। এই ছক নির্মাণ করে চলেছে বৈষম্য ও  বঞ্চনার বহমান ইতিহাসের স্রোতহীন ধারায় ক্রমাগত জন্মাতে থাকা বিষাক্ত পরজীবীদের ক্ষুদ্র স্বার্থ  চরিতার্থ করার প্রকাণ্ড ক্ষুধা। । এই হ্যাঁমুখ ক্ষুধা মেটানোর সতত পরিবর্তনশীল কৌশলের আধুনিকতম সংস্করণের বাংলা ট্যাগ লাইন: ‘আনন্দে থাকুন, সারাদিন’ (‘আনন্দ’ মানে ‘মস্তি’)।  এক-পৃথিবী মজা (অর্থাৎ, সর্বার্থে  ‘মস্তি’) – ২৪ ঘন্টা × ৩৬৫ দিন – ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ইতর সাধারণের সামনে। মজা লুটে নাও যেমন খুশি। মজা লুটে, কে কত বেশি সুখ-ভোগ করতে পারে- তার প্রতিযোগিতা যা, সর্বস্তরে আমাদের যাপনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার শর্ত একটাই:  সুখ ভোগের প্রক্রিয়ায় কে কত বেশি মানুষকে বাতিল করতে পারছে – কত মানুষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে ‘মজা’ লুটতে পারছে — তার ওপর নির্ভর করছে, কে কত বেশি ‘সফল’ হবে। সুখের অংশীদার যে যত কম রাখবে, সে তত মজা লুটে নিতে পারবে। আত্ম-সুখকে পাখীর চোখ করে, যে যতটা আত্ম-কেন্দ্রিক হতে পারবে, তার লক্ষ‍্যভেদ ততই নির্ভুল। সে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পারবে। এই সাফল্যের চূড়া- ‘পাখীর চোখ’। কিন্তু পাখীর চোখ দেখতে গিয়ে যদি কেউ গোটা পাখীটাকে দেখতে শুরু করে, আর পাখীর সাথে পাখীর ছানা, পাখী যে গাছে বসে আছে- সেই গাছের ডাল, পাতা- ফুল-ফল সহ- দৃশ্যমান সব কিছু সামগ্রিকতার প্রেক্ষিতে দেখতে শুরু করে, তা হলে, আত্ম-সুখের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে কোনোমতেই সে পারবে না। প্রমাণ হবে, সে ব‍্যর্থ। এবং তার এই ব‍্যর্থতার দায় তাকেই নিতে হবে। এই শর্তেই আমাদের অস্তিত্বের ছক-বন্দী পরিসর ক্রমশই সংকুচিত আর তার দেওয়াল শক্ত হতে থাকে । আত্মপরিচয় হয়ে উঠল তাৎক্ষণিক সাফল্য-রক্ষা ও আত্মরক্ষার দুর্ভেদ্য বর্ম। 

আত্মপরিচয় অন্বেষণে একজন নারীবাদী সাংবাদিকের দৃষ্টিতেও,  নারীর ক্ষমতায়ন বিচার্য হয় কেবলই  নারীর  আর্থিক রোজগারের সুযোগ বৃদ্ধি,  নারীর যাপন-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য অনুযায়ী তার মন, অবসর, বিনোদন, ও তার পরিবারের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, খাদ‍্য-সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত‍্যাদি বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চান না, দেখাতে চান না। সম্প্রতি, কৃষি সংক্রান্ত একটা আলোচনা সভায়, এমনই একজন সাংবাদিক – তাঁর নারীবাদী বিচার ধারায় – জৈব পদ্ধতিতে কৃষি কাজের বিরোধিতা করেছেন। কারণ, জৈব পদ্ধতিতে চাষ করলে কৃষক পরিবারে নারীর আর্থিক রোজগার কমে যাওয়ার বা না থাকার সম্ভাবনা প্রবল। পুরষতান্ত্রিক অবদমনে নারীর কৃষি উৎপাদনে অংশগ্রহণ পারিবারিক ‘মূল্যহীন’ শ্রমে পরিণত হবে। তাঁর এই ‘উদ্বেগ’ পরিবারের জন্য শ্রম দানের মূল্যকে শুধুমাত্র টাকার অঙ্কে দেখালেন। পরিবারের Net income এর হিসেবে রাখলেন না। তাঁর এই কাঁচা- টাকা হাতে পাওয়ার সাথে নারীর সুখ ও ক্ষমতায়নের সমীকরণ — কৃষক- নারীর  নিজের ও তাঁর সন্তানদের জন‍্য বিষ-মুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার উৎপাদন এবং ভোগ করার স্বক্ষমতাকে আড়াল করল। এই অসম্পূর্ণ খণ্ড যুক্তির অবতারণায় তিনি জন্মকালীন রস-রক্ত-ক্লেদের সাথে সদ‍্য জন্মানো শিশুকেও , অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।  কেরিয়ার-ভিত্তিক জ্ঞান চর্চার ছকে এই আচরণ আয়ত্ত না করতে পারলে তাঁর ‘নারীবাদী’ আত্মপরিচয় থেকে সাফল‍্য আসবে না।

