গান্ধী এবং রবি ঠাকুরের স্বপ্নের গ্রাম : আজকের পৃথিবী জুড়ে কিছু উদাহরণ

– সুজিত সিনহা

মেন্দালেখা গ্রাম, জেলা – গড়চিরলি, মহারাষ্ট্র 

১। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে, গোন্দ আদিবাসীদের একশ ঘরের এই গ্রাম, মেন্দালেখা, ঘোষণা করে যে “দিল্লি মুম্বাইতে আমাদের সরকার, আমাদের গ্রামে আমরাই সরকার।

২। এই গ্রামে কোনো  নির্বাচিত সরকার নেই। প্রতি মাসে গ্রামসভা মিটিং হয়। এই মিটিং-এ প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন মহিলা এবং একজন পুরুষের আসা আবশ্যিক। পালা করে প্রত্যেক পরিবার থেকে কেউ মিটিং-এর সভাপতি হয়। 

৩। সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে হয়। মানে প্রত্যেককে রাজি হতে হবে, কোনো ভোট হবে না। যদি কোনো একজন রাজি না হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত হবে না। এমনও হয়েছে যে সবাই রাজি না হওয়াতে একটি সিদ্ধান্ত দু বছর আটকে পড়েছিল। 

৪। গ্রামসভার লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো মন্ত্রী সান্ত্রী সরকারি আধিকারিক গ্রামে এসে কারোর সঙ্গে কোনো উন্নয়ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না। কোনো এনজিও, অধ্যাপক বা অন্য কোনো বাইরের লোকের জন্যও একই নিয়ম। 

৫। সরকারি স্কিমের টাকা কীভাবে খরচ হবে তা গ্রামসভায় ঠিক হয় । ১০০ দিনের কাজ (NREGA), পায়খানা স্কিম, ঘর বানানো ইত্যাদি, গ্রামসভা ঠিক করে – কী হবে, কীভাবে হবে, কে কতো টাকা পাবে, কত টাকা গ্রাম কোষে যাবে ইত্যাদি।

৬। বন অধিকার আইন (FRA) ২০০৬ এর অন্তর্গত ভারতের এটি প্রথম গ্রাম যেটি “সামুহিক বন-অধিকার”  পায়। এরা আপাতত  ব্যক্তিগত বনাধিকারের কথা ভাবেনি। 

৭। যদি গ্রামসভা বা গ্রামের কয়েকজন নতুন কিছু শিখতে চায়, কোনো কাজ, কোনো আইন, তখন তারা একটি ‘আলোচনা চক্র’ শুরু করে। এই স্বেচ্ছায় তৈরি দল,  বাইরের কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে চুক্তি করে যা  শিখবার শিখে নেয়। কিন্তু এই আলোচনাচক্রে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়  না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র গ্রামসভারই রয়েছে। আর সেখানে কোনো বাইরের বিশেষজ্ঞ থাকে না। 

৮। দরকার মতো গ্রামসভা বিষয়ভিত্তিক কার্যকরী সমিতি বানায়। যেমন – জঙ্গল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, হিসাব, মহিলা, চাষ, জল, ১০০ দিনের কাজ ইত্যাদি। এই সমিতিগুলিকে গ্রামসভার সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করতে হয়। 

৯। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর , ২০১৪ সালে এই গ্রাম মেন্দালেখা “গ্রামদান” আইনে অর্ন্তভুক্ত হয়। এটি  পঞ্চাশের দশকের শেষে বিনোবা ভাবের শুরু করা একটি ব্যবস্থা। এই আইন মোতাবেক গ্রামে কোনো ব্যক্তিগত জমি থাকবে না। সব জমি গোটা গ্রামের, গ্রামসভার এক্তিয়ারে।

