সন্ত্রস্ত হন্তারক : সমীর ভট্টাচার্য

– সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

গ্যালিফ স্ট্রিট থেকে আমরা মন্থর চরণে রাজবল্লভ পাড়া পর্যন্ত হেঁটে এসে বুঝতে পারি এ কলকাতা আর আমাদের নেই৷  গিরিশ ঘোষের বাড়ির পাশে চিনে খাবারের দোকান। এই দেখে সমীর গতি বাড়ায়৷  গাঙ্গেয় কলকাতায় সে দেখতে পায় ঈশ্বরের মরদেহ গরানহাটায় পড়ে আছে৷  কেন যে রোদ্দুর, কেন যে নিমডালে কাক, কেন দিবাস্বপ্ন ছাড়া কোন শুভবার্তা নেই- সমীর জানতো না৷  একা, কর্কটে বচনহারা, সমীর জানতে পেরেছিল নিমতলা ঘাটের প্রতীক্ষালয় এখন বাতানুকূল ট্যুরিস্ট কুটিরবৎ৷  শেষবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয় শোভাবাজার মেট্রোর পেছনে প্রধান আঁধারে৷  জগৎ মুখার্জি পার্কের নৈঋত কোণ থেকে পঞ্চমীর চাঁদ- ধরণীর যে কি আঁচল-  সমীরের চোখের কোলে সেই মায়া-  সে আর বলতে পারে না গঙ্গা বলে প্রাণ ত্যজিব জাহ্নবী জীবনে৷

আসলে চিত্রকর সমীর ভট্টাচার্য  একুশ শতকের অন্তত দুটি দশক পার করার আগেই নিশ্চিত হয়েছিল যে সোনাগাছির বেশ্যাদের পুনরুত্থানের পথ আছে৷  কারণ তাদের শরীরে উৎকীর্ণ হয়ে আছে সেলস রিপোর্ট৷  তার খদ্দেরদের হাতে কম বেশি পনেরো মিনিট সময়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পাপ লুকিয়ে ফেলার জন্য কলতলা , যেখানে টাকা তাদের চামড়ার ময়লা সাফ করে দেবে৷  অর্থাৎ সমীর জেনেই গিয়েছিল পরিত্রাণের পথ নেই৷  প্রতিষ্ঠান, ভিসা অফিস, গ্যালারি ছাড়িয়ে সে তাই চলে যায় ব্যর্থ অন্ধকারে৷  হাতে পাতালের চিরকুট ছিল বলেই ভিড়ে৷  লোহাপট্টিতে, আদি গঙ্গার ময়লা জলে চাঁদ ঠেলে ছদ্মবেশী অসনাক্ত রাজকুমারের মতো লুকিয়ে থাকতো সে৷  বস্তুত একই সঙ্গে বেড়াল ও বেড়ালের মুখে ধরা ইঁদুর হাসাতে গিয়ে বৈকুণ্ঠ ও নরকের থেকে তার অবস্থান কতদূর জানতে চেয়ে সমীর ঠোঁটের ডান কোণে যে হাসিটি ঝুলিয়ে রাখত তা হিমশীতল, তা শিল্পীদের কবরের মাপ জানে৷  আমার আজ আর সন্দেহই নেই আহিরিটোলার দত্তদের বাড়ির বটের ঝুড়ির পাশে সে আমাদের নাগরিক  মেফিস্টোফিলিস৷  এমন দেবতুল্য শয়তানের সঙ্গে কত মজা করেছি মনে এলে এখন চোখে জল আসে৷

হয়তো এক জন্মের ভুলচুক সমীরকে সভাকবি ও রাজশিল্পী হতে বাঁধা দিয়েছে৷  কিন্তু ছোট ছোট পটেও, ক্যানভাসেও, একটা এ-ফোর কাগজেও তাঁর ড্রয়িং  কি অলৌকিক!  অ্যাঁগ্রে যেমন ড্ৰইংয়ের-এর সংগতি, সমীরও আমাদের ছোট এলাকায় দৃশ্যকে জরায়ু পর্যন্ত উলঙ্গ করে দিতো৷ এ কাজ কঠিন। রঙ চিত্রকরের পক্ষে একরকম আঙরাখা৷  নগ্নবক্ষে শিরোস্ত্রাণহীন সমীর যখন পটে আধিপত্য করতো তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না৷  সর্বতোভাবে একা ও আধুনিক সমীর, তার  রক্তে ও মর্মে সমকালীন শিল্প ঐতিহ্যের প্রতি ঔৎসুক্য ছিল৷  আমাদের ক’জন সহকর্মী এমন আশ্চর্য পথে সময়ের সহবাস করে গেছে তা বলা দুষ্কর৷  একজন শিল্পীকে ইতিহাসের বাসর ঘরে ঢুকতে হয়৷  শোভাবাজার আর কুমারটুলি থেকে সমীর জানতে চাইত টাইমস স্কোয়ারে কি গান হচ্ছে৷  আড্ডায় তার মধ্যে একটিই আলো আমার চোখে পড়েছে– তা কূপমাণ্ডুক্যহীনতা।  সে অপরের কাছে মদের জন্য হাত পেতেছে কিন্তু মিডিয়া শোভন হওয়ার জন্য প্রদর্শনী থেকে প্রদর্শনীতে হাজিরা নথিভুক্ত করেনি৷

সমীর হয়তো নিজের মোমবাতি  দু’দিক থেকেই পুড়িয়ে ছিল, কিন্তু এক বিরল শিল্পী যে জীবনের কোরাস থেকে চ্যুত হয়নি৷  যেমন অনেকের ধারণা যে সমীর আলাভোলা আপন স্বভাবে পথ চলত- তা নয়৷  সে অবহিত ছিল, অন্তত সচেতন একটি অ্যানটেনা ব্যবহার করতো শিল্পের সর্বাধুনিক অভিব্যক্তি জানতে৷ রতিকান্ত মুদির ছেলের জন্য সে জানালা খুলে দেয় যাতে ত্রিস্তান চ্যাপেল আর অজন্তার গুহা দেখা যায় যুগপৎ৷  আমাকে সে কতো ভালো বেসেছিল!  তাঁর শেষ ফেসবুক ছবি আমার, জানার পরেই আমি সিদ্ধান্ত নেই যে আমাকে শ্মশান যাত্রায় দেখলে সমীরের অভিমান হবে৷  আমি তাঁর অন্তেষ্টিতে থাকবো না৷  আমাদের তো একদিন দেখা হবেই৷  স্বর্গ বা নরকের অনির্বচনীয় ক্যাণ্টিনে অবিরাম ফুর্তিতে৷

শোক আমার জন্য নয়৷  বিদায় সমীর!