পিলচুবুড়হির সিরিঞ

– আয়েশা খাতুন

 মানুষ বাসা বাঁধে মানুষের পাশে। এই যে আমরা পাশে পাশে বাস করি অথবা আশে পাশে বাস করি তার কিছু অর্থ বুঝে কিছু না বুঝে বাস করি। পাশা পাশি বাস করি মানে ডান দিকে বাম দিকে অথবা সামনে পিছনে কাছকাছি বাস করি। আসলে পাশা পাশি বাসের আর এক অর্থ লুকিয়ে আছে। প+আ+শ+আ+প+আ+শ+ই= পরিপূর্ণ আশ্বাসে  শবে-আনন্দে (শব একটি পারসি শব্দ যার অর্থ রাত) এবং পরিপূর্ণভাবে আত্মীয়তায়,শান্তিতে ইচ্ছায় বাস করা। অথবা যদি কেউ বলে আশে পাশে বাস করে তাহলেও আর একটা অর্থ আনা যেতে পারে, তা হলো –  আশ্ ক’রে আশা নিয়ে যে পড়শি আমাকে ভালোবাসবে ভালো আচরণ করবে ভালো জিনিসের আদান-প্রদান করবে। সুতরাং মানুষ আশে পাশে বা পাশে পাশে বাস করে আসছে। মানুষের মধ্যে যেমন জাগরণ আসে তেমনি কিছু উপাদান আগামী  প্রজন্মের জন্য সে গুছিয়ে রেখে যায়। মূলবাসী জনজাতি সমাজের মানুষের মধ্যেই রয়েছে সেই চরম সামাজিক উৎকর্ষ।

পৃথিবীতে কীভাবে মানুষের আবির্ভাব হয়েছে এই নিয়ে আমাদের কাছে কতই না কাহিনি! বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে কীভাবে মানুষের ক্রমবিবর্তন ঘটেছে কোটি কোটি বছর ধরে। এসেছে জিনতত্ত্ব। শুধুমাত্র ধর্মীয় আখ্যান নির্ভর মানুষ মানতে চাননি সেসব কথা। প্রশ্ন উঠেছে, ‌‘বাঁদর থেকে যদি মানুষের সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে বাঁদর থেকে আর কেন মানুষের জন্ম হচ্ছে না?’ 

পৃথিবীতে মানুষ তৈরি হয়েছে, সেই মানুষকে জান্নাতে (বেহেশত, বাগান, স্বর্গ ইত্যাদি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে, জান্নাত থেকে তাড়ানোও হয়েছে। আবার সেই মানুষই কর্ম দিয়ে ধর্মকে জয় করে জিতেছে আল্লাহ। এমন কাহিনিও আছে ইসলাম ধর্ম গ্রন্থে। আল্লাহ তাঁর এক বিখ্যাত ফেরেস্তাকে ডেকে আদেশ দিলেন আদম সৃষ্টি করার। সেই ফেরেস্তা আজাজিল আদম তৈরি করলেন পৃথিবীর মাটি দিয়ে। এ পর্যন্ত সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সংঘাত ছিলো না। (আজাজিল আর আদমের মধ্যে)। কিন্তু মূলস্রষ্টা (আল্লাহ) বললেন ‌‘‌‘আদম স্রষ্টার চেয়ে  স্রষ্টার-সৃষ্টি ‘আদম’ শ্রেষ্ঠ‌’’।

আজাজিল ফেরেস্তা আল্লাহর একথা মানতে রাজি ছিলো না। তার দাবি ছিলো অন্য। সে বলেছিলো আমি আগুন থেকে সৃষ্ট আর আদম মাটি থেকে। আমার চেয়ে আদম শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। তারপর সে অনেক কথা। এবং সেই অনেক কথার পরও আজাজিল ঘোষণা করলো, নৈব নৈব চ। আমি যাকে কেটে ছেঁটে তৈরি করলাম সেই আদমকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গ্রহণ করবো না এবং তাকে শিজদাও (দুই পা দুই হাত, দুই হাঁটু, কপাল ও নাকের অগ্রভাগ মাটিতে ঠেকিয়ে আত্মনিবেদনের ইসলামী রীতি) করবো না।

এই সংঘাতের জেরে আদমের পৃথিবীতে পা দেবার আগেই তার শত্রু আজাজিলকে শয়তানে পরিণত করে পৃথিবীতে পাঠালেন আল্লাহ। এত সহজ না আদমের কু-মনটাকে সরিয়ে সুন্দর করে সাজানো। যেদিন আজাজিলকে আল্লাহ জান্নাত থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেদিনই  আজাজিল শপথ করেছিলো, “যার জন্য তুমি আমাকে স্বর্গ থেকে বের করে দিলে সেই আদমকে আমি একদিন তোমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাবো এবং সেই আদমকেও তোমার স্বর্গে থাকতে দেবো না।”

আল্লাহও সে চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে বলেছিলেন “সে ক্ষমতা তোমাকে দিলাম তবে আদম যদি আমাকে ভালোবাসে তাহলে সে কাজ আদম করবে না এবং তুমি ব্যর্থ হবে।’  আজাজিল মাথা হিলিয়ে বলেছিল, চ্যালেঞ্জ রইলো।

 সে যাইহোক সকলকেই স্বর্গ থেকে মাইগ্রেটেড হতে হলো। শয়তান আগে তার পরে বাবা আদম আর মা-হাওয়া এলেন এই ধরাধামে। কথায় আছে,  রাজায় রাজায় লড়া্ই হয়,  উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। তাই হলো। শয়তানের সঙ্গে আল্লার ঝামেলা আর মাইগ্রেটেড  হলো আদম। অবশ্য আদমও ভুল করেছিলো, কিন্তু যাক সেসব কথা, কারণ আদম আর ইভ অথবা বাবা আদম আর মা হাওয়াকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে বিভিন্ন ধর্মীয় কিতাবে।

মানুষের মধ্যে বা সমস্ত ধর্মের মানুষের মধ্যে আছে মানব সৃষ্টির একটা ধর্মীয় বর্ণনা এবং পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে আছে নানান সব জল্পনা-কথা। মূলবাসী জনজাতি সমাজের মানুষের ঈশ্বর ভাবনায় আদমের বা হড়ের কীভাবে পৃথিবীতে জন্ম হলো সেই বৃত্তান্তে আমাদের চারপাশের প্রাণীজগৎ বড় জ্যান্ত।  