একইভাবে চাকরিতে নিয়োগের দাবিতে, চাকরি-প্রার্থীদের যোগ‍্য-অযোগ্য প্রমাণ ও অপ্রমাণের প্রতিযোগিতায় বেকার, বঞ্চিত যুবক যুবতীরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভাজিত ও একে অন্যের মূল শত্রু হয়ে উঠলেন। অথচ, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা চাকরির নিয়োগকর্তা, সরকারি আমলা, শাসক দলের নেতারা, সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা -হাতা, দালাল মিডিয়ার মাথা-হাত-পা, চতুর উকিল – কেউ বেকারদের শত্রু থাকলো না। যুযূধান যুযুধান সব চাকরি প্রার্থীর দাবির মধ্যে কোথাও এক বিন্দুও খুঁজে পাওয়া গেলো না – বাংলার সব বেকারের হাতে তাঁদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দেওয়ার দাবি।

কারণটা পরিষ্কার: কর্তৃপক্ষ চেয়েছে আন্দোলনের ফোকাসড দাবি। সব বেকারের যন্ত্রণা ও বঞ্চনা নিয়ে দাবি গ্রাহ্য হবে না। শুধু নিজেদেরকে নিয়ে ভেবে দাবি দাওয়া রাখাটাই প্রতিষ্ঠানে দস্তুর। অতএব, প্রতিষ্ঠানের অংশ হতে চাওয়া চাকরি-প্রার্থী প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা ‘ফোকাস’ এর বাইরে যায় কি করে! 

এই প্রসঙ্গে, আরও একটা ঘটনার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। কয়েক দিন আগে, ফেসবুকে ‘বাংলা পক্ষ’ সৈনিকদের একটা পোস্ট দেখে চমকিত হলাম। কলকাতা বা তার আশপাশের কোনো আবাসনে- ভোর চারটে থেকে ডিজে বক্স ও মাইক সহযোগে পুরবাসীকে তারস্বরে মহালয়া শোনানোর মহান দায়িত্ব পালন করতে উদ‍্যোগ নেন সেই আবাসনের জাগ্রত বাঙালি সদস্যদের কয়েক জন। এ যাবৎ, যে সব অত্যাচারে আমরা খানিকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তার মধ্যে মাইকে অষ্টপ্রহর নাম-গান বা মাঝ রাত অবধি মুসলমান পিরজাদাদের জলসা এবং হিন্দিগানের জলসা ছিল। নাগরিক উৎপাতে মাইক লাগিয়ে হনুমান চালিসা পাঠ যুক্ত হয়েছে। অসময়ে এই ধরনের উৎপাতের বিরুদ্ধে পাড়ার কোনো না কোনো সাহসী ও সংবেদনশীল মানুষ প্রতিবাদ করে থাকেন। কখনও কাজ হয়, কখনও হয় না। এবার এই সব অত্যাচারের সাথে নতুন সংযোজন- অসময়ে মাইক বাজিয়ে মহালয়া প্রচার। স্বাভাবিক ভাবেই আবাসনের কিছু অবাঙালি ও তাঁদের সঙ্গী গুটিকয়েক বাঙালি আবাসিক এই গণ-মহালয়া পালনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন । শুরু হয় গা-জোয়ারি। কাক-ভোরে শব্দ-দৈত্যের আক্রমণ থেকে বাঁচার ন‍্যয‍্য অধিকারকে দেখানো হলো বাংলার সংস্কৃতি চর্চার ওপর আক্রমণ হিসেবে। ফেসবুকে অবাঙালিদের মুণ্ডপাত করা হলো যৎপরনাস্তি। লাইক পরল অসংখ‍্য। ‘বাঙালি সংষ্কৃতি চর্চা’র বিকৃত ব‍্যাখ‍্যায় বাঙলা পক্ষের ‘ফোকাস’ অনেকটা মজবুত হলো হয়তো, তবে শব্দ-দুষণের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন বঙ্গপোসাগরে ডুবে গেলো যে – সে ব‍্যপারে কোনো সন্দেহ থাকলো না।

