কমলেশ পাল

না-ভেবে ছুড়েছি জাল

না-ভেবে ছুড়েছি জাল, চাঁদ ফেঁসে গ্যাছে।

জালে ম্যালা জ্যোৎস্না-চাঁদা, নক্ষত্র-মৌরলা
ছাড়াতে পারছি না আমি। টানাটানি হলে
ঘাই ছিঁড়ে যাবে।

থাকো তবে জাল থাকো, এভাবে আকাশে গোল হয়ে।

আমার অনেক হয়ে আছেঃ
নারী ও পুকুর-ঘাট, জলসেঁচি, কুটুম্ব-পাখিরা…
খালুই আতিথ্য নিতে আর পারছে না
তার এখন দশা টুবুটুবু।

আমারও এ-গালে জ্যোৎস্না, ও-গালে গভীর অমারাত।
অন্তিম জালের দড়ি শূন্য থেকে নামছে মুঠোয়…
সংযোগ-বিয়োগ-হারা, বাঞ্ছাহারা দড়ি।

না-ভেবে ছুড়েছি জাল, চাঁদ ফেঁসে গ্যাছে।

ঘা দিয়েছো

ঘা দিয়েছো কর্তালে কর্তালে
নেচে উঠছে কবেকার অস্পষ্ট কীর্তন
না গেয়ে কি পারি?
আবাহনে লাগিছে মাথুর?
সমে এসে মিলিছে না সুর? না মিলুক
আমার কদমখন্ডি তোমার শ্রীপুর…
অজয় বহিয়া যাক মাঝখান দিয়ে

সাধি নি, সাধি নি আমি, কিচ্ছুটি সাধি নি
রয়ে গেছি তোমার আনাড়ি

ঘা দিয়েছো কর্তালে কর্তালে
নেচে উঠছে কবেকার অস্পষ্ট কীর্তন
না গেয়ে কি পারি?

সোঁদরবনের কাব্য

ব্যথার মতো জল ছলাচ্ছে, জোয়ার যাচ্ছে ফিরে
ভালোবাসার হালুম জাগছে বারোটা রাত্তিরে

জেগে ঘুমাও মউলি মেয়ে, শয্যা সোঁদরবন
কাদায় গোপন শূল রয়েছে, সামলে পদার্পণ
করো কন্যা, মন অনন্যা রাখো বাঘের দিকে
মউপোকারা গুনগুনাচ্ছে, জোস্নাটি ফিকফিকে

মুখ ঘুরিয়ে পিছনে চাও, সামনে মুখোশ বাঁধো
‘ভাল্লাগেনা বাঘ তোমাকে’ নখড়া করে কাঁদো
ধোঁয়ার মশাল জ্বালো কন্যে, মশালে দাও ফুঁ
চক্ষু টাটাক মউপোকাদের, কাল বাদে পরশু

বাঘ তোমাকে নিয়ে যাবে, ভালোবাসার বাঘ
গরগরাচ্ছে সোঁদরবনে, তোমার দিকে তাক
ভান করে সে চুপ ঘুমন্ত কেওড়াঝোপের আড়ে
তোমায় ধরে না নিয়ে বাঘ ফিরবে না সংসারে

চাঁদ ঘুমোতে অস্তে যাচ্ছে হাইতুলে খুব ধীরে
ভালোবাসার হালুম জাগছে বারোটা রাত্তিরে

দোলযাত্রা

দূরবর্তী বুলবুলি তুমি
নিমগাছটিকে নিয়ে কাছে চলে এসো।
তোমাদের একটুখানি রঙ্ মেখে দেবো।
দিনান্তে ছলকাচ্ছে খুব ব্যর্থতার রঙিন নির্যাস
যাকে পাবো তাকেই লাগাবো।
মানুষ পাচ্ছি না, তার টায়ার দরকার,
পেট্রল দরকার তার, ডিজিটাল পিস্টন দরকার…
আর কিনা দোলমঞ্চ হয়ে আছি আমি?
নেমে যাচ্ছে মেরুন সিগনাল।
আকাশ ফেস্টুন করে শালের মিছিল শুরু হোক,
খোঁপায় ফুলের ঝান্ডা, গোধূলি স্লোগান দাও
চিহড়লতারা!
ও দোয়েল, রঙ্… শুধু রঙ্…
সত্যি বলছি, বুকে কোনো জলকামান নেই।
বিষাদগুচ্ছটি