আদিতে পৃথিবীটা ছিলো জলময়। শুধুই জল আর জল। এখানে কোনো মানুষ,গাছ পালা এবং মাটি ছিলো না। জলের মধ্যে ছিল কেবল কুমির, কাঁকড়া, বোয়াল, কেঁচো আর কচ্ছপ। এরাই বহু বছর ধরে জলের মধ্যে রাজ করতো। এদিকে মারাংবুরু (ভগবান) একটি অদৃশ্য রেখা বা সুতো ধরে ঝুলতে ঝুলতে জলে নামতেন স্নানের জন্য। স্নান সেরে মারাংবুরু আবার সেই সুতো ধরে ধরে উপরে উঠে যেতেন। কোটি কোটী বছর ধরে এই ভাবে স্নান সারতেন মারাংবুরু। একদিন তাঁর শরীর থেকে অনেক ময়লা বের হলো। তখন তিনি নিজের কাছেই প্রশ্ন রাখলেন এতো ময়লা আমি রাখি কোথায়? কিছুক্ষণ ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমি এই ময়লা দিয়ে  দুটো পাখি তৈরি করবো। যেই ভাবা অমনি কাজ শুরু করে দিলেন। পাখি দুটি তৈরি করার পর তিনি তাদের নাম দিলেন শরলি চেঁড়ে এবং পালি চেঁড়ে। (হাঁস আর হাঁসি। এঁরা, এই সমাজের মানুষ বলেন, ‘গেডে’ )। যেই পাখি দুটিকে হাতের মধ্য থেকে বের করলেন, অমনি গেলো ফুড়ুৎ করে উড়ে। উড়তে থাকলো আকাশ জুড়ে এবং উড়তেই থাকলো। এক সময় বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়লো । কোথাও বসায় জায়গা পেলো না। যেদিকে তাকায় শুধু জল আর জল।পাখিদুটি আবেদন জানালো মারাংবুরুকে, এত বড়ো আকাশ,  নিচেও এত বড়ো জায়গা কিন্তু জল আর জল,  আমরা খুব ক্লান্ত, বসবো কোথায়?

মারাংবুরু একদিন একটি ঘোড়াকে পাঠালেন পৃথিবীতে জলপান করার জন্য। ঘোড়া নেমে এলো আকাশ থেকে এবং সেই ঘোড়া জল পান করলো। এদিকে জল পান করার সময়ে ঘোড়ার মুখ থেকে অনেক ফেনা বের হয়ে এলো আর সেই ফেনা জলে ভাসতে থাকলো। মারাংবুরু শরলি চেঁড়ে এবং পালি চেঁড়েকে ডেকে বললেন, ওই দেখো জলের মধ্যে ফেনা ভাসছে। তোমরা তার মধ্যে গিয়ে বসো। শরলি চেঁড়ে আর পালি চেঁড়ে সেই ফেনার চারিদিকে উড়ে বেড়ায়, তাদের ডানার হাওয়ায় তখন সেই ফেনা হয়েছে নৌকাকৃতি। পাখিরা বসার জায়গা পেলো এবং বসলো। পাখি দুটি বসার পরে বড়ো ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে ঘুমালো। ঘুম থেকে উঠে তারা ফেনার চারিদিকে ঘুরতে থাকলো কারণ তারা খুবই ক্ষুধা অনুভব করলো কিন্তু কোথাও খাবার পেলো না। তখন আবার তারা মারাংবুরুকে আবেদন করে বললো,  মারাংবুরু আমরা এই ফেনার চারিদিকে কেবল উড়ে বেড়াচ্ছি কিন্তু কোনো খাবার দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের যে বড়ো ক্ষুধা। খাবার কোথায় পাবো? 

মারাংবুরু এই আবেদন শুনে চঞ্চল হয়ে উঠলেন,  ভাবতে থাকলেন আরে এই পাখিদুটি খেতে না পেলে মারা যাবে। তাহলে তাদেরকে বাঁচানো যাবে কি করে? অনেক ভেবে মারাংবুরু জলের নিচে থেকে কুমিরকে ডাকলেন। ডাক শুনে কুমির তড়িঘড়ি মারাংবুরুর কাছে হাজির। করজোড়ে জানতে চাইলো, তাকে কেন ডাকা হয়েছে?

মারাংবুরু বললেন জলের তলা থেকে মাটি কি জলের উপরে আনতে পারবে? কুমির বললো,  আপনি যখন আদেশ করেছেন তখন নিশ্চয়ই পারবো, চেষ্টা করে তো দেখি। কুমির মাটি আনতে জলের গভীরে প্রবেশ করলো। জলের তলদেশে গিয়ে কামড় দিয়ে মাটির  চাঁই মুখের গহ্বরে রেখে জলের উপরে আসতে থাকলে জলের ঢেউয়ে সে মাটি  সবই গলে বেরিয়ে গেলো। একটি কাঁকর বা বালিও কুমির আনতে পারলো না। 

মারাংবুরু এবারে কাঁকড়াকে ডাক দিলেন। কাঁকড়া হাজিরা দিয়ে বললো,  মারাংবুরু আমাকে  ডেকেছেন? মারাংবুরু বললেন, হ্যাঁ। 

মারাংবুরু বললেন – জলের তলে গিয়ে মাটি আনতে হবে। সে কাজ কি তুমি করতে পারবে?

কাঁকড়া – নিশ্চয়ই পারবো আপনি যখন বলেছেন তখন চেষ্টা করে তো দেখি।

কাঁকড়া চলে গেলো জলের তলে এবং সে তার দুই দাঁড়া দিয়ে শক্ত করে মাটিকে খামচিয়ে তুলে নিলো। এর পর উপরে যাবার পালা। কিন্তু কি সর্বনাশ এতো সম্ভব হচ্ছে না,মাটি জলের তল থেকে উপরে আনতে আনতে সব গলে জলে চলে গেলো।

এবার মারাংবুরু ডাক দিলেন বোয়াল মাছকে।বোয়াল এসে তার শুঁড় দুটো নিচে ঝুলিয়ে জানতে চাইলো তাকে কি করতে হবে?

