দেখা

– অর্ঘ্যদীপ

সবাই বলে, পৃথিবীটা নাকি খুব সুন্দর।

আমি যেরকম ভাবি, তার থেকে অনেক বেশি
সুন্দর এই পৃথিবী…

আমারই দেখার চোখ ছিল না হয়তো,
তাই দেখা হয়নি।

দেখা হয়নি সমুদ্র
দেখা হয়নি পাহাড়
দেখা হয়নি দূর বরফের দেশে
হলুদ মেপল পাতা
বিষণ্ণ বাতাসে পাক খেতে খেতে
ঝরে যায় অবিরাম

একা, একা, আরও একা হয়ে
কত দীর্ঘ পথ আমি হেঁটে গেছি মানুষের ভিড়ে
হয়নি দেখা বন্ধুর মতো কারও সাথে কতকাল!

নতজানু হয়ে বসে
প্রেমিকের জীবন চেয়েছি
প্রতিটি প্রার্থনায়

অথচ দেখিনি প্রেমিকার মুখ কোনওদিন…

তাতেও কোনও দুঃখ নেই আমার।

ভুল প্রেমে
ক্রমশ অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে,

আমি শুধু তোমাকে

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে দেখেছি
দু-একবার…

তপস্বিনী

অজানা বাতাস আসে কালের ইশারা নিয়ে
যেটুকু যা খড়কুটো ভেসে চলে যায়
কোন দিগন্তের পারে

যেতে দাও তাকে, যে খুঁজেছে তোমাকে
আলো-অন্ধকারে

উপোসের বেলা মুছে দেয়
বিদায়ের সুর

কান পেতে শোনো—

শিবের মতো বর, তুমি তো চাওনি কখনও…

টেলিভিশন

ঘরের পোর্টেবল টিভিটার বয়স হয়েছিল অনেক৷ তীক্ষ্ণতা এবং প্রাবল্য বাড়লে শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে যেত, প্রতিটি দৃশ্যই কেমন যেন একটু ঘোলাটে দেখাত, থেকে থেকেই ঝিরিঝির করত ছবি৷ সিনেমাটা দেখার সময়ও এই সমস্যাগুলো হচ্ছিল৷ সস্তা সিএফএল বাল্বের সাদা আলো অল্প অল্প কাঁপছিল৷ গাঢ় নীলের ওপর কালো ছিট ছিট দাগ একটা প্রজাপতি উড়ছিল এ-দেওয়াল থেকে ও-দেওয়াল৷ যদিও ছেলেটির হুঁশ ছিল না কোনওদিকেই৷ সে সিনেমা দেখছিল আশ্চর্য একাগ্রতার সঙ্গে৷ দেখতে দেখতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছিল৷ অশ্রুমতী নায়িকার চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া হচ্ছিল তার, দিগ্বিজয়ী নায়ককে দেখে জেগে উঠছিল চাপা হিংসে আর দলছুট, বিষণ্ণ খলনায়ককে আরেকটিবার ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে ইচ্ছে করছিল খুব৷ সেই ছেলেবেলা থেকেই তো এরকম হয়৷ সিনেমা দেখতে দেখতে, গল্পের বই পড়তে পড়তে সে হারিয়ে যায় কোনও এক অজানা পৃথিবীতে৷ সহজে ফিরতে পারে না আর৷ ফিরে ফিরে জ্বর আসে শরীরে৷ জ্বরের ভিতরে ভুল বকে৷ দু’তিনদিন কাটে এভাবেই৷ তারপর নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায় আবার৷ অথবা, ঠিক হয় না কিছুই৷ গাঢ় নীলের ওপর কালো ছিট ছিট দাগ একটা প্রজাপতি ফ্যানের ব্লেডের কাছাকাছি গিয়ে নিমেষে বদলে দেয় রেফারেন্স ফ্রেম৷ তখন অশ্রুমতী নায়িকা, দিগ্বিজয়ী নায়ক আর দলছুট খলনায়করা সকলেই জেনে যায় সত্যিটা—

এই ঘরে অবসেস্ড চরিত্ররা বাঁচে না বেশিদিন৷ বয়স যা বাড়ে, তা কেবলই একটা পরিত্যক্ত পোর্টেবল টিভি সেটের…

জন্মদিনের চিঠি

তোমার জন্মদিন কাছাকাছি এসে গেলে, বারবার মনে হয় বাড়ির ঠিকানাটা জানলে কতই না ভালো হত! চিঠি লিখতাম, যেমন চিঠি শুধু অসময়ে হারিয়ে যাওয়া কবি এবং সৈনিকরা লেখে অথচ কাউকেই পাঠাতে পারে না শেষ অবধি৷ উপহারে পাঠাতাম ফুল, যে ফুল স্বর্গের কোনও নিভৃত বাগানে ফোটে শুধু তোমারই জন্য৷ পরীদের দেশে খবর পৌঁছে দিতাম, তোমাদের ওই মফসসল পাড়াটাও যাতে জায়গা পায় তাদের মানচিত্রে৷ আর এসব কিছুই যদি আমি করে উঠতে না পারি, তবুও…

তোমার জন্মদিন এলে, তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয় আমার। আরেকটিবার৷ এখনও।

পুরাতন

পুরোনো লেখায় আছে পুরোনো অসুখ
স্মৃতির কবরে ঢাকা কিছু চেনা মুখ

ধীরে ধীরে জেগে ওঠে ঘুমের আড়ালে
রহস্যময় এই কুয়াশার কালে

বাতাস বদলে যায় ইঙ্গিতে কোনও
কার যেন ডাকনাম ভুলিনি এখনও

ভুলিনি বাঁশির সুর, বিষণ্ণ রথে
রাখাল-জন্ম গেছে অলিগলিপথে

গলি থেকে ভেসে আসে অবুঝ সানাই
পরওয়ারদিগারাকে, বিদায় জানাই

বিদায়ের পরে থাকে নিস্তব্ধতা
মুছে ফেলি বালকের মায়াপ্রবণতা

স্মৃতির কবর পোড়ে মরা জ্যোৎস্নায়
পুরোনো অসুখ লেগে, পুরোনো লেখায়…