১০। এই রকম আদর্শ গণতন্ত্র এবং সমতা এখন গড়চিরলির অন্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে। ২০১৮ থেকে দুটি ব্লকে মহাগ্রামসভা গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে । একটি মেন্দাকে ঘিরে থাকা ধানোরা ব্লকের ৯০ টি গ্রামসভা নিয়ে। আরেকটি পাশের কোরচি ব্লকে, “আমহি আমচা আরোগ্য সাথী”  নামের একটি এনজিওর উদ্যোগে ৯০ টি গ্রামসভা নিয়ে। 

কিবুৎজ – ইজরায়েল দেশের এক বিশেষ ধরনের গ্রাম

আজকের দিনেও ২৪০ টি কিবুৎজ এর মধ্যে প্রায় ৬০ টি, পুরনো আদর্শ সমাজতান্ত্রিক মন্ত্র কে ধরে রেখেছে। যে মন্ত্রে বলা হয় ‘প্রত্যেকে নিজের ক্ষমতা মত সমাজকে দেবে, আর তারা নিজের প্রকৃত চাহিদা মত সমাজ থেকে পাবে’।

১। কিবুৎজে কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তি নেই। জমি, ঘর, আসবাব, যন্ত্রপাতি, কারখানা, যানবাহন – সব গোটা গ্রামের সম্পত্তি। যে কোনো গ্রামবাসী, কিবুৎজের ভেতরে অথবা বাইরে থেকে যত আয় করুক না কেন, তা গ্রামকোষে জমা পড়বে। গত তিরিশ বছরে চারদিকে ব্যক্তিমালিকানার ধুম, সব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি ডুবে গেছে, সেখানে এই ৬০ টি কিবুৎজ যেন সেই সমাজতান্ত্রিক আগুনকে আবার জ্বালিয়ে দিয়েছে। যেভাবে এক সময় বিনোবাজী উত্তর ভারতের একটি কথাকে কার্যকরী করতে চেষ্টা করেছিলেন – “সবই ভুমি গোপালকি, না কিসি কি মালকি” ।  

২। এখানে প্রত্যেকে সমান ভাতা পায়, সে তারা যে কাজই করুক, যতটা করুক না কেন। অবস্থা বুঝে কেউ অল্প-বেশি পায়। কিন্তু সেটা গ্রামসভার সিদ্ধান্ত মতো। রাঁধুনী, ঝাড়ুদার, সফটওয়্যার পারদর্শী, স্থপতি/আর্কিটেক্ট – সব্বার সমান ভাতা। (এটাই ছিল গান্ধীজির স্বপ্ন – সব কাজের জন্যে সমান মর্য্যাদা ও সমান আয়। জন রাস্কিনের থেকে শিখে তিনি এটি নিজের দক্ষিণ আফ্রিকার ফিনিক্স আশ্রমে চালু করে দেন)। 

৩। কারো বাড়িতে আলাদা রান্নার হাঁড়ি চড়ে না। গোটা গ্রামের রান্না হয় সামূহিক রান্নাঘরে/কমিউনিটি কিচেনে। একসঙ্গে খাওয়া হয় একটি খাবার হলে। এতে জ্বালানি, জল ইত্যাদির সাশ্রয় তো হয়ই, সবচেয়ে বড়ো কথা – বাড়িতে রান্না মানেই মুলত মহিলাদের ঘাড়ে দায়িত্ব, সেটার থেকে তারা রেহাই পায় । এর ফলে স্ত্রী-পুরুষ বৈষম্যকে সরানোর লড়াইটা সহজ হয়। তাছাড়া, খাবার ঘরে রোজ দেখা, গল্প, নানা বিষয় আলোচনা – সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। 