মারাংবুরু সেই একই কথা বললেন, জলের তল থেকে মাটি আনত হবে, সেকাজ কি সে করতে পারবে? বোয়াল একথা শুনে জানালো এতো ছোটো একটা কাজ এখনই করছি। বলেই সে লাফিয়ে জলের তলে চলে গেলো। বোয়াল তার মুখের যতটা ফাঁক হয় সবটা ফাঁক করে মাটিতে কামড় মারলো মুখভরতি মাটি। কিন্তু সে মাটি উপরে আনতে আনতে কানকো দিয়ে সব বেরিয়ে গেলো।

 মারাংবুরু এবার ডাক দিলেন কেঁচোকে। কেঁচো এলে তাকে বলা হলো জলের তলে মাটি আছে, আনতে হবে। পাখিদের খাবার নেই সেখান থেকে খাবার পাওয়া যাবে। সুতরাং তুমি মাটি নিয়ে এসো।

 কেঁচো কিচ্ছুক্ষণ চুপ থেকে বলে আমি মাটি আনত পারবো কিন্তু সাহায্য করার জন্য কচ্ছপকে চায়।  মারাংবুরু সঙ্গে সঙ্গে কচ্ছপকে ডেকে পাঠালে কচ্ছপ এলো। 

কচ্ছপ জানতে চাইলো তাকে কেন ডাকা হয়েছে। 

মারাংবুরু বললেন জলের তল থেকে মাটি আনতে হবে, পারবে? 

কেঁচো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, জলের তলে না মারাংবুরু, আমি যাবো জলের তলে আর ওকে থাকতে হবে জলের উপরে। তবে মাটি আনতে পারবো।

মারাংবুরু কচ্ছপকে বললেন, শুনলে তো। তোমাকে জলের উপরে থাকতে হবে,পারবে তো?

কচ্ছপ বললো আপনি যখন বলছে তখন থাকবো। ব্যাস এবারে কচ্ছপ জলের উপরে যেই নেমেছে অমনি মারাংবুরু  কচ্ছপের চার হাত পা শিকল দিয়ে বেঁধে দিলেন।এবারে কেঁচো তার মুখটাকে জলের তলে নিয়ে গেলো। মাটি উঠিয়ে সে মাটি  কচ্ছপের পিঠে গিয়ে জমা হতে থাকলো। মাটি জমতে জমতে পাহাড়। কচ্ছপ পালাতে পারছে না। মাটির পাহাড় মারাংবুরু সমান করে দিলেন। কিছু দিনের মধ্যে মাটিতে ঘাস বেরিয়ে গেলো, বেরিয়ে এলো মহুয়া,পলাশ,শাল করঞ্জগাছ। শুধু তাই না এই সঙ্গে বেরিয়ে এলো আরো নাম না জানা কতগাছ এবং তৈরি হলো জঙ্গল পাহাড় নদী। 

এই যে অসংখ্য গাছ ঘাস জন্মালো তাদের মধ্য কুঁচি জাতীয় কিছু  ঘাস জন্মালো। যাদের বলা হয় সিরোমদান্দিরে। শক্ত ঘাসের কাঠি জোগাড় করে সেই পাখি দুটো এই সিরোমদান্দিরে গাছে বাসা বাঁধলো। ঘাসের ভেতরে যতো ঘাসপোকা ছিলো সেগুলো খেলো এবং এই পাখি দুটো তাদের এই জীবনে যে কটা দিন পাবো এই ভেবে পেয়ার মহব্বতে থাকতে থাকতে দুটো ডিম পাড়লো। স্ত্রী পাখিটা বাসায় থেকে ডিমে তা দেয় এবং পুরুষ পাখিটা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে খাবার জোগাড় করে আনে। মাঝে মাঝে স্ত্রী পাখিটি তার ডানা ঝাপ্টানোর জন্য আকাশে উড়তে যায় আর এর ফাঁকে কিছু খাবার খেয়ে আসে এবং নিয়েও আসে তার বন্ধুটির জন্য, সেই সময় পুরুষ পাখি ডিমে তা দেয়। 

এই ভাবে কয়েক বছর তা দিতে লাগলো।তাছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। কেবল এই ডিমে উষ্ণতা দেওয়া। পুরুষ পাখিটা কম সময় থাকে তার কারণ, তার পালকের সংখ্যা একটু বেশি, সে যদি ডিমে তা দেয় তাহলে ডিম গরম বেশি পেয়ে নষ্ট হতে পারে। তাই স্ত্রী পাখিটি তার নরম পালকের ভিতরে রেখে বসে বসে ডিমে তা দেয়। এক সময় তারা কথা বলে ,হ্যাঁগো আমাদের জন্য মারাংবুরু এতো কিছু করলো কেনে? স্ত্রী পাখিটি বলে, হবে আমাদেরকে তো তার গায়ের ময়লা থেকে বানিয়েছে, তাই খানিক দরদ আছে। পুরুষ পাখি জানায়, উদিকে তো সেই কেঁচোটো মাটি তুলেই যাচ্ছে তুলেই যাচ্ছে আর বেচারা কচ্ছপের চার হাতপা মারাংবুরু শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে দিলো সে তো আর পালাতে পারবে না! স্ত্রী পাখি বলে,  তিনি মারাংবুরু, তিনি সবার ভালোর লেগেই করেছেন,আমাদের এতো বলার কিছু নাই। পুরুষ পাখি বলে হুম, তাই তো। 

স্ত্রী পাখি একদিন খুশিতে বলে উঠলো, হ্যাঁগো আমাদের ডিম থেকে মনে হচ্ছে কিছু বেরোলো। ডিমের খুলি ফেটে গেলো। দুজনেই দেখে, ঝাপটা-ঝাপটি করে দেখে। আর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে একজন আর একজনের দিকে। সেকি! এতো আমাদের মতো দেখতে না! এরা তো কেমন কেমন দেখতে! এরা তো হড় হড় হড়।

এদিকে মারাংবুরুর কাছে খবর গেলে মারাংবুরু এসে দেখেন সবকিছু। হ্যাঁ, তিনি যেভাবে ভেবেছিলেন সেইরকমই দেখতে হয়েছে। চাঁদের মতো গোল মাথা, চ্যাপ্টা এইবড়ো মুখ। নাকের ফুটো আছে, মুখের একটা ফুটো, কানের দুটো। মনে হচ্ছে নরম মাড়ির লয়। কিছু গড়বেন বলে মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন, কিন্তু গড়া আর গড়া হয়নি কেবল শুরু করেছিলেন যেন। এবার বড় করে গড়ে তোলার পালা। কিন্তু পাখিরা তো আর বড় করতে পারবে না। তাই তিনি নিজের হাতে কাপাস গাছ থেকে তুলো তুলে এনে জলে ভিজিয়ে ওই হড় দুটোর মুখে ভরে দিলো এবং এই তুলো চুষে চুষে হড় দুটো বড়ো হতে থাকলো।মারাংবুরু এই হড় দুটোর নাম রাখলেন পিলচুহাড়াম আর পিলচুবুড়হি।

এই পিলচুহাড়াম পৃথিবীর প্রথম পুরুষ এবং পিলচুবুড়হি পৃথিবীর প্রথম নারী। তারা বড় হচ্ছিলো, এমন সময়ে লিটৌ নামে একজন এলো। লিটৌ তাদের  জিঞ্জাসা করলো – তোমরা কেমন আছো? আমাকে কি চিনতে পারছো? 