এই একই পথ ধরে – সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, ঋণ-গ্রস্ত কৃষক, কাজ হারানো ক্ষেতমজুর, পরিবেশ দূষণের শিকার হওয়া নাগরিক, গ্রামবাসী, আদিবাসিদের অধিকার, রাজনৈতিক কর্মীর মানবাধিকারের বাম-ডান বিভাজন-দীর্ণ অগুণতি আন্দোলনের রিংগুলো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ফোকাসের ক্লোজ-আপে নিজেদের রাখার প্রতিযোগিতায় একে অন‍্যের হাত ধরতে পারলো না। বরং যত দিন গত হয়েছে, আরো ছোট হয়েছে ছক-বন্দী আত্মরতি সুখের পরিসর। 

প্রাণ-বিবর্তন, জ্ঞান-বিবর্তন, সাংস্কৃতিক-বিবর্তনের যে স্তরে পৌঁছে মানবিক অস্তিত্বের ‘আমি’ – চেতনার অভূতপূর্ব স্ফুরণ- বৃহৎ সামগ্রিকতায  আত্মপরিচয়ের ব্যপ্ত পরিসর খুঁজে পেয়েছিল- যেখানে সুখ বাস্তব হয়ে উঠত, আনন্দ রূপ নিত– যথা সম্ভব, সুখের অংশীদার বাড়িয়ে । এই জীবন-দায়ী-বোধ এখন প্রায় নাগালের বাইরে। ক্রমশ বাড়তে থাকল প্রকৃতির সাথে ‘আমি’র বিচ্ছিন্নতা। আমরা এই বিচ্ছিন্নতাকে ‘সভ‍্যতা’র ‘প্রগতি’ বলে চিনতে শিখলাম। আত্মীয়-সমাজ চালিত মানবিক সম্পর্কের সাথে বিচ্ছিন্নতা  ক্রমশ মানুষকে একা এবং বোকা করতে লাগলো। আমাদের  শেখানো হলো- এটাই ‘আধুনিকতা’, যা ব‍্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের ধারক- যেখানে খালি পেটে দিন কাটলেও গোপনীয়তার মালিকানা পাওয়া যায়। অবোধের গো-বোধে সুখ পাওয়ার পরিণতিতে, পর্যায়ক্রমে আমার ইচ্ছে , কল্পনা, শ্রম, সৃষ্টি, ক্রিয়াকলাপের থেকে ‘আমি’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।  কাজের অভ্যেসে- কাজ; অপরের মুনাফার জন্য আর যন্ত্রের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে – শ্রম; বাজারের চাহিদা মতো কল্পনা ও সৃজন । আত্মীয়েরা হয়ে উঠলেন ‘বোঝা’, সমাজ ক্রমশ হয়ে উঠলো অসহিষ্ণু, অসংবেদনশীল, নীতি-নৈতিকতা-মুক্ত সুযোগ-সন্ধানী ছোট ছোট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনমনীয় প্রতিষ্ঠান। আর ‘আমি’ হয়ে উঠলাম অগুণতি তাৎক্ষণিক লক্ষ‍্য পুরণ করে চলার ইচ্ছে ও অভ্যেস তাড়িত চলমান যন্ত্র। এই বার, এখন, এই শেষ-তম পর্বে, ‘আমি’ত্বের বিভ্রান্ত সচেতন অস্তিত্ব পৌঁছেছে এমন এক সংকটে, যেখানে তাকে রাষ্ট্র দেখতে পাচ্ছে, কর্পোরেট দেখতে পারছে, মিডিয়া দেখতে পাচ্ছে, রাষ্ট্রবাদী সমাজ দেখতে পাচ্ছে। এদের সম্মিলিত ডেটা সেটের অ‍্যালগোরিদম নির্ধারিত একটি পরিমাপ-যোগ‍্য অবজেক্ট হিসেবে ‘আমি’ রাষ্ট্র, মাফিয়া, বাজারে দৃশ‍্যমান। অথচ ‘আমি’ নিজের কাছে  উপলব্ধ নয়। সে অদৃশ‍্য। পৃথিবীকে মুড়ে ফেলেছে যে স্যাটেলাইট-চাদর — অনন্তর নজর রেখে চলেছে, মেপে চলেছে আমার প্রতি মুহূর্তের অবস্থান, শ্বাস প্রশ্বাসের স্পন্দন , মগজের নিউরো-ট্রান্সমিটারে ডোপামিন নিঃসরণের মাত্রা । 