৪। বাচ্চারা গোটা গ্রামের , কোনো একটা পরিবারের নয়। একটি বয়সের পর তারা নিজেদের আলাদা কেন্দ্রে বাস করে। এই কেন্দ্রের পরিচালনা তারা নিজেরাই করে। এটা এতটাই অভাবনীয় যে বহু বছর ধরে অনেক পর্যটক এই কেন্দ্রগুলিকে দেখতে ইজরায়েলে আসে, ছোটোবেলা থেকে দায়িত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবহার কীরকম হতে পারে তাই দেখতে। বাচ্চাদের ভালোভাবে বড় হওয়াটা কেবল তার বিশেষ পরিবারের চিন্তা নয়। গোটা গ্রামের। এর ফলেও মহিলাদের স্বাধীনতা অনেকটা বেড়ে যায়। এই কেন্দ্রগুলির সঙ্গে মধ্য ভারতের আদিবাসীদের “ঘোটুল” , যা এখন লুপ্তপ্রায়, তার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে। 

৫। কিবুৎজের আরম্ভের দিন থেকেই স্ত্রী-পুরুষদের মধ্যে কাজ নিয়ে কোনো বৈষম্য নেই, এমনকী খুব শারীরিক পরিশ্রমের কাজের ক্ষেত্রেও। আমরা দেখলাম যে দুইটি বিশেষ কাজ – শিশুপালন এবং রান্না – যেগুলি নারীদের জন্য ধরে নেওয়া হয়, সেগুলিকে পরিবারের বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে। নারীরা যাতে সব রকম কাজ করার স্বাধীনতা পায় তার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

৬। এখানে সমস্ত সভ্যদের নিয়ে সাধারণ সভাই সব সিদ্ধান্ত নেয়;  যাবতীয় টাকা-পয়সার সিদ্ধান্তও এর অর্ন্তগত। তিনটি পদ রয়েছে, যেগুলি স্বেচ্ছায় এবং অবৈতনিকভাবে সব সভ্যদের পালা করে দায়িত্ব নিতে হয় (অনেকটা মেন্দালেখার মত, যেখানে কোনো নির্বাচিত নেতা নেই। সবাইকে কোনো না কোনো কমিটির সদস্য হয়ে কাজ করতে হয়)। 

৭। কিবুৎজ আন্দোলন শুরু ১৯১০ সালে। এই আন্দোলন অনেক টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে গেছে। ১১০ বছরের পুরনো এই আন্দোলন মোটেই ক্ষণস্থায়ী নয়। যেটা বিশেষভাবে বলা দরকার যে, ১৯৯০ সাল থেকে গতিশীল বাজারীকরণ, ব্যক্তিবাদের আঘাতকে প্রতিরোধ করে প্রায় ৬০টি কিবুৎজ নিজের পুরনো সমাজবাদের আদর্শকে ফের দাঁড় করাতে পেরেছে। 

জাপাতিস্তা, চিয়াপাস – মেক্সিকো

১ জাপাতিস্তা কী?

উত্তর আমেরিকায় মেক্সিকো, জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর ১০ নম্বর দেশ। এই মেক্সিকোর চিয়াপাস রাজ্যের আদিবাসীদের শিল্প সভ্যতার বিকল্প খোঁজার আন্দোলনের নাম জাপাতিস্তা। বিশ্বায়ন/ভুবনায়ন, নয়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। দুটি কারণে এই আন্দোলনটি অসাধারণ।  প্রথমত, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই আন্দোলন চলছে এবং ক্রমশ একটি পরিপূর্ণ সভ্যতার আকার ধারণ করছে। দ্বিতীয়ত, সাধারণভাবে এই রকম বিকল্প আন্দোলন কয়েকটি গ্রাম আর শহর জুড়ে দেখা যায়। এটি কিন্তু ২০০০ টি গ্রাম, ২৯ টি শহর, প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিয়ে , আজ পৃথিবীর এই ধরনের সবচেয়ে বড়ো আন্দোলন। 