 পিলচাহাড়াম পিলচাবুড়হি বলল – না আমরা কাউকেই চিনি না। 

লিটৌ বললো, আরে আমি তোমাদের দাদু (লিটৌ মানে দাদু)।

তার পরে লিটৌ বলল- চলো আমার সঙ্গে জঙ্গলে।ওরা গেলো এবং লিটৌ শিকড় চিনিয়ে দিলো আর কিছু শিকড় তুলে এনে পিলচুবুড়িকে বললো বাটতে। পিলচুবুড়হি শিলে শিকড় বাটলো এবং লিটৌ ময়দার মতো কি এনে দিয়ে সেই শিকড় বাটাগুলোকে ভালো করে মিশিয়ে দিলো আর সেগুলোকে রোদে শুকিয়ে নিলো এবং বললো এগুলোর নাম ‘বাখল’। এর পরে লিটৌ সুমতু, বুকুচ আর সামা ঘাসের বীজ তুলে আনলো আর জড়ো করলো। তার পরে সেই বীজের খোসা ছাড়িয়ে চালের মতো করলো। লিটৌ পিলচুবুড়হিকে বললো রাঁধো। পিলচুবুড়হি রাঁধলো। সেই সুতুম, বুকুচ আর সামা ঘাস বীজ রান্না হলে তাতে সেই বাখল মিশিয়ে দিলো এবং পাঁচদিন ধরে রেখে দিলো। তারপরে সেই রান্নাকরা জিনিসগুলো পচে তৈরি হলো মদ। এবার লিটৌ বললো শাল পাতা তুলে আনো। লিটৌ চিনিয়ে দিলো শাল পাতা আর সেই শাল পাতা দিয়ে ঠোঙা তৈরি করতে শেখালো, বললো তিনটে ঠোঙা তৈরি করো। এবং একটা ঠোঙাতে সবার আগে মদ ঢালো ও মারাংবুরুর নামে উৎসর্গ করো। আর পরের দুটোতে দুই ঠোঙা মদ ঢালো। এবার বললো মারাংবুরুর নাম নিয়ে খাও। 

পিলচুহাড়াম এবং পিলচুবুড়হি দুজনেই খুব মদ খেলো এবং তাদের খুব নিশা হয়ে গেলো।এই সব করতে করতে সূর্য ডুবে গেলে লিটৌ চলে গেলো। পিলচুহাড়াম আর পিলচুবুড়হি দুজনে একই বাসায় ঘুমিয়ে গেলো এবং তারা আনন্দ করতে  থাকলো। ভোরবেলায় তাদের ঘুম ভেঙে গেলো, চোখ মেলে দেখে মারাংবুরু এসেছেন আর জিজ্ঞাসা করছেন, মদ খেয়ে কেমন লাগল তোমাদের? ঘর থেকে বেরিয়ে এসো।

পিলচুহাড়াম আর পিলচুবুড়হি বলে – আমরা কি করে বাইরে আসবো? আমরা যে উলঙ্গ আছি।

মারাংবুরু বললেন তোমাদের ঘরের পিছনেই শালপাতা আছে, সেগুলো সেলাই করো আর ওগুলো পরো। তারপর থেকে পিলচুহাড়াম আর পিলচুবুড়হি শালপাতা সেলাই করে পরতে শিখলো।

এই ভাবে থাকতে থাকতে তাদের সাত ছেলে আর সাত মেয়ের জন্ম হলো। তারাও আস্তে আস্তে বড়ো হতে থাকলো।একদিন পিলচু হাড়াম তার সাত পুত্রদের নিয়ে জঙ্গলে শিকার শেখাতে নিয়ে গেলো। এদিকে পিলচুবুড়হি তার সাতকন্যাদের নিয়ে জঙ্গলে শাক তুলতে আর সেই সুমতু, বুকুচ, আর সামা ঘাসের বীজ কোথায় থাকে সেগুলো চেনাতে নিয়ে গেলো। অনেক দিন কেউ কাউকে খুঁজে পেলো না জঙ্গলে, কে কোথায় হারিয়ে গেলো। তারপর একদিন এক বটগাছের তলায় সবাই এসে হাজির হয়েছে আর তখনই সকলেই সকলকে খুঁজে পেলো। তখন সবাই বড় হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারে না কেবল পিলচুহাড়াম আর পিলচুবুড়হি ছাড়া। তাদের মধ্যে আলাপ পরিচয়  হলো। মারাংকুড়া এবং মারাংকুড়িয়ে (মানে বড়ো ছেলে আর বড়ো মেয়ে) ওদের মুনামুনি হলো, মানে পছন্দ হলো আর এদিকে হুডিঞকুড়া এবং হুডিঞকুড়িয়ে (ছোটো ছেলে ছোটো মেয়ের) মুনামুনি হলো, মানে বেছে নিলো। এই ভাবে বাকিদেরও মুনামুনি হলো। 

এর পরে পিলচুবুড়হি আর পিলচুবুড়হা আলোচনা করতে থাকলো যে আমরা সাতটা ছেলে আর সাতটা মেয়ের বিয়ে দিলাম এবং সাতটা দলে এবারে ভাগ করে দিতে হবে। আর এই ভাগগুলোর নাম দিতে হবে। তারা খুব ভেবে ভেবে সাতটা দলের নাম দিলো যথাক্রমে বড়ো ছেলের হাঁসদা; মেজোর মুরমু; সেজো ছেলের কিস্কু; তারপরের ছেলের পদবী দিলো হেমব্রম; তারপর মারান্ডি; সরেন; একেবারে  ক্ষুদের দলটার নাম দিলো টুডু। এই ভাবে সাতটা ভাগে ভাগ হলো এবং তারপর থেকে সবাই  ্নিজের নিজের পদবী ব্যবহার করতে থাকলো। এছাড়াও আরও দুটো ভাগ আছে যাদের বলা হলো বেসরা এবং বাস্কী। এই ভাগের ফলে মানব সমাজের জন্য বিবাহ বা বাপলা দিতে সুবিধা হবে। আদিবাসী সমাজে পদবী যদি একই হয় তাহলে বিয়ে বা বাপলা হবে না। তাই হাঁসদার সঙ্গে সরেন হতে পারে বা মুরমুর সঙ্গে বেসরা হতে পারে এমনি করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাপলা হবে। 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীতে প্রথম মানব সৃষ্টির গল্প বা কাহিনী অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে কোথাও না কোথাও মিল আছে। আর এই আদিবাসী সমাজের প্রথম মানব সৃষ্টির গল্প বড়ই বাস্তব অন্তত পক্ষে খাবার জোগাড় এবং পোশাকে আর বিবাহে। এই যে জঙ্গল, কেঁচো সেই শরালিচেঁড়ে আর পালিচেঁড়ে – পিলচুহাড়াম পিলচুবুড়হি, সুমতু  বুকুচ আর সামা আর সেই লিটৌ সবই যেন পটে সাজানো। প্রথম পৃথিবী জেগে উঠলো অপূর্ব সূর্যের বিচ্ছুরণে। এই হলো আদিবাসী সমাজের প্রথম মানুষের সন্ধান বা ভাবনা।