এই মহাজগতের সঙ্গে আমার সংযুক্ত থাকার স্মৃতি, প্রতিটি প্রাণ কণার অস্তিত্বের অনিশ্চেয়তায় ‘আমি’র ভেসে থাকা, ডুবে যাওয়ার স্মৃতি, প্রতিটি মানুষের যে কোনো একজনের ‘আমি’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনার স্মৃতি এবং সবার অস্তিত্বের সাথে সবার অস্তিত্ব যে অবিচ্ছেদ্য সংশ্লেষে জড়িয়ে আছে – তার স্মৃতি, এমন সব সহজাত স্মৃতি মুছে ফেলে বদলে দিয়েছে আমার অস্তিত্বের স্থানাংক। অস্তিত্ববোধের যে অভিজ্ঞান অতীতের ‘আমি’র সঙ্গে দূরাগত ভবিষ‍্যতের ‘আমি’র পরিচয় করিয়ে দিতে পারে– তাকে চিনতে শেখাই হয়ত ধারাবাহিক বর্তমানের কাজ। এই কাজে যুক্ত ছিলেন পরম্পরাগত জ্ঞানের ধারক বহু অরণ্যবাসী দার্শনিক, প্রচীন জ্ঞান-সমৃদ্ধ পণ্ডিত, দার্শনিক, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ । এখনও যুক্ত আছেন কিছু মানুষ।  ‘আমি’ র অতীতকে ভবিষ্যতের ‘আমি’র সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এ যাবৎ কাজের বিবরণ ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টায় প্রকৃতি বিজ্ঞান ও গাণিতিক যুক্তির বেশ কিছু তাত্ত্বিক অনুসঙ্গ এই আলোচনা চলে আসছে।

চেতনার বিবর্তন ধারায় আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণ ছক-বন্দী দশা

মানব চেতনার বিবর্তন প্রধানত আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি থেকে উৎসারিত। প্রাথমিকভাবে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম ছিল—তার আত্মপরিচয় ছিল সমষ্টির পরিচয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, পরিবেশের সঙ্গে সমন্বিত। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশে আত্মরক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে হতে আত্মপরিচয়ের ছক-বন্দী পরিসরগুলো কখনও সংকীর্ণ  হয়েছে, কখনও প্রসারিত হয়েছে। কখনও একে অপরের সাথে জুড়েছে, কখনও জোড় ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এইভাবে গোষ্ঠী, ভাষা, জাতি,  ধর্ম, শ্রেণী, দেশ, মতাদর্শ ইত্যাদি নানান বিন্যাসে জুড়ে থাকা আত্মপরিচয়ের সীমানা যত অনমনীয় হয়েছে, মানুষ ততই বৃহত্তর সামগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।  ফলত, চেতনা বিভক্ত হয়ে পড়েছে দুই বিপরীতমুখী প্রবণতায়—

ক) বাতিল-প্রবণ আগ্রাসী আচরণ (Exclusive Aggression):

স্বাতন্ত্র্য ও প্রাধান্য রক্ষার জন্য অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন।

খ) আত্মীকরণ-প্রবণ  সহযোগী আচরণ (Inclusive reciprocity) 

বৃহত্তর সমষ্টির জন্য  শুভকামনার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বের একাত্মতা উপলব্ধি করা। 

এই দুই প্রবণতার দ্বন্দ্বই আধুনিক সভ্যতার কেন্দ্রীয় সংকট।

বাতিল-প্রবণ (এক্সক্লুসিভ) আগ্রাসী আচরণ ও ভাবনার বর্তমান রূপ 

বর্তমান Cognitive Evolution-এর যুগে আগ্রাসন আর সরাসরি সামরিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক একচেটিয়ায় (Technological Monopoly) রূপ নিয়েছে।

এই বাস্তবতায় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার 5% থেকেও কম মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে—

১) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা ইকোসিস্টেম,

২) শক্তি-সম্পদ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, এবং

৩)  বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের নকশা ও সরবরাহ চেইন।

এই নিয়ন্ত্রণ একটি বাতিল-প্রবণ প্রযুক্তি-চালিত আগ্রাসন (Exclusive Technological Aggression) যা মানব প্রজাতির বাকি অংশকে পরাধীন উপভোক্তায়  (dependent consumer)  রূপান্তরিত করেছে। এই রূপান্তত প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিপজ্জনক, কারণ এই রূপান্তরের পরিণতিতে —

জ্ঞান ও সম্পদ প্রবাহ অসম হয়,

সহযোগিতার সম্ভাবনা নষ্ট হয়, এবং 

প্রজাতির প্রতিকুল পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা  (species resilience) কমে যায়। 

এই বাস্তবতাকে গাণিতিকভাবে ধরতে আমরা ব্যবহার করব Prisoner’s Dilemma Model.

(পরের অংশ আগামী সংখ্যায়)