২ ইতিহাস 

জাপাতিস্তা আন্দোলন শুরু হয় ১৯৯৪ সালের ১ লা জানুয়ারি, মেক্সিকো সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিবাদের মাধ্যমে। সেদিন মেক্সিকো, আমেরিকা, কানাডা এই তিন দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যের চুক্তি (NAFTA) শুরু হচ্ছিল। পৃথিবীর নানা জায়গায় বামপন্থী গেরিলা সংঘর্ষ যেমন হয়, এদেশের নকশাল আন্দোলন যেমন হয়েছিল, এই আন্দোলনটিও সেই ধাঁচে হয়েছিল। কিন্তু অল্প কয়েক দিনেই জাপাতিস্তারা বুঝল আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সহিংস লড়াই কঠিন এবং ধংসাত্বক। তাই হিংসা বাদ দিয়ে, গত ২৫ বছর ধরে শিল্প সভ্যতার বিকল্প সমাজ গড়ার জন্যে তৃণমূল থেকে মানুষের সংগঠন তৈরির কাজই তারা করছে।

৩ মহিলা শক্তি

প্রথম দিন থেকে এই আন্দোলনের একটা মূল উদ্দেশ্য মহিলাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এজন্যে তারা তৈরি করেছে “বিপ্লবী মহিলা আইন”। পরবর্তীকালে সব ধরনের লিঙ্গসাম্য (LGBTQ) এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্যেও তারা তৎপর হয়। 

৪ নেতা

আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ব্যাপক আদিবাসী আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন (সাব কমান্দান্তে) মার্কোস। যিনি নিজে আদিবাসী নন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। কয়েক বছর আগে তার জায়গায় এই আন্দোলনের মুখপাত্র হয়েছেন আদিবাসী নেত্রী মারিয়া মারতিনেজ। জাপাতিস্তারা চায় যে তাদের আন্দোলনে সবাই যুক্ত হোক। তারা মনে করে, পৃথিবীর যেখানে এই ধরনের আন্দোলন হচ্ছে, তাদের সঙ্গে জাপাতিস্তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রয়োজন রয়েছে।   এ হল আদিবাসী আর অনাদিবাসীর মধ্যে বিভেদকে মিলিয়ে দেওয়ার এক সাধু প্রচেষ্টা।

৫ গ্রাম স্তরে সহভাগী সরকার

এখানকার আদিবাসীদের প্রত্যেক গ্রামে (আনুমানিক জনসংখ্যা ৩৫০) নিয়মিত জনসভা হয়। এই সভায় “১২ বছরের” ওপরে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে! গ্রাম-সরকারের তিনটি সংস্থা আছে – একটি দৈনন্দিন কাজ দেখার জন্য। একটি জমি আর ঝগড়া-বিবাদ মেটানোর জন। আর তৃতীয়টি হল পুলিশ।

৬ ত্রিস্তর সরকার

গ্রামের ওপর স্তরকে বলে মারেয। প্রত্যেকটিতে গড়ে ৩৫ টি গ্রাম রয়েছে। ২০০৩-এ তারা পাঁচটি জেলা স্তরের সরকার গঠন করে। যার নাম হল কারাকোলে। প্রত্যেকটি কারাকোলে রয়েছে ৬ – ৮  টি করে মারেয। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সরকারি কর্মচারীদের গ্রামবাসীরা নির্বাচন করে। কোনো পরীক্ষা বা ভোট বা প্রচার হয় না। দ্বিতীয় আশ্চর্যের ব্যাপার হল, কর্মচারীরা এক নাগাড়ে সর্বাধিক ১৫ দিন কাজ করে। তারপর এক মাস বাদ দিয়ে আবার ১৫ দিন কাজ করে। এইভাবে চলে তিন বছর অবধি। তৃতীয় আশ্চর্য হল – কর্মচারীরা কোনো মাইনে পায় না; গ্রামের সবাই তাদের পারিবারিক চাহিদার দায়িত্ব নেয়! এই রকম সরকার পৃথিবীতে আর কোথাও  কি আছে?