***

তখন বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকে কাজ করি। গ্রাম পঞ্চায়েত, শালডিহা।  সেখানে ন‌’টা গ্রামের সাতটাই মূলবাসী জনজাতির মানুষজনের গ্রাম। আমাদের কথায় আদিবাসী গ্রাম। আমার অফিস ছিল রামপুর গ্রামে। গোদাতোড় নামে একটা গ্রামেও আমাকে যেতে হ‌’ত। সবই আদিবাসী প্রধান গ্রাম। এই আদিবাসী মানুষজনের একটা বড় অংশই পেটের টানে বছরে তিনবার মাইগ্রেটেড হতেন। যার ফলে তেমন করে কাউকে গ্রামে পেতাম না। যারা থাকতো তাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ বয়স্ক এবং কিশোর। কিশোরদের বয়স আট থেকে এগার বছর।  সুশান্তর মা আমাকে নানা ভাবে সঙ্গ দিত। 

গোদাতোড় গ্রামে যেতাম দুপুরে। ওই গ্রামের সুকুমুনি বেসরা আমাকে তেমনই বলে দিয়েছিল। রামপুর থেকে পশ্চিমে যেতে যেতে কয়েকটা বড় পুকুর পড়ে। সেই পুকুরের পাড়ে বেশির ভাগ তেঁতুল আর বাঁশ গাছ।  গোদাতোড় গ্রামে গিয়ে মেয়েদের খুঁজে বেড়াতাম। এই গ্রামগুলোর পথঘাট বেশিরভাগ পলাশ এবং পলাশের ছোটগাছে ঢাকা। রাস্তা জুড়ে ছাগল ভেড়া শুয়ে থাকতো, কারো কারো ঘরের প্রাচীরে চালা নামিয়ে মোষ বলদ গরু বেঁধে রাখতো। জঙ্গলের  ছায়ায় থাকত শুকরের দল তাদের ছানাপোনা নিয়ে। দুচারটে বুনোমুরগি আর হাঁসেদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে।

সেই গ্রামে কালিপদ বাস্কে নামে এক মানুষ ছিলেন। তাঁর বাড়ির উঠোন প্রায় একবিঘা হবে। সেখানে ছাগল গরু হাঁস মুরগির বাস। কালিপদ কোনো এক ব্যাঙ্কে চাকরি করেন তাই তাকে সহজে পাওয়া যেতো না। রাতেই পাওয়া যেতো। এদিকে গ্রামের মানুষ সারা দিন বাইরে কাজে যায় তাই মিটিং বা আলোচনা করতে গেলে আমাকেও রাতেই যেতে হতো কোনো কোনো দিন। কালিপদ তার উঠোন বারান্দা ছেড়ে দিয়েছিলো কাজ করার জন্য।এখানেই হতো চাষিদের জমি, সেচব্যবস্থা, বীজ আর গোবর সারের যোগান বাড়ানো নিয়ে আলোচনা। আলোচনা করতে করতে রাত হয়ে যেতো। 

আমি আমার রামপুর অফিসের ঘরে ফিরবো। গোদাতোড় থেকে রামপুরের দূরত্ব খুব বেশি না, তবুও একটু দূর আর মাঝে কোনো ঘর নেই। কালিপদ আমাকে খুব ভয় দেখাত ভূতের। কারণ মাঠের মাঝে যে বিশাল পুকুর পেরিয়ে আমি আসি, সেই পুকুরেই নাকি এলাকার অনেক মানুষ মারা গেছেন। তাদের সবাইকেই নাকি নিশি ডেকে নিয়ে যায় আর সেই তেঁতুল গাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেয়। আমি সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে কালির দিকে তাকিয়ে থাকলে কালি হা হা হা করে হাসে। 

কালির বৌ খুব ভদ্র। সে বলতো চল আমি তুখে এগিয়ে দিয়ে আসি। এই ভাবেই চলতো। গোদাতোড়ের মেয়েদের সঙ্গে মিটিং হতো মাশরুম চাষ আর বাঁশ লাগানো নিয়ে। কখনো কখনো  শুয়োর চাষ নিয়েও আলোচনা হতো। ওরা আমাকে শেখাতো সাঁওতালি গান। সেই গান শুরু হতো নিচের স্কেল থেকে আর মাঝে ছেড়ে দিয়ে বহুদূর তাদের পাঠিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো, তারপর আবার ধরতো সেই গানের রেশ।আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম গান শেষ হয়ে গেছে তাই হাততালি দিয়ে ফেলতাম। মেয়েরা কিছু বলতো না। তারা যখন আবার গান ধরে ফেলতো তখন নিজের বোকামির জন্য লজ্জা পেতাম। সেই সময় তারা শিখিয়েছিলো যে গানগুলো তার কয়েকটি এখানে দিলাম – এই জন্যই যে প্রকৃতিকে বাঁচাতে প্রকৃতি থেকে কিছু নিতে তাদের যে লজ্জা এবং কৃতজ্ঞতা এইটুকু বোঝানোর জন্যে। আর খানিকটা আমাদের নিজেদের লজ্জা নেওয়ার জন্যে।

   আদিবাসী গানের বেশ কয়েকটি ভাগ আছে – ধর্মের নাকি প্রকৃতির বোঝা যায় না।ধর্ম আর প্রকৃতি একাকার হয়ে আছে। আদিবাসী সমাজে বার মাসে বেশ কয়েকটি পার্বণ, শরহায়, ছোটোবাঁধনা, দাশায়, বাহা। করম পুজোও হয় আবার চড়ক পুজোও করতে দেখি। গানের কথায় সুরে, প্রকৃতি, পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গদের বেঁচে থাকা, বাঁচিয়ে রাখা। 