হিসাব মিলিয়ে দ্যাখো, বিষয় নিইনি।
তুমি দিয়েছিলে বলে
বিষাদগুচ্ছটি
বুকে লয়ে শুয়ে আছি আমি।

আশেপাশে রজনিগন্ধার ভীড় ধূপকাঠি লয়ে
জমিয়েছে রীতিমতো শোকের আবহ।
এরা সঙ্গে ততদূরই যাবে
যতদূর শোকার্তরা যায়, যেতে পারে —
চুল্লির বাহির অব্দি, ভেতরে যাবে না।

কেবল তোমার দেয়া বিষাদগুচ্ছটি
বুকে করে চুল্লির ভিতরে
প্রবেশিব আমি।

ভালবাসা কিছু দিলে, সঙ্গে নিয়ে পুড়ে যেতে হয়।

শাদা পদাবলি

আলখাল্লা মেজাজে বানিয়ে
কী করে যে আমি তার বাইরে রয়ে গেছি!
আলনাতে ফকিরি অবাক।

নিজেরই পোর্ট্রেট আঁকতে স্কেচকে ডিঙিয়ে
চলে যাচ্ছি নক্ষত্রপাড়ায়।
ইজেল থাকলো খাড়া তেরো বাই দুই কোন ভুল সরণিতে।

ঠিকমতো গীটারে বাজছি না
বেতালা থাপকি হচ্ছি হই-রই গানের গাজনে—
বিটোফেন ভিতরে কাতর।

ভালবাসা ভেবে ভুল শরীরের দিকে
পৌঁছে আমি হল্লা তুলে সোনাগাছি তোলপাড় করিঃ
আছো নাকি রামী!

আছো নাকি রামী… রামী… রামী প্রতিধ্বনি…
কাঁপে ধোবিঘাট।
ডায়েরিতে ষোলো পাতা শাদা পদাবলি।

অনুমতি করো

ভোলাদা জিলিপি ভাজছে, এসে বসে পড়ো
হাটখোলা শ্রীক্ষেত্র হোটেল—
ফ্রি-ভোজন, ফাটিয়ে ঢেকুর তোলো, ব্বাস্।
ইচ্ছে আছে ঢেকুর ফাটাবো…

সবকিছু জীবনকড়ার
আদিগন্ত বেহিসাব পৃষ্ঠার বিস্তার –
খাতকের নাম নেই, টিপছাপ কোনোখানে নেই।
যা দরকার লোটো।

খুব লুটছি জলদাপাড়া অযোধ্যাপাহাড়…
লুটের কেঁদুলি-ধুলো…মেখে ফেলছি গোটা জয়দেব –
বাউল গানের সঙ্গে কতো নেবো গাবগুবির মাতন…
কোঁচড়ে জায়গা নেই আর।

চতুষ্কোণ দিয়ে ঘেরা জানালায় সন্ধ্যার আকাশ –
চেষ্টা করছি, কামরাতে ঢোকাতে পারছি না।
সাইড ব্যাগে চাঁদতারা ঢোকাতে পারছি না
সাইড ব্যাগ বেফালতু কিনেছি।

গাছ নদী শেওলা শালুক বেনেবউ,
কবিতা করব আমি, একটুখানি শব্দরূপ ধরো।
ভোলাদা, জিলিপি ভাজছো… শ্রীক্ষেত্র হোটেল, তুমি খোলা…
একটি প্রণাম লিখবো, অনুমতি করো।