৭ শিক্ষা

কল্পনা করুন এমন স্কুল যেখানে শুধু শিশু বা অল্পবয়সীরা নয়, সব বয়সের মানুষই শিখছে। যে স্কুলে শিক্ষক একজন আদিবাসী এবং আদিবাসী ভাষা হচ্ছে শেখার মাধ্যম। আবার স্প্যানিশ ভাষাও শেখানো হচ্ছে। শেখানো হচ্ছে আদিবাসী ইতিহাস, আজকের রাজনীতি। আর আনন্দময় জীবন-জীবিকার জন্যে যা যা দরকার তা সবই শেখানো হচ্ছে। শিক্ষা শুধু ক্লাসে বসে নয়, অনেকটাই হচ্ছে মাঠে-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে–সমবায়-কারখানাতে। আর আশ্চর্য – শিক্ষক কোনো নগদ মাইনে পায় না; গ্রামবাসীরা তার জাগতিক চাহিদা মেটায়! গান্ধীজি আর রবি ঠাকুর দেখলে কি আনন্দই না পেতেন।

৮ স্বাস্থ্য 

প্রত্যেক গ্রামে একজন স্বাস্থ্য কর্মী আছে, যাকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে তার দক্ষতা বাড়ানো হয়। বেশির ভাগ মারেযে  একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। জাপাতিস্তাদের কয়েকটা বড়ো হাসপাতাল আছে, যার মধ্যে একটি শুধু মহিলাদের জন্যে। অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা দিয়ে শুরু হলেও, ক্রমশ ভেষজ এবং অন্যান্য দেশি চিকিৎসা পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

৯ অর্থনীতি

ব্যক্তিগত জীবিকার থেকে সমবায়ের ওপর বেশি জোর দেয় জাপাতিস্তারা। চাষ, পশুপালন, খাবার জিনিস তৈরি, তাঁত, কফি চাষ, উপযুক্ত প্রযুক্তি ইত্যাদি – সবই সমবায় ভিত্তিতে উৎপাদন করে,  তা বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়।

১০ মুল ভাবনা-চিন্তা, নীতি 

কৌশল বোঝানোর জন্যে স্লোগান ও ছবির ব্যবহার

বেশির ভাগ সফল আন্দোলন সুন্দর স্লোগান ও ছবির ব্যবহার করেই থাকে। কিন্তু জাপাতিস্তারা সবাইকে টেক্কা দিয়ে রেখেছে। ওদের কিছু স্লোগান এখন গোটা বিশ্বে ব্যবহার হচ্ছে। “অনেক হয়েছে , আর নয় “ (Ya Basta), “সেই জগতই চাই যে একখানা, যার ভেতরে থাকবে জগত নানা “ (A World Where Many Worlds Fit ), “প্রশ্ন করতে করতে চলা” ( Asking We Walk) ইত্যাদি। 

১১ চিয়াপাস-মেক্সিকোর সীমান্ত পেরিয়ে 

জাপাতিস্তারা গত ৮-১০ বছরে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আর্ন্তজাতিক কর্মশালা, সম্মেলন করেছে। যার মধ্যে দুটি হয়েছে শুধু নারীদের জন্য সম্মেলন। এত মানুষ এই স্বপ্নের আন্দোলনকে দেখতে যেতে চায় যে, এখন কোনো গ্রামে গিয়ে থাকার জন্য আগের থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হয়।  

আমেরিকা দেশের আমিশ সম্প্রদায়

আমরা জানি আমেরিকার সমাজ ভোগবাদ আর আত্ম-কেন্দ্রিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ। সেই দেশের কিছু শহরের কাছেই এমন কিছু গ্রাম আছে যারা এই ভোগবাদ আর আত্ম-কেন্দ্রিকতাকে একেবারে নাকচ করে দিয়েছে। এমনকী শিল্প সভ্যতার অসাধারণ সুবিধেজনক বহু জিনিসকে এরা ব্যবহার করে না, বা খুব কম ব্যবহার করে । 