সূঁচ কিদায়ঞ ডাডি-কিদাঞ সরবনখা নাড়ি ঢিপোর্যে
হেলকাওয়াতে দাদোঃ লৌঁওয়া
হেলকাওয়াতে দাদোঃ লৌঁওয়া
দাদোঃ বডেএঞ-
জ্যাঙ্গে জ্যাঙ্গে এদেলবাহা
মহোসদোঃ বাঃনুয়া
জানুমিনা কিয়া বাহা জানু মিনা কিয়া বাহা
সৌদা মিনাআঃ

বাংলা সুবর্ণরেখা নদীর জল নিতে গেলে
বালি সরিয়ে সরিয়ে জলের ঝর্ণা আনতে হয়
এই বালি থেকে ঝরে আসা জল
হিলিয়ে দিলে জল কাদাগোলা হয়ে যায়
তাই এই জল কলসিতে ভরতে হলে
ধীরে ধীরে জল তুলে নিতে হবে
ঝাঁকে ঝাঁকে পলাশ শিমুল ফোটে
সকলেই দেখতে পায়
কিন্তু তাদের সুগন্ধ নেই
অথচ কাঁটায় ঘেরা কেয়া ফুল কোথায় ফোটে
কেউ তেমন করে দেখতে পায় না
কিন্তু সুগন্ধ নাকে এসে লাগে।

রাজ বাহা তুয়া বাহা
ওকারিলাং
রহো আনা দায়
আড়ি বাড়ি বাঁধ আড়ি রে!
যখুন ইঞবাবা ইঞ-গ
কিংগজোয়া
তখুন নিওবাহা বাবা আর গ
মিতাকিনৌঞ
তখুনই গেতআ
রাজ বাহা তুয়া বাহা।
পদ্মফুল এবং শালুকফুল
তুলে এনেছি দিদি
বলো কোথায় লাগাবো
দিদি বলছে- বাড়ির পাশে বাদাড়ের পাশে
যে পুকুরগুলো আছে
সেখানেই লাগাও
যখন আমাদের বাবা মা থাকবে না
তখন আমরা এই ফুলগুলোকে
বাবা মা ভাববো আর কাঁদবো।

বুরুরে সিং অড়া পালুএনা
গ-ববা হুকিঞ লাঙ্গাএনা
হড় হলাং হহো আকু
পাজ্জি হো লাং ঞেল ইচুয়
গ-ববা হোলাং দুলৌড়কিনা

পাহাড়ে একটা শাক বুড়িয়ে গেলো কিন্তু পাহাড় ধরে রেখেছে সেই ভাবে আমাদের মা বাবারা আস্তে আস্তে বুড়ো হয়ে যাবে আমরাও আমাদের বুড়িয়ে যাওয়া মা বাবাদের ভালবাসবো

আলে ঝটকারে জানুমদারি
দৌন আতেদো প্রিয়ো আলুম রাহাআ
আলে রেন গুতি কুড়া আড়ি গি ঠোক আ
শাতি লাতার খয় টুটি ঞিয়া।

আমাদের উঠোনে একটা কুল গাছ আছে সেখানে একটা পাখি ডাকছিলো আমাদের একটা বাগাল আছে সে খুব রাগি ঘরের পিছন থেকে গুলতি দিয়ে তাকে মারে।

আলে ঝটকারে জানুমদারি
কিড়-বিড়বিড়-কিবিড়
বিং এ টুডোংকানা
দেসে তালা দাদা কিড়বিড় বিড়কিবিড়
বাবের নৌতে আগু ঔ মে
কিড়-বিড়বিড়-কিবিড় বিং

ইং পাসি ইয়া
আমাদের আঙিনাতে একটা কুলগাছ আছে
সেই গাছে একটা সাপ হিলে দুলে উঠছে
দাদা একটো দড়ি নিয়ে আয়
সাপটাকে বেঁধে রাখি তবে।

কুলহি মুচোত জোড়াবাঁধ
বাহিড় হুড়ু দারি এনা দাদা
হুড়ু দৌয় না বালাং গেদ আ
হাঁসা হাঁসি চেঁড়ে দৌয় নাকি তুকো আকাদা
হুড়ু দৌয় নালাংগেদ আ
তুকো দৌয় না বালাং
সবুজ লুতি সুতোম তিকিং তুকো আকাদা।

রাস্তার মোড়ে এক বাঁধ আছে সেখানে ধান গাছ বড়ো হলো সেখানেই হাঁসা হাঁসি বাসা বেঁধেছে আমরা ধান কেটে নেবো কিন্তু ওই পাখির বাসাটা কাটবো না কারণ তারা সবুজ সুতো দিয়ে বাসা বেঁধেছে।

কুলহিরে ঝিঙেনাড়ি বাড়্গিরে ঝিঙে নাড়ি
গৌই দাদা ঝালি আকানা
গৌই দাদা আলুম দালে ঝিঙে নাড়ি গেতমে
মিহু দাদা জনমে টুয়োর

মাঝ রাস্তায় ঝিঙের লতা ঘরের পিছনে ঝিঙের লতা সেখানে গরুবাছুর লতাতে জড়িয়ে গেছে গাই গরুকে মেরোনা দাদা বাছুরটা তো অনাথ হয়ে যাবে।

মারাং বরু চটরে মনরে গাডালেকা
কিদিন বাহা
মনে মনে তদৌ দিসো মেঞা
কিদিন বাহা
তিরী পুরুষ লিকা উই হর মিয়াঁ
পাহাড়ের উপরে একটা মনের মতো ফুল ফুটে আছে
মনে মনে ফুলটা মনে পড়ে
আর চিন্তা লাগে।

এ দাদা মারাং দাদা আডি ল্যাবেড় কাঁথা
গুডু নাচ নিও পুসি মোদে রিও
মেরোমকুড়ি তুরুকড় বাপলা
আলেরেন বান্ডিসেতা রায়বার দিলাত
এ দাদা মারাং দাদা।

দাদা এ বড়দা একোটা মজার কথা শোন ইঁদুর নাচছে বাঁদর মাদল বাজাচ্ছে ছাগলের মেয়ে এবং শিয়ালের ছেলের বিয়ে হচ্ছে ঘটকালি করেছে বেঁড়ে কুকর

১০

হড়রেন গ,বাবা দো জাড়ি লবয়
ইঞ রেন বানু কুউয়া
দুঃক্ষু পুকুরিরে দুলুকা দুঃখ দিয়ো কাতে
বাহা সীতা আঃ।

সবার বাবা মা আছে আমার বাবা মা নেই আমার মনে খুব দুঃখ হয় আর দুখটা ভুলে রাখি আমি ফুল তুলতে যায়।

১১

মারাং বুরু কু কুড়কি কিদা
সানাম দারিসাকাম ঞুর চাবা এনা
চেঁড়ে দুকুরা কিদা দারি হিরল
ধারতি মানেওয়া চাঁদু হিরল।

জঙ্গলের গাছ পালা সব কেটে দিয়েছে গাছেদের সব পাতা ঝরে গেলো তাই সব পাখিরা কান্নাকাটি করছে আর মানুষেরা ভগবানের উপরে নির্ভর করে বেঁচে আছে।

গানের সাঁওতালি হলো সিরিঞ। এই সিরিঞগুলো বিশেষভাবেই   আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। মূলবাসী জনজাতির মানুষ কখনোই প্রকৃতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারেনি। তাদের হড় সৃষ্টির কাহিনিতেই বলা হয়েছে শারলি আর পালির গর্ভ থেকেই তাদের জন্ম। জন্মের গল্পে, কোনো লিঙ্গ বৈষম্য বা পক্ষপাতিত্ব  নেই। পুরুষের জন্ম স্বয়ং ঈশ্বরের হাতে আর নারীর জন্ম অন্য কোনোভাবে, এমন কিন্তু নয়। পুরুষ ও নারী সমানে সমান বা বলা যেতে পারে সমান এবং সমানতায় তারা জীবিকা যাপন করে আসছে।

প্রথম গানে অনাবিল এক সৌন্দর্য বোধ। জলের সঙ্গে মিতালি, বালির সঙ্গে বন্ধুত্ব আর গাছদের সঙ্গে ভালোবাসা। লুকানো জিনিসের সুগন্ধ আর প্রকাশিত জিনিস যা কেবল প্রদর্শন সেই বোধটাকে গানে গানে সমাজের স্তরে স্তরে মাখিয়ে রাখেন তাঁরা। অভিজ্ঞতাকে গানের মধ্য দিয়ে একটি পানীয় বা শরবৎ বানিয়ে রেখেছেন, যা কিনা  আগামী প্রজন্মের জন্যে স্যালাইন। যেমন চমৎকার কথা, তেমনই চমৎকার শব্দের ব্যবহার।  

আদিবাসী মানুষেরা সেই আদিমকাল থেকে নদী থেকেই সংগ্রহ করে আসছেন খাবার জল। অবশ্য শুধু আদিবাসী কেন, সম্প্রদায়ের  মানুষজন তখন তো আর শতধারায় বিভক্ত ছিলো না। সকলেই দূর থেকে, নদী থেকেই খাবার জল আনতেন। পুকুর থেকেও সংগ্রহ করা হ’ত কিন্তু মানুষ যত আধুনিক হয়েছে ততই  অলস হয়েছেন। অত্যাচারী হয়েছেন তাই দখলদারিও বেড়েছে। সেই দখলদারিকে সরকার মদত দিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা মেহনত দিয়ে সৃজন করতে পারেন তাঁরা আর লড়াইয়ে যাননি। আর এই মানুষগুলোর অধিকাংশই হচ্ছেন আদিবাসী মানুষজন। তারা জানেন, বিশ্বাস করেন প্রকৃতি তো মাতা। মায়ের হাতে খাবারের হাঁড়ি দিয়ে সকলেই নিশ্চিত যে তিনি সকলের পাতেই খাবার  দেবেন।

 পেটুক সন্তানের পাত থেকে খাবার কি করে কেটে রাখতে হয় মা জানেন, প্রকৃতি থেকেই এই পাঠ নিয়েছেন মা। প্রকৃতি যেমন জানে সব হারিয়ে যাচ্ছে তাই এই হারাতে বসা কিছু কিছু সম্পদ সে লুকিয়ে রাখে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে, বাঁচিয়ে রাখেন আরো কিছু কাল। তাই এই প্রকৃতি এবং সন্তানেরা জানে বালি শুকনো দেখালেও, জমাট বালি কি করে যেন বাতাস থেকে বায়ু ধরে জল তৈরি করতে পারে। এক লরি বালি যখন সামনে দিয়ে চলে যায় তখন দেখা যায় লরিটি যেন এক খণ্ড মেঘ সারাক্ষণ বৃষ্টি ঝরাতে ঝরাতে চলে যাচ্ছে। জল চুরি হয়ে যায় এই বালি মাফিয়াদের কাছে। আদিবাসী মানুষ তাই বালিকে পরতে পরতে সরাতে বলেছে. বালির গা বেয়ে নেমে আসবে জলের ধারা। এই ধারাকে যেন না হয় ভাঙা, না দেয় নড়িয়ে। নড়িয়ে দিলে জল ঘোলা হয়ে যাবে। দেখছো না কত এদেলবাহা শিমুলফুল ফুটে থাকা সকলেরই চোখে  পড়ে কিন্তু তার কি কোনো সুগন্ধ আছে? মোটেও নেই। সুগন্ধি অতি দুর্লভ কাঁটায় ঘেরা, হাতে পাওয়া বড়োই দুষ্কর, সেই কেয়াফুল গাছেই থাকে, তার সুগন্ধ নাকে এসে লাগে, আহা মহোসদো মিনাআ। আহা কি সুন্দর তার সুগন্ধ বাতাসে ভাসে, ঘ্রাণে তার পরশ। 

দ্বিতীয় গানে ভারি সুন্দর এক অনুভূতি। প্রকৃতি আর আপন ভাবনার আধারের। পদ্মফুল শালুক ফুল তুলে এনেছে,  তার গোড়াও তুলে এনেছে, আলোচনা করছে দিদির সঙ্গে। জানাচ্ছে, কি ভাবনায় সে ফুল তুলেছে আর কেনইবা সে ফুলগাছ  লাগাবে নিজের ঘরের পাঁজরে (পাশে) যে জলাশয় আছে, পুকুর আছে, সেখানে। যেখানে আদিবাসী মানুষের তেমন করে আর বিলাস করার জায়গা নেই। এক প্রকার রাজ্য হারিয়েছে আর্যদের কাছে। বন্দিদশায় ভুমি হারিয়ে ক্ষেতমজুরি করে সেখানে তো আর কমলকানন গড়া যাবে না! সারা ভূমি জুড়ে যেখানে জলাশয়, সেই ছুলবুলে জলামাটিতে লাগিয়ে রাখো ফুল ফসল। ধান কাটাতে ধান পুঁততে যাবো। অন্য লোকের, অন্যের ভুমিতে ফুটে থাকবে ফুল আর আমাদের বাবা মা  এই রাজবাহা তুয়াবাহা। গোলাপি পদ্মফুল আর সাদা শালুকফুল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পথে ঘাটে মায়ের মতো কাউকে মনে হবে,আচমকা দেখে বাবার মতো কাউকে মনে হবে। সেদিন হয়তো এই পরমাত্মীয়রা থাকবে না সামনে, তবে এই যে আমরা লাগিয়ে রাখছি রাজবাহা তুয়াবাহা,  এদেরই বাবা-মা ভেবে, আপন মনকথা বলবো মা গো।

জানিনাতো আমরা যারা স্কুলে পাঠ নিয়েছি, তারা বা তাদের মধ্যে কতজন অন্যের জমিতে ফুটে থাকা ফুল পাতা, দাঁড়িয়ে থাকা বনভূমিদের নিজের মা বাবা ভেবে কাছে বসে, আর একটু জল ঢেলে, গোড়ার মাটি একটু আলগা করে অক্সিজেন ভরে দেবে। যদি এমনি করেই আদিবাসীদের আইমানহড়দের কাছে থেকে  নেওয়া যেতো সেই পাঠ, তাহলে আজকের পৃথিবী এতো অসুস্থ হতো না। 

তৃতীয় গানে অনুভূতি আসে, জানি না কেন ওরা বললো না আমাদের বুড়ো মা-বাবাদের বৃদ্ধাশ্রমে রাখে দেবে আর খবর নেবো না। হয়তো তাদের বাবা মায়েরা তাদেরকে মাটিতে, গাছের তলে পিঁপড়ে কাঠবেড়ালিদের খেলার সাথি করেছিলো আর বলেছিলো এই মাটি, তোমার এই জঙ্গল, তোমার এই শিকড়, তোমরা দেখো আর সুখী থেকো। কিছু খেয়ো আর বাকিটা রাখে দিও আগামী পৃথিবীকে সুস্থ রাখার জন্য। শিখতে হবে জানতে হবে। আর সময় নেই। আমরা নিশ্চুপ হয়ে বসে থেকে নিজেদের বসে থাকা ডালে কোপ মারা যদি না  বন্ধ করি,  তাহলে সবাই, আমরা সবাই-ই একই গর্তে যাবো। 

পরের দুটো গানেও পাখি আর সরীসৃপকে রক্ষার কথা বলা হয়েছে। উঠোনে একটা কুলের গাছ, আর তাতে একটা পাখির  বাসা। কিন্তু আশঙ্কা করছে যে ঘরে গরু ছাগল দেখাশোনা করা রাখাল বড় বদমেজেজি,  কি জানি কখন গুলতি দিয়ে পাখিটাকে মেরে ফেলে। পঞ্চম গানে তাদের উঠোনের যে কুলগাছ, সি গাছে একটা সাপ হেলেদুল উঠছে। দাদা একটা দড়ি আনো সেই সাপটাকে বেঁধে রাখি। অথবা সাপটাকে মারবো। যতক্ষণে দাদা লাঠি আনবে, ততক্ষণে এ সাপটা পালিয়ে যাবে । এই যে কৌশল করে সাপকে বাঁচিয়ে রাখা, এ এক প্রাণীজগতের সঙ্গে সম্পর্ক-কথা। আমরা সাপ দেখা মাত্র কাউকে লাঠি আনতে বলতে হয় না, নিজেরাই হাতের কাছে সাপ কুকুর মারার জন্যে লাঠি রেডি রাখি। আমরা আধুনিক মানুষেরা ইকো-সিস্টেমকে ধ্বংস করছি। কি ভাবে ব্যালেন্স রাখবো আমরা! আজ যে পৃথিবীর কঠিন অসুখ। কে বলেছে পৃথিবীর অসুখ এসে একেবারে সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কেবল মাত্র মানুষদেরই ধরেছে!  ৫ এবং ৬ নাম্বার গান দেখলেও দেখা যায় প্রকৃতিকে যেমন রক্ষার কথা বলছে তেমনি প্রাণীকেও রাখার কথা বলছে। 

পরের গানে ধান কাটতে যাবার কথা। কিন্তু সেই মাঠে যে শরালি আর পলি দুজনেই বাসা বেঁধেছে!  তারা সবুজ সুতো দিয়ে ভালোবেসে  বাসা বাঁধেছি। সেই বাসাকে তো রক্ষা করতে হবে! রাস্তার ধারে ঘরের উঠোনে ঝিঙের গাছ আর সেই গাছের মাঝে একটা গাই আটকে গেছে। দেখো ওই গাইটাকে মেরী না যেনো, তাহলে বাছুরটা অনাথ হয়ে যাবে। বাছুর আর ঝিঙের লতা অতি কোমল। আবার বাছুর সেটাও কচি সুতরাং তাদের যদি মারো তাহলে অনাথ হয়ে যাবে। 

এই বোধের কথাই অন্য গানগুলোতেও। ওই প্রকৃতিই। পাহাড়ে ফুল ফোটে, তা বড় মনোরম, ফুলটা তো তুলে মাথায় রাখা উচিত। একটি গানে তো খুবই রসিকতা করেছে তাঁর দাদাকে। বলছে কি মজার কথা শুনেছো! ছাগলের ছানার বিয়ে হচ্ছে শিয়ালের ছেলের সঙ্গে! 

গানের ভিতর দিয়ে তাদের আপন ভুবনখানি ডানা মেলে।  প্রকৃতি কত না বৈচিত্রে ভরে ওঠা। চোখ মেলে চাওয়া। 

শেষ গানে লোভি মানুষ, আরো আরো পেতে চায়। গাছপালা মানুষে কেটে দিচ্ছে, পাতা ঝরে পড়ছে, পাখিরা কাঁদছে আর মানুষ কত চালাক, বাঁধ বেঁধে  বানের জলে তাদের এলাকা ভাসিয়ে দিচ্ছে! 

মূলবাসী জনজাতি  সমাজে, প্রতিটি কাজই যেন তাদের নিজস্ব ইতিহাস বহন করে। দেওয়াল চিত্রে সেই ইতিহাস ফুটিয়ে তোলে। কোথাও কোথাও দেওয়াল-ছবির সঙ্গে স্কাল্পচার। কাঠ লতা পাতা ফুল পাখি ময়ূর সাপ বাজপাখি কি নেই সেই সব ছবি জুড়ে! কোথাও মনে হয়, কেবলই হিজিবিজি!  না। সেসব তাদের নিজেদের কাহিনি,  আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কেবল ছড়িয়ে থাকে সে ইতিহাস তাদেরই মধ্যে! আমরা কেউই মূল্য দিইনি, অবজ্ঞা, অবহেলায়! অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। ঋণ শোধের সময় আজ।