১। তারা ইলেকট্রিক লাইন নেয়নি। রাত্রের আলো মানে সেই পুরোনো তেলের লম্ফ।

২। অতএব বিদ্যুৎ চালিত মেশিন বাড়িতে নেই – ফ্রিজ, মিক্সি, ফ্যান, ওয়াশিং মেশিন ইত্যদির প্রশ্নই নেই।

৩। তাদের গ্রামে তারা কোনো দিন রেডিও ও টিভি ঢুকতে দেয়নি।

৪। কোনো রকম আধুনিক যানবাহন গ্রামে নেই – মোটরবাইক, গাড়ি, ট্রাক্টর ইত্যাদি। তারা ছোট্ট ঘোড়া গাড়ি ব্যবহার করে। চাষ হয় ঘোড়ার লাঙ্গলে। 

৫। টেলিফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। গ্রামের মধ্যে কারোর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলা যায় না।

৬। তাদের নিজস্ব স্কুল ও পাঠ্যক্রম আছে। তারা রাষ্ট্রের পাঠ্যক্রম মানে না। মোটামুটি অষ্টম শ্রেণি অবধি তারা পড়াশোনা শেখে। তারপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-ব্যবস্থা নেই। 

৭। একেবারে কোনো রকম শারীরিক হিংসা নেই। তারা দেশের সৈন্যবাহিনীতে বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি।

৮। তারা নিজেদের কোনো ছবি তোলে না। অতএব কোন প্রকার ছবি সমেত আইডেন্টিটি কার্ড ওদের নেই। 

৯। কোনো সরকারি ভাতা, পেনশন, দান তারা নেয় না। কোনো জীবনবিমা করে না।

১০। তারা কিন্তু আমেরিকার মুল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাদের রীতিমত কেনা-বেচা লেন-দেনের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের তৈরি কাঠের আসবাবপত্র এবং দুধ থেকে তৈরি নানা সামগ্রীরপ্রচুর চাহিদা রয়েছে। 

১১। ১৮ বছর বয়স হলে ওদের বেছে নিতে বলা হয় যে তারা গ্রামে থাকবে না বেরিয়ে যাবে। বাইরে ওদের অবাধ স্বাধীনতা, ভোগবিলাসের, আর অনেক কিছু করার সুযোগ। যেটা গ্রামে নিষিদ্ধ। তাই তাদের মধ্যে অনেকে বেরিয়ে যায়। 

১২। তারা স্বেচ্ছায় ফেরত আসতে পারে। তবে ফেরত এলে সম্প্রদায়ের সব নিয়মই মানতে হবে। অনেকে ফেরতও আসে।

১৩। গত ৩০ বছরে তাদের জনসংখ্যা দুগুণ হয়ে গেছে। তিন থেকে ৩০ টা রাজ্যে আমিশরা ছড়িয়ে পড়েছে। এখন গোটা দেশে তাদের প্রায় ২০০০টি গ্রাম রয়েছে।

১৪। সাধারণ অ্যামেরিকানদের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্য উন্নত । আমিসশরা বেশিরভাগ বেশ সুখী। প্রকৃতিকে তারা শোষণ করে না বললেই চলে।  

১৫। পৃথিবীতে ইদানিং কালে এত দীর্ঘমেয়াদি, এত সংখ্যায়, একটি সম্প্রদায়, শিল্প সভ্যতার ‘অসাধারণ’ অবদানগুলি না ব্যবহার করে, সুখে-স্বাচ্ছন্দে আছে – এই রকম উদাহরণ প্রায় নেই। 

১৬। এটা কী করে সম্ভব হল? যখনই নতুন কিছু আসে সেটাকে যাচাই করা আর গ্রহণ করার জন্য আমিশদের একটা সহজ মাপকাঠি আছে। তারা খতিয়ে দেখে যে সেই ‘নতুন’, তাদেরকে একে অন্যের কাছাকাছি আনবে না দূরে ঠেলে দেবে। যা কিছু তাদের একে অন্যের থেকে দূরে ঠেলে দেয় তা তারা নেয় না। তাদের সবচেয়ে বড় গালি হচ্ছে ‘হকমুট’ যার অর্থ হল অহঙ্কারী। 

সব মিলিয়ে আগামীর একটি ভালো গ্রামের / 

গ্রাম-স্বরাজের ছবি

মে – মেন্দাগ্রাম, কি – কিব্যুতজ, 

 জা  – জাপাতিস্তা,  আ – আমিশ

১। গ্রাম হবে একটা যৌথ পরিবার। (কি) 

২। তার মানে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ধন-সম্পত্তি ও উৎপাদন প্রায় নেই-এর সমান। সবই গোটা গ্রামের। এক অর্থে “গ্রামীণ সমাজবাদ”। (মে, কি)

৩। সব আয়, গ্রামের ভেতরে কিংবা বাইরে কাজ করে হোক, একটি গ্রামকোষে জমা পড়বে (কি)

৪। যে যাই কাজ করুক না কেন, প্রত্যেক পরিবার এই আয়–উৎপাদনের সমান ভাগ পাবে। (কি) 

৫। পারিবারিক রসুই ঘর নয়; যৌথ রান্না-খাওয়া হবে। (কি) 

৬। সব সিদ্ধান্ত গ্রামসভায় সবাই মিলে নেবে, অর্থাৎ “সহভাগী গণতন্ত্র”। এতে ১২ বছরের ওপর কিশোর কিশোরীরাও অংশগ্রহণ করবে। (মে, কি, জা) 

৭। কে কোন কাজ করবে তা গ্রামসভায় ঠিক হবে। বেকার বলে কেউ থাকবে না। (কি, জা) 

 ৮। কোনো পরিবার আলাদাভাবে বাজারের সঙ্গে লেন-দেন করবে না। বেচাকেনা সব হবে যৌথভাবে। এক্ষেত্রে দরকার মতো একটি আলাদা কমিটি বানিয়ে নেওয়া হবে। 

৯। বাচ্চাদের দেখাশোনা আর মানুষ করা কোন একটি পরিবারের নয়, বাচ্চারা গোটা গ্রামের দ্বায়িত্ব । (কি)

১০। গ্রামের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। যেটা হবে এই ভালো গ্রামের আদর্শের সাথে মানানসই (জ, আ)। এর মধ্যে থাকবে নানা ধরণের শিখন-আড্ডা। (মে) 

১১। বারবার আলোচনার মাধ্যমে গ্রামবাসীদের ঠিক করতে হবে –

# ভালো সমাজ, ভালো থাকা, ভালো মানুষ বলতে তারা কী বোঝে  

# তার ভিত্তিতে তারা ঠিক করবে যে – কী কী নেবে/ভোগ করবে; কী করবে না; এবং কী কী সীমিত আকারে করবে (আ)

১২। “আভ্যন্তরীণ সত্যাগ্রহের” মাধ্যমে নিজেদের সমাজের দোষ ত্রুটিগুলি শোধরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবে। (মে, জা) 

১৩। রাষ্ট্র বা রাজ্যের বড় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে ফেলতে হবে। খাদ্য–ঘর-অন্যান্য সুবিধে – এই সব ব্যবস্থা গ্রামকেই করতে হবে; মানে “রাষ্ট্রবাদ” বাতিল। (জা, আ) 

১৪। ১০-১২ টি গ্রাম নিয়ে একটি গ্রাম-সমষ্টি, তারপর ১০-১২ টি গ্রাম-সমষ্টি নিয়ে আরো বড় ~১০০ টি গ্রামের সমষ্টি বানানো ও তাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এইসব গ্রাম এবং তার বড়-বড় সমষ্টি – ক্ষমতার দিক দিয়ে সবাই সমান — গান্ধীজির ভাষায় “সম-স্তরের সামুদ্রিক বৃত্ত” তৈরি হবে এই গ্রাম এবং সমষ্টিগুলি। (মে